তিস্তায় ভেসে যাচ্ছিল ১৫ দিনের হাতিশাবক, প্রাণপণে উদ্ধার করলেন জেলেরা
স্ট্রিম ডেস্ক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির গজলডোবায় তিস্তা নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল মাত্র ১৫ দিনের একটি হাতিশাবক। চারপাশে তখন উত্তাল নদী। স্রোতের টানে ছোট্ট হাতিটি ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছিল। ঘটনাটি মাছ ধরতে থাকা স্থানীয় দুই জেলের চোখে পড়ে। এক মুহূর্তও দেরি না করে তাঁরা নৌকা ঘুরিয়ে তাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে যান।
তিস্তার প্রবল স্রোতে উদ্ধারের কাজ সহজ ছিল না। জেলেরা প্রায় তিন কিলোমিটার নৌকা চালিয়ে পিছু নেন। একপর্যায়ে তাঁরা কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন। উদ্ধারের পর হাতিটিকে নৌকায় তোলার সময় পরিস্থিতি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নৌকা দুলতে শুরু করায় সেটি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। কিন্তু জেলেরা শেষ পর্যন্ত হাতিটিকে নিয়ে নিরাপদে তীরে পৌঁছান।
ঘটনাটি ঘটে তিস্তা ব্যারেজের কাছাকাছি এলাকায়। স্থানীয় বন বিভাগের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে উদ্ধার অভিযান চলে। জেলেরা প্রথমে হাতিটিকে নিজেদের নৌকায় তোলেন। পরে তীরে এনে বনকর্মীদের খবর দেন।
খবর পেয়ে বৈকুণ্ঠপুর বন বিভাগের কাঠামবাড়ি রেঞ্জের বনকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। হাতিটিকে দেখতে সেখানে স্থানীয় মানুষের ভিড় জমে যায়। তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বনকর্মীরা দ্রুত সাধারণ মানুষকে এলাকা থেকে সরিয়ে দেন। কারণ উদ্ধার করা হাতিশাবকের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ যত কম রাখা যায়, ততই তার জন্য ভালো।
এরপর শুরু হয় তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পালা। বন বিভাগের কর্মীরা ধারণা করছিলেন, হাতির পাল তিস্তা ব্যারেজের ওপারে নদীর অপেক্ষাকৃত শুকনো অংশে আশ্রয় নিয়েছে। তাই হাতিটিকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বনকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের সমন্বিত চেষ্টার পর হাতিশাবককে নদীর সেই শুকনো অংশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাতির পাল থাকার সম্ভাবনা ছিল। কিছুক্ষণ পরই দেখা যায়, একটি মা হাতি ছোট্ট হাতিটির দিকে এগিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত মা ও শাবকের দেখা হয়।
এই উদ্ধার অভিযানের একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের আইএএস কর্মকর্তা সুপ্রিয়া সাহু ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করেন। সেখানে তিনি স্থানীয় জেলে ও বৈকুণ্ঠপুর বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাহস ও দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জেলেদের দ্রুত পদক্ষেপ এবং বন বিভাগের তৎপরতাই হাতিটিকে নিরাপদে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যেও সাড়া পড়ে। অনেকেই জেলে ও বনকর্মীদের প্রশংসা করেন। বিশেষ করে নৌকার ওপর ছোট্ট হাতিটিকে তুলে নেওয়ার দৃশ্য এবং পরে মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তটি নজর কাড়ে। কেউ কেউ এই উদ্ধারকে মানবিকতার সুন্দর উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
তবে উদ্ধারের পর আরেকটি বিষয় নিয়েও সতর্ক ছিলেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। হাতিশাবকের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ যতটা সম্ভব কম রাখা জরুরি। কারণ দীর্ঘ সময় মানুষের সংস্পর্শে থাকলে মা হাতি বা তার পাল কখনো কখনো শাবকটিকে গ্রহণ নাও করতে পারে। সে কারণেই তাকে উদ্ধারের পর দ্রুত মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গে এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের অক্টোবরে বন্যার সময় মেচি নদী থেকে একটি হাতিশাবককে উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে সেটিকে তার পাল গ্রহণ করেনি বলে খবর পাওয়া যায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার উদ্ধার করার পর দ্রুত শাবকটিকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ওপর জোর দেন বনকর্মীরা।
তথ্যসূত্র: ইটিভি ভারত, এনডিটিভি
.png)








