‘আমি চাই না আপনারা আমাকে দেখেন, মানুষ খুশি থাকলে আমিও খুশি’— অত্যন্ত সাধারণ এই জীবনবোধের অধিকারী কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার চরের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম তাজুর। তিনি আজ ইন্টারনেটে এক পরিচিত নাম। পেশায় একজন রাজমিস্ত্রির সহকারী হয়েও তিনি যেভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে তৃণমূলের সমস্যাগুলো তুলে ধরছেন, তা সমকালীন ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা নাগরিক সাংবাদিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে পরিচিত এই তরুণের উত্থান কেবল একটি ভাইরাল ভিডিওর গল্প নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও তাত্ত্বিক তাৎপর্য।
তাজু ভাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তোলেন গত ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবসে। নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর বাজারে জিলাপি বিক্রি নিয়ে করা একটি ভিডিওতে তিনি দোকানিকে প্রশ্ন করেন, ‘জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন? সরকারি রেটে?’ এই অতি সাধারণ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটে। ভিডিওটি ইতিমধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ দেখেছেন।
ফলশ্রুতিতে, মাত্র ৫-৬ দিন আগেও যাঁর ফলোয়ার ছিল মাত্র ছয় হাজার, সোমবার (৩০ মার্চ) রাত নাগাদ তা ১ লাখ ৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তাজু ভাইয়ের এই জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষ কৃত্রিমতার চেয়ে মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের সারল্য ও সাহসকে বেশি পছন্দ করে।
তাজু ভাইয়ের ভিডিওগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল বিনোদন দিতে ভিডিও বানান না। তাঁর বিষয়বস্তু অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ। তিনি নারায়ণপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ চিত্র নিয়ে ভিডিও বানান। নৌকায় মোটরসাইকেল পারাপার কিংবা কর্দমাক্ত রাস্তা নিয়ে করা তাঁর ভিডিওগুলো কুড়িগ্রামের অবহেলিত যোগাযোগ ব্যবস্থার বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
তাজু ভাই শ্রমজীবী মানুষের জীবন নিয়ে ভিডিও তৈরি করেন। হাড়কাঁপানো শীতের রাতে রাজমিস্ত্রিদের কাজ করার দৃশ্যপট তিনি যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
এছাড়া সরিষা ক্ষেতে সেচ বা ট্রেনের সময়সূচি নিয়ে তাজু ভাইয়ের তৈরি করা তথ্যমূলক ভিডিওগুলো স্থানীয় মানুষের জন্য দারুণ উপকারী।
তাজু ভাই কেন ‘আলোচনায়’
তাজু ভাইয়ের কাজকে বিকল্প মিডিয়া তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। মূলধারার মিডিয়া সাধারণত জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ফলে চরের মানুষের ভাঙা রাস্তা বা নৌকার কষ্টের মতো ‘ক্ষুদ্র’ ইস্যুগুলো সেখানে জায়গা পায় না। মেইন স্ট্রিম মিডিয়া যখন করপোরেটের পেটের ভেতর ঢুকে পড়েছে, তাজু ভাই তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে বুম হাতে মাঠে নেমেছেন। তিনি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। আর এটিই বিকল্প মিডিয়ার প্রধান কাজ।
নাগেশ্বরীর ‘দরিদ্র’ ইউনিয়ন নারায়ণপুরের তাজু ভাইয়ের কাজকে উন্নয়ন যোগাযোগ তত্ত্বের সঙ্গেও মেলানো যায়। বহুল আলোচিত এই তত্ত্বে তত্ত্বে মিডিয়াকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। তাজু ভাই যখন জনপ্রতিনিধিদের কাছে রাস্তা সংস্কারের আহ্বান জানান, তখন তিনি পরোক্ষভাবে এলাকার উন্নয়নেই ভূমিকা রাখেন। তাঁর ভিডিওগুলো কেবল অভিযোগ নয়, বরং পরিবর্তনের একটি দাবি হিসেবে কাজ করছে।
তাজু ভাই নিজেকে সাংবাদিক দাবি করেন না বটে, তবে তাঁর কাজের ধরন নিখুঁতভাবে ‘গ্রাসরুট জার্নালিজম’। হাতে লম্বা বুম আর মাইক্রোফোন ধরে তাঁর প্রশ্ন করার ভঙ্গিটি হয়তো অনেকের কাছে ব্যঙ্গাত্মক মনে হতে পারে, কিন্তু সেই ভঙ্গির আড়ালে তিনি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলোই করছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্য বলার জন্য ডিগ্রি বা বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে বেশি প্রয়োজন সাহস এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা।