স্ট্রিম ডেস্ক

১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব কেবল ইসলামপন্থীদের একক কোনো লড়াই ছিল না। শাহের পতন ঘটাতে বামপন্থী ও সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন। রাজতন্ত্রের পতন নিশ্চিত হওয়ার পর সবাই একটি নতুন ও স্বাধীন ইরানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র গঠিত হয় তখন রাজনৈতিক সমীকরণ খুব দ্রুত পাল্টে যায়। বিপ্লবের সঙ্গী হওয়া সত্ত্বেও সুন্নি, কমিউনিস্ট এবং সেক্যুলারদের জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। একটি সম্মিলিত গণ-অভ্যুত্থান কীভাবে একটি একক আদর্শের রাষ্ট্রে পরিণত হলো তা আধুনিক ইতিহাসের এক চমকপ্রদ অধ্যায়।
বিপ্লবের ঠিক পরেই একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। খোমেনি নিজেই সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী নেতা মেহেদি বাজারগানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্ম ও আধুনিকতার ভারসাম্য থাকবে। কিন্তু খুব দ্রুতই ক্ষমতার দুটি আলাদা কেন্দ্র তৈরি হয়। একদিকে ছিল বাজারগানের আনুষ্ঠানিক সরকারি কাঠামো। অন্যদিকে ছিল খোমেনির নেতৃত্বাধীন রেভল্যুশনারি কাউন্সিল এবং ইসলামি বিপ্লবী পাহারাদার বাহিনী।
মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট সেক্যুলারদের রাজনৈতিক কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। ইসলামপন্থী ছাত্ররা যখন তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে তখন বাজারগান তার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আব্বাস আমানত তাঁর ইরান: আ মডার্ন হিস্ট্রি বইয়ে এই সময়টাকে দারুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, জিম্মি সংকট খোমেনিকে উদারপন্থীদের হটিয়ে চরমপন্থীদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার সবচেয়ে বড় সুযোগ করে দিয়েছিল। সেক্যুলার জাতীয়তাবাদীদের আর কখনোই ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরতে দেওয়া হয়নি।
প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবুল হাসান বনিসদরও টিকতে পারেননি। তিনি ইসলামি কাঠামোর ভেতরে থেকেই একটি উদারনৈতিক চিন্তাধারার সরকার চালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কট্টরপন্থীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ১৯৮১ সালের ২১ জুন তাঁকে অভিশংসন বা ইমপিচ করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি ফ্রান্সে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় সেক্যুলার চিন্তাধারার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।
কমিউনিস্ট তুদেহ পার্টি এবং পিপলস মুজাহিদিন অব ইরানের বা এমইকের মতো বামপন্থী দলগুলো শাহবিরোধী আন্দোলনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। বিপ্লবের প্রথম কয়েক বছর তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। তুদেহ পার্টি এমনকি খোমেনির ইসলামি প্রজাতন্ত্রকেও সমর্থন করেছিল। তারা ভেবেছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এই লড়াইয়ে তারা ইসলামপন্থীদের মিত্র হিসেবেই থেকে যাবে।
কিন্তু আদর্শিক সংঘাত ছিল অবশ্যম্ভাবী। ইসলামি শাসনতন্ত্রের সঙ্গে মার্কসবাদের কোনো মিল ছিল না। ১৯৮১ সালের পর থেকে বামপন্থীদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু হয়। এমইকে যখন সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে তখন সরকারও কঠোর হাতে তা দমন করে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এরভান্দ আব্রাহামিয়ান তাঁর টর্চার্ড কনফেশনস বইয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে বামপন্থীদের নির্মূল করা হয়েছিল। ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে তুদেহ পার্টিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে ১৯৮৮ সালে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই হাজার হাজার বামপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক বন্দীকে গোপন বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিপ্লবের সঙ্গী বামপন্থীরা শেষ পর্যন্ত বিপ্লবেরই সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র মনে করত কমিউনিস্টরা সোভিয়েত ইউনিয়নের গুপ্তচর এবং তারা দেশের ইসলামি ভিত্তি ধ্বংস করতে চায়।
ইরান ঐতিহাসিকভাবে একটি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তবে সেখানে কুর্দি, বালুচ এবং তুর্কমেনদের মতো বিশাল সুন্নি জনগোষ্ঠী রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ হলো সুন্নি। বিপ্লবের সময় তারা আশা করেছিল নতুন সরকারে তারা সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবে। কুর্দিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বিশাল আন্দোলন গড়ে ওঠে। কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সংবিধান সুন্নিদের জন্য অনেক পথ শুরুতেই বন্ধ করে দেয়।
নতুন সংবিধানে ‘বেলায়েত-ই ফকিহ’ বা ইসলামি আইনবিদের শাসনের কথা বলা হয়। সেখানে স্পষ্ট করা হয় যে দেশের সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডারকে অবশ্যই শিয়া মতাবলম্বী হতে হবে। রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে শিয়া ইসলামকে পাকাপোক্ত করা হয়। সুন্নিদের ধর্ম পালনের অধিকার দেওয়া হলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে তাদের অনেক দূরে রাখা হয়।
ইরানি গবেষক মেহেরজাদ বোরুজেরদি তাঁর লেখায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন। বিপ্লবের পর সরকার সুন্নি এলাকাগুলোতে রাস্তাঘাট ও বিদ্যুতের মতো উন্নয়নমূলক কাজ করেছে ঠিকই। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বেলায় তারা পিছিয়ে ছিল। কুর্দিস্তান ও সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হলে সরকার সামরিক শক্তিতে তা কঠোরভাবে দমন করে। সুন্নিরা রাজধানী তেহরানে একটি নিজস্ব বড় মসজিদ নির্মাণেরও অনুমতি পায়নি। তারা মূলত নিজেদের দেশেই এক ধরনের রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হন।
আয়াতুল্লাহ রুহুলাহ খোমেনির লক্ষ্য ছিল কাচের মতো স্পষ্ট। তিনি একটি খাঁটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর চোখে কমিউনিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ছিল পশ্চিমা বা বিদেশি আদর্শ। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন ইসলামই সমাজের সব সমস্যার একমাত্র সমাধান। তাঁর বিখ্যাত একটি উক্তি ছিল এমন—‘বিপ্লব কোনো অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য হয়নি, বিপ্লব হয়েছে ইসলামের জন্য’।

খোমেনির এই দৃষ্টিভঙ্গিই রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রয়োগ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ চালানো হয়। সেক্যুলার ও বামপন্থী শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা হয়। পাঠ্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে ইসলামীকরণ করা হয়। বিচার ব্যবস্থায় ইসলামি আইন বা শরিয়া পুরোপুরি কার্যকর করা হয়। নারী অধিকার ও পোশাকের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যারা এই নতুন নিয়মের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে।
যেকোনো বিপ্লব কখনো সরল রেখায় চলে না। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব বা ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের মতো ইরানি বিপ্লবও তার নিজ সন্তানদের গ্রাস করেছিল। ইসলামপন্থীরা সে সময় অত্যন্ত সুসংগঠিত ছিল। তাদের পেছনে মসজিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং বিপুল সাধারণ মানুষের অন্ধ সমর্থন ছিল। সেক্যুলার ও কমিউনিস্টদের সেই বিশাল জনভিত্তি বা সাংগঠনিক শক্তি ছিল না।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফ্রেড হ্যালিডে মনে করেন, ইসলামপন্থীরা জোর করে ক্ষমতা দখল করেনি। তারা মূলত ক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণ করেছিল। শাহের পতনের পর রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। তখন একমাত্র খোমেনির অনুসারীদেরই সেই ক্ষমতা ছিল রাষ্ট্রকে এক সুতোয় বাঁধার। তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।
১৯৭৯ সালের পর ইরান একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়। তারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে। তারা কারো কাছে মাথা নত করেনি। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনের একটি চড়া অভ্যন্তরীণ মূল্য ছিল। যারা ইসলামি রাষ্ট্রের আদর্শের সঙ্গে বিন্দুমাত্র দ্বিমত পোষণ করতেন নতুন ইরানে তাদের জন্য কোনো জায়গা ছিল না। সুন্নি, কমিউনিস্ট এবং সেক্যুলাররা সেই মূল্যই চুকিয়েছেন। একটি বহুত্ববাদী ও সম্মিলিত আন্দোলনের পরিণতি ঘটে একচেটিয়া ধর্মভিত্তিক শাসনে। বিপ্লব সব সময় সবার জন্য মুক্তি আনে না। ইরানি বিপ্লব সেই ঐতিহাসিক সত্যেরই এক প্রামাণ্য দলিল।

১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব কেবল ইসলামপন্থীদের একক কোনো লড়াই ছিল না। শাহের পতন ঘটাতে বামপন্থী ও সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন। রাজতন্ত্রের পতন নিশ্চিত হওয়ার পর সবাই একটি নতুন ও স্বাধীন ইরানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে যখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র গঠিত হয় তখন রাজনৈতিক সমীকরণ খুব দ্রুত পাল্টে যায়। বিপ্লবের সঙ্গী হওয়া সত্ত্বেও সুন্নি, কমিউনিস্ট এবং সেক্যুলারদের জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। একটি সম্মিলিত গণ-অভ্যুত্থান কীভাবে একটি একক আদর্শের রাষ্ট্রে পরিণত হলো তা আধুনিক ইতিহাসের এক চমকপ্রদ অধ্যায়।
বিপ্লবের ঠিক পরেই একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। খোমেনি নিজেই সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী নেতা মেহেদি বাজারগানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্ম ও আধুনিকতার ভারসাম্য থাকবে। কিন্তু খুব দ্রুতই ক্ষমতার দুটি আলাদা কেন্দ্র তৈরি হয়। একদিকে ছিল বাজারগানের আনুষ্ঠানিক সরকারি কাঠামো। অন্যদিকে ছিল খোমেনির নেতৃত্বাধীন রেভল্যুশনারি কাউন্সিল এবং ইসলামি বিপ্লবী পাহারাদার বাহিনী।
মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট সেক্যুলারদের রাজনৈতিক কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। ইসলামপন্থী ছাত্ররা যখন তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে তখন বাজারগান তার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আব্বাস আমানত তাঁর ইরান: আ মডার্ন হিস্ট্রি বইয়ে এই সময়টাকে দারুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, জিম্মি সংকট খোমেনিকে উদারপন্থীদের হটিয়ে চরমপন্থীদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার সবচেয়ে বড় সুযোগ করে দিয়েছিল। সেক্যুলার জাতীয়তাবাদীদের আর কখনোই ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরতে দেওয়া হয়নি।
প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবুল হাসান বনিসদরও টিকতে পারেননি। তিনি ইসলামি কাঠামোর ভেতরে থেকেই একটি উদারনৈতিক চিন্তাধারার সরকার চালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কট্টরপন্থীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ১৯৮১ সালের ২১ জুন তাঁকে অভিশংসন বা ইমপিচ করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি ফ্রান্সে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় সেক্যুলার চিন্তাধারার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।
কমিউনিস্ট তুদেহ পার্টি এবং পিপলস মুজাহিদিন অব ইরানের বা এমইকের মতো বামপন্থী দলগুলো শাহবিরোধী আন্দোলনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। বিপ্লবের প্রথম কয়েক বছর তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। তুদেহ পার্টি এমনকি খোমেনির ইসলামি প্রজাতন্ত্রকেও সমর্থন করেছিল। তারা ভেবেছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এই লড়াইয়ে তারা ইসলামপন্থীদের মিত্র হিসেবেই থেকে যাবে।
কিন্তু আদর্শিক সংঘাত ছিল অবশ্যম্ভাবী। ইসলামি শাসনতন্ত্রের সঙ্গে মার্কসবাদের কোনো মিল ছিল না। ১৯৮১ সালের পর থেকে বামপন্থীদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু হয়। এমইকে যখন সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে তখন সরকারও কঠোর হাতে তা দমন করে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এরভান্দ আব্রাহামিয়ান তাঁর টর্চার্ড কনফেশনস বইয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে বামপন্থীদের নির্মূল করা হয়েছিল। ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে তুদেহ পার্টিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে ১৯৮৮ সালে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই হাজার হাজার বামপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক বন্দীকে গোপন বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিপ্লবের সঙ্গী বামপন্থীরা শেষ পর্যন্ত বিপ্লবেরই সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র মনে করত কমিউনিস্টরা সোভিয়েত ইউনিয়নের গুপ্তচর এবং তারা দেশের ইসলামি ভিত্তি ধ্বংস করতে চায়।
ইরান ঐতিহাসিকভাবে একটি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তবে সেখানে কুর্দি, বালুচ এবং তুর্কমেনদের মতো বিশাল সুন্নি জনগোষ্ঠী রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ হলো সুন্নি। বিপ্লবের সময় তারা আশা করেছিল নতুন সরকারে তারা সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবে। কুর্দিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বিশাল আন্দোলন গড়ে ওঠে। কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সংবিধান সুন্নিদের জন্য অনেক পথ শুরুতেই বন্ধ করে দেয়।
নতুন সংবিধানে ‘বেলায়েত-ই ফকিহ’ বা ইসলামি আইনবিদের শাসনের কথা বলা হয়। সেখানে স্পষ্ট করা হয় যে দেশের সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডারকে অবশ্যই শিয়া মতাবলম্বী হতে হবে। রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে শিয়া ইসলামকে পাকাপোক্ত করা হয়। সুন্নিদের ধর্ম পালনের অধিকার দেওয়া হলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে তাদের অনেক দূরে রাখা হয়।
ইরানি গবেষক মেহেরজাদ বোরুজেরদি তাঁর লেখায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন। বিপ্লবের পর সরকার সুন্নি এলাকাগুলোতে রাস্তাঘাট ও বিদ্যুতের মতো উন্নয়নমূলক কাজ করেছে ঠিকই। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বেলায় তারা পিছিয়ে ছিল। কুর্দিস্তান ও সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হলে সরকার সামরিক শক্তিতে তা কঠোরভাবে দমন করে। সুন্নিরা রাজধানী তেহরানে একটি নিজস্ব বড় মসজিদ নির্মাণেরও অনুমতি পায়নি। তারা মূলত নিজেদের দেশেই এক ধরনের রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হন।
আয়াতুল্লাহ রুহুলাহ খোমেনির লক্ষ্য ছিল কাচের মতো স্পষ্ট। তিনি একটি খাঁটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর চোখে কমিউনিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ছিল পশ্চিমা বা বিদেশি আদর্শ। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন ইসলামই সমাজের সব সমস্যার একমাত্র সমাধান। তাঁর বিখ্যাত একটি উক্তি ছিল এমন—‘বিপ্লব কোনো অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য হয়নি, বিপ্লব হয়েছে ইসলামের জন্য’।

খোমেনির এই দৃষ্টিভঙ্গিই রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রয়োগ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ চালানো হয়। সেক্যুলার ও বামপন্থী শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা হয়। পাঠ্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে ইসলামীকরণ করা হয়। বিচার ব্যবস্থায় ইসলামি আইন বা শরিয়া পুরোপুরি কার্যকর করা হয়। নারী অধিকার ও পোশাকের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যারা এই নতুন নিয়মের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে।
যেকোনো বিপ্লব কখনো সরল রেখায় চলে না। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব বা ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের মতো ইরানি বিপ্লবও তার নিজ সন্তানদের গ্রাস করেছিল। ইসলামপন্থীরা সে সময় অত্যন্ত সুসংগঠিত ছিল। তাদের পেছনে মসজিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং বিপুল সাধারণ মানুষের অন্ধ সমর্থন ছিল। সেক্যুলার ও কমিউনিস্টদের সেই বিশাল জনভিত্তি বা সাংগঠনিক শক্তি ছিল না।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফ্রেড হ্যালিডে মনে করেন, ইসলামপন্থীরা জোর করে ক্ষমতা দখল করেনি। তারা মূলত ক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণ করেছিল। শাহের পতনের পর রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। তখন একমাত্র খোমেনির অনুসারীদেরই সেই ক্ষমতা ছিল রাষ্ট্রকে এক সুতোয় বাঁধার। তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।
১৯৭৯ সালের পর ইরান একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়। তারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে। তারা কারো কাছে মাথা নত করেনি। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনের একটি চড়া অভ্যন্তরীণ মূল্য ছিল। যারা ইসলামি রাষ্ট্রের আদর্শের সঙ্গে বিন্দুমাত্র দ্বিমত পোষণ করতেন নতুন ইরানে তাদের জন্য কোনো জায়গা ছিল না। সুন্নি, কমিউনিস্ট এবং সেক্যুলাররা সেই মূল্যই চুকিয়েছেন। একটি বহুত্ববাদী ও সম্মিলিত আন্দোলনের পরিণতি ঘটে একচেটিয়া ধর্মভিত্তিক শাসনে। বিপ্লব সব সময় সবার জন্য মুক্তি আনে না। ইরানি বিপ্লব সেই ঐতিহাসিক সত্যেরই এক প্রামাণ্য দলিল।

১৯৭৮ সালের শেষভাগ। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে কিছুটা দূরেই এক শান্ত, প্রায় অচেনা গ্রাম নফল-লে শাতো। এখানে প্রতিদিন ভিড় জমছে সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী আর দূরদেশ থেকে আসা ইরানি প্রবাসীদের। কিন্তু এই ভিড় কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে নয়। এই গ্রামে বসেই নির্বাসিত এক ধর্মীয় নেতা দূরবর্তী একটি রাষ্ট
২ ঘণ্টা আগে
‘আমি চাই না আপনারা আমাকে দেখেন, মানুষ খুশি থাকলে আমিও খুশি’— অত্যন্ত সাধারণ এই জীবনবোধের অধিকারী কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার চরের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম তাজুর। তিনি আজ ইন্টারনেটে এক পরিচিত নাম।
১৮ ঘণ্টা আগে
পৃথিবীর ইতিহাসে সংক্রামক ব্যাধির সঙ্গে মানুষের লড়াই অনেক পুরোনো। বিভিন্ন যুগে নানা রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব রোগে প্রাণহানি ঘটেছে কোটি কোটি মানুষের। চতুর্দশ শতাব্দীতে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা প্লেগ রোগে ইউরোপের বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যায়। এরপর গুটিবসন্ত, কলেরা ও স্প্যানিশ ফ্লু পৃথিবীতে ব্যাপক ধ্বং
১ দিন আগে
দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় একসময় হাম ছিল শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এক সময় এই সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগটি বহু শিশুর জীবন কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি টিকাদান কর্মসূচি, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে আজ সেই চিত্র বদলে গেছে।
২ দিন আগে