leadT1ad

মওলানা ভাসানীর কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’

কাগমারী সম্মেলন ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন। ১৯৫৭ সালের ৭ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারী গ্রামের সন্তোষে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮: ৪২
মওলানা ভাসানী। সংগৃহীত ছবি

সময়টা ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি। টাঙ্গাইলের নিভৃত পল্লি কাগমারীতে লেখা হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন। এর মধ্যে তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি ১৯৫৭ সালের ‘কাগমারী সম্মেলন’।

এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের মঞ্চেই মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়ে কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন।

কাগমারীতে জড়ো হয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ। ভাসানী এই আয়োজনকে ‘আফ্রো-এশীয় সম্মেলন’ বলে অভিহিত করেন। আপাতদৃষ্টিতে সাংস্কৃতিক সম্মেলন হিসেবে পরিচিতি পেলেও এর গভীরে ছিল দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্বপ্ন।

‘১২ বছরের মধ্যে পূর্ব বাংলা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবে’— কাগমারী সম্মেলনের এক ফাঁকে ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ভাসানী। ১৪ বছর পর ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সেই ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি হয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কাগমারী সম্মেলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার প্রথম আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়।

কাগমারী সম্মেলন কেন দরকার ছিল

কাগমারী সম্মেলন ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন। ১৯৫৭ সালের ৭ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারী গ্রামের সন্তোষে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি সে সময় আওয়ামী লীগের সভাপতির আসনে থাকলেও সম্মেলনটি কোনো দলীয় ব্যানারে হয়নি। যদিও প্রথম দুই দিন ছিল আওয়ামী লীগের সম্মেলন। পরের দুই দিন লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে নানা অনুষ্ঠান হয়। এটি ভাসানী করেছিলেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে।

কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী। সংগৃহীত ছবি
কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী। সংগৃহীত ছবি

এই সম্মেলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালিদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তাকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। ভাসানী বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন দিয়ে মুক্তি আসবে না; এর জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জাগরণ। কাগমারী সম্মেলন ছিল সেই সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বিমাতাসুলভ আচরণ এবং অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে ভাসানী সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। এই সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের সামনে পূর্ব বাংলার বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরাও ছিল ভাসানীর অন্যতম উদ্দেশ্য।

মওলানা ভাসানী ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। তিনি চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষকে প্রত্যক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে পারস্পরিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে।

কী ঘটেছিল কাগমারী সম্মেলনে

‘কাগমারী সম্মেলন: মওলানা ভাসানীর পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম’ বইটিতে সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘১৯৮০-তে যখন আমি অন্য বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের সাক্ষাৎকার নিই, তিনি জানান, তাতে তাঁর মনে হয়েছে, এমন একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন অবিভক্ত বাংলায় আগে ও পরে অথবা কখনও হয়নি।’

কাগমারী সম্মেলনের দিনগুলো ছিল উৎসবে মুখর। টাঙ্গাইল শহর থেকে সন্তোষের কাগমারী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা সাজানো হয়েছিল বর্ণিল তোরণ দিয়ে। ৫১টি তোরণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—হজরত মোহাম্মদ (সা.) তোরণ, মহাত্মা গান্ধী তোরণ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী তোরণ, কাজী নজরুল ইসলাম তোরণ, মহাকবি ইকবাল তোরণ, নেতাজি সুভাষ বসু তোরণ, হাজী শরীয়তউল্লাহ তোরণ, শহীদ তিতুমীর তোরণ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তোরণ, হাজী মোহাম্মদ মূহসীন তোরণ, সি আর দাস তোরণ, লেনিন তোরণ, স্ট্যালিন তোরণ, মাও সেতুং তোরণ, ওয়ার্ডসওয়ার্থ তোরণ, বায়রন তোরণ, শেলি তোরণ, মাওলানা রুমি তোরণ, হজরত ইমাম আবু হানিফা তোরণ এবং হজরত ইমাম গাজ্জালি তোরণ। সর্বশেষ তোরণটি ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামে। এই নামকরণের মধ্য দিয়ে ভাসানী তাঁর অসাম্প্রদায়িক, বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছিলেন।

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। সংগৃহীত ছবি
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। সংগৃহীত ছবি

তবে কাগমারী সম্মেলনের মূল আকর্ষণ ছিল মওলানা ভাসানীর ভাষণ। তিনি তাঁর স্বাগত বক্তৃতায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক—উভয় দিকই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘পূর্ব বাংলা যদি তার ন্যায্য অধিকার না পায়, তবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব হবে না।’

ভাষণের একপর্যায়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশে ভাসানী সেই ঐতিহাসিক ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণ করেন। উপস্থিত শ্রোতাদের মতে, এটিই ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রথম স্পষ্ট দাবি। পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন এই বলে—সামরিক-বেসামরিক চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংখ্যাসাম্য নীতি পালিত না হলে পূর্ব পাকিস্তান ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলবে।

সম্মেলনে ভাষা, শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, ভূমিব্যবস্থা, কৃষি ও নারীর অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ভাসানী চেয়েছিলেন কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি ও মজলুম মানুষের জন্য সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে।

সম্মেলনে যে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন

কাগমারী সম্মেলন ছিল সত্যিকার অর্থেই একটি আন্তর্জাতিক মিলনমেলা। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের প্রায় সব প্রগতিবাদী লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ ও সাংবাদিক এতে অংশ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া ভারত, ব্রিটেন, মিসর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

মওলানা ভাসানী সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের, চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ সুকর্ণ এবং ব্রিটেনের বিরোধী দলের নেতা। আমন্ত্রিতদের মধ্যে জওহরলাল নেহরু, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় এবং জামাল আবদুল নাসের সশরীর উপস্থিত হতে না পারলেও চিঠি দিয়ে সম্মেলনের সাফল্য কামনা করেছিলেন।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধ কুমার সান্যাল, হুমায়ুন কবির এবং কবি জসীমউদ্ দীন উপস্থিত ছিলেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে হাঁটার সময় ভাসানী যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় আজও অমলিন।

মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও অবদান

মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন ছিল কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত। কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন পূর্ব বাংলা, অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক সম্মেলনে রূপ নেয়। এ সম্মেলনকে ঘিরে পাকিস্তানি সমর্থকরা বিরূপ সমালোচনায় মুখর হয়। অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থক পত্র-পত্রিকাগুলো কাগমারী সম্মেলনকে সুনজরে না দেখে বিরূপ সমালোচনা করে।

এই সম্মেলনের পর ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় বামপন্থী রাজনীতির বিকাশ ঘটে এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নতুন গতি পায়। কিন্তু মতবিরোধের জেরে আওয়ামী লীগ ভেঙে যায় এবং ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। কাগমারীর ময়দানে ভাসানী যে স্বাধীন, সার্বভৌম এবং শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজও আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।

Ad 300x250

সম্পর্কিত