দেলওয়ার হুসাইনের লেখা

সুফি মাজার: দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয় ঐতিহ্য

দক্ষিণ এশীয় সমাজবিষয়ক গবেষক ও লেখক দেলওয়ার হুসাইন ২০১০ সালে এই নিবন্ধটি দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় লিখেছিলেন। লেখাটির গুরুত্ব বিবেচনায় তা অনুবাদ করা হলো।

লেখা:
লেখা:
দেলওয়ার হুসাইন

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ০২
লাহোরের দাতা দরবার। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া

২০১০ সালের ২৫ অক্টোবর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে বাবা ফরিদ দরগায় বোমা বিস্ফোরণে ছয়জন নিহত হন। মাজারটি ছিল ১২০০ বছরের পুরোনো। এই মাজারে হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও করাচির আবদুল্লাহ শাহ গাজী মাজারে বিস্ফোরণে ৯জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। একই বছরের জুলাই মাসে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সুফি মাজার দাতা দরবারে জোড়া আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জনের মৃত্যু হয় এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে, আফগানিস্তানের যুদ্ধ থেকে ছড়িয়ে পড়া ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা পাকিস্তানের সুফি মাজারগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এসব উগ্রপন্থীরা সুফি অনুসারীদের ‘অমুসলিম’ মনে করে এবং তাদের আচার-অনুষ্ঠানকে ধর্মবিরোধী হিসেবে দেখে। তবে বাস্তবে, মাজারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামের ভেতরকার মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে, এ অঞ্চল সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ারও অনেক আগে থেকে। ১৮০০ শতক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ওহাবিবাদসহ বিভিন্ন ইসলামি পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ভারতীয় দেওবন্দি ধারার অনুসারীরা সুফিবিরোধী অবস্থান নিয়ে মাজারে ইবাদত বা প্রার্থনা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রতিবেশী বাংলাদেশেও মাজারগুলোকে ঘিরে সহিংস হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০০৪ সালে সিলেটের প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো শাহজালাল মাজারে দুটি পৃথক বিস্ফোরণে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। ওই সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারও এ ঘটনায় আহত হন। এর আগে ও পরে বাংলাদেশে মাজারগুলোতে আরও কিছু কম আলোচিত হামলার ঘটনাও ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে মাজারে পবিত্র বলে বিবেচিত শত শত মাছ ও কচ্ছপকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা।

মাজারগুলো মূলত সুফি সাধক বা পীরদের স্মরণে নির্মিত। ইসলামি বিশ্বের নানা প্রান্তে এগুলো ছড়িয়ে রয়েছে। ইতিহাসবিদ রিচার্ড এটনের মতে, উপমহাদেশের নিরক্ষর সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিতে পীররাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, কারণ তারা মানুষের কাছে ঐশী বিধানের একটি দৃশ্যমান ও সহজবোধ্য রূপ উপস্থাপন করেন। আজও ধর্মীয় চর্চা ও সাধারণ মানুষের বিশ্বাস-অনুশীলনে মাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে। মতবাদ বা কঠোর ধর্মীয় বিধানের চেয়ে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে মাজারভিত্তিক এই ধারাটি প্রথাগত ধর্মতত্ত্ববিদ ও আলেমদের শাস্ত্রনির্ভর ইসলামের সঙ্গে এক ধরনের নীরব বিরোধ তৈরি করে।

পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতে সমসাময়িক সময়ে মাজার ও সামগ্রিকভাবে সুফিবাদের বিরোধী যে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো রয়েছে, তারা ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে এসেছে। ইসলামি বিশ্বসমাজ বা উম্মাহর ওপর তাদের জোর দেওয়ার ফলে ধর্মীয় চর্চার স্থানীয় রূপগুলোকে তারা প্রত্যাখ্যান করে এবং এর পরিবর্তে মক্কাকেন্দ্রিক ‘শুদ্ধ’ সুন্নি ইসলামের প্রচার করে।

পীর তিনি জীবিত হন বা মৃত (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে) অনুসারীদের কাছে আল্লাহর সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচিত হন। অনেক পীরের ক্ষেত্রেই অলৌকিক ক্ষমতার বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। কোনো পীরের মৃত্যুবর্ষিকী উপলক্ষে পালিত উরস অনুষ্ঠানকে ঘিরে নৃত্য ও সংগীতের উচ্ছ্বাসময় পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে লাখো নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করতে পারে। অনেকের বিশ্বাস, পবিত্র মাজারে গিয়ে দান-দক্ষিণা ও ইবাদত-বন্দেগি করলে পাপ মোচন হয়, কিয়ামতের দিনের জন্য সওয়াব অর্জিত হয় এবং কারও কারও কাছে এটি ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ পালনের সমতুল্য হিসেবেও বিবেচিত হয়।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে রক্ষণশীল ধর্মীয় অনুশীলনের দিকে ঝোঁক বৃদ্ধি সত্ত্বেও, মাজারগুলো এসব দেশে এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিঃসন্দেহে আধ্যাত্মিক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

আধ্যাত্মিক গুরুত্বের পাশাপাশি মাজারগুলো এমন কিছু সামাজিক ভূমিকা পালন করে, যা রাষ্ট্র অনেক সময় করতে পারে না বা করতে চায় না। জীবনের নানাবিধ সংকট থেকে মুক্তির আশায় মানুষ মাজারে যায়। চাকরির সাক্ষাৎকারের আগে, আদালতের মামলায় জয়ের আশায় কিংবা বিয়ের পূর্বে মানুষ মাজারে গিয়ে দোয়া প্রার্থনা করে। শুধু মুসলমানরাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে হিন্দু, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও মাজারে গিয়ে প্রার্থনা করেন। নানা বিভাজন থাকা সত্ত্বেও, এটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্প্রীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী উদাহরণ।

রাজনীতিবিদরাও নির্বাচনের আগে মাজারে গিয়ে দোয়া নেন। পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ লাহোরের দাতা দরবারে নিয়মিত যেতেন। আর বাংলাদেশে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ তার শাসনামলের অস্থির সময়জুড়ে আটরশি পীরের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য সুপরিচিত ছিলেন।

তবে মূলত মাজারগুলো সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছেই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। ইসলামের বহুত্ববাদী ব্যাখ্যার পাশাপাশি এই দিকটিও সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাদের ‘সামাজিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে বিবেচনা করা হয়, তাদের কাছে মাজারই প্রায় একমাত্র আশ্রয়স্থল। এর মধ্যে রয়েছে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, সন্তানহীনতায় ভোগা নারী-পুরুষ, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করা ব্যক্তিরা। সবাই মাজারে গিয়ে সান্ত্বনা ও মানসিক শক্তি খোঁজেন। মাজারের আকার ও সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে কিছু ভক্ত সেখানে অস্থায়ীভাবে বসবাসও করেন, যেখানে দর্শনার্থীদের দেওয়া খাবারেই তাদের জীবিকা চলে। এমনকি অবিবাহিত গর্ভবতী নারীদের সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত মাজারে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।

ওহাবিবাদের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মাজারপ্রথা দুর্বল, দমন কিংবা কোথাও কোথাও পুরোপুরি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সুফি ইসলামের তুলনামূলক ‘উদারতা’, ভিন্ন জীবনধারার প্রতি সহনশীলতা এবং এর ব্যাপক প্রভাব এসব কারণেই মাজারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। একই সঙ্গে, মাজারগুলো এমন এক আধ্যাত্মিক চর্চার প্রসার ঘটায়, যা কোরআন ও হাদিসভিত্তিক ‘নতুন রক্ষণশীলতা’ থেকে সরে গিয়ে বরং আধ্যাত্মিকতা, অনুভূতি ও ঐশী শক্তির কাল্পনিক দিকের ওপর জোর দেয় যা কট্টর মতবাদে বিশ্বাসী গোষ্ঠীর কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে রক্ষণশীল ধর্মীয় অনুশীলনের দিকে ঝোঁক বৃদ্ধি সত্ত্বেও, মাজারগুলো এসব দেশে এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিঃসন্দেহে আধ্যাত্মিক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কট্টরপন্থী বা উগ্র ইসলাম যত মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বা ভবিষ্যতে ফেলতে পারবে, তার চেয়েও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনে মাজারের প্রভাব ও গুরুত্ব অব্যাহত রয়েছে।

(দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

সম্পর্কিত