আজ আমাদের সংগীতজগতের ক্ষণজন্মা প্রতিভা হ্যাপী আখান্দের জন্মদিন। হ্যাপীর চলে যাওয়া কেন বাংলা ব্যান্ড সংগীত ইতিহাসের প্রথম বড় ধাক্কা? কেমন ছিল মিউজিশিয়ান হ্যাপীর পথচলা?
গৌতম কে শুভ

এই গানটি শুনেছেন কিন্তু কোথাও ঘুরতে গিয়ে মনের অজান্তে গুনগুন করে গেয়ে ওঠেননি, এমন মানুষ সম্ভবত খুব কমই পাওয়া যাবে। পঞ্চাশ বছর আগে তৈরি হওয়া গানটি ক্যাম্পাসের আড্ডাতে এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এখনো রাত কিংবা দিনে আমাদের প্লেলিস্টে বাজে এই গান। শুনে মুগ্ধ হই বারবার। অথচ, এই গানে যে কণ্ঠ, যে মায়া তার মালিক হ্যাপী আখান্দকে চেনে না আজকের প্রজন্ম।
আজ হ্যাপী আখান্দের ৬৫তম জন্মদিন। ১৯৮৭ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি অনেক মিউজিশিয়ানের মতে, হ্যাপীর চলে যাওয়া বাংলা ব্যান্ড ইতিহাসের প্রথম বড় কোনো ধাক্কা।

আশ্চর্য লাগে, এই ২৭ বছর বয়সেই মারা যাওয়াটাও কিন্তু সংগীতজগতের এক কৌতূহল। সারা বিশ্বের শ্রোতাদের কাছে এটি ‘ক্লাব টোয়েন্টি সেভেন’ নামে পরিচিত। এটা আসলে মৃতদের ক্লাব। একেবারে ঠিক ২৭ বছরেই আশ্চর্যজনকভাবে মারা গেছেন জিম মরিসন, জিমি হেনড্রিক্স, কার্ট কোবেইন, ব্রায়ান জোন্স, জ্যানিস জপলিনের মতো কিংবদন্তি রক মিউজিশিয়ানরা। এঁদের সবারই কিন্তু উত্থান ঘটেছিল ধূমকেতুর মতো, আর প্রস্থান! খুবই আকস্মিকভাবে।
আমাদের সংগীতের ক্ষণজন্মা প্রতিভা হ্যাপী আখান্দও কিন্তু ঢুকে গেছেন অদ্ভুতুড়ে এই ক্লাবে।
হ্যাপী আখান্দ জন্মেছিলেন ঢাকার পাতলা খান লেনের আখান্দ পরিবারে। হ্যাপীর আগেই এই পরিবারে জন্মেছিলেন আরেক কিংবদন্তি গায়ক-সুরকার, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক লাকী আখান্দ। এদের পূর্বপুরুষ ছিল পার্সিয়ান আর তাদের নামের মূল পদবি ছিল আখান্দজাদে। এই আখান্দ ব্রাদার্সের বাবাও ছিলেন একজন সুরকার ও সংগীতপ্রেমী মানুষ।
ছোটবেলা থেকেই এক সাংগীতিক আবহে বড় হয়েছেন হ্যাপী। সংগীতে হ্যাপীর হাতেখড়ি মাত্র আট বছর বয়সে। প্রথমে শুরু তবলা দিয়ে। এরপর গিটারের প্রতি ঝোঁক বাড়িয়ে দিলেন বড় ভাই লাকী আখান্দ। তারপর পিয়ানো, কি–বোর্ড, ড্রামস। কী বাজাতে পারতেন না তিনি!
এ ছাড়া আশপাশে থাকা যেকোনো কিছু থেকে সাউন্ড বের করে ফেলতে পারতেন হ্যাপী আখান্দ। এক স্মৃতিচারণায় প্রয়াত শাফিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, ‘হ্যাপী আখান্দ সব বাদ্যযন্ত্রই বাজাতে পারতেন। এমনকি বাদ্যযন্ত্র ছাড়াও তিনি সক্রিয় থাকতেন। সব সময় দেখেছি হ্যাপী গানের ভেতর ঢোকার উপায় পেয়ে যেতেন। এমনও সময় ছিল, ঘরে চার-পাঁচজন আড্ডা দিচ্ছি। হয়তো সবার জন্য অ্যাকুস্টিক গিটার নেই। হাতের কাছে কিছু না পেয়ে পকেটে থাকা ম্যাচের বাক্স থেকে কাঠি বের করে সেটা দিয়েই কিছু একটা বাজাতেন হ্যাপী।’
মূলত বড় ভাই লাকী আখান্দের হাত ধরেই সংগীতে আগমন ঘটেছিল হ্যাপীর। যেখানেই লাকী গান গাইতে যেতেন, সঙ্গে বাজানোর জন্য নিতেন কিশোর হ্যাপীকেও। ল্যাটিন আমেরিকান বিট খুব স্পর্শ করত তাঁকে। ছিলেন জ্যাজ, ব্লুজের ভক্ত। বড় ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছিলেন ম্যাক্সিকান, রাশিয়ান সংগীতের সঙ্গে।

প্রখর মনোযোগ আর নতুন কিছু তৈরির আগ্রহের ফলে খুব অল্প বয়সে হ্যাপী আখান্দের ছিল তুখোড় মিউজিক সেন্স। এতটাই দক্ষ ছিলেন যে কোনো গানের সবচেয়ে জটিল নোটটা সবার আগে ধরা দিত তাঁর কানে। জীবনে মিউজিক ছাড়া আসলে আর কিছু ছিল না তাঁর।
স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকটি ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন হ্যাপী। ‘স্পন্দন’ ব্যান্ডের সঙ্গে কিছুদিন বাজিয়েছেন। আজম খানের সঙ্গে টিএসসির কনসার্টেও বাজিয়েছেন তিনি। হ্যাপী তখন ‘উইন্ডি সাইড অব কেয়ার’ ব্যান্ডেও গাইতেন-বাজাতেন। এই ব্যান্ডের পূর্বনাম ছিল ‘আইওলাইটস’, যাদেরকে স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড বলা হয়।
‘উইন্ডি সাইড অব কেয়ার’ ভেঙে গেলে ১৯৭৯ সালে হ্যাপীরা গঠন করেন ‘মাইলস’। হ্যাপীদের হাতে গড়ে ওঠা ‘মাইলস’ ব্যান্ডটি সেই তখন থেকে এখন পর্যন্ত তুমুল জনপ্রিয়। এসব ব্যান্ডের বাইরেও হ্যাপী আখান্দ নিয়মিত পারফর্ম করতেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। স্বাধীনতার পরবর্তী দশকে যে কয়েকজন তাঁদের গান দিয়ে তরুণদের মন জয় করতে পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হ্যাপী আখান্দ ছিলেন সামনের সারিতে।
শুধু সাধারণ শ্রোতারাই নয়, হ্যাপী ভালোবাসা ও প্রশংসা পেয়েছেন রাহুল দেব বর্মণ, মান্না দের মতো সংগীতজ্ঞদের কাছেও।

১৯৭৫ সাল। সবে তখন হ্যাপীর কণ্ঠে এস এম হেদায়েতের গাওয়া আর লাকী আখান্দের সুর করা ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ গানটি জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। তখন কলকাতার এক স্টুডিওতে মান্না দের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় লাকী আখান্দের। তারপর সেখানে এই গানটির রেকর্ড মান্না দেকে শোনানো হয়। গানটি শুনে মুগ্ধতা নিয়ে মান্না দে বললেন, ‘কে গাইছে? ’ লাকী আখান্দ বললেন, ‘হ্যাপী, আমার ছোট ভাই।’ মান্না দে উত্তর দিলেন, ‘দারুণ গায়, চমৎকার থ্রোয়িং!’
সত্তরের দশকের শেষ দিকে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল পশ্চিমবাংলার দুর্গাপুরের এক কনসার্টে। সেদিন অতিথি ছিলেন রাহুল দেব বর্মণ, আশা ভোসলের মতো শিল্পীরা।
আখান্দ ব্রাদার্স তখন কলকাতা গিয়েছিলেন একটা গানের রেকর্ডিংয়ে। তাঁদের কলকাতার এক বন্ধু এই দুই ভাইকে নিয়ে গেলেন সেখানে গান শুনতে। ব্যাকস্টেজে গিয়ে শিল্পীদের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে হ্যাপী আখান্দ মঞ্চে একটা গান গাইতে চাইলেন। আয়োজকদের প্রথমে আপত্তি থাকলেও শেষমেশ রাজি হলেন তারা। মঞ্চে হ্যাপী উঠলেন গিটার নিয়ে, সঙ্গে কি–বোর্ডে তাঁর ভাই লাকী। তিনি প্রথমে গাইলেন একটি জনপ্রিয় ফোক গান, তারপর রাহুল দেব বর্মণের গান। দর্শক তখন মাতোয়ারা। দর্শকদের অনুরোধে গাইলেন নিজেদের গান। সেদিন হ্যাপী গান গেয়েছিলেন মোট ১১টি। এরপরও দর্শক অনুরোধ করছেন আরও গান গাইতে হবে। এরপর স্টেজ থেকে নামলে সবার সামনে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন রাহুল দেব বর্মণ।
একজন সুরকার, কি–বোর্ড বাদক, গিটার বাদক, সংগীত পরিচালক হ্যাপী আখান্দ খুব বেশি গান আমাদের জন্য রেখে যাননি। এ নিয়ে লাকী আখান্দ আজীবন আক্ষেপ করেছেন। নব্বই দশকের শুরুতে আদরের ছোট ভাই হ্যাপী আখান্দের গান দিয়ে ‘শেষ উপহার’ নামে অ্যালবাম বের করেছিলেন তিনি। হ্যাপীর স্মরণে ‘হ্যাপীটাচ’ নামে ব্যান্ডও বানিয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর। এরপর ধীরে ধীরে লাকীও অনেকটাই নীরব হয়ে যান, প্রধান কারণ ছিল হ্যাপীর না-থাকা। প্রচণ্ড অভিমান বুকে নিয়ে তিনিও চলে গেছেন পরপারে।

হ্যাপী আখান্দ মানুষকে শেখাতেও ভালোবাসতেন। এখনকার মতো তখন এই সব বাদ্যযন্ত্র শেখার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। সবাই মিলে একসঙ্গে বসে শিখতেন, অনুশীলন করতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা কলকাতা—বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে শিক্ষা নিয়েছেন এখনকার নামকরা অনেক মিউজিশিয়ানও।
অন্যদিকে খুব বোহেমিয়ান জীবন যাপন করতেন হ্যাপী আখান্দ। তখন যাঁরা ব্যান্ড সংগীত চর্চা করতেন, তাঁরা বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন তাঁর কাছ থেকে। তাই তো আইয়ুব বাচ্চু কিংবা শাফিন আহমেদের মতো ব্যান্ড তারকারা বিভিন্ন সময়ে অকপটে স্বীকার করেছেন হ্যাপীর মাহাত্ম্য এবং শূন্যতাকে। হ্যাপীর চলে যাওয়া তখন যে কত বড় ধাক্কা ছিল, সেটা বোঝার জন্য আরেক কিংবদন্তি গিটার মায়েস্ত্রো নিলয় দাশের দিকে তাকাতে হবে। বন্ধুর স্মরণে গিটার শিক্ষক নিলয় দাশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘হ্যাপী স্কুল অব মিউজিক’। আবার তাঁর প্রকাশিত অ্যালবামেও একটি গান ছিল হ্যাপীকে নিয়ে। শিরোনাম ‘হ্যাপী তোকে মনে পড়লেই’। এখনো ঠিক তেমনই, কাঁধে গিটার নিয়ে বোহেমিয়ান কোনো তরুণকে হেঁটে যেতে দেখলে আমাদের মনে পড়ে যায় হ্যাপী আখান্দের নাম।

এই গানটি শুনেছেন কিন্তু কোথাও ঘুরতে গিয়ে মনের অজান্তে গুনগুন করে গেয়ে ওঠেননি, এমন মানুষ সম্ভবত খুব কমই পাওয়া যাবে। পঞ্চাশ বছর আগে তৈরি হওয়া গানটি ক্যাম্পাসের আড্ডাতে এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এখনো রাত কিংবা দিনে আমাদের প্লেলিস্টে বাজে এই গান। শুনে মুগ্ধ হই বারবার। অথচ, এই গানে যে কণ্ঠ, যে মায়া তার মালিক হ্যাপী আখান্দকে চেনে না আজকের প্রজন্ম।
আজ হ্যাপী আখান্দের ৬৫তম জন্মদিন। ১৯৮৭ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি অনেক মিউজিশিয়ানের মতে, হ্যাপীর চলে যাওয়া বাংলা ব্যান্ড ইতিহাসের প্রথম বড় কোনো ধাক্কা।

আশ্চর্য লাগে, এই ২৭ বছর বয়সেই মারা যাওয়াটাও কিন্তু সংগীতজগতের এক কৌতূহল। সারা বিশ্বের শ্রোতাদের কাছে এটি ‘ক্লাব টোয়েন্টি সেভেন’ নামে পরিচিত। এটা আসলে মৃতদের ক্লাব। একেবারে ঠিক ২৭ বছরেই আশ্চর্যজনকভাবে মারা গেছেন জিম মরিসন, জিমি হেনড্রিক্স, কার্ট কোবেইন, ব্রায়ান জোন্স, জ্যানিস জপলিনের মতো কিংবদন্তি রক মিউজিশিয়ানরা। এঁদের সবারই কিন্তু উত্থান ঘটেছিল ধূমকেতুর মতো, আর প্রস্থান! খুবই আকস্মিকভাবে।
আমাদের সংগীতের ক্ষণজন্মা প্রতিভা হ্যাপী আখান্দও কিন্তু ঢুকে গেছেন অদ্ভুতুড়ে এই ক্লাবে।
হ্যাপী আখান্দ জন্মেছিলেন ঢাকার পাতলা খান লেনের আখান্দ পরিবারে। হ্যাপীর আগেই এই পরিবারে জন্মেছিলেন আরেক কিংবদন্তি গায়ক-সুরকার, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক লাকী আখান্দ। এদের পূর্বপুরুষ ছিল পার্সিয়ান আর তাদের নামের মূল পদবি ছিল আখান্দজাদে। এই আখান্দ ব্রাদার্সের বাবাও ছিলেন একজন সুরকার ও সংগীতপ্রেমী মানুষ।
ছোটবেলা থেকেই এক সাংগীতিক আবহে বড় হয়েছেন হ্যাপী। সংগীতে হ্যাপীর হাতেখড়ি মাত্র আট বছর বয়সে। প্রথমে শুরু তবলা দিয়ে। এরপর গিটারের প্রতি ঝোঁক বাড়িয়ে দিলেন বড় ভাই লাকী আখান্দ। তারপর পিয়ানো, কি–বোর্ড, ড্রামস। কী বাজাতে পারতেন না তিনি!
এ ছাড়া আশপাশে থাকা যেকোনো কিছু থেকে সাউন্ড বের করে ফেলতে পারতেন হ্যাপী আখান্দ। এক স্মৃতিচারণায় প্রয়াত শাফিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, ‘হ্যাপী আখান্দ সব বাদ্যযন্ত্রই বাজাতে পারতেন। এমনকি বাদ্যযন্ত্র ছাড়াও তিনি সক্রিয় থাকতেন। সব সময় দেখেছি হ্যাপী গানের ভেতর ঢোকার উপায় পেয়ে যেতেন। এমনও সময় ছিল, ঘরে চার-পাঁচজন আড্ডা দিচ্ছি। হয়তো সবার জন্য অ্যাকুস্টিক গিটার নেই। হাতের কাছে কিছু না পেয়ে পকেটে থাকা ম্যাচের বাক্স থেকে কাঠি বের করে সেটা দিয়েই কিছু একটা বাজাতেন হ্যাপী।’
মূলত বড় ভাই লাকী আখান্দের হাত ধরেই সংগীতে আগমন ঘটেছিল হ্যাপীর। যেখানেই লাকী গান গাইতে যেতেন, সঙ্গে বাজানোর জন্য নিতেন কিশোর হ্যাপীকেও। ল্যাটিন আমেরিকান বিট খুব স্পর্শ করত তাঁকে। ছিলেন জ্যাজ, ব্লুজের ভক্ত। বড় ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছিলেন ম্যাক্সিকান, রাশিয়ান সংগীতের সঙ্গে।

প্রখর মনোযোগ আর নতুন কিছু তৈরির আগ্রহের ফলে খুব অল্প বয়সে হ্যাপী আখান্দের ছিল তুখোড় মিউজিক সেন্স। এতটাই দক্ষ ছিলেন যে কোনো গানের সবচেয়ে জটিল নোটটা সবার আগে ধরা দিত তাঁর কানে। জীবনে মিউজিক ছাড়া আসলে আর কিছু ছিল না তাঁর।
স্বাধীনতার পর বেশ কয়েকটি ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন হ্যাপী। ‘স্পন্দন’ ব্যান্ডের সঙ্গে কিছুদিন বাজিয়েছেন। আজম খানের সঙ্গে টিএসসির কনসার্টেও বাজিয়েছেন তিনি। হ্যাপী তখন ‘উইন্ডি সাইড অব কেয়ার’ ব্যান্ডেও গাইতেন-বাজাতেন। এই ব্যান্ডের পূর্বনাম ছিল ‘আইওলাইটস’, যাদেরকে স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড বলা হয়।
‘উইন্ডি সাইড অব কেয়ার’ ভেঙে গেলে ১৯৭৯ সালে হ্যাপীরা গঠন করেন ‘মাইলস’। হ্যাপীদের হাতে গড়ে ওঠা ‘মাইলস’ ব্যান্ডটি সেই তখন থেকে এখন পর্যন্ত তুমুল জনপ্রিয়। এসব ব্যান্ডের বাইরেও হ্যাপী আখান্দ নিয়মিত পারফর্ম করতেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। স্বাধীনতার পরবর্তী দশকে যে কয়েকজন তাঁদের গান দিয়ে তরুণদের মন জয় করতে পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হ্যাপী আখান্দ ছিলেন সামনের সারিতে।
শুধু সাধারণ শ্রোতারাই নয়, হ্যাপী ভালোবাসা ও প্রশংসা পেয়েছেন রাহুল দেব বর্মণ, মান্না দের মতো সংগীতজ্ঞদের কাছেও।

১৯৭৫ সাল। সবে তখন হ্যাপীর কণ্ঠে এস এম হেদায়েতের গাওয়া আর লাকী আখান্দের সুর করা ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ গানটি জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। তখন কলকাতার এক স্টুডিওতে মান্না দের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় লাকী আখান্দের। তারপর সেখানে এই গানটির রেকর্ড মান্না দেকে শোনানো হয়। গানটি শুনে মুগ্ধতা নিয়ে মান্না দে বললেন, ‘কে গাইছে? ’ লাকী আখান্দ বললেন, ‘হ্যাপী, আমার ছোট ভাই।’ মান্না দে উত্তর দিলেন, ‘দারুণ গায়, চমৎকার থ্রোয়িং!’
সত্তরের দশকের শেষ দিকে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল পশ্চিমবাংলার দুর্গাপুরের এক কনসার্টে। সেদিন অতিথি ছিলেন রাহুল দেব বর্মণ, আশা ভোসলের মতো শিল্পীরা।
আখান্দ ব্রাদার্স তখন কলকাতা গিয়েছিলেন একটা গানের রেকর্ডিংয়ে। তাঁদের কলকাতার এক বন্ধু এই দুই ভাইকে নিয়ে গেলেন সেখানে গান শুনতে। ব্যাকস্টেজে গিয়ে শিল্পীদের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে হ্যাপী আখান্দ মঞ্চে একটা গান গাইতে চাইলেন। আয়োজকদের প্রথমে আপত্তি থাকলেও শেষমেশ রাজি হলেন তারা। মঞ্চে হ্যাপী উঠলেন গিটার নিয়ে, সঙ্গে কি–বোর্ডে তাঁর ভাই লাকী। তিনি প্রথমে গাইলেন একটি জনপ্রিয় ফোক গান, তারপর রাহুল দেব বর্মণের গান। দর্শক তখন মাতোয়ারা। দর্শকদের অনুরোধে গাইলেন নিজেদের গান। সেদিন হ্যাপী গান গেয়েছিলেন মোট ১১টি। এরপরও দর্শক অনুরোধ করছেন আরও গান গাইতে হবে। এরপর স্টেজ থেকে নামলে সবার সামনে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন রাহুল দেব বর্মণ।
একজন সুরকার, কি–বোর্ড বাদক, গিটার বাদক, সংগীত পরিচালক হ্যাপী আখান্দ খুব বেশি গান আমাদের জন্য রেখে যাননি। এ নিয়ে লাকী আখান্দ আজীবন আক্ষেপ করেছেন। নব্বই দশকের শুরুতে আদরের ছোট ভাই হ্যাপী আখান্দের গান দিয়ে ‘শেষ উপহার’ নামে অ্যালবাম বের করেছিলেন তিনি। হ্যাপীর স্মরণে ‘হ্যাপীটাচ’ নামে ব্যান্ডও বানিয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর। এরপর ধীরে ধীরে লাকীও অনেকটাই নীরব হয়ে যান, প্রধান কারণ ছিল হ্যাপীর না-থাকা। প্রচণ্ড অভিমান বুকে নিয়ে তিনিও চলে গেছেন পরপারে।

হ্যাপী আখান্দ মানুষকে শেখাতেও ভালোবাসতেন। এখনকার মতো তখন এই সব বাদ্যযন্ত্র শেখার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। সবাই মিলে একসঙ্গে বসে শিখতেন, অনুশীলন করতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা কলকাতা—বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে শিক্ষা নিয়েছেন এখনকার নামকরা অনেক মিউজিশিয়ানও।
অন্যদিকে খুব বোহেমিয়ান জীবন যাপন করতেন হ্যাপী আখান্দ। তখন যাঁরা ব্যান্ড সংগীত চর্চা করতেন, তাঁরা বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন তাঁর কাছ থেকে। তাই তো আইয়ুব বাচ্চু কিংবা শাফিন আহমেদের মতো ব্যান্ড তারকারা বিভিন্ন সময়ে অকপটে স্বীকার করেছেন হ্যাপীর মাহাত্ম্য এবং শূন্যতাকে। হ্যাপীর চলে যাওয়া তখন যে কত বড় ধাক্কা ছিল, সেটা বোঝার জন্য আরেক কিংবদন্তি গিটার মায়েস্ত্রো নিলয় দাশের দিকে তাকাতে হবে। বন্ধুর স্মরণে গিটার শিক্ষক নিলয় দাশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘হ্যাপী স্কুল অব মিউজিক’। আবার তাঁর প্রকাশিত অ্যালবামেও একটি গান ছিল হ্যাপীকে নিয়ে। শিরোনাম ‘হ্যাপী তোকে মনে পড়লেই’। এখনো ঠিক তেমনই, কাঁধে গিটার নিয়ে বোহেমিয়ান কোনো তরুণকে হেঁটে যেতে দেখলে আমাদের মনে পড়ে যায় হ্যাপী আখান্দের নাম।

প্রযুক্তির ইতিহাসে ১৯২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। বর্তমান যুগে আমরা যে টেলিভিশনকে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছি, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল এই দিনটিতেই। স্কটিশ প্রকৌশলী জন লগি বেয়ার্ড সেদিন প্রথমবারের মতো ‘রিয়েল টেলিভিশন’ বা প্রকৃত টেলিভিশন জনসমক্ষে প্রদর্শন কর
২২ মিনিট আগে
দোহারের ইকরাশি গ্রামের শান্তি রানী পাল। বয়স ৯২ বছর। বয়সের ভারে অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন। চোখের আলো কমে গেছে, গলার স্বরও ভেঙে গেছে; তবু সংসারের চাকাকে সচল রাখতে আদি পেশা হিসেবে কুমারের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
২০ ঘণ্টা আগে
জেনে অবাক হবেন যে শত বছর আগে বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলে বন্যপ্রাণী বাস করত। কোন কোন বন্যপ্রাণী ও পাখি সেখানে ছিল? নদী, জলাভূমি ও পুকুরে কী কী মাছ পাওয়া যেত? ১৯১০ সালে প্রকাশিত জে এন গুপ্ত-এর পূর্ববঙ্গ ও আসামের ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (বগুড়া) থেকে অনুবাদ করেছেন ভূ-পর্যটক তারেক অণু।
২১ ঘণ্টা আগে
আজ ২৫ জানুয়ারি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মদিন। সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্য-পরিসরে শতবর্ষ পরেও তিনি বেঁচে আছেন সক্রিয়তার ভেতর দিয়েই। এও সত্য যে, তাঁকে নিয়ে তাঁর কালেই তো বেশ জোরজারের সাথে চর্চা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ধুন্ধুমারভাবে প্রভাবিত করে গেছেন বিচিত্র ধারার সাহিত্যের লোকজনকে। এসবের পরও সেইকালে মধুসূদন
১ দিন আগে