ad

নাচে-গানে, ঢোল-মাদলে নওগাঁয় কারাম উৎসব

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নওগাঁ

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ০৩
কারাম উৎসব। স্ট্রিম ছবি
কারাম উৎসব। স্ট্রিম ছবি

পায়ে আলতা, খোঁপায় বাহারি ফুল। লাল-হলুদ শাড়িতে রঙিন হয়ে উঠেছে চারপাশ। মাঠজুড়ে ঢোল, মাদল আর মন্দিরার রিনঝিন শব্দ। তার সঙ্গে ঝুমুর গানের সুর। ঢোল-মাদলের তালে তালে নাচছেন নারী-পুরুষ। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে পূজার উপকরণ। মাঠের মাঝখানে পুঁতে রাখা কারাম গাছের ডাল ঘিরে যেন জেগে উঠেছে বহুদিনের এক শেকড়ের গল্প। সেই ডাল ঘিরে নেচে-গেয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গল্প বলছেন সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ।

নওগাঁর পত্নীতলার মাঠে বুধবার বিকেলে এমনই এক আবহে অনুষ্ঠিত হলো কারাম উৎসব। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের আয়োজনে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছিলেন ওঁরাও, মুন্ডা, সাঁওতাল, মাহাতো ও হাঁড়িসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ। তাঁদের নিজস্ব মাতৃভাষায় সমবেত গান আর ছন্দময় নৃত্যে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।

কেবল আদিবাসী সম্প্রদায়ই নয়, এই বৈচিত্র্যময় উৎসবের রূপ দেখতে ভিড় করেছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা শেকড়ের টানে প্রবীণরাও মিশে গিয়েছিলেন তরুণদের সঙ্গে।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

নাচের তালে তরুণ-তরুণীরা ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গল্প। কারাম মূলত খিল কদম গাছের ডাল পূজাকে কেন্দ্র করে পালিত একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে, মাঠে ধান রোপণের কাজ শেষ হওয়ার পর এই উৎসব পালন করা হয়। উৎসবের আগের দিন সন্ধ্যায় গ্রামের অবিবাহিত তরুণীরা জঙ্গল থেকে পবিত্র ‘কারাম’ বা খিল কদম গাছের ডাল কেটে নিয়ে আসেন। তাঁদের বিশ্বাস, কারাম উৎসব জীবনে সৌভাগ্য বয়ে আনে এবং অভাব ও গ্লানি দূর করে।

উৎসবের দিন সকালে নির্দিষ্ট মাঠে সেই ডাল পুঁতে তাতে নানা রঙের ফুল ও নতুন গামছা পরানো হয়। বাঁশের ডালায় রাখা বালুমিশ্রিত মাটিতে বিভিন্ন শস্যের বীজ রেখে প্রদীপ জ্বালানো হয়। চলে বিশেষ পূজা-অর্চনা। এরপর শুরু হয় গান আর নাচ। দিনশেষে নেচে-গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেই ডাল নিকটস্থ পুকুরে বিসর্জনের মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি হয়।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

কারাম উৎসবের সঙ্গে কৃষি ও প্রকৃতির সম্পর্ক গভীর। করম দেবতার উপাসনার মাধ্যমে জমির উর্বরতা ও ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করেন তাঁরা। স্থানভেদে এই উৎসব চলে পাঁচ থেকে সাত দিন। সাঁওতাল, ওরাঁও, মাহাতো, পাহান, মাহালীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিজেদের রীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী এই উৎসব পালন করেন।

উৎসবে অংশ নিয়ে নিজেদের অনুভূতির কথা জানান তরুণ প্রজন্ম। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তরুণী রিয়া পাহাড়ি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সবার সামনে তুলে ধরতে পেরে আমরা দারুণ খুশি। তবে শুধু একবার নয়, আমাদের এই প্রাণের উৎসব টিকিয়ে রাখতে এমন আয়োজন আরও বেশি বেশি হওয়া দরকার।’

সুজিত উরাওয়ের কথাতেও শেকড় আঁকড়ে থাকার প্রত্যয়। তিনি বলেন, ‘শেকড়কে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে আমাদের প্রজন্ম সবসময় পাশে থাকবে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের এই সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হবে।’

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

আদিবাসী সমাজকর্মী ও গবেষক বিশ্বনাথ সিংয়ের কাছে কারাম পূজা আবহমানকালের ঐতিহ্য। তাঁর ভাষায়, ‘প্রাকৃতিকভাবেই আদিবাসীরা পরিবেশের পূজারি। এই উৎসব আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়।’ তবে শহুরে সংস্কৃতি ও আধুনিকতার প্রভাবে এই মৌলিক উৎসবগুলো যেন হারিয়ে না যায়, সে জন্য তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার কথাও বলেন তিনি।

আয়োজকদের মতে, সংস্কৃতির এই শেকড়গুলো আগামী দিনের তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত এক অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত