গ্যাসের পর বিদ্যুৎ সংকট যেন তীব্র না হয়

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ০০
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

গ্যাস সংকট কাটতে শুরু করেও কাটছে না আর তাতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত। এ বিষয়ে সেমিনারে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও যারা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের শিকার, তারা তাৎক্ষণিকভাবে এর মোকাবিলা নিয়েই চিন্তিত। এ ক্ষেত্রে বিকল্পের শরণাপন্ন হতে গিয়ে রান্নাঘর থেকে শিল্পকারখানা পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার যে করা যাচ্ছে, তাও নয়। এতে সব ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হয়ে সংকট ঘনীভূত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষুদ্র শিল্প, পোল্ট্রি এবং মাছ শিকারে বরফের প্রাপ্যতা নিয়ে বেড়ে ওঠা সংকটের খবর এসেছে স্ট্রিমে। কোথাও কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার শংকার কথাও জানাচ্ছেন বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিতরা। পুলিশ মোতায়েন করে হয়তো পরিস্থিতি সামলানো যাবে; তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোই এর সমাধান। সেই পথে হাঁটার বিকল্প নেই।

গ্যাস সরবরাহে আমরা ক্রমে আমদানিনির্ভর হয়েছি। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি করে গ্যাসনির্ভর। সে কারণেও অনেক সময় শিল্পকারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস পায় না। হালে গ্যাস পরিস্থিতির বড় অবনতি হওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে। শিল্পাঞ্চলে বাড়ে সমস্যা। গ্যাসভিত্তিক ক্যাপটিভ প্লান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শিল্পে কাজ চালানোর পরিস্থিতিও পড়ে সংকটে। বাসাবাড়ি আর যানবাহনে গ্যাস প্রাপ্তিও কঠিন হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের দিকে ছিল দৃষ্টি। সেটি আংশিক চালুর খবরেও সবাই খুশি হয়েছিল। এখন টার্মিনালটি পুরোপুরি চালুর আগে ৭২ ঘন্টা বন্ধ রাখতে হবে টেকনিক্যাল কারণে। এর মধ্যে প্রতিকূল আবহাওয়ায় এলএনজিবাহী একটি জাহাজ সিঙ্গাপুরে ফিরে যাওয়ার খবর হতাশা বাড়িয়েছে। এসব কারণেই আসলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ঠিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

মাঝে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ার খবর মিলেছিল। ইরান যুদ্ধ ঘিরে কয়লার সহজপ্রাপ্যতা নিয়ে সংকটও কম নয়। কার্যত সব ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহই বিঘ্নিত। এ অবস্থায় যে কোনো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনাই সংকটে পড়তে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট বৃদ্ধিও স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এগোতে পারলেও সংকট এতটা তীব্র হতো না। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের চাপে কলকারখানা বন্ধ কিংবা পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনে থাকতে না পারা বিদ্যমান কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে যে কত দুর্ভাগ্যজনক, সেটাও ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। গ্যাসভিত্তিক শিল্পের পাশাপাশি বিদ্যুৎনির্ভর খাতগুলোও আঘাতপ্রাপ্ত বলে খবর মিলছে। কর্মসংস্থানে এসব খাতের অবদান কিন্তু বিরাট। পোল্ট্রির মতো খাতে তরুণ জনগোষ্ঠীর একাংশের আত্মকর্মসংস্থানেরও একটা ব্যবস্থা হয়েছিল। তারা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে উৎপাদিত পণ্যের সন্তোষজনক দাম না পাওয়ার সংকটে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বাধ্য হওয়ায় তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়াটা নতুনতর সংকটের জন্ম দিচ্ছে। পণ্যবাজারেও পড়ছে এর প্রভাব। ইতোমধ্যে ডিমের দাম বৃদ্ধিতে এটা কিছুটা প্রতিফলিত।

গ্যাসে এলএনজি-নির্ভরতা স্বল্পমেয়াদে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলে এর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সব ধারার বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলারও বিকল্প নেই। নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে সরকার জোর দিলেও দ্রুত এখান থেকে বাড়তি বিদ্যুৎ মিলবে না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোদমে চালু হওয়াটাও শর্তসাপেক্ষ। প্রচলিত ধারার উৎসগুলো সচল রাখাটাই তাই এ মুহূর্তে জরুরি। গ্যাস-বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহারও যথাসম্ভব নিশ্চিত করা চাই। অপচয় বন্ধের প্রয়াসও এ ধরনের সংকটে কম উপকারে আসে না। আমরা আশা করব, জনজীবন থেকে শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত স্বাভাবিকতা ও উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে সরকার কর্মতৎপর থাকবে। আর অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই এ ক্ষেত্রে এগোতে হবে বলে আমরা মনে করি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত