ড. আইনুন নিশাতের সাক্ষাৎকার

গঙ্গা চুক্তি নবায়ন রাজনীতির বিষয়, রাজনীতিবিদেরাই ঠিক করবেন

বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছর পূর্ণ হবে এ বছর। জলবায়ু, পরিবেশ, কৃষি, জনজীবন ও আর্থ-সামাজিকসহ দুই দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের জন্যও এই চুক্তির সময়োপযোগী নবায়ন জরুরি। তাই নাগরিক সমাজে ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে এই চুক্তি নবায়নসংক্রান্ত নানা দিক আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সাম্প্রতিক ভারত সফরের আলোচ্যসূচিতেও ছিল গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বিষয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রখ্যাত পানিসম্পদ ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতের মুখোমুখি হয়েছিল স্ট্রিম। আন্তসীমান্ত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর রয়েছে গভীর জ্ঞান ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। স্ট্রিমের রিসার্চ ফেলো সানীউজ্জামানের নেওয়া সাক্ষাৎকার পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো–

অধ্যাপক আইনুন নিশাত। স্ট্রিম গ্রাফিক

স্ট্রিম: বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ৭ এপ্রিল ৩ দিনের শুভেচ্ছা সফরে ভারত গিয়েছেন। কূটনৈতিক সূত্রমতে, তাঁর এই সফরে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, ভিসা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ গঙ্গা চুক্তি নবায়নও আলোচ্য সূচিতে রয়েছে। আমরা কি গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারি?

আইনুন নিশাত: এটা মূলত রাজনৈতিক ব্যাপার, কাজেই তারাই ব্যাপারটা দেখবেন। আবার রাজনীতির ব্যাপার হলেও এটা দেখা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। গত ৬ এপ্রিল বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার দেখা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে। আবার পরের দিনই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারতে গেলেন। সুতরাং রাজনীতিবিদেরাই নির্ধারণ করবেন।

স্ট্রিম: এক বছর আগে অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ‘হাই রিপ্রেসেন্টেটিভ’ হিসেবে দায়িত্বরত অবস্থায় এক সংবাদ সম্মেলনে খলিলুর রহমান এ বছর ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ভারতের সর্বোচ্চ সহযোগিতা কামনা করেছিলেন। এখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছেন। কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?

আইনুন নিশাত: বাস্তব সমস্যার সমাধান রাজনীতির মাধ্যমেই হয়, তাই না? ভারত কী চায়, তাদের কী দরকার, তাদের জন্য চুক্তি নবায়ন কতটা জরুরি তারা সেগুলো হিসেব-নিকাশ করেই এগোবেন। নিঃসন্দেহে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আমরা তো গত ৩০ বছর কিছু করিনি।

১৯৯৬ সালে চুক্তি হয়েছে, সেসময় একটা সরকার ৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। আবার ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তারা ছিল। অর্থাৎ তারা গত ৩০ বছরের মধ্যে ২০ বছরই ক্ষমতায় ছিল।এই দীর্ঘ সময়ে তারাও তো কিছু করল না।

স্ট্রিম: বিভিন্ন সংবাদসূত্রে আমরা জানতে পারছি, ভারত ১৯৯৬-এর চুক্তির আদলে এই চুক্তি নবায়ন করতে আগ্রহী নয়। তারা তাদের বর্তমান প্রাপ্যের চেয়েও আরও ৩০-৩৫ হাজার কিউসেক পানি বেশি চায় এবং ১০-১৫ বছরের জন্য স্বল্পমেয়াদী চুক্তি চায়। যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদনদীর পানিবণ্টন চুক্তি সাধারণত মেয়াদি হয় না, বরং স্থায়ী হয়। এ ক্ষেত্রে আপনার মূল্যায়ন কী?

আইনুন নিশাত: দেখুন ভারত অনেক সেয়ানা। ভারত যদি বলে পানি তো তোমার দরকার নেই, তুমি তো ব্যবহার করো না, তাহলে কি বলবেন! তাই বলছি এটা রাজনীতির ব্যাপার, শুধু টেকনিকাল ব্যাপার না। কেননা চুক্তি নবায়নের আলাপেও দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক, সীমান্ত চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ইত্যাদি নানা বিষয় জড়িত। কাজেই এটা রাজনীতির খেলা, টেকনিক্যাল খেলা না। এ বিষয়ে আমার বলার কিছু নেই।

'৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিলের প্রথম ও শেষ ১০ দিন এবং মে মাসের মাঝের ১০ দিন ৩৫ হাজার কিউসেক পানি আপনি পাবেন–এটা গ্যারান্টেড। ভারতও মার্চের শেষ, এপ্রিলের মাঝের এবং মে মাসের প্রথম ১০ দিন ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। তাই ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ নেই কথাটা পুরপুরি ঠিক না।

স্ট্রিম: গঙ্গা চুক্তি হয়েছিল দুই দেশের মানুষের প্রাপ্য অধিকারকে খর্ব না করে একটি যথাযথ ও ন্যায্য সমাধান খুঁজে পাওয়ার ইচ্ছা থেকে, অন্তত চুক্তির ভাষা তেমনই। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বছরের পর বছর পার প্রাপ্য অধিকার পায়নি। কিছু প্রতিবেদন বলছে, ভারত ফারাক্কার উজানে প্রায় তিনশ ড্যাম ও ডাইভারশন তৈরি করেছে। তো আমরা যদি আমাদের প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে চাই, তাহলে আমাদের কী করার আছে?

আইনুন নিশাত: বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারতের কী কী প্রয়োজন, কেন ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায় বা চাইবে–সেটাই আমাদের অস্ত্র। ভারতের যদি বাধ্যবাধকতা থাকে যে বাংলাদেশের ক্ষতি হলে ভারতেরও ক্ষতি হবে, সেটাই রাজনীতির বিষয়। তারা এটুকু বোঝে যে গঙ্গা চুক্তি না হলে বাংলাদেশের মানুষ ক্ষ্যাপবে। এমনিতেই বাংলাদেশের মানুষ যথেষ্ট ভারত-বিরোধী। আপনার যে ক্ষোভ আছে, আর তাদেরও যে বাধ্যবাধকতা আছে, সেটা ভারতকে বোঝাতে হবে।

স্ট্রিম: দিল্লিতে যৌথ নদী কমিশনের সর্বশেষ (৮৮তম) মিটিং হয়েছে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায়, বাংলাদেশ গড়ে ৪০ হাজার কিউসেক পানিসহ একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির দাবী উত্থাপন করেছে। ৪০ হাজার কিউসেক পানি আমাদের পরিবেশগত ও সংশ্লিষ্ট আর্থ-সামাজিক প্রয়োজন এবং জলবায়ু পরিবর্তনগত ঝুকি মোকাবিলার দায় কতটা পূরণ করবে বলে মনে করেন?

আইনুন নিশাত: সত্যি বলতে আমি এই ৪০ হাজার কিউসেক পানির কথা আজ প্রথম শুনলাম। আমি ১৯৯৯ সালে যৌথ নদী কমিশন থেকে সরে গেছি। আমি তখন বুয়েট থেকে অব্যাহতি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হই। তারপর থেকে আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি।

মাঝেমধ্যে দুই-একটি প্রতিষ্ঠান আন্তসীমান্ত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বক্তৃতা দিতে ডাকে, তখন কিছু আলাপ-আলোচনা করি। সে পরিপ্রেক্ষিতে কেউ কেউ কিছু আলাপও করেন। কিন্তু সত্যি সত্যিই, ১৯৯৯ সালের পর থেকে যৌথ নদী কমিশনের কারও সঙ্গে তেমন কোনো কথা হয়নি। যারা কমিশনের সদস্য, তারা তো আমার সরাসরি ছাত্র, দেখা হলে সালাম দেয়, বহু কথা বলে; কিন্তু কাজের কথা তো বলে না ওরা! ওদেরও তো গোপনীয়তার ব্যাপার আছে।

প্রথমত ৪০ হাজার কিউসেক পানির ব্যাপারটা আমি প্রথম শুনলাম। দ্বিতীয়ত হলো এ ধরনের আলোচনায় সমানে সমান থাকার একটি বিষয় আছে। শুনেছিলাম যে বিগত অন্তবর্তী সরকার একটা কমিটি নাকি করেছিল, যারা আমাদের চাওয়া-পাওয়াগুলো নির্ধারণ করবে। তখন যৌথ নদী কমিশনের সদস্য তালিকায় পরিবর্তন হয়েছে। কেন হয়েছে, তা আমি জানি না, সরকার সেটা করতেই পারে। কিন্তু দেখেন যে কোনো আলোচনায় প্রটোকল বলে একটি বিষয় আছে। দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, কৌশল ও সক্ষমতায় সমানে সমান হওয়ার একটা বিষয় আছে। যেহেতু আলোচনাটা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে। আশা করি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নিশ্চয়ই বিভিন্ন কারিগরি দিক নিয়ে ওয়াকিবহাল হয়েই ভারতে গিয়েছেন।

স্ট্রিম: ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি নিয়ে একটা আলোচনা আছে যে সেই চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি নিয়ে পরিষ্কারভাবে নির্দেশিত কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ নেই। আবার কেউ কেউ মনে করেন সেটা ১৯৭৭ সালে স্বাক্ষরিত সম্মতিতে (অ্যাগ্রিমেন্ট) ছিল। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

আইনুন নিশাত: ১৯৭৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি বা সম্মতি ছিল ৫ বছরের জন্য। ‘৭৭ সালের সম্মতিতে বলা হয়েছিল ৩ বছরের মধ্যে পানির প্রবাহ প্রবৃদ্ধি করতে হবে। আমরা নেপালে জলাধার নির্মাণের প্রস্তাব করলাম, ওরা বলল খালখননের কথা, ব্রহ্মপুত্রের পানির নিয়ে। কেউ কারো কথায় রাজি হলো না। কথা ছিল দুই দেশের প্রস্তাবের মধ্য থেকে ১৯৮০ সালে যেকোনো একটা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। কিন্তু আশির দশকের পর আরও দুই বছর কিছুই হলো না। ১৯৮২ সালে যখন ‘৭৭ সালের সম্মতি নবায়নের কথা বাংলাদেশ তুলল, ততদিনে কিন্তু দেশের বাস্তবতা বদলে গেছে। জিয়াউর রহমান আর নেই, এরশাদ সাহেব ক্ষমতায় এসেছেন। ভারতের অনুগ্রহ লাভ করা দরকার। ‘৮২ সালে ভারত বললো ‘৭৭-এর ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল ৫ বছরের জন্য, যা এখন আর কার্যকর না। এরপরে ‘৮২ সালে তারা তাদের ইচ্ছামতো পানি দিয়েছে।

যেহেতু পানিপ্রবাহ প্রবৃদ্ধির ব্যাপারের দুই দেশ কোনো সম্মতিতে পৌঁছতে পারল না ‘৭৭ সালের চুক্তি আর নবায়ন হলো না। ৭ অক্টোবর ১৯৮২ আরেকটা সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং হলো দুই বছরের (১৯৮৩-১৯৮৪) জন্য। সেই সমঝোতায় ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ উঠে গেলো, সেখানে ‘বারডেন শেয়ারিং’ বলে একটা কথা এল। ৮৪ সালের পরে এরশাদ সাহেব ৩ বছরের জন্য (১৯৮৬-১৯৮৮) আবার একটা সমঝোতা করলেন (২২ নভেম্বর, ১৯৮৫)। এখানে ‘বারডেন শেয়ারিং’-এর নামে আমাদের আরও দুর্বল করে দেওয়া হলো।

ভারতের মূল দাবি ছিল তাকে ব্রহ্মপুত্রের পানি দিতে হবে। ’৮৮ সালেও বাংলাদেশ সে বিষয়ে রাজি হয়নি। তো ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ভারত একতরফা ভাবে যা করার করেছে।

৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিলের প্রথম ও শেষ ১০ দিন এবং মে মাসের মাঝের ১০ দিন ৩৫ হাজার কিউসেক পানি আপনি পাবেন–এটা গ্যারান্টেড। ভারতও মার্চের শেষ, এপ্রিলের মাঝের এবং মে মাসের প্রথম ১০ দিন ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। তাই ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ নেই কথাটা পুরপুরি ঠিক না।

কথা সত্যি, যে ১৯৭৭ সালের ‘গ্যারান্টি ক্লজ’-এর মতো শক্তিশালী ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ’৯৬ সালের চুক্তিতে নেই, কিন্তু সেটাতো আমরা ’৮২-তেই সমর্পণ করেছি। ’৭৭-এর ‘গ্যারান্টি ক্লজ’-এর মূল শর্ত ছিল পানিপ্রবাহ প্রবৃদ্ধি, কিন্তু সেটা তো আর বাস্তবায়ন করা গেল না।

পানির ঘাটতিই তো বণ্টন করা হচ্ছে। পানির ঘাটতি তো আছে। সে জন্যই তো ১৯৭৪ সালে দুই দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী একমত হন যে পানির প্রবাহ যথেষ্ট না। কাজেই পানি প্রবাহের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হবে, এটাই সেই ‘অগমেন্টেশন’-এর আলাপ। এটাই সিন্দাবাদের দৈত্য যা আমাদের কাঁধ থেকে নামছে না।

স্ট্রিম: ১৯৯৬ সালের চুক্তির সময় এই বাস্তবতাগুলো কী প্রভাব রেখেছিল? আন্তর্জাতিক রেওয়াজ অনুযায়ী বৃহৎ নদীর ক্ষেত্রে অববাহিকার সব দেশ নিয়ে চুক্তি হয়। গঙ্গা অববাহিকায় নেপাল গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলেও চুক্তি প্রক্রিয়ার বাইরে। এ ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বলুন।

আইনুন নিশাত: ’৯৬ সালে যখন আলোচনা হয়, আমি ছিলাম। তখনো এ বিষয়টা ছিল যে পানিপ্রবাহ প্রবৃদ্ধি করতে হবে, কেননা যে পরিমাণ পানি লাগবে, সেই পরিমাণ পানি তো নাই। আমরা ’৭৭-এ বলেছি নেপালে জলাধার নির্মাণ করও, ওরা বলেছে নেপাল তো আরেকটা দেশ। ’৮৫ সালে যখন আবার আলোচনা হয়েছে, নেপালের সঙ্গে আলোচনা করতে ভারত রাজি হয়েছে। আমি ছিলাম সেই দলে। নেপাল বলেছে আমি কেনো জলাধার করব, আমার তাতে লাভ কি!

আমরা কি গত ১৫ বছরে নেপালকে কখনো জোরালোভাবে বলেছি যে তুমি আমার সাথে যোগ দাও! একদম যে বলিনি, তা-ও না। পুরো বিষয়টা রাজনৈতিক অনেক জটিলতায় পূর্ণ। কিন্তু দিন শেষে যেটা আমাদের সবার বুঝতে হবে, তা হলো, গঙ্গার পানি বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রয়োজন। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশকে রক্ষার জন্য। আর ভারতের একটি অনুযোগ হচ্ছে বাংলাদেশ পানি ব্যবহার করে না, পানিটা বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। এর একটা জবাব আমাদের দিতে হবে চুক্তি নবায়নের আলোচনায়।

স্ট্রিম: ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এই আলাপটাও তোলা হয় যে শুধুম গঙ্গার পানির প্রবাহ নয় বরং পানির ঘাটতিও বণ্টন করতে হবে। এই বিষয়ে কী বলবেন?

আইনুন নিশাত: পানির ঘাটতিই তো বণ্টন করা হচ্ছে। পানির ঘাটতি তো আছে। সে জন্যই তো ১৯৭৪ সালে দুই দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী একমত হন যে পানির প্রবাহ যথেষ্ট না। কাজেই পানি প্রবাহের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হবে, এটাই সেই ‘অগমেন্টেশন’-এর আলাপ। এটাই সিন্দাবাদের দৈত্য যা আমাদের কাঁধ থেকে নামছে না। ১৯৭২ থেকেই ফারাক্কার উজানে কি হবে সে বিষয়ে আমাদের কথা বলার কোনো অধিকার নেই। এই ইতিহাস ও রাজনীতিটা আমাদের সবার বুঝতে হবে।

স্ট্রিম: সম্প্রতি এ ধরনের একটি আলাপ পাওয়া যাচ্ছে যে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলাপ-আলোচনার শুরুর আগে বাংলাদেশের উচিৎ ’৯৬ সালের চুক্তিকে ‘অবসোলেট’ বা লুপ্ত ঘোষণা করে তারপর আলোচনা করা। এই আলাপের মূল ভিত্তিও এই যে একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির প্রবাহ কমে গিয়েছে, অন্যদিকে ভারত অধিক পানি ও স্বল্পমেয়াদী চুক্তি দাবি করছে। তাই ’৯৬-এর পানি প্রবাহ মানদণ্ড ধরে আলাপ করলে বাংলাদেশ তার ন্যায্য প্রাপ্য পাবে না, আসলে ভারতকেই লাভবান করবে। আর চুক্তি লুপ্ত ঘোষণা করলে আলোচনা আজকের বাস্তবতার সাপেক্ষে সম্পূর্ণ নতুন আলোকে হবে। আপনার অভিমত কী এ বিষয়ে?

আইনুন নিশাত: যদি আমরা গঙ্গা চুক্তিকে ‘অবসোলেট’ বা লুপ্ত ঘোষণা করি আর ভারত আর এরপরে কোনো কথাই বলল না, তাহলে কি করবেন? ভারত ক্ষমতাধর রাষ্ট্র এবং সে আন্তর্জাতিক আলাপ-আলোচনা অত্যন্ত ভদ্রভাবে করে। তারা কূটনৈতিক আলাপ কীভাবে করতে হয়, জানে। চুক্তি আগেই লুপ্ত ঘোষণা করলে ভারতের কোনো দায়ই থাকে না বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলার। পুরোনো চুক্তিগুলো আছে বলেই তো তারা বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলছে। ‘অবসোলেট’ ঘোষণা করলে তো আর কথা বলার জায়গাই থাকে না।

স্ট্রিম: গঙ্গা চুক্তির রাজনীতির মতোই এর কারিগরি দিকও অনেক জটিল। একজন পানিসম্পদব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনি তা গভীরভাবে জানেন এবং একসময়ে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের সদস্য হিসেবে নিজে এই প্রক্রিয়া ভিতর থেকে দেখেছেনও। গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বছরে এসে নতুন সরকারকে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বলতে চান?

আইনুন নিশাত: এটা হলো আলোচনার জন্য সরকারের প্রস্তুতির প্রশ্ন। তাদের যদি প্রয়োজন হয় তাহলে কারিগরি দিকে বিশেষজ্ঞ ও পারদর্শীদের সঙ্গেও কথা বলবেন। কেননা দেশের ভেতরেও তো সরকারের একটা জনমত গড়ে তুলতে হবে। পানি যদি নাও পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রেও তো একটা অবস্থান নিতে হবে। পানি পেলে কত পাওয়া যাবে, সে বিষয়েও একটি অবস্থান নিতে হবে।

আশা করি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী চুক্তি নবায়নসংক্রান্ত কারিগরি দিকগুলোর বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বসহ নেবেন এবং যারা এ বিষয়ে দীর্ঘদিন অধ্যয়ন করেছেন ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তাদের পরামর্শগুলোকে সমন্বয় করবেন।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত