বিশ্ব হাতি দিবস

হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসনে বনে বাঁশঝাড়-ক্ষতিপূরণ

Multiple Authors
স্ট্রিম প্রতিবেদক ও স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাঙামাটি

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ২২: ৩৪
হাতি তার নির্দিষ্ট করিডোর দিয়ে চলাচল করে। সেখানে বাধা পড়লেই মানুষের জানমালের ক্ষতি হয়। স্ট্রিম গ্রাফিক

বন উজাড়, খাদ্যাভাব ও চলাচলের পথ (করিডোর) রুদ্ধ হওয়ায় অস্তিত্ব সংকটে হাতি। খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে এসে গত এক দশকে যেমন দেশে দেড় শতাধিক বুনো হাতি মারা পড়েছে, তেমনি প্রাণ গেছে বহু মানুষের। এতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীর সঙ্গে মানুষের বিরোধ তৈরি হয়েছে।

এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে বুধবার পালিত হলো বিশ্ব হাতি দিবস। হাতিকে বাঁচাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে বাঁশবাগান সৃজন, জলাধার নির্মাণসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। একইসঙ্গে বাড়ানো হয়েছে হাতির হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, বুনো হাতির সুরক্ষায় প্রধান বাধা বনের ভেতর দিয়ে সড়ক তৈরি এবং চলাচলের পথে বসতি স্থাপন। এতে হাতির পাল চলাচলে বাধা পেয়ে দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, তখনই ঘটছে প্রাণহানি।

এক দশকে ১৫১ হাতির মৃত্যু

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এশিয়ান হাতি বর্তমানে ‘মহাবিপন্ন’ প্রাণী। বন বিভাগের তথ্য ও বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে সারা দেশে অন্তত ১৫১টি বন্য হাতি প্রাণ হারিয়েছে, যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, পাতা ফাঁদে আটকে, গুলিবিদ্ধ হয়ে বা ট্রেনের ধাক্কায় বাড়ছে হাতির মৃত্যু।

এশীয় হাতি বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এমএ আজিজ বলেন, ‘উন্নয়নের নামে বন খণ্ডবিখণ্ড হচ্ছে। হাতির আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য সংকটে পড়ে এরা লোকালয়ে আসছে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাড়ছে।’

উদ্বেগের বিষয়, ২০১৬ সালের পর দেশে হাতির নতুন কোনো জাতীয় জরিপ হয়নি। ওই জরিপে দেশে হাতি ছিল ২১০ থেকে ৩৩০টি। এরপর থেকে হাতি সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সুরক্ষায় বাঁশবাগান ও জলাধার

ক্রমহ্রাসমান এই প্রাণীকে বাঁচাতে সরকার দেশজুড়ে ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে। রাঙামাটিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি এলাকায় এই প্রকল্পের অধীনে কাজ চলছে। হাতির খাদ্যের জোগান দিতে রাঙামাটির হাতি অধ্যুষিত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচ হেক্টর জমিতে বাঁশবাগান তৈরি করা হয়েছে। বনের ভেতরে হাতির গোসল ও পিপাসা মেটাতে জলাধার (রিজার্ভার) তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে বন বিভাগের।

গত এক দশকে সারা দেশে অন্তত ১৫১টি বন্য হাতি প্রাণ হারিয়েছে, যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, পাতা ফাঁদে আটকে, গুলিবিদ্ধ হয়ে বা ট্রেনের ধাক্কায় বাড়ছে হাতির মৃত্যু।

মাঠে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এসএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। আগে স্বেচ্ছাসেবকেরা বিনামূল্যে সহায়তা করতেন। এখন হাতির দেখভাল ও স্থানীয়দের সতর্ক করতে তিনটি ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে। হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় এই দলের সদস্যদের প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে সম্মানী, ইউনিফর্ম ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে।

দ্বন্দ্ব নিরসনে ক্ষতিপূরণ

হাতির পাশাপাশি হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে। তাই ক্ষোভ কমাতে হাতির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে বন বিভাগ। ডিএফও সাজ্জাদ হোসেন জানান, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। নিহতের পরিবারকে ৩ লাখ, গুরুতর আহতদের ১ লাখ এবং সম্পদ ও ফসলের ক্ষতিতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

হাতি তার নির্দিষ্ট করিডোর দিয়েই চলাচল করে। সেখানে বাধা পড়লেই মানুষের জানমালের ক্ষতি হয়। হাতিকে উত্ত্যক্ত করা যাবে না। তাদের চলাচলের পথ ও খাদ্যাভ্যাস নষ্ট করা যাবে না। সাধারণ মানুষ সচেতন হলেই হাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। রফিকুজ্জামান শাহ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ডিএফও

বন বিভাগের তথ্যে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত কাপ্তাইয়ে হাতির আক্রমণে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ১২ লাখ টাকা এবং আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ১০ জনকে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন রাঙামাটির লংগদু ও বরকলে ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত হাতির আক্রমণে মারা গেছেন ৯ জন। নিহতদের পরিবারকে ১৯ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত আরও ২০৩ জনকে দেওয়া হয়েছে ৪৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। তবে এই এলাকায় হাতির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বরকলে দুটি হাতি শাবক এবং লংগদুতে একটি মা হাতির মৃত্যু হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ডিএফও রফিকুজ্জামান শাহ বলেন, ‘হাতি তার নির্দিষ্ট করিডোর দিয়েই চলাচল করে। সেখানে বাধা পড়লেই মানুষের জানমালের ক্ষতি হয়। আমাদের মূল বার্তা– হাতিকে উত্ত্যক্ত করা যাবে না। তাদের চলাচলের পথ ও খাদ্যাভ্যাস নষ্ট করা যাবে না। সাধারণ মানুষ সচেতন হলেই হাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত