ফাবিহা বিনতে হক

১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিল। ইরানের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দিন। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। পতন ঘটে রেজা শাহ পাহলভির শাসনের। এই রাজনৈতিক বাকবদলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে ইরানের সংস্কৃতিতে। বিশেষ করে ইরানের চলচ্চিত্র জগতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ইরানি সিনেমা প্রথমে হোঁচট খায়। কিন্তু এরপর ধাপে ধাপে তারা নিজেদের বদলে ফেলে বিশ্বমঞ্চ জয় করে।
বিপ্লবের আগে ইরানের সিনেমা ছিল মূলত হলিউড বা বলিউডের অনুকরণে তৈরি। এই সিনেমাগুলোকে বলা হতো ‘ফিল্ম ফার্সি’। সেই সিনেমাগুলোতে নাচ, গান, মারপিট আর রোমান্সের আধিক্য ছিল। বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে দর্শককে বিনোদন দেওয়াই ছিল এর মূল লক্ষ্য। ১৯৫০-৬০ দশকের মধ্যে প্রায় ৩২৪টি ছবি মুক্তি পায় ইরানে। শাহ সরকার সিনেমা শিল্পের অগ্রগতির জন্য যথেষ্ট তৎপর ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে এই সিনেমাগুলোর বেশিরভাগই বাণিজ্যিক এবং পশ্চিমা ভাবধারার আবহে বানানো হয়েছিল বলে ইরানের সমাজ-সংস্কৃতির প্রতিফলন সেখানে অনুপস্থিত ছিল। এ কারণে জনগণও ধীরে ধীরে এসব সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে।
১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সরকার ইরানি সিনেমার ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে। ইরান ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। সিনেমায় নারী ও পুরুষের মধ্যে শারীরিক স্পর্শ নিষিদ্ধ করা হয়। সিনেমায় নারীদের নাচ-গান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় ঘরের ভেতরের দৃশ্য নিয়ে। কঠোর নিয়মের কারণে ঘরের ভেতরে স্বামী বা সন্তানের সামনেও অভিনেত্রীদের হিজাব পরে থাকতে হতো।

কিন্তু বাস্তবে ইরানি নারীরা ঘরের ভেতর পরিবারের সামনে হিজাব পরেন না। ফলে সিনেমায় ঘরের দৃশ্যগুলো দর্শকদের কাছে খুব অবাস্তব ও হাস্যকর লাগতো। এই সমস্যা এড়াতে পরিচালকরা ঘরের ভেতরের দৃশ্য যেমন এড়িয়ে চলতে শুরু করেন, এর পাশাপাশি ইরানি সিনেমাগুলোও ধীরে ধীরে নারী বিবর্জিত হতে শুরু করে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে নির্মিত মোট ২২০৮টি সিনেমার মধ্যে ১৯৫৬টি সিনেমা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইরানি সিনেমার এই কালো অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
পর্দা প্রথার কঠোর প্রয়োগ, চরম লিঙ্গ বৈষম্য ধীরে ধীরে ইরানি ছবিকে প্রাণহীন করে তুলছিল। ঠিক এই সময়ে, ১৯৮৫ সালে মুক্তি পায় দাভান্ডে। একটি শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইরানের সমাজ ব্যবস্থাকে তুলে ধরেন পরিচালক আমির নাদেরি।
সিনেমায় নারীদের উপস্থিতি যখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন পরিচালকরা নতুন কৌশল খোঁজেন। তারা বুঝতে পারেন, শিশুদের নিয়ে সিনেমা বানালে সেন্সর বোর্ডের কাঁচি থেকে বাঁচা যাবে। শিশুদের ক্ষেত্রে পর্দার নিয়মকানুন অতটা কড়া ছিল না। শিশুরাও খুব স্বাভাবিক ও সাবলীল অভিনয় করতে পারত। তাদের সরল চোখের দৃষ্টি দিয়ে সমাজের বড় বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সত্য তুলে ধরা যেত।
এই ধারায় প্রথম বড় সাফল্য পান বিখ্যাত পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁর হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম? (১৯৮৭) সিনেমাটি দারুণ প্রশংসিত হয়। এরপর মাজিদ মাজিদি নির্মাণ করেন চিলড্রেন অব হেভেন (১৯৯৭)। এক জোড়া হারানো জুতো নিয়ে দুই ভাইবোনের এই গল্প বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এটিই প্রথম ইরানি সিনেমা যা অস্কারে ‘সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগে মনোনয়ন পায়।

মাজিদ মাজিদির আরেকটি বিখ্যাত সিনেমা হলো দ্য কালার অব প্যারাডাইস (১৯৯৯)। সেখানে প্রকৃতির মাঝে বেড়ে ওঠা এক অন্ধ শিশুর গল্প বলা হয়। এছাড়া পরিচালক জাফর পানাহি শিশুদের নিয়ে নির্মাণ করেন দ্য হোয়াইট বেলুন (১৯৯৫)। এই সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্যামেরা ডি’অর পুরস্কার জিতে নেয়। বিপ্লব-পরবর্তী সময় শিশুরাই প্রথমে ইরানি সিনেমাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং নিজেদের বিশ্বদরবারে পরিচিত করে।
১৯৮৮ সালে খোমিনীর মৃত্যু ইরানের রাজনীতিতে নতুন মোড় আনে। সিনেমা এবং শিল্প জগতে নতুন বিপ্লব শুরু হয়।
কয়েক বছর পর পরিচালকরা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখেন। দশকের মাঝামাঝি সময়ে, ধর্মীয় ফিকাহ ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকে। তবে এসময়ে ইরান আরও একবার কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়। এবার আর দেশের অভ্যন্তরে কোনো জনবিপ্লব নয়, ইরাক-ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধের পটভূমিকা উদ্বুদ্ধ করে ইরানের পরিচালকদের। মোহসেন মাখমালবাফ, বাহরাম বাইজায় প্রমুখ পরিচালক যুদ্ধের পটভূমিতে সিনেমা তৈরি করতে থাকেন। অদ্ভুতভাবেই কোনো সিনেমাতেই যুদ্ধকে পরিষ্কার করে দেখানো হয়নি। না দেখানো হয়েছে গোলাগুলি, কামান দাগা, না সেনাবাহিনীর জাতীয়তাবোধ। যুদ্ধের মরসুমে মানুষের জীবন যাত্রা তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে।
পর্দায় ধীরে ধীরে নারীদের উপস্থিতিও বাড়তে শুরু করে। কারণ ততদিনে নির্মাতারা বুঝে গেছেন, কীভাবে নিয়মের মধ্যে থেকেই নারীদের গল্প বলা যায়। তবে তারা আর আগের মতো গ্ল্যামারাস রূপে পর্দায় আসেননি। বাস্তব জীবনের লড়াকু ও সংগ্রামী নারী হিসেবে সিনেমার পর্দায় আবির্ভূত হন তারা।
১৯৯০ সালে মোহসেন মাখমালবাফ পরিচালিত নেওয়াতে আশিকী ইরানের সমস্ত পর্দা প্রথাকে বিদ্রূপ করে। মাল্টিপল ন্যারেটিভে চিত্রিত ছবিতে নারী চরিত্র গজল প্রধান হয়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত জাফর পানাহীর প্রথম ছবি বাদকণাকে সফেদ বহু প্রশংসিত হয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে।

পরিচালক জাফর পানাহি নির্মাণ করেন দ্য সার্কেল (২০০০)। এই সিনেমায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের বন্দিদশা ও কষ্টের কথা বলা হয়। সিনেমাটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পুরস্কার জেতে।
তার দুই বছর পর ২০০২ সালে আব্বাস কিয়ারোস্তামি নির্মাণ করেন টেন। এই সিনেমার পুরো শুটিং হয় একটি চলন্ত গাড়ির ভেতর। গাড়ির ভেতর এক নারী চালক এবং তার ছেলে ও যাত্রীদের কথোপকথনের মাধ্যমে নারীদের না বলা কথা বেরিয়ে আসে। গাড়ির ভেতরটিকে নারীদের একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখানো হয়।
নারী পরিচালক রাখশান বানি এতেমাদও এই সময়ে নারীদের সংগ্রাম নিয়ে দারুণ সব সিনেমা নির্মাণ করেন। এভাবেই নারীরা আবারও ইরানি সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।
১৯৯৭ সালে নতুন সংস্কারবাদী সরকার গঠন হয় ইরানে। রাষ্ট্রপতি হন মহম্মদ খাতামি। রিফর্মিস্ট সরকারের সঙ্গে শুরু হয় দো-এ খুরদাদ বা রিফর্মিস্ট আন্দোলন। ইরানের যুব সমাজ এই সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে এবং খোমিনীর শাসনকালে আরোপিত বিধিনিষেধ ভেঙে নতুন সমাজ গঠনে তৎপর হয়। এই সময় ইরানের সিনেমা উপহার পায় একগুচ্ছ নতুন পরিচালক এবং পুরানো পরিচালকের স্বতঃস্ফূর্ত পরিচালনা।
ইরানি পরিচালকরা স্টুডিওর বাইরে বেরিয়ে আসেন। তারা ক্যামেরা নিয়ে কখনো ছুটে যান রাস্তায়, কখনো পাহাড়ে, কখনো প্রত্যন্ত গ্রামে। নামিদামি তারকার বদলে সাধারণ মানুষদের দিয়ে অভিনয় করানো শুরু হয়। মেকআপ বা কৃত্রিম আলোর ব্যবহার একদম কমে যায়। তৈরি হয় এক নতুন ধারা, যার নাম দেওয়া হয় ‘পোয়েটিক রিয়ালিজম’ বা কাব্যিক বাস্তবতা। তারা সরাসরি রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মাধ্যমে জীবনের গভীর দর্শন তুলে ধরেন।
এই ধারার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আব্বাস কিয়ারোস্তামির টেস্ট অফ চেরি (১৯৯৭)। একজন মানুষ আত্মহত্যা করতে চায়, সে তাকে মাটি দেওয়ার জন্য একজন লোক খুঁজছে—এটাই সিনেমার গল্প। এই সহজ অথচ গভীর দর্শনের সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার ‘পাম ডি’অর’ জয় করে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে ইরানের নাম চিরস্থায়ী হয়। এরপর মোহসেন মাখমালবাফ নির্মাণ করেন ‘কান্দাহার’ (২০০১)। আফগানিস্তানের যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটিও কান উৎসবে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং টাইম ম্যাগাজিনের সেরা ১০০ সিনেমার তালিকায় জায়গা পায়।

২০০০ সালে মুক্তি পায় জাফর পানাহির সিনেমা দ্য সার্কেল। সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মানোর কষ্ট এবং মেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কঠিন নিয়মকানুনের চিত্র খুব সুন্দরভাবে এই সিনেমায় ফুটে উঠেছে। এর পাশাপাশি পুলিশের ক্ষমতা এবং আইনের অপব্যবহার নিয়েও এখানে সাহসী প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
জাফর পানাহির এমন সাহসী কাজের আরেকটি দারুণ উদাহরণ হলো অফসাইড সিনেমা। বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বানানো এই সিনেমায় দেখানো হয়, ইরানে মেয়েদের স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখা নিষেধ। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলের একটি বাছাইপর্বের ম্যাচ দেখার জন্য একদল মেয়ের মাঠে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা ও সংগ্রাম নিয়েই সিনেমাটির গল্প সাজানো হয়েছে।
২০০০ সালের পর ইরানি সিনেমায় আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে। শুধু গ্রাম বা শিশুদের গল্প নয়, শহরের মধ্যবিত্ত জীবনের জটিল গল্পও উঠে আসতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের মূল কারিগর ছিলেন পরিচালক আসগর ফরহাদি। তিনি সমাজের নৈতিক দ্বন্দ্ব, আইনি জটিলতা, মিথ্যা এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেন।
২০১১ সালে তাঁর পরিচালিত এ সেপারেশন সিনেমাটি মুক্তি পায়। একটি সাধারণ বিবাহবিচ্ছেদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুটি পরিবারের নৈতিক সংকটের গল্প বলে এই সিনেমা। প্রথম ইরানি সিনেমা হিসেবে অস্কারে ‘সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ পুরস্কার জেতে এ সেপারেশন। এরপর ২০১৬ সালে তাঁর আরেকটি সিনেমা দ্য সেলসম্যান পুনরায় অস্কার জয় করে। এই সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবেও সেরা চিত্রনাট্য ও সেরা অভিনেতার পুরস্কার পায়। আসগর ফরহাদির হাত ধরে ইরানি সিনেমা সফলতার একেবারে চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে যায়।
ইসলামি বিপ্লব ইরানের সমাজ-সংস্কৃতিতে বিশাল ধাক্কা দিলেও তা সামলে নিজেদের অবস্থানকে বিশ্ব দরবারে পাকাপোক্ত করেছে দেশটি। মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে একটা জাতি একটা সামগ্রিক পরিবর্তনের পথে চলছে। বিপ্লবোত্তর ছবির তৃতীয় পর্ব এখনো চলছে ইরানে। ইরানের রাজনীতিতে পরিবর্তন আসার পাশাপাশি গণমানুষের চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হচ্ছে। সেই পরিবর্তনের ছায়া পড়ছে ইরানি ছবিতে। চলচ্চিত্র যদি সমাজ রাজনীতির কথা না বলে তবে এর সফলতাই বা কোথায়?

১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিল। ইরানের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দিন। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। পতন ঘটে রেজা শাহ পাহলভির শাসনের। এই রাজনৈতিক বাকবদলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে ইরানের সংস্কৃতিতে। বিশেষ করে ইরানের চলচ্চিত্র জগতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ইরানি সিনেমা প্রথমে হোঁচট খায়। কিন্তু এরপর ধাপে ধাপে তারা নিজেদের বদলে ফেলে বিশ্বমঞ্চ জয় করে।
বিপ্লবের আগে ইরানের সিনেমা ছিল মূলত হলিউড বা বলিউডের অনুকরণে তৈরি। এই সিনেমাগুলোকে বলা হতো ‘ফিল্ম ফার্সি’। সেই সিনেমাগুলোতে নাচ, গান, মারপিট আর রোমান্সের আধিক্য ছিল। বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে দর্শককে বিনোদন দেওয়াই ছিল এর মূল লক্ষ্য। ১৯৫০-৬০ দশকের মধ্যে প্রায় ৩২৪টি ছবি মুক্তি পায় ইরানে। শাহ সরকার সিনেমা শিল্পের অগ্রগতির জন্য যথেষ্ট তৎপর ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে এই সিনেমাগুলোর বেশিরভাগই বাণিজ্যিক এবং পশ্চিমা ভাবধারার আবহে বানানো হয়েছিল বলে ইরানের সমাজ-সংস্কৃতির প্রতিফলন সেখানে অনুপস্থিত ছিল। এ কারণে জনগণও ধীরে ধীরে এসব সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে।
১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সরকার ইরানি সিনেমার ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে। ইরান ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। সিনেমায় নারী ও পুরুষের মধ্যে শারীরিক স্পর্শ নিষিদ্ধ করা হয়। সিনেমায় নারীদের নাচ-গান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় ঘরের ভেতরের দৃশ্য নিয়ে। কঠোর নিয়মের কারণে ঘরের ভেতরে স্বামী বা সন্তানের সামনেও অভিনেত্রীদের হিজাব পরে থাকতে হতো।

কিন্তু বাস্তবে ইরানি নারীরা ঘরের ভেতর পরিবারের সামনে হিজাব পরেন না। ফলে সিনেমায় ঘরের দৃশ্যগুলো দর্শকদের কাছে খুব অবাস্তব ও হাস্যকর লাগতো। এই সমস্যা এড়াতে পরিচালকরা ঘরের ভেতরের দৃশ্য যেমন এড়িয়ে চলতে শুরু করেন, এর পাশাপাশি ইরানি সিনেমাগুলোও ধীরে ধীরে নারী বিবর্জিত হতে শুরু করে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে নির্মিত মোট ২২০৮টি সিনেমার মধ্যে ১৯৫৬টি সিনেমা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইরানি সিনেমার এই কালো অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
পর্দা প্রথার কঠোর প্রয়োগ, চরম লিঙ্গ বৈষম্য ধীরে ধীরে ইরানি ছবিকে প্রাণহীন করে তুলছিল। ঠিক এই সময়ে, ১৯৮৫ সালে মুক্তি পায় দাভান্ডে। একটি শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইরানের সমাজ ব্যবস্থাকে তুলে ধরেন পরিচালক আমির নাদেরি।
সিনেমায় নারীদের উপস্থিতি যখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন পরিচালকরা নতুন কৌশল খোঁজেন। তারা বুঝতে পারেন, শিশুদের নিয়ে সিনেমা বানালে সেন্সর বোর্ডের কাঁচি থেকে বাঁচা যাবে। শিশুদের ক্ষেত্রে পর্দার নিয়মকানুন অতটা কড়া ছিল না। শিশুরাও খুব স্বাভাবিক ও সাবলীল অভিনয় করতে পারত। তাদের সরল চোখের দৃষ্টি দিয়ে সমাজের বড় বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সত্য তুলে ধরা যেত।
এই ধারায় প্রথম বড় সাফল্য পান বিখ্যাত পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁর হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম? (১৯৮৭) সিনেমাটি দারুণ প্রশংসিত হয়। এরপর মাজিদ মাজিদি নির্মাণ করেন চিলড্রেন অব হেভেন (১৯৯৭)। এক জোড়া হারানো জুতো নিয়ে দুই ভাইবোনের এই গল্প বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এটিই প্রথম ইরানি সিনেমা যা অস্কারে ‘সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগে মনোনয়ন পায়।

মাজিদ মাজিদির আরেকটি বিখ্যাত সিনেমা হলো দ্য কালার অব প্যারাডাইস (১৯৯৯)। সেখানে প্রকৃতির মাঝে বেড়ে ওঠা এক অন্ধ শিশুর গল্প বলা হয়। এছাড়া পরিচালক জাফর পানাহি শিশুদের নিয়ে নির্মাণ করেন দ্য হোয়াইট বেলুন (১৯৯৫)। এই সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্যামেরা ডি’অর পুরস্কার জিতে নেয়। বিপ্লব-পরবর্তী সময় শিশুরাই প্রথমে ইরানি সিনেমাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং নিজেদের বিশ্বদরবারে পরিচিত করে।
১৯৮৮ সালে খোমিনীর মৃত্যু ইরানের রাজনীতিতে নতুন মোড় আনে। সিনেমা এবং শিল্প জগতে নতুন বিপ্লব শুরু হয়।
কয়েক বছর পর পরিচালকরা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখেন। দশকের মাঝামাঝি সময়ে, ধর্মীয় ফিকাহ ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকে। তবে এসময়ে ইরান আরও একবার কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়। এবার আর দেশের অভ্যন্তরে কোনো জনবিপ্লব নয়, ইরাক-ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধের পটভূমিকা উদ্বুদ্ধ করে ইরানের পরিচালকদের। মোহসেন মাখমালবাফ, বাহরাম বাইজায় প্রমুখ পরিচালক যুদ্ধের পটভূমিতে সিনেমা তৈরি করতে থাকেন। অদ্ভুতভাবেই কোনো সিনেমাতেই যুদ্ধকে পরিষ্কার করে দেখানো হয়নি। না দেখানো হয়েছে গোলাগুলি, কামান দাগা, না সেনাবাহিনীর জাতীয়তাবোধ। যুদ্ধের মরসুমে মানুষের জীবন যাত্রা তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে।
পর্দায় ধীরে ধীরে নারীদের উপস্থিতিও বাড়তে শুরু করে। কারণ ততদিনে নির্মাতারা বুঝে গেছেন, কীভাবে নিয়মের মধ্যে থেকেই নারীদের গল্প বলা যায়। তবে তারা আর আগের মতো গ্ল্যামারাস রূপে পর্দায় আসেননি। বাস্তব জীবনের লড়াকু ও সংগ্রামী নারী হিসেবে সিনেমার পর্দায় আবির্ভূত হন তারা।
১৯৯০ সালে মোহসেন মাখমালবাফ পরিচালিত নেওয়াতে আশিকী ইরানের সমস্ত পর্দা প্রথাকে বিদ্রূপ করে। মাল্টিপল ন্যারেটিভে চিত্রিত ছবিতে নারী চরিত্র গজল প্রধান হয়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত জাফর পানাহীর প্রথম ছবি বাদকণাকে সফেদ বহু প্রশংসিত হয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে।

পরিচালক জাফর পানাহি নির্মাণ করেন দ্য সার্কেল (২০০০)। এই সিনেমায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের বন্দিদশা ও কষ্টের কথা বলা হয়। সিনেমাটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পুরস্কার জেতে।
তার দুই বছর পর ২০০২ সালে আব্বাস কিয়ারোস্তামি নির্মাণ করেন টেন। এই সিনেমার পুরো শুটিং হয় একটি চলন্ত গাড়ির ভেতর। গাড়ির ভেতর এক নারী চালক এবং তার ছেলে ও যাত্রীদের কথোপকথনের মাধ্যমে নারীদের না বলা কথা বেরিয়ে আসে। গাড়ির ভেতরটিকে নারীদের একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখানো হয়।
নারী পরিচালক রাখশান বানি এতেমাদও এই সময়ে নারীদের সংগ্রাম নিয়ে দারুণ সব সিনেমা নির্মাণ করেন। এভাবেই নারীরা আবারও ইরানি সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।
১৯৯৭ সালে নতুন সংস্কারবাদী সরকার গঠন হয় ইরানে। রাষ্ট্রপতি হন মহম্মদ খাতামি। রিফর্মিস্ট সরকারের সঙ্গে শুরু হয় দো-এ খুরদাদ বা রিফর্মিস্ট আন্দোলন। ইরানের যুব সমাজ এই সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে এবং খোমিনীর শাসনকালে আরোপিত বিধিনিষেধ ভেঙে নতুন সমাজ গঠনে তৎপর হয়। এই সময় ইরানের সিনেমা উপহার পায় একগুচ্ছ নতুন পরিচালক এবং পুরানো পরিচালকের স্বতঃস্ফূর্ত পরিচালনা।
ইরানি পরিচালকরা স্টুডিওর বাইরে বেরিয়ে আসেন। তারা ক্যামেরা নিয়ে কখনো ছুটে যান রাস্তায়, কখনো পাহাড়ে, কখনো প্রত্যন্ত গ্রামে। নামিদামি তারকার বদলে সাধারণ মানুষদের দিয়ে অভিনয় করানো শুরু হয়। মেকআপ বা কৃত্রিম আলোর ব্যবহার একদম কমে যায়। তৈরি হয় এক নতুন ধারা, যার নাম দেওয়া হয় ‘পোয়েটিক রিয়ালিজম’ বা কাব্যিক বাস্তবতা। তারা সরাসরি রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মাধ্যমে জীবনের গভীর দর্শন তুলে ধরেন।
এই ধারার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আব্বাস কিয়ারোস্তামির টেস্ট অফ চেরি (১৯৯৭)। একজন মানুষ আত্মহত্যা করতে চায়, সে তাকে মাটি দেওয়ার জন্য একজন লোক খুঁজছে—এটাই সিনেমার গল্প। এই সহজ অথচ গভীর দর্শনের সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার ‘পাম ডি’অর’ জয় করে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে ইরানের নাম চিরস্থায়ী হয়। এরপর মোহসেন মাখমালবাফ নির্মাণ করেন ‘কান্দাহার’ (২০০১)। আফগানিস্তানের যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটিও কান উৎসবে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং টাইম ম্যাগাজিনের সেরা ১০০ সিনেমার তালিকায় জায়গা পায়।

২০০০ সালে মুক্তি পায় জাফর পানাহির সিনেমা দ্য সার্কেল। সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মানোর কষ্ট এবং মেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কঠিন নিয়মকানুনের চিত্র খুব সুন্দরভাবে এই সিনেমায় ফুটে উঠেছে। এর পাশাপাশি পুলিশের ক্ষমতা এবং আইনের অপব্যবহার নিয়েও এখানে সাহসী প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
জাফর পানাহির এমন সাহসী কাজের আরেকটি দারুণ উদাহরণ হলো অফসাইড সিনেমা। বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বানানো এই সিনেমায় দেখানো হয়, ইরানে মেয়েদের স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখা নিষেধ। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলের একটি বাছাইপর্বের ম্যাচ দেখার জন্য একদল মেয়ের মাঠে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা ও সংগ্রাম নিয়েই সিনেমাটির গল্প সাজানো হয়েছে।
২০০০ সালের পর ইরানি সিনেমায় আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে। শুধু গ্রাম বা শিশুদের গল্প নয়, শহরের মধ্যবিত্ত জীবনের জটিল গল্পও উঠে আসতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের মূল কারিগর ছিলেন পরিচালক আসগর ফরহাদি। তিনি সমাজের নৈতিক দ্বন্দ্ব, আইনি জটিলতা, মিথ্যা এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেন।
২০১১ সালে তাঁর পরিচালিত এ সেপারেশন সিনেমাটি মুক্তি পায়। একটি সাধারণ বিবাহবিচ্ছেদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুটি পরিবারের নৈতিক সংকটের গল্প বলে এই সিনেমা। প্রথম ইরানি সিনেমা হিসেবে অস্কারে ‘সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র’ পুরস্কার জেতে এ সেপারেশন। এরপর ২০১৬ সালে তাঁর আরেকটি সিনেমা দ্য সেলসম্যান পুনরায় অস্কার জয় করে। এই সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবেও সেরা চিত্রনাট্য ও সেরা অভিনেতার পুরস্কার পায়। আসগর ফরহাদির হাত ধরে ইরানি সিনেমা সফলতার একেবারে চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে যায়।
ইসলামি বিপ্লব ইরানের সমাজ-সংস্কৃতিতে বিশাল ধাক্কা দিলেও তা সামলে নিজেদের অবস্থানকে বিশ্ব দরবারে পাকাপোক্ত করেছে দেশটি। মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে একটা জাতি একটা সামগ্রিক পরিবর্তনের পথে চলছে। বিপ্লবোত্তর ছবির তৃতীয় পর্ব এখনো চলছে ইরানে। ইরানের রাজনীতিতে পরিবর্তন আসার পাশাপাশি গণমানুষের চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হচ্ছে। সেই পরিবর্তনের ছায়া পড়ছে ইরানি ছবিতে। চলচ্চিত্র যদি সমাজ রাজনীতির কথা না বলে তবে এর সফলতাই বা কোথায়?

১৯৬৯ সালের জুলাই। মানব ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত একটি বাক্য ভেসে আসে চাঁদের মাটি থেকে— ‘একজন মানুষের জন্য ছোট ধাপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য বিশাল এক পদক্ষেপ।’ নীল আর্মস্ট্রংয়ের সেই প্রথম পদচিহ্ন, মানবজাতির এক নতুন ইতিহাস। তবে, এই ঘটনাটি শুধু প্রযুক্তির জয় ছিল না, ছিল এক রাজনৈতিক সময়ের প্রতীক।
২ ঘণ্টা আগে
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব কেবল ইসলামপন্থীদের একক কোনো লড়াই ছিল না। শাহের পতন ঘটাতে বামপন্থী ও সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন। রাজতন্ত্রের পতন নিশ্চিত হওয়ার পর সবাই একটি নতুন ও স্বাধীন ইরানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্
৮ ঘণ্টা আগে
১৯৭৮ সালের শেষভাগ। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে কিছুটা দূরেই এক শান্ত, প্রায় অচেনা গ্রাম নফল-লে শাতো। এখানে প্রতিদিন ভিড় জমছে সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী আর দূরদেশ থেকে আসা ইরানি প্রবাসীদের। কিন্তু এই ভিড় কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে নয়। এই গ্রামে বসেই নির্বাসিত এক ধর্মীয় নেতা দূরবর্তী একটি রাষ্ট
৯ ঘণ্টা আগে
‘আমি চাই না আপনারা আমাকে দেখেন, মানুষ খুশি থাকলে আমিও খুশি’— অত্যন্ত সাধারণ এই জীবনবোধের অধিকারী কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার চরের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম তাজুর। তিনি আজ ইন্টারনেটে এক পরিচিত নাম।
১ দিন আগে