leadT1ad

১০৩ বছর আগে আজকের এই দিনে প্রথম মানবদেহে প্রয়োগ

ইনসুলিন আবিষ্কারের পেছনের গল্প

আজ ১১ জানুয়ারি। ১৯২২ সালের এই দিনে প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে ইনসুলিন প্রয়োগ করা হয়েছিল। যে ডায়াবেটিস একসময় নিশ্চিত মৃত্যুর সমার্থক ছিল, সেই রোগের চিকিৎসায় সেদিন খুলে যায় নতুন দিগন্ত। শুরু হয় আধুনিক চিকিৎসার এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এর পেছনে ছিল কয়েক বছরের গবেষণা আর কুকুরের ওপর চালানো বহু ব্যর্থ–সফল প্রচেষ্টা।

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৩১
১০৩ বছর আগে আজকের এই দিনে প্রথম মানবদেহে প্রয়োগ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

ডায়াবেটিস রোগ সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাওয়া যায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে। এই রোগে আক্রান্ত হলে তখন নিশ্চিত মৃত্যু হিসেবে ধরে নেওয়া হতো। ডায়াবেটিস হলে রোগীকে একেবারে কম পরিমাণ শর্করাজাতীয় খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হতো।

কিন্তু এভাবে টিকে থাকা ছিল খুবই কঠিন। অনেক ডায়াবেটিস রোগী রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিতেন। ফলাফল হিসেবে দেখা যেত, রোগী না খেয়ে মারা যাচ্ছেন। কিংবা কঙ্কালসার শরীর নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন।

উনিশ শতকের আগে কেউ জানতেন না, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ে উৎপন্ন হওয়া ইনসুলিন নামক হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। ১৮৮৯ সালের দিকে ‘অস্কার মিনকোভস্কি’ এবং ‘জোসেফ ভন মেরিং’ আবিষ্কার করেন অগ্ন্যাশয় এর সঙ্গে ডায়বেটিস এর গুরুত্বপূর্ণ সংযুক্তি আছে।

এর অনেক বছর পর ডায়াবেটিসের নিরাময়ে ইনসুলিন আবিষ্কৃত হয়। ১৯২২ সালের ১১ জানুয়ারি কানাডার টরন্টো জেনারেল হাসপাতালে প্রথমবারের মতো কোনো মানুষের শরীরে ইনসুলিন প্রয়োগ করা হয়েছিল।

লিওনার্ড থম্পসন ও ইনসুলিনের প্রথম পরীক্ষা। সংগৃহীত ছবি
লিওনার্ড থম্পসন ও ইনসুলিনের প্রথম পরীক্ষা। সংগৃহীত ছবি

মৃত্যুপথযাত্রী লিওনার্ড থম্পসন ও ইনসুলিনের প্রথম পরীক্ষা

টরন্টো জেনারেল হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে মৃত্যুর প্রহর গুনছিল ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর। নাম লিওনার্ড থম্পসন। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছেলেটির ওজন ছিল খুবই কম। ঠিক এই সময়েই ডা. ফ্রেডরিক বেন্টিং এবং তার সহযোগী চার্লস বেস্ট হাসপাতালে হাজির হন তাঁদের আবিষ্কৃত নতুন এক ‘ওষুধ’ নিয়ে। তাঁরা দাবি করেন, এটি ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে পারে। কুকুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে সফলও হয়েছেন। কিন্তু মানুষের ওপর এর আগে কখনো এটি প্রয়োগ করা হয়নি। লিওনার্ডের বাবা মৃত্যুপথযাত্রী ছেলেকে বাঁচাতে শেষ ভরসা হিসেবে এই পরীক্ষায় রাজি হন।

লিওনার্ড থম্পসনের শরীরে প্রথমবারের মতো পুশ করা হলো সেই পরীক্ষামূলক ইনসুলিন। যদিও তখন এর নাম ছিল আইলেটিন। কিন্তু প্রথমদিনের ফলাফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। ইনজেকশন দেওয়ার পর লিওনার্ডের রক্তে শর্করার মাত্রা সামান্য কমে ঠিকই কিন্তু তাঁর শরীরে দেখা দিল তীব্র অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন। ইনজেকশন দেওয়ার স্থানটি ফুলে গিয়ে ফোড়া বা অ্যাবসেস তৈরি হলো। বিজ্ঞানীরা বুঝলেন, তাঁদের তৈরি ইনসুলিন এখনো মানুষের শরীরের জন্য পুরোপুরি বিশুদ্ধ বা ‘পিওর’ নয়।

পরীক্ষাটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলো। কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়লেন না। দলের বায়োকেমিস্ট জেমস কলিপ দিনরাত এক করে ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে থাকলেন ইনসুলিনকে বিশুদ্ধ করার জন্য। টানা ১২ দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তিনি ইনসুলিনকে অ্যালার্জিমুক্ত ও বিশুদ্ধ করতে সক্ষম হন।

২৩ জানুয়ারি লিওনার্ড থম্পসনকে আবার দ্বিতীয় দফায় ‘বিশুদ্ধ’ ইনসুলিন দেওয়া হলো। এবার যা ঘটল, তা ছিল অলৌকিক। ছেলেটির রক্তে শর্করার মাত্রা নিমিষেই স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এল। গ্লুকোজ বা কিটোন কিছুই পাওয়া গেল না। মৃতপ্রায় লিওনার্ড চোখ মেলে তাকাল, তাঁর শরীরে শক্তি ফিরে এল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই ঘটনাটি ‘দ্য রেজারেকশন’ বা পুনরুত্থান হিসেবে পরিচিত।

‘কুকুর নম্বর ৪১০’-এর ওপর তাঁরা প্রথম সাফল্য পান। সংগৃহীত ছবি
‘কুকুর নম্বর ৪১০’-এর ওপর তাঁরা প্রথম সাফল্য পান। সংগৃহীত ছবি

ডায়াবেটিস আক্রান্ত লিওনার্ড থম্পসন সেই ঘটনার পর আরও ১৩ বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি মারা যান নিউমোনিয়ায়।

কুকুর, ল্যাব আর ‘জেদি’ চিকিৎসক

ইনসুলিন আবিষ্কার ছিল চারজন বিজ্ঞানীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তবে এর মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন ফ্রেডরিক বেন্টিং, যিনি ছিলেন একজন অর্থোপেডিক সার্জন।

প্রথমবারের মতো বেন্টিংয়ের মাথায় আসে, অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস থেকে নির্গত রস ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে পারে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ম্যাকলিওড এই গবেষণার জন্য একটি ল্যাবরেটরি, ১০টি কুকুর আর গবেষণাকাজে সহায়তার জন্য সহকারী হিসেবে মেডিকেল ছাত্র চার্লস বেস্টকে দেন।

১৯২১ সালের মে মাসে তাঁরা কাজ শুরু করেন। প্রথমে সুস্থ কুকুরের অগ্ন্যাশয়ের একটি নালী বা রগ সুতো দিয়ে বেঁধে দেওয়া হলো। এর ফলে অগ্ন্যাশয়ের হজম করার রসগুলো শুকিয়ে যেত, কিন্তু ভেতরের যে অংশ ইনসুলিন তৈরি করে, সেটা নষ্ট হতো না। এই অংশটির নাম ‘আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহেন্স’।

ইনসুলিন গবেষণায় সবচেয়ে বিখ্যাত কুকুরটির নাম ছিল ‘মার্জোরি’। ল্যাবরেটরিতে তার নম্বর ছিল ৩৩। বেন্টিং আর বেস্ট মার্জোরির অগ্ন্যাশয় অপসারণ করে তাকে কৃত্রিমভাবে ডায়াবেটিস রোগী বানিয়েছিলেন।

কিছুদিন পর তাঁরা সেই অংশটুকু কেটে নিয়ে পিষে একধরনের রস বা নির্যাস বানাতেন। এরপর সেই রসটা ইনজেকশন দিয়ে ডায়াবেটিস আছে এমন কুকুরের শরীরে প্রবেশ করাতেন। ডায়বেটিস আক্রান্ত কুকুর বলতে এখানে অগ্ন্যাশয় কেটে ফেলা হয়েছে এমন কুকুরকে বোঝানো হয়েছে। তাঁরা দেখতে চাইতেন, এই রসটা দিলে অগ্ন্যাশয়বিহীন কুকুরগুলো সুস্থ হয় কি না!

শুরুতে একের পর এক পরীক্ষা ব্যর্থ হতে থাকে। ভুল অস্ত্রোপচার আর ইনফেকশনের কারণে অনেক কুকুর মারা যায়। একপর্যায়ে তাঁদের হাতে আর কোনো কুকুর ছিল না, এমনকি কুকুর কেনার টাকাও ছিল না। কিন্তু বেন্টিং এতটাই মরিয়া ছিলেন যে, শোনা যায় তিনি নিজের হাতের সোনার ঘড়ি এবং একমাত্র সম্পদ ‘ফোর্ড’ গাড়িটি বিক্রি করে দেন। সেই টাকায় তিনি রাস্তা থেকে কুকুর ধরে আনা লোকেদের কাছ থেকে কুকুর কিনতেন গবেষণার জন্য।

জুলাই মাসের শেষের দিকে, ‘কুকুর নম্বর ৪১০’-এর ওপর তাঁরা প্রথম সাফল্য পান। অগ্ন্যাশয় কেটে ফেলা এই কুকুরটির ব্লাড সুগার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বেন্টিং যখন তৈরি নির্যাস কুকুরটির দেহে পুশ করেন, মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ব্লাড সুগার আশ্চর্যজনকভাবে কমে আসে। যদিও পরের দিন কুকুরটি মারা যায়, কিন্তু এটি প্রমাণ করে যে ফর্মুলা কাজ করছে।

নায়ক ‘মার্জোরি’: ইতিহাসের সাক্ষী

ইনসুলিন গবেষণায় সবচেয়ে বিখ্যাত কুকুরটির নাম ছিল ‘মার্জোরি’। ল্যাবরেটরিতে তার নম্বর ছিল ৩৩। বেন্টিং আর বেস্ট মার্জোরির অগ্ন্যাশয় অপসারণ করে তাকে কৃত্রিমভাবে ডায়াবেটিস রোগী বানিয়েছিলেন। এরপর নিয়মিত তাকে ইনসুলিন ইনজেকশন দিতে থাকেন। আশ্চর্যজনকভাবে, মার্জোরি ছিল প্রথম প্রাণী যে অগ্ন্যাশয় ছাড়া ইনসুলিন নিয়ে প্রায় ৭০ দিন বেঁচে ছিল। মার্জোরির এই দীর্ঘ বেঁচে থাকাই বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস জুগিয়েছিল যে, এই ওষুধ মানুষের শরীরেও কাজ করতে পারে।

ইনসুলিন আবিষ্কারের জন্য ১৯২৩ সালে ফ্রেডরিক বেন্টিং এবং জন ম্যাকলিওড নোবেল পুরস্কার পান। সংগৃহীত ছবি
ইনসুলিন আবিষ্কারের জন্য ১৯২৩ সালে ফ্রেডরিক বেন্টিং এবং জন ম্যাকলিওড নোবেল পুরস্কার পান। সংগৃহীত ছবি

মার্জোরির মৃত্যুর পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, লাখ লাখ মানুষের জন্য ইনসুলিন তৈরি করতে হলে শুধু কুকুর দিয়ে হবে না। তাঁরা তখন কসাইখানা থেকে গরুর অগ্ন্যাশয় সংগ্রহ করা শুরু করেন এবং দেখেন যে গরুর অগ্ন্যাশয় থেকেও একই মানের ইনসুলিন পাওয়া সম্ভব।

এই পর্যায়ে অধ্যাপক ম্যাকলিওড দলের সঙ্গে যুক্ত করেন বায়োকেমিস্ট জেমস কলিপকে। কলিপের কাজ ছিল ইনসুলিনকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী বা বিশুদ্ধ করা। মূলত কলিপের দক্ষতার কারণেই ১৯২২ সালের জানুয়ারিতে লিওনার্ড থম্পসনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল।

ইনসুলিন আবিষ্কারের জন্য ১৯২৩ সালে ফ্রেডরিক বেন্টিং এবং জন ম্যাকলিওড নোবেল পুরস্কার পান। কিন্তু পুরস্কারের অর্থ সহযোগী চার্লস বেস্ট এবং জেমস কলিপের সঙ্গে ভাগ করে নেন। ইনসুলিন আবিষ্কারের পর এই বিজ্ঞানীরা এর পেটেন্ট বা স্বত্ব নিজেরা না রেখে উন্মুক্ত করে দেন যাতে সারাবিশ্বের মানুষ এটি থেকে উপকৃত হতে পারে। বেন্টিং বলেছিলেন, ‘ইনসুলিন আমার নয়, এটি সারা বিশ্বের মানুষের।’

মাত্র এক ডলারের বিনিময়ে তাঁরা টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ইনসুলিন উৎপাদনের স্বত্ব বিক্রি করে দেন, যাতে পৃথিবীর গরিব থেকে গরিব মানুষটিও এই ওষুধটি পায়। ১৯২২ সালের ১১ জানুয়ারির সেই পরীক্ষামূলক প্রয়োগ আজ কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়ে চলেছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত