জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ব্রেইল পদ্ধতির জন্ম: বই পুড়েছিল, কিন্তু থামেনি লুই ব্রেইল

নিজে দৃষ্টিহীন হয়েও হাজারো দৃষ্টিহীন মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন লুই ব্রেইল। আজ তাঁর জন্মদিন। এই কিংবদন্তীর স্মরণে বিশ্বজুড়ে আজকের দিনটি বিশ্ব ব্রেইল দিবস হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু যে পদ্ধতির জন্য আজ বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিহীনরা শিক্ষার আলো পাচ্ছে, সেই ‘ব্রেইল পদ্ধতি’তাঁর জীবদ্দশায় ছিল উপেক্ষিত।

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ০৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন এমন মানুষের মধ্যে লুই ব্রেইল অন্যতম। তিনি ১৮০৯ সালের ৪ জানুয়ারি এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এই কিংবদন্তীর স্মরণে বিশ্বজুড়ে আজকের দিনটি বিশ্ব ব্রেইল দিবস হিসেবে পালিত হয়।

আমরা প্রায় সবাই ‘ব্রেইল’ পদ্ধতি সম্পর্কে কমবেশি জানি। দৃষ্টিশক্তি ছাড়াই এক থেকে ছয় বিন্দুতে অঙ্গুলি নির্দেশনা ও স্পর্শের মাধ্যমে প্রতিটি অক্ষর উপলব্ধি করে লেখা ও পড়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ব্রেইল পদ্ধতি। এর আবিষ্কারক লুইস ব্রেইল। তিনি যক্ষ্মায় ভুগে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে যখন মারা যান, তখনও জানতেন না এই আবিষ্কারে তিনি হয়ে উঠবেন অন্ধজনে আলো ছড়ানো এক ধ্রুবতারা।

অন্ধকারে ঢেকে যাওয়া শৈশব

লুই ব্রেইলের জন্ম ফ্রান্সের প্যারিস থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরের ছোট এক গ্রামে। গ্রামটির নাম কুপভ্রে। বাবা সাইমন রেনে ব্রেইল ছিলেন গ্রামের একজন চামড়া ব্যবসায়ী (চর্মকার)। বাবার কর্মশালায় চামড়া কাটার নানা ধারালো যন্ত্রপাতি নিয়ে খেলা করাই ছিল ছোট্ট লুইয়ের নেশা। কিন্তু মাত্র তিন বছর বয়সে সেই খেলার নেশাই লুইয়ের জীবনে চিরস্থায়ী অন্ধকার হয়ে নেমে আসে। বাবার অনুপস্থিতিতে চামড়া ফুটো করার একটি ধারালো সুঁচ বা ‘অল’নিয়ে খেলতে গিয়ে সেটি সোজা গেঁথে যায় তাঁর ডান চোখে। চিকিৎসার অভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তাঁর বাম চোখেও। পৃথিবীর আলো দেখতে না দেখতেই ছোট্ট লুইকে অন্ধত্ব বরণ করে নিতে হয়।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে লুই ব্রেইল দিনরাত পরিশ্রম করে বার্বিয়ারের সেই জটিল ১২ বিন্দুর পদ্ধতিকে কমিয়ে ৬ বিন্দুতে নামিয়ে আনেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষের আঙুলের ডগায় ১২ বিন্দু একসঙ্গে অনুভব করা কঠিন। কিন্তু ছয় বিন্দুর বিন্যাস আঙুলের স্পর্শে সহজেই বোঝা সম্ভব।

কিন্তু দৃষ্টি হারালেও শেখার অদম্য কৌতূহল লুইকে আটকে রাখতে পারেনি। দৃষ্টিহীনতা লুইয়ের জীবনে যেন বাঁধা না হয়ে দাঁড়ায় এই উদ্দেশ্যে তাঁর বাবা-মা ও জ্যাকুস পলি নামের গীর্জার এক যাজক তাঁকে কুপভ্রের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। সেখানে অসামান্য মেধার পরিচয় দেন লুই। কিন্তু অন্ধত্ব সেখানেও বাঁধা হয়ে দাড়ায়। কারণ, শিক্ষাপদ্ধতি ছিল সাধারণ শিশুদের জন্য। দশ বছর তিনি সেই বিদ্যালয়েই পড়াশোনা করেন। লুইয়ের মেধা ও সৃজনশীলতা বিদ্যালয়ের পাদ্রীদের মুগ্ধ করে।

তাই ১৮১৯ সালে লুইকে ‘রয়্যাল ইনস্টিটিউট ফর ব্লাইন্ড ইয়ুথ’ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। এটি ছিল তৎকালীন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য বিদ্যালয়গুলোর একটি।

কিন্তু প্যারিসের সেই স্কুলে ভর্তি হয়ে লুই দেখলেন দৃষ্টিহীনদের পড়াশোনার ব্যবস্থা তখনও খুবই সেকেলে। ভ্যালেন্টাইন হাউ নামের এক ব্যক্তির আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে তাঁদের পড়ানো হতো, যেখানে মোটা কাগজের ওপর বড় বড় করে ইংরেজি অক্ষরগুলো উঁচু করে ছাপানো থাকত। ছাত্ররা সেই উঁচু অক্ষরে হাত বুলিয়ে পড়ত। কিন্তু সেই বইগুলো ছিল বিশাল ও ভারী, আর একটি পাতা পড়তেই অনেক সময় লেগে যেত। যেহেতু ভ্যালেনটাইন হাউ নিজে দৃষ্টিহীন ছিলেন না, তাই তাঁর পক্ষে পুরোপুরিভাবে বোঝা সম্ভব ছিল না যে একজন দৃষ্টিহীনের পক্ষে এই বই পড়তে কী অসুবিধা হতে পারে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এই পদ্ধতিতে শুধু পড়া যেত, কিন্তু দৃষ্টিহীনদের পক্ষে কোনো কিছু লেখার উপায় ছিল না। লুই বুঝতে পারলেন, এমন এক ভাষা দরকার যা দিয়ে তাঁরা শুধু পড়বে না, লিখতেও পারবে। ঠিক এই সময়েই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় একটি ঘটনা।

ব্রেইল পদ্ধতির জন্ম যেভাবে

১৮২১ সালে চার্লস বার্বিয়ার নামের ফরাসি সেনাবাহিনীর এক ক্যাপ্টেন তাঁদের স্কুল পরিদর্শনে আসেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের জন্য অন্ধকারে ও নিঃশব্দে সংবাদ আদান-প্রদানের একটি বিশেষ সংকেত পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘নাইট রাইটিং’। এটি ছিল ১২টি বিন্দুর সমন্বয়ে তৈরি একটি জটিল সংকেত। সৈন্যরা এটি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করায় সেনাবাহিনী এটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু কিশোর লুই ব্রেইল এই পদ্ধতির মাঝেই এক বিশাল সম্ভাবনা দেখতে পেলেন।

লুই ব্রেইলের বই। সংগৃহীত ছবি
লুই ব্রেইলের বই। সংগৃহীত ছবি

মাত্র ১৫ বছর বয়সে লুই ব্রেইল দিনরাত পরিশ্রম করে বার্বিয়ারের সেই জটিল ১২ বিন্দুর পদ্ধতিকে কমিয়ে ৬ বিন্দুতে নামিয়ে আনেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষের আঙুলের ডগায় ১২ বিন্দু একসঙ্গে অনুভব করা কঠিন। কিন্তু ছয় বিন্দুর বিন্যাস আঙুলের স্পর্শে সহজেই বোঝা সম্ভব। ১৮২৯ সালে তিনি এই নতুন পদ্ধতিটি প্রকাশ করেন, যা আজকের ‘ব্রেইল পদ্ধতি’নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে ছয়টি বিন্দুর নানা বিন্যাসে ৬৩টি অক্ষর, সংখ্যা, এমনকি সংগীতের স্বরলিপিও লেখা সম্ভব ছিল। লুই চেয়েছিলেন তাঁর স্কুলের অন্ধ ছাত্ররা এই সহজ পদ্ধতিতে পড়াশোনা করুক।

যখন ব্রেইলকে থামাতে চেয়েছিল প্রতিষ্ঠান

স্কুলের তৎকালীন পরিচালক ও রক্ষণশীল শিক্ষকরা এই নতুন পদ্ধতি মেনে নিতে চাইলেন না। তাঁদের যুক্তি ছিল, দৃষ্টিহীনরা যদি এমন কোনো সাংকেতিক ভাষায় লেখে যা সাধারণ অক্ষরের মতো নয়, তবে তাঁরা সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আসলে শিক্ষকদের ভয় ছিল যে এই পদ্ধতি গৃহীত হলে ছাত্রদের ওপর তাঁদের কর্তৃত্ব কমে যায় কি না! তাঁদের আর দরকার পড়বে না! বিশেষ করে স্কুলের নতুন পরিচালক পিয়েরে আর্মান্ড দুফো ব্রেইল পদ্ধতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। ব্রেইল পদ্ধতিতে মুদ্রিত বহু বই ধ্বংস করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। আর পরিচালক নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা প্রতিটি বই ও লেখার যন্ত্রপাতি সব একসাথে জড়ো করে স্কুলের উঠানে পুড়িয়ে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, সেই ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক ড. আলেকজান্ডার ফ্রাঙ্কোরেন পেইনিয়ারকে ‘দি হিস্ট্রি অফ ফ্রান্স’বইটি ব্রেইলের ভাষায় অনুবাদ করার জন্য বরখাস্ত করা হয়।

লুই ব্রেইল পরবর্তীতে সেই স্কুলেই শিক্ষকতা শুরু করেন, কিন্তু তাঁর আবিষ্কৃত পদ্ধতিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহারের অনুমতি পাননি। কিন্তু লুই দমে যাননি, তিনি জানতেন তাঁর পদ্ধতিটিই সবচেয়ে উপযোগী। তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে ছাত্রদের এই পদ্ধতি শেখাতেন। ছাত্ররাও দেখল যে পুরোনো পদ্ধতির চেয়ে লুইয়ের পদ্ধতিতে তাঁরা বেশ দ্রুত লিখতে ও পড়তে পারছে। তাই তারাও লুকিয়ে লুকিয়ে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ালেখার চর্চা চালিয়ে যেতে লাগল।

দিনরাত পরিশ্রম আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে লুই ব্রেইল মাত্র ৪০ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। চরম হতাশা আর বুকভরা অভিমান নিয়ে ৪৩ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন লুই ব্রেইল। তাঁর মৃত্যুর সময় প্যারিসের কোনো বড় পত্রিকায় শিরোনাম হয়নি, কোনো রাষ্ট্রীয় শোক পালন হয়নি। জানা যায়, তাঁর শেষকৃত্যেও অল্পসংখ্যক লোকের সমাগম হয়েছিল। প্যারিসের এক কোণে অবহেলায় সমাহিত করা হয় তাঁকে।

অবশেষে ইতিহাসের ন্যায়বিচার

লুইয়ের মৃত্যুর মাত্র দুই বছর পর, ১৮৫৪ সালে স্কুলের ছাত্ররা কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো দাবি তোলে যে তাঁরা ব্রেইল পদ্ধতিতেই পড়তে চায়। ছাত্রদের দাবির মুখে আর এই পদ্ধতির কার্যকারিতা দেখে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স সরকার ও স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্রেইল পদ্ধতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

লুই ব্রেইল মারা যাওয়ার পর তাঁর আবিষ্কারের খ্যাতি ঝড়ের গতিতে ফ্রান্স ছাড়িয়ে প্রথমে ইউরোপ এবং পরবর্তীতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৭৮ সালে বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিহীনদের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্রেইলকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

১৯২৯ সালে লুই ব্রেইলের গ্রামে 'লুই মনুমেন্ট'-এর সামনে। এএফবি থেকে নেওয়া ছবি
১৯২৯ সালে লুই ব্রেইলের গ্রামে 'লুই মনুমেন্ট'-এর সামনে। এএফবি থেকে নেওয়া ছবি

ভাগ্যের পরিহাস এই যে, যার শিখন পদ্ধতি একসময় নিষিদ্ধ ছিল, পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল যার বই, সেই পদ্ধতিই হয়ে উঠল কোটি কোটি মানুষের চোখের আলো।

আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ভাষায় ব্রেইল পদ্ধতিতে বই আছে। লুই ব্রেইল আজ আর কোনো সাধারণ নাম নন, তিনি অন্ধজনে আলো ছড়ানো এক মহানায়ক।

মৃত্যুর ১০০ বছর পর, ১৯৫২ সালে লুই ব্রেইলের দেহাবশেষ তাঁর গ্রামের কবর থেকে তুলে এনে প্যারিসের প্যান্থিয়নে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়। কেননা এই স্থানটিতে সমাহিত করা হয় ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। তবে লুইয়ের জন্মস্থান কুপভ্রে গ্রামের মানুষের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর শরীরের একটি অংশ সংরক্ষণ করা হয় ব্রেইলের গ্রামের বাড়ির কবরে।

শুধু তাই নয়, ২০০৯ সালে তাঁর ২০০তম জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে স্মারক ডাকটিকিট, প্রদর্শনী ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া ব্রেইলের জন্মস্থান কুপভ্রে তাঁর বাসভবনটিকে ঐতিহাসিক ভবন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সেখানে ‘লুইস ব্রেইল’জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। প্যারিস শহরের চত্বরে ব্রেইলের স্মরণে তৈরি একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, যা ‘ব্রেইল স্কয়ার’নামে পরিচিত।

লুই ব্রেইল সেই দুর্ভাগা মানুষদের একজন যারা আজীবন কাজ করে গেছেন মানুষের কল্যাণে কিন্তু জীবদ্দশায় নিজের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদার স্বাদ ভোগ করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর আবিষ্কৃত ছয় বিন্দুর সেই জাদুকরী স্পর্শ আজও অন্ধকারে থাকা কোটি কোটি মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন আলোয় পৃথিবীকে দেখার।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত