leadT1ad

পাবনার রমা থেকে মহানায়িকা: ৩৬ বছরে একবারও কেন ক্যামেরার সামনে ফিরলেন না সুচিত্রা সেন

আজ ১৭ জানুয়ারি সুচিত্রা সেনের মৃত্যুবার্ষিকী। পাবনার সাধারণ রমা দাশগুপ্ত থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কলকাতার বাংলা সিনেমার মহানায়িকা। টানা সাফল্যের শীর্ষে থেকেও হঠাৎ করেই নিজেকে সরিয়ে নেন সবার চোখের আড়ালে। কেন জনপ্রিয়তার চূড়ায় দাঁড়িয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি?

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯: ১৪
পাবনার রমা থেকে মহানায়িকা। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

সুচিত্রা সেন। এই নাম শুনলেই মনে পড়ে এক রহস্যময়ী মহানায়িকার কথা। যেন রবীন্দ্রনাথের ‘অপরিচিতা’র সেই লাইনটাই তাঁর জীবনের সঙ্গে মিলে যায়, ‘ওগো অপরিচিতা, তোমার পরিচয়ের শেষ হইল না, শেষ হইবে না…।’

চলচ্চিত্রের ‘পথ শেষ না হওয়ার’ যাত্রায় কখনো হয়েছেন সপ্তপদীর রিনা ব্রাউন, কখনো সুর হারিয়েছেন রমা ব্যানার্জি হয়ে, কখনো দীপ জ্বেলেছেন রাধা হিসেবে। উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি মানেই ছিল প্রেম, আবেগ আর মোহের এক আলাদা জগৎ। তাঁদের সিনেমা মানেই দর্শকের মনে বসন্তের হাওয়া।

দীর্ঘ ২৬ বছরের অভিনয়জীবনে সুচিত্রা সেন যে দাগ বাঙালি হৃদয়ে কেটেছিলেন, তা যেন কিছুটা ক্ষত হিসেবেই দগদগে রেখে ১৯৭৮ সালে রহস্যের অন্তরালে হারিয়ে গেলেন সুচিত্রা সেন। এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছর তাঁকে আর দেখা যায়নি। অবশেষে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, নিভৃতেই, যেমনটা তিনি বেছে নিয়েছিলেন।

সুচিত্রা সেন। সংগৃহীত ছবি
সুচিত্রা সেন। সংগৃহীত ছবি

১৯৭৮ সালের পর আর কোনো সিনেমা নয়, কোনো অনুষ্ঠান নয়, এমনকি উপস্থিত থেকে পুরস্কার গ্রহণও নয়। ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’-এর মতো সম্মাননাও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আজ এই মহানায়িকার প্রয়াণ দিবসে ফিরে দেখা যাক পাবনার সেই সাধারণ রমা থেকে রহস্যময়ী সুচিত্রা হয়ে ওঠার গল্প এবং তাঁর অন্তরালে চলে যাওয়ার পেছনের সম্ভাব্য কারণগুলো।

পাবনার রমা দাশগুপ্ত থেকে মহানায়িকা

সুচিত্রা সেনের জন্ম ১৯৩১ সালে বাংলাদেশের পাবনা শহরে, গোপালপুর মহল্লায়। বাবা-মায়ের দেওয়া আদরের নাম ছিল রমা। পাবনার ধুলোবালি আর অলিগলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সুচিত্রা সেনের স্মৃতির ঋণ। কখনো ইছামতির জলে ঝাঁপাঝাঁপি তো কখনো পদ্মার পাড়ের কাশবনে কাটানো সোনালি শৈশব।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু ১৯৩৮ সালে মহাকালী পাঠশালায় (বর্তমান পাবনা টাউন গার্লস হাই স্কুল)। প্রাথমিকের পর ভর্তি হন পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলের যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল সুচিত্রার সরব উপস্থিতি। পাবনার সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রবিন্দু বনমালী ইনস্টিটিউটেও ছিল তাঁর পদচারণা। সুযোগ পেলেই সিনেমা দেখতে যেতেন অরোরা টকিজে (বীনাবাণী হল)।

১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবি দিয়ে চলচ্চিত্র দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন সুচিত্রা সেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই ছবিটি কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। তবে পরের বছরই মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করলেন ‘সাড়ে ৭৪’ ছবিতে, আর তাতেই বাজিমাত! এই ছবি দিয়েই বাংলা চলচ্চিত্রে জন্ম নিল সেরা রোমান্টিক জুটি ‘উত্তম-সুচিত্রা’। দীর্ঘ ২৬ বছরের ক্যারিয়ারে সুচিত্রা অভিনয় করেছেন মোট ৬১টি ছবিতে, যার মধ্যে প্রায় ৩০টিতেই তাঁর নায়ক ছিলেন উত্তম কুমার।

বাংলা সিনেমায় উত্তম-সুচিত্রা জুটি মানেই ছিল প্রেম আর আবেগের এক অন্যরকম জাদু। সংগৃহীত ছবি
বাংলা সিনেমায় উত্তম-সুচিত্রা জুটি মানেই ছিল প্রেম আর আবেগের এক অন্যরকম জাদু। সংগৃহীত ছবি

‘দীপ জ্বেলে যাই’ (১৯৫৯), ‘সপ্তপদী’ (১৯৬১), এবং ‘সাত পাকে বাঁধা’ (১৯৬৩)—প্রতিটি ছবিতেই তিনি নিজেকে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়েছেন। বিশেষ করে ‘উত্তর ফাল্গুনী’ (১৯৬৩) ছবিতে একই সঙ্গে যৌনকর্মী পান্নাবাই এবং তাঁর মেয়ে আইনজীবী সুপর্ণার দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

বলিউডেও সফল পদচারণা ছিল মহানায়িকার। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ অবলম্বনে নির্মিত হিন্দি ‘দেবদাস’ ছবিতে ‘পার্বতী’ চরিত্রে অভিনয় করে জিতে নিয়েছিলেন সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বিতর্কিত ও আলোচিত সিনেমা ছিল ‘আঁধি’ (১৯৭৫)। এই ছবিতে তাঁর চরিত্রটি তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আদলে তৈরি বলে ধারণা করা হয়, যার জেরে গুজরাটে ছবিটি ২০ সপ্তাহ নিষিদ্ধ ছিল।

শোনা যায়, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করা সুচিত্রা সেন এতটাই ব্যস্ত ছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ও তাঁর শিডিউল পেতেন না। শিডিউল পাননি বলে তিনি ‘চৌধুরানী’ ছবিটি বানালেনই না! ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ সিনেমার জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সুচিত্রা সেন ‘সিলভার প্রাইজ ফর বেস্ট অ্যাকট্রেস’ পুরস্কার জিতে নেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী, যিনি এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কারটি পেয়েছিলেন। পরে ভারত সরকার ১৯৭২ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে।

সুচিত্রা সেন। ছবি: বলিউড পিকচার্স গ্যালারী
সুচিত্রা সেন। ছবি: বলিউড পিকচার্স গ্যালারী

টানা ২৫ বছর অভিনয়ের পর ১৯৭৮ সালে অবসরে যান সুচিত্রা সেন। তাঁর শেষ অভিনীত চলচ্চিত্রটি ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে, নাম ‘প্রণয় পাশা’। কিন্তু সিনেমাটি ব্যবসাসফল হয়নি।

কেন নিভৃতে ছিলেন সুচিত্রা সেন

সাফল্যের একেবারে শীর্ষে থেকেও হঠাৎ করে কেন সুচিত্রা সেন নিজেকে সবার চোখের আড়ালে সরিয়ে নিলেন, এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আজও কেউ জানে না। তাঁর এই রহস্যময় অন্তর্ধান নিয়ে একাধিক মিথ বা ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এর কোনোটিই প্রমাণসিদ্ধ নয়।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মিথটি জড়িয়ে আছে মহানায়ক উত্তম কুমারের নিয়ে। বাংলা সিনেমায় উত্তম-সুচিত্রা জুটি মানেই ছিল প্রেম আর আবেগের এক অন্যরকম জাদু। পর্দায় তাঁদের রসায়ন এতটাই বাস্তব মনে হতো যে অনেক দর্শক বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, এই সম্পর্ক শুধু সিনেমার মধ্যেই নয়, বাস্তব জীবনেও ছিল।

শোনা যায়, ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমার একটি পোস্টারে ‘আমাদের প্রণয়ের সাক্ষী হল অগ্নিপরীক্ষা’ লেখা ছিল, যার নিচে সুচিত্রা সেনের স্বাক্ষর নিয়ে তখন বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। যদিও এই বিষয় নিয়ে তাঁরা কেউই কখনো প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবু গুঞ্জন ছিল। এই সম্পর্ক তাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে প্রভাব ফেলেছিল।

লোকমুখে আরও শোনা যায়, উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর সুচিত্রা সেন ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। তখন নাকি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আর কার সঙ্গে অভিনয় করব?’ কাকতালীয়ভাবে যে হাসপাতালে সুচিত্রা সেন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, সেই হাসপাতালেই ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মারা যান উত্তম কুমার।

মেয়ে, মেয়ে-জামাই, নাতনীদের সঙ্গে সুচিত্রা সেন। সংগৃহীত ছবি
মেয়ে, মেয়ে-জামাই, নাতনীদের সঙ্গে সুচিত্রা সেন। সংগৃহীত ছবি

আরেকটি কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন, সুচিত্রা সেন চেয়েছিলেন তাঁর সৌন্দর্য আর তারুণ্য যেন মানুষের মনে অমলিন থাকে। হলিউডের অভিনেত্রী গ্রেটা গার্বোর মতো তিনিও চাননি, বয়সের ছাপ তাঁর ইমেজে পড়ুক। তিনি চেয়েছিলেন, দর্শকরা তাঁকে আজীবন সেই চিরসবুজ, সুন্দর রূপেই মনে রাখুক।

অবশ্য সুচিত্রা সেনের কন্যা অভিনেত্রী মুনমুন সেনের কথায় উঠে এসেছে ভিন্ন এক বাস্তবতার চিত্র। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সত্তরের দশকের শেষ দিকে কলকাতার বাংলা সিনেমার মান ও কাজের পরিবেশ সুচিত্রার মনমত ছিল না। তিনি যে ঘরানার পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, তাঁদের অনেকেই একে একে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন। নতুন ধারার সিনেমায় হয়ত তিনি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না, কিংবা আপস করতে চাননি নিজের রুচির সঙ্গে। তাই একরকম অভিমান ও পেশাগত অতৃপ্তি থেকেই রুপালি জগতকে বিদায় জানান তিনি।

জীবনের শেষ দিকে সুচিত্রা সেন রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। চোখে রোদ চশমা পরে, কালো কাচ ঢাকা গাড়িতে চেপে কলকাতার বেলুড় মঠ, দক্ষিণেশ্বর, তারকেশ্বর হয়ে উঠেছিল তাঁর বাড়ির বাইরের একমাত্র গন্তব্যস্থল। শোনা যায়, নিজের বাড়িতে যে ঘরের দেওয়াল একসময় ভর্তি থাকত চলচ্চিত্রের নানা ছবি, পোস্টারে। সেই ঘরের দেওয়াল একদিন সুচিত্রাহীন করে দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। বদলে ঘরের দেওয়ালে থাকত কেবল রামকৃষ্ণ আর সারদার ছবি। দীর্ঘ অন্তরাল ভেঙে মাত্র একবার ১৯৯৫ সালে সুচিত্রা প্রকাশ্যে এসেছিলেন। দক্ষিণ কলকাতার একটি কলেজে ভোটার আইডি কার্ডের জন্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান।

সুচিত্রা সেন কেন পর্দার আড়ালে চলে গিয়েছিলেন, তা আজও এক রহস্য হয়ে আছে। তবে এত বছর চোখের আড়ালে থেকেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা একটুও কমেনি। আজও অগণিত দর্শকের মনে তিনি রয়ে গেছেন বিশ কিংবা তিরিশের কোঠায় আটকে থাকা সেই স্মিত হাসির, মায়াবী মহানায়িকা হিসেবেই।

Ad 300x250

সম্পর্কিত