জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইতিহাসের আয়নায় গণভোট ও বাংলাদেশ

ইতিহাসে গণভোটের ধারণা প্রাচীন। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে প্রাচীন এথেন্সে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার চর্চা দেখা যায়। আধুনিককালে প্রথম উল্লেখযোগ্য গণভোট হয় ফ্রান্সে।

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৫৬
ইতিহাসের আয়নায় গণভোট ও বাংলাদেশ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

ইতিহাসে গণভোটের ধারণা প্রাচীন। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে প্রাচীন এথেন্সে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার চর্চা দেখা যায়। আধুনিককালে প্রথম উল্লেখযোগ্য গণভোট হয় ফ্রান্সে। ১৭৯৩ সালে নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য সেখানে গণভোট হয়, যাকে তখন ‘প্লেবিসাইট’ বলা হতো। পরে ১৯৫৮ সালে চার্লস দ্য গল গণভোটের মাধ্যমেই ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

তবে গণভোটকে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় সুইজারল্যান্ড। ১৮৪৮ সালের সংবিধানের পর থেকে সেখানে গণভোট সরাসরি গণতন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে। এখনো দেশটিতে বছরে একাধিক গণভোট হয়। এ কারণেই সুইজারল্যান্ডকে বিশ্বের প্রাতিষ্ঠানিক গণভোটের জন্মভূমি বলা হয়।

বিশ্বের নানা দেশে গণভোট বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন এনেছে। নরওয়ে ১৯০৫ সালে গণভোটের মাধ্যমেই সুইডেন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়। যুক্তরাজ্যে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট ইউরোপ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। আবার ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ড স্বাধীন হবে কি না, সে সিদ্ধান্তও জনগণ নেয় গণভোটের মাধ্যমে। জনগণ যুক্তরাজ্যের সাথেই থাকার পক্ষে রায় দেয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে গণভোট

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিক্রমায় গণভোটের অভিজ্ঞতা মিশ্র। বেশির ভাগ গণভোটই হয়েছে সামরিক শাসন বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে। তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এসব গণভোটের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন।

স্বাধীনতার আগে ১৯৪৭ সালের ৬–৭ জুলাই সিলেট গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে যায়। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রশাসনিক গণভোট এবং আরেকটি সাংবিধানিক গণভোট। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি জনগণের আস্থা আছে কি না—তা যাচাই করতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের শাসন ও নীতিমালার প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ে গণভোট হয়।

১৯৯১ সালের গণভোট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তিত হয় এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার অবসান ঘটে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে গণভোটের বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়। ২০২৪ হাইকোর্টের রায়ে ওই অংশ বাতিল ঘোষণা করে গণভোট-সংক্রান্ত বিধান পুনর্বহালের কথা বলা হয়।

গণভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ

প্রথমত, এটি জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। নির্বাচনে আমরা প্রতিনিধি বেছে নিই; গণভোটে আমরা নিজেই সিদ্ধান্ত দিই। দ্বিতীয়ত, বিতর্কিত বা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে গণভোট রাজনৈতিক বৈধতা বাড়ায়। যখন কোটি মানুষের রায় কোনো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে, তখন তা অধিক গ্রহণযোগ্যতা পায়। তৃতীয়ত, এটি গণতান্ত্রিক চর্চাকে গভীর করে; নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা ও মতপ্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

তবে গণভোটের কিছু সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিও আছে। অনেক সময় জটিল রাষ্ট্রীয় বা আইনি বিষয়কে শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—এই দুই বিকল্পে নামিয়ে আনা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি পুরোপুরি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সঠিক তথ্য না থাকলে আবেগের বশে ভোট দেওয়ার ঝুঁকিও থাকে। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তে সংখ্যালঘু মানুষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের চলমান প্রেক্ষাপটে গণভোট

সাম্প্রতিক সময়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোটের প্রস্তাব আলোচনার কেন্দ্রে। এই সনদের অধীনে যেসব মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদ সীমাবদ্ধতা, সংবিধানের মৌলিক নীতিতে কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। নাগরিকত্বের পরিচয় ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়ত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাতৃভাষার স্বীকৃতিতে বাংলার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জাতিসত্তার মাতৃভাষাগুলোকেও স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিকে (যেমন: পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ) আরও অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান। মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সুশাসন ও জবাবদিহিতা।

জুলাই জাতীয় সনদে মোট ৮৪টি প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত এবং ৩৭টি সাধারণ আইন পরিবর্তনের বিষয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় এই সনদ তৈরি হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।

বর্তমান প্রস্তাবিত গণভোট বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এটি হতে পারে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সোপান। তাই এই প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কেবল রাজনৈতিক কৌশলের ফাঁদ না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল ও সচেতন নাগরিক সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। গণভোটের চেয়ে বড় কথা হলো দৈনন্দিন রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ, সংসদে কার্যকর বিতর্ক এবং সকল প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে টেকসই গণতন্ত্রের ভিত রচনা করা।

লেখক: শিক্ষক, বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল, হবিগঞ্জ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত