মৃত্যুবার্ষিকী

মানুষ কতটা বিখ্যাত হতে পারে, মাইকেল জ্যাকসন তার উত্তর

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১৮: ৫৫
মাইকেল জ্যাকসন। সংগৃহীত ছবি

১৯৮৮ সালের জুন মাস। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর তখন এক অকল্পনীয় উন্মাদনায় কাঁপছে। কারণ, সেখানে এসেছেন পপ কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসন। তাঁর ‘ব্যাড’ অ্যালবামের প্রচারের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল বিশাল কনসার্টের। স্টেডিয়ামে তিল ধারণের জায়গা নেই। হাজার হাজার চোখ মঞ্চের দিকে। হঠাৎ আলো নিভে গিয়ে চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে গেল। মঞ্চে এলেন মাথায় হ্যাট, রুপোলি জিপার দেওয়া কালো জ্যাকেট আর পায়ে চকচকে জুতোয়।

মাইকেল জ্যাকসন তখনো গান শুরু করেননি, কেবল চুলে হাত দিয়ে সামান্য একটা ঝাঁকুনি দিলেন। আর তাতেই শুরু হলো অদ্ভুত সম্মোহন। স্টেডিয়ামের এক তরুণী তো চিৎকারে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতেই পড়ে গেলেন! মুহূর্তের মধ্যে সেই উন্মাদনা পুরো গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ল। ভিয়েনার ওই একটি কনসার্টেই তাঁকে সামনে দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন ১৩০ জন নারী ভক্ত! রেডক্রসের কর্মীরা স্ট্রেচার নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন তাঁদের সামলাতে।

মাইকেল জ্যাকসনের সম্মোহনী শক্তি ঠিক কতটা ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এমন ঘটনা তাঁর ক্ষেত্রে বারবার ঘটেছে। ১৯৯৩ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক বিমানবন্দরে যখন তিনি নামলেন, এক নজর দেখার জন্য হাজারো মানুষের ভিড় জমে গিয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিমানবন্দর ও আশপাশের সব রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। মানুষ কাজ-কর্ম সব ফেলে ছুটে গিয়েছিল তাঁকে এক নজর দেখার জন্য। হোটেলের বারান্দায় তিনি কয়েক সেকেন্ডের জন্য এসে দাঁড়ালেই রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়ত।

জনপ্রিয়তার এমন তীব্রতাকে রূপকথার গল্প মনে হলেও, মাইকেল জ্যাকসনের জীবনে এটি ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা।

মাইকেল জ্যাকসনের তারকাদের ‘তারকা’ হয়ে ওঠা

১৯৫৮ সালে জন্ম নেওয়া এই আফ্রিকান-আমেরিকান শিল্পী আশির দশকে এসে সংগীত দুনিয়ার সব হিসাব-নিকাশ উলটপালট করে দেন। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘গট টূ বি দেয়ার’। প্রথম অ্যালবামেই বাজিমাত করেন। প্রথম কয়েকটি ‘অ্যালবামের অবিশ্বাস্য সাফল্যের হাত ধরেই তাঁর ঝুলিতে আসে গ্র্যামি, আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ও বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডের মতো মর্যাদাপূর্ণ সব পুরস্কার।

বিখ্যাত ‘মুনওয়াক’ আজও দারুণ জনপ্রিয়। সংগৃহীত ছবি
বিখ্যাত ‘মুনওয়াক’ আজও দারুণ জনপ্রিয়। সংগৃহীত ছবি

তবে সংগীতের দুনিয়ায় এমজির ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যায় ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ষষ্ঠ একক অ্যালবাম ‘থ্রিলার’-এর মাধ্যমে। এই একটি অ্যালবাম মাইকেল জ্যাকসনকে একজন পপ তারকা থেকে রূপান্তরিত করে ‘গ্লোবাল ফেনোমেনন’-এ। সেই থেকে বিশ্ববাসী তাঁকে এক নামে চিনতে শুরু করে ‘কিং অব পপ’ হিসেবে। শোনা যায়, মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই বিক্রি হয় মিলিয়ন কপি। দীর্ঘ সময় ধরে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসাসফল অ্যালবামের রেকর্ডটি একাই ধরে রেখেছিল ‘থ্রিলার’।

তবে থ্রিলারের সাফল্য কেবল ব্যবসায়ী সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে মাইকেল জ্যাকসন আবির্ভূত হন মুক্তির দূত হিসেবে। সেসময় আমেরিকায় মিডিয়ায় বর্ণবৈষম্য বেশ প্রকট ছিল। কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের গান সহজে বড় মঞ্চ বা টেলিভিশনে জায়গা পেত না। মাইকেল জ্যাকসনই ছিলেন ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ তারকা, যিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভৌগোলিক সীমানা নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন।

শুধু কণ্ঠের জন্য নয়, মাইকেল জ্যাকসনের নাচের মুদ্রাও মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। তাঁর বিখ্যাত ‘মুনওয়াক’ আজও দারুণ জনপ্রিয়। পরবর্তীতে ‘স্মুথ ক্রিমিনাল’, ‘ব্ল্যাক অর হোয়াইট’ কিংবা ‘ব্যাড’-এর মতো দুর্দান্ত সব মিউজিক ভিডিওতে নাচের জাদু দেখান এই জাদুকর।

মাইকেল জ্যাকসনের মতো জনপ্রিয় হওয়া কি সম্ভব

আজকের যুগে একজন শিল্পীর ‘ভাইরাল’ হতে কিংবা অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে তেমন কাঠখড় পোড়াতে হয় না। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম শিল্পীর এই যাত্রা কিছুটা হলেও সহজ করেছে। অথচ মাইকেল জ্যাকসন জনপ্রিয় হয়েছেন এমন এক সময় যখন এসবের কিছুই ছিল না। তখন ছিল টেলিভিশনের যুগ। টেলিভিশনে হাতেগোণা কয়েকটি চ্যানেল ছিল।

শুধু পশ্চিমা বিশ্ব নয়, প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়েছিল মাইকেল জ্যাকসনের জনপ্রিয়তা। যারা কখনও তাঁর গান কখনও শোনেনি, তাঁরাও মাইকেল জ্যাকসনের নাম শুনে থাকবেন, এমনই ছিল মানুষটির ক্রেজ। তাঁর ‘জাস্ট বিট ইট’ গানে যেমন তাল মিলিয়েছে আশির দশকের তরুণ প্রজন্ম, তেমনি আজকের যুগের জেন-জি, মিলেনিয়ানরাও।

মাইকেল জ্যাকসনের সম্মোহনী শক্তি ঠিক কতটা ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সংগৃহীত ছবি
মাইকেল জ্যাকসনের সম্মোহনী শক্তি ঠিক কতটা ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সংগৃহীত ছবি

ম্যাডোনা বা প্রিন্সের মতো সমসাময়িক তারকারা সে সময় রাজত্ব করলেও, মাইকেলের জনপ্রিয়তার ধারেকাছে কেউ ছিলেন না। আজকের এই ডিজিটাল দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া গেলেও এমন সর্বজনীন জনপ্রিয়তা কি কোনো শিল্পীর পক্ষে পাওয়া সম্ভব? উত্তরটা ভবিষ্যতের জন্যই তোলা থাক।

‘আমাদের পিছু নিয়ো না, ওদের বিভ্রান্ত করো।’

মাইকেল জ্যাকসনের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার মুদ্রার উল্টো পিঠটাও ছিল বড়ই অন্ধকার। বিশ্বজোড়া খ্যাতি তাঁকে দিয়েছে কোটি ভক্তের ভালোবাসা, কিন্তু কেড়ে নিয়েছিল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি কাটিয়েছেন পাপারাজ্জি ও ভক্তদের তীক্ষ্ণ নজরদারিতে। এ যেন রীতিমতো এক লড়াই।

মাইকেলের ব্যক্তিগত চিকিৎসক কনরাড মারে এক সাক্ষাৎকারে এই খ্যাতির বিড়ম্বনা সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “মাইকেলনিজের বাড়িতেও শান্তিতে সময় উপভোগ করতে পারতেন না। পাপারাজ্জি ও ভক্তরা সর্বদা তাঁর বাড়ির দিকে দূরবীণ নিয়ে নজর রাখত। আমরা বহুবার মাঝরাতে গাড়ির পেছনের সিটে কম্বল মুড়ি দিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে বের হয়েছি। মাইকেল নিরাপত্তাকর্মীদের বলতেন, ‘আমাদের পিছু নিয়ো না, ওদের বিভ্রান্ত করো।’ তাঁর এসব ঝুঁকি নিতে দেখলে আমার নিজেরই হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেত।”

খ্যাতির এই বিড়ম্বনা কেবল নজরদারিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০০৫ সালে আদালত তাঁকে সমস্ত মামলা থেকে বেকসুর খালাস দিলেও, এই কলঙ্কজনক সমালোচনা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর ছায়ার মতো পিছু ছাড়েনি।

এ ছাড়া শারীরিক অসুস্থতাও ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। ১৯৮৪ সালে পেপসির একটি বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ের সময় মাইকেলের চুলে আগুন ধরে তাঁর মাথার খুলির চামড়া মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। এই দুর্ঘটনার পর থেকে সারা জীবনের জন্য অসহ্য মাথাব্যথা নিয়ে চলতে হয়েছে তাঁকে। ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে মাইকেল জ্যাকসন চিকিৎসকদের পরামর্শে কড়া পেইনকিলার খাওয়া শুরু করেন। একসময় দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

একসময়ে মাইকেলের গায়ের রং নিয়েও বিশ্বজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়। আশির দশকের শেষভাগ থেকে তাঁর গায়ের রং কালো থেকে দিন দিন শ্বেতাঙ্গদের মতো সাদা হতে শুরু করে। গুজব রটে যায় যে, কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয় মুছে ফেলার জন্য মাইকেল জ্যাকসন নাকি পুরো শরীরের চামড়া কেমিক্যাল দিয়ে ব্লিচ করে ফেলেছেন। বর্ণবাদী সমালোচনার শিকার হতে হয় তাঁকে। দীর্ঘ নীরবতার পর, ১৯৯৩ সালে ‘অপরাহ উইনফ্রে শো’-তে এক সাক্ষাৎকারে মাইকেল জানান, তিনি আসলে ‘শ্বেতী’ রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগে শরীরের ত্বকের স্বাভাবিক পিগমেন্ট নষ্ট হয়ে যায়। গায়ের রঙের এই অসঙ্গতি ঢাকতেই তিনি মেকআপের সাহায্য নিতেন, কোনো ব্লিচিং নয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত