আসন্ন নির্বাচনকে ভারত, চীন ও পাকিস্তান ঠিক কীভাবে দেখছে? ভোটের ফলাফল কি সত্যিই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমরা কিছু বিষয় খতিয়ে দেখব।
আল-জাজিরা এক্সপ্লেইনার

২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের শাসনের অবসান হয়েছে। এরপর এই প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। এই নির্বাচনের দিকে সতর্ক নজর রাখছে বাংলাদেশে প্রভাবশালী তিন দেশ ভারত, চীন ও পাকিস্তান। বর্তমানে দেশটি পরিচালিত হচ্ছে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। চলতি মাসে অনুষ্ঠেয় ভোটে ক্ষমতার লড়াইয়ে নেমেছে প্রধান দুটি দল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী । জানুয়ারির শেষের দিকে দলগুলো জোরেশোরে প্রচারণা শুরু করেছে।
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিল। কিন্তু ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সময় নৃশংস দমনাভিযানের অভিযোগে দলটিকে এবার নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসনে। বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সেই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে ভারত এখনো তাকে প্রত্যর্পণে রাজি হয়নি। অন্যদিকে শেখ হাসিনা আসন্ন নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি গত মাসে বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, বিভাজনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার একটি বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন হাসিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপটে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান জানান, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ তলানিতে ঠেকেছে। এর বিপরীতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে কৌশলগত বন্ধনও আগের চেয়ে অনেক গভীর হয়েছে।
তাহমিদ রেজওয়ান ব্যাখ্যা করেন, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যে চলত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ভারতের সঙ্গে সার্বিক ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলা। পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত দূরত্ব ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে সতর্ক সম্পর্ক ধরে রাখা। কিন্তু এখন ঢাকা ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেই অবস্থান সম্পূর্ণ উল্টে ফেলেছে। চীনের ক্ষেত্রে নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এই নির্বাচনকে ভারত, চীন ও পাকিস্তান ঠিক কীভাবে দেখছে? ভোটের ফলাফল কি সত্যিই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমরা কিছু বিষয় খতিয়ে দেখব।
হাসিনার পতন পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার ও মিত্র হিসেবে দেখত। এ ছাড়া এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগীও ভারত। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে ভারত বাংলাদেশে ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ছিল টেক্সটাইল, চা, কফি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, বিদ্যুৎ, কৃষি পণ্য, ইস্পাত ও প্লাস্টিক। উল্টো দিকে বাংলাদেশ থেকে ভারত তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যসহ ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তবে হাসিনার ভারতে পালানোর পর চলমান উত্তেজনার কারণে দুই দেশই একে অপরের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সমর্থন দিয়েছিল। সেই স্বাধীনতার পর থেকে ঢাকার মসনদে কে থাকছে তার ওপর ভিত্তি করে সম্পর্কে চড়াই-উতরাই দেখা গেছে। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি সব সময় দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেছিলেন। ২০২০ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন গত পাঁচ-ছয় বছরে ভারত ও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় রচনা করেছে। আমাদের অংশীদারত্ব নতুন মাত্রা ও দিশা পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো বরাবরই অভিযোগ করত, ভারত প্রসঙ্গে হাসিনা ‘খুবই দুর্বল’ ছিলেন। ভারতের ইকোনমিক টাইমস পত্রিকা ২০১৬ সালে জানিয়েছিল বিএনপির এক উপদেষ্টা হাসিনাকে ভারতের সঙ্গে যৌথ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, এই প্রকল্প পরিবেশের ক্ষতি করবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট ছিল। জামায়াতকে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল হিসেবে দেখা হয়। দলটি ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক চায়। ১৯৭১ সালে তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। ২০২৪ সালে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও ভারতকে তাকে ফেরত না দেওয়ায় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব চড়া হয়েছে। গত বছর ভারতবিরোধী আন্দোলনের নেতা ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডের পর এই তিক্ততা আরও বেড়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডের জেরে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল। ভারত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। গত ডিসেম্বরে ভালুকা অঞ্চলে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
গত মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতে অনুষ্ঠেয় আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) গত সপ্তাহে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেয়। এর প্রতিবাদে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানায়। রোববার পাকিস্তান ঘোষণা করে, তারা ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ম্যাচে অংশ নেবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, হাসিনার পতনের মাধ্যমে ভারত বড় এক কৌশলগত ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে দিল্লি বেশ অস্বস্তিতে ছিল। ভারতের মনে হয়েছে বর্তমান প্রশাসনে জামায়াত ও অন্য ধর্মীয় নেতাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যা তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি।
এই উত্তেজনার মধ্যেই গত বছরের এপ্রিলে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদি ও ড. ইউনূসের প্রথম বৈঠক হয়। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সাংবাদিকদের জানান মোদি একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মিশ্রি আরও জানান তারা হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কথা বলেছেন। তবে এখনো হাসিনা ভারতেই অবস্থান করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে ভারতের জন্য এই নির্বাচনে ঝুঁকি অনেক। কুগেলম্যান মনে করেন ভারত এমন সরকারের আশা করছে যারা তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবে। ভারতের স্বার্থের জন্য হুমকি এমন কাউকে তারা ক্ষমতায় চায় না। খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান অবশ্য মনে করেন নতুন সরকার যেই আসুক তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারবে না। তিনি বলেন জামায়াত বা ইসলামপন্থী দলগুলো সরকারের অংশ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন হবে। প্রথাগত নিরাপত্তার হুমকি, বাণিজ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের স্বার্থে ঢাকাকে দিল্লির সঙ্গে চলতে হবে। ভোটের রাজনীতিতে ভারতবিরোধী বক্তৃতা দেওয়া সহজ। কিন্তু সরকারে আসার পর প্রতিবেশী শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার সময় সেই পপুলিস্ট বা সস্তা জনপ্রিয়তার অবস্থান বদলে যায়।
ভারতের নীতিনির্ধারকরা নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দেন। গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের জন্য শুভকামনা জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আঞ্চলিক প্রতিবেশীসুলভ মনোভাব বাড়বে। তিনি জানুয়ারির শুরুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার জানাজায় ঢাকায় এসেছিলেন। পরে এক্সে তিনি লিখেন যে তিনি বিশ্বাস করেন খালেদা জিয়ার আদর্শ ও মূল্যবোধ দুই দেশের অংশীদারিত্বকে পথ দেখাবে।
কুগেলম্যান বলেন জামায়াত নির্বাচনে জিতলে ভারত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। তবে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে দিল্লি কিছুটা ‘স্বস্তিতে’ থাকবে। তিনি বলেন আজকের বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের আর জোট নেই। দলটি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারত ভাঙা সম্পর্কের টুকরোগুলো জোড়া লাগাতে প্রস্তুত থাকবে। তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে পছন্দ করত। কিন্তু ভারত এখন মেনে নিয়েছে আওয়ামী লীগ সহসাই আর রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হতে পারছে না। তাই তারা বিএনপি সরকারের সঙ্গে কাজ করতে রাজি থাকবে।
যেহেতু জনমত জরিপে জামায়াত ও বিএনপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে তাই ভারত দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। জামায়াতের প্রধান শফিকুর রহমান এ মাসে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ডিসেম্বরে এক ভারতীয় কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ দুইবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তাঁরা দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ব্যাপারে আলোচনা করেন। এরপর গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় আসেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে যে ফাটল তৈরি হয়েছিল তিনি তা মেরামতের মাধ্যমে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার বার্তা দেন।
বিশ্লেষকদের মতে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এখন অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে একাত্তরের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যের দুয়ার খুলেছে। এর আগে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন চুক্তি হয়েছিল। মাত্র গত সপ্তাহেই ১৪ বছর পর সরাসরি বিমান চলাচল আবারও শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ২০১২ সালে এই সেবা বন্ধ করেছিল ঢাকা। এ ছাড়া গত এক বছরে দুই দেশ সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একাধিক বৈঠকও করেছে।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ানের মতে, পাকিস্তান মূলত প্রতিরক্ষা ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে সম্পর্ক গভীর করতে চাইছে। তাদের নিজেদের অর্থনীতি দুর্বল হওয়ায় বাণিজ্যে দেওয়ার মতো খুব বেশি কিছু তাদের নেই। তাদের লক্ষ্য হলো ঢাকার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করে ভারতের পূর্ব দিকে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ানো।
রেজওয়ান আরও বলেন পাকিস্তান হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে। তবে তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিচ্ছে। বাংলাদেশে চলমান ভারতবিদ্বেষ এবং ইসলামি চেতনার উত্থানকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান একাত্তরের সেই অধ্যায়কে পাশ কাটাতে চাইছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে চীন ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিদেশীয় জোট গড়ার চেষ্টা করছে।
নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তান কী ভাবছে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রধান দুই দলের যারাই আসুক ইসলামাবাদ খুশি হবে। তবে তাদের প্রথম পছন্দ নিঃসন্দেহে জামায়াত। এই অঞ্চলে পাকিস্তানই জামায়াত সরকারকে সবচেয়ে বেশি স্বাগত জানাবে।
বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও পাকিস্তান সেটা মেনে নেবে বলে কুগেলম্যানের ধারণা। তবে তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখবে যাতে বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে না যায়। সেটা হলে ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক সব চেষ্টা বিফলে যাবে।
কুগেলুম্যান আরও মনে করেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলেও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি নিজের স্বার্থে দিল্লির সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করে নিতে পারে। তারা সরাসরি সংঘাতে জড়াবে না। অন্যদিকে বিএনপি সব দিকেই ভারসাম্য রাখবে। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খোলা রাখবে ঠিকই কিন্তু তাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবে না। তাদের নীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি শক্তির দিকে না ঝুঁকে সবার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে চায়। একাত্তরে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও ১৯৭৫ সালের পর থেকে তারা ঢাকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বেইজিং সব সময়ই দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার নীতিতে বিশ্বাসী।
হাসিনার আমলে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু অর্থনৈতিক চুক্তি হয়েছিল। ইউনূসের সময়েও সেই ধারা অব্যাহত আছে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে চীনের কাছ থেকে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বা ২১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঋণ ও অনুদান নিশ্চিত করেছে। অবকাঠামো খাতে আরও চীনা বিনিয়োগ টানার চেষ্টাও চলছে।
মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল সামাল দিতেও চীন বাংলাদেশকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কক্সবাজারে এই বিশাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। গত বছর চীন সফরের সময় ইউনূস যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও আলোচনা করেছিলেন। তবে তা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলেন, চীন হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনাকে বাস্তবতার চোখে দেখছে। বেইজিং অন্তর্বর্তী সরকারকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। নতুন বাস্তবতায় তারা সবার আগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি বলেন চীনের এই বন্ধুত্বের কারণে ঢাকার বর্তমান প্রশাসন বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছে। হাসিনার আমলের চেয়েও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। ভোটের পর যারাই ক্ষমতায় আসুক এই সম্পর্ক অটুট থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।
চীনও বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বেশ সক্রিয়। গত এক বছরে চীনা নেতারা বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গত বছরের এপ্রিলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এক জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদল জামায়াত নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর জুনে চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান উইডং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই বৈঠকেই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
কুগেলম্যান বলেন, চীন এই নির্বাচন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। কারণ তারা বাংলাদেশকে তাদের বাণিজ্যের অন্যতম চাবিকাঠি মনে করে। বেইজিংয়ের কাছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা নিরাপত্তাজনিত কোনো কারণে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ুক।
রেজওয়ানের মতে দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতেও এই নির্বাচন চীনের জন্য জরুরি। কারণ এই অঞ্চলটিকে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রভাব বলয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারতের মতো চীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। এমনকি হাসিনার শাসনকালেও তারা বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল।
নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে চীন কাউকে আলাদা করে সমর্থন দিচ্ছে না। যারাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে চীন তাদের পূর্ণ সমর্থন দেবে। পাশাপাশি অন্য বড় দলগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখবে। বেইজিং সব পক্ষের সঙ্গেই কাজ করতে পছন্দ করে। তবে তাদের আসল চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনে বিজয়ী দলের ওপর মার্কিন প্রভাব ঠেকানো।

২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের শাসনের অবসান হয়েছে। এরপর এই প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। এই নির্বাচনের দিকে সতর্ক নজর রাখছে বাংলাদেশে প্রভাবশালী তিন দেশ ভারত, চীন ও পাকিস্তান। বর্তমানে দেশটি পরিচালিত হচ্ছে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। চলতি মাসে অনুষ্ঠেয় ভোটে ক্ষমতার লড়াইয়ে নেমেছে প্রধান দুটি দল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী । জানুয়ারির শেষের দিকে দলগুলো জোরেশোরে প্রচারণা শুরু করেছে।
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিল। কিন্তু ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সময় নৃশংস দমনাভিযানের অভিযোগে দলটিকে এবার নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসনে। বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সেই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে ভারত এখনো তাকে প্রত্যর্পণে রাজি হয়নি। অন্যদিকে শেখ হাসিনা আসন্ন নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি গত মাসে বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, বিভাজনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার একটি বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন হাসিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপটে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান জানান, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ তলানিতে ঠেকেছে। এর বিপরীতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে কৌশলগত বন্ধনও আগের চেয়ে অনেক গভীর হয়েছে।
তাহমিদ রেজওয়ান ব্যাখ্যা করেন, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যে চলত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ভারতের সঙ্গে সার্বিক ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলা। পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত দূরত্ব ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে সতর্ক সম্পর্ক ধরে রাখা। কিন্তু এখন ঢাকা ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেই অবস্থান সম্পূর্ণ উল্টে ফেলেছে। চীনের ক্ষেত্রে নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এই নির্বাচনকে ভারত, চীন ও পাকিস্তান ঠিক কীভাবে দেখছে? ভোটের ফলাফল কি সত্যিই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমরা কিছু বিষয় খতিয়ে দেখব।
হাসিনার পতন পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার ও মিত্র হিসেবে দেখত। এ ছাড়া এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগীও ভারত। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে ভারত বাংলাদেশে ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ছিল টেক্সটাইল, চা, কফি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, বিদ্যুৎ, কৃষি পণ্য, ইস্পাত ও প্লাস্টিক। উল্টো দিকে বাংলাদেশ থেকে ভারত তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যসহ ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তবে হাসিনার ভারতে পালানোর পর চলমান উত্তেজনার কারণে দুই দেশই একে অপরের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সমর্থন দিয়েছিল। সেই স্বাধীনতার পর থেকে ঢাকার মসনদে কে থাকছে তার ওপর ভিত্তি করে সম্পর্কে চড়াই-উতরাই দেখা গেছে। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি সব সময় দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেছিলেন। ২০২০ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন গত পাঁচ-ছয় বছরে ভারত ও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় রচনা করেছে। আমাদের অংশীদারত্ব নতুন মাত্রা ও দিশা পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো বরাবরই অভিযোগ করত, ভারত প্রসঙ্গে হাসিনা ‘খুবই দুর্বল’ ছিলেন। ভারতের ইকোনমিক টাইমস পত্রিকা ২০১৬ সালে জানিয়েছিল বিএনপির এক উপদেষ্টা হাসিনাকে ভারতের সঙ্গে যৌথ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, এই প্রকল্প পরিবেশের ক্ষতি করবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট ছিল। জামায়াতকে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল হিসেবে দেখা হয়। দলটি ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক চায়। ১৯৭১ সালে তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। ২০২৪ সালে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও ভারতকে তাকে ফেরত না দেওয়ায় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব চড়া হয়েছে। গত বছর ভারতবিরোধী আন্দোলনের নেতা ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডের পর এই তিক্ততা আরও বেড়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডের জেরে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল। ভারত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। গত ডিসেম্বরে ভালুকা অঞ্চলে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
গত মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতে অনুষ্ঠেয় আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) গত সপ্তাহে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেয়। এর প্রতিবাদে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানায়। রোববার পাকিস্তান ঘোষণা করে, তারা ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ম্যাচে অংশ নেবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, হাসিনার পতনের মাধ্যমে ভারত বড় এক কৌশলগত ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে দিল্লি বেশ অস্বস্তিতে ছিল। ভারতের মনে হয়েছে বর্তমান প্রশাসনে জামায়াত ও অন্য ধর্মীয় নেতাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যা তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি।
এই উত্তেজনার মধ্যেই গত বছরের এপ্রিলে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদি ও ড. ইউনূসের প্রথম বৈঠক হয়। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সাংবাদিকদের জানান মোদি একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মিশ্রি আরও জানান তারা হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কথা বলেছেন। তবে এখনো হাসিনা ভারতেই অবস্থান করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে ভারতের জন্য এই নির্বাচনে ঝুঁকি অনেক। কুগেলম্যান মনে করেন ভারত এমন সরকারের আশা করছে যারা তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবে। ভারতের স্বার্থের জন্য হুমকি এমন কাউকে তারা ক্ষমতায় চায় না। খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান অবশ্য মনে করেন নতুন সরকার যেই আসুক তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারবে না। তিনি বলেন জামায়াত বা ইসলামপন্থী দলগুলো সরকারের অংশ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন হবে। প্রথাগত নিরাপত্তার হুমকি, বাণিজ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের স্বার্থে ঢাকাকে দিল্লির সঙ্গে চলতে হবে। ভোটের রাজনীতিতে ভারতবিরোধী বক্তৃতা দেওয়া সহজ। কিন্তু সরকারে আসার পর প্রতিবেশী শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার সময় সেই পপুলিস্ট বা সস্তা জনপ্রিয়তার অবস্থান বদলে যায়।
ভারতের নীতিনির্ধারকরা নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দেন। গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের জন্য শুভকামনা জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আঞ্চলিক প্রতিবেশীসুলভ মনোভাব বাড়বে। তিনি জানুয়ারির শুরুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার জানাজায় ঢাকায় এসেছিলেন। পরে এক্সে তিনি লিখেন যে তিনি বিশ্বাস করেন খালেদা জিয়ার আদর্শ ও মূল্যবোধ দুই দেশের অংশীদারিত্বকে পথ দেখাবে।
কুগেলম্যান বলেন জামায়াত নির্বাচনে জিতলে ভারত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। তবে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে দিল্লি কিছুটা ‘স্বস্তিতে’ থাকবে। তিনি বলেন আজকের বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের আর জোট নেই। দলটি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারত ভাঙা সম্পর্কের টুকরোগুলো জোড়া লাগাতে প্রস্তুত থাকবে। তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে পছন্দ করত। কিন্তু ভারত এখন মেনে নিয়েছে আওয়ামী লীগ সহসাই আর রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হতে পারছে না। তাই তারা বিএনপি সরকারের সঙ্গে কাজ করতে রাজি থাকবে।
যেহেতু জনমত জরিপে জামায়াত ও বিএনপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে তাই ভারত দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। জামায়াতের প্রধান শফিকুর রহমান এ মাসে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ডিসেম্বরে এক ভারতীয় কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ দুইবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তাঁরা দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ব্যাপারে আলোচনা করেন। এরপর গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় আসেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে যে ফাটল তৈরি হয়েছিল তিনি তা মেরামতের মাধ্যমে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার বার্তা দেন।
বিশ্লেষকদের মতে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এখন অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে একাত্তরের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যের দুয়ার খুলেছে। এর আগে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন চুক্তি হয়েছিল। মাত্র গত সপ্তাহেই ১৪ বছর পর সরাসরি বিমান চলাচল আবারও শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ২০১২ সালে এই সেবা বন্ধ করেছিল ঢাকা। এ ছাড়া গত এক বছরে দুই দেশ সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একাধিক বৈঠকও করেছে।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ানের মতে, পাকিস্তান মূলত প্রতিরক্ষা ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে সম্পর্ক গভীর করতে চাইছে। তাদের নিজেদের অর্থনীতি দুর্বল হওয়ায় বাণিজ্যে দেওয়ার মতো খুব বেশি কিছু তাদের নেই। তাদের লক্ষ্য হলো ঢাকার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করে ভারতের পূর্ব দিকে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ানো।
রেজওয়ান আরও বলেন পাকিস্তান হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে। তবে তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিচ্ছে। বাংলাদেশে চলমান ভারতবিদ্বেষ এবং ইসলামি চেতনার উত্থানকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান একাত্তরের সেই অধ্যায়কে পাশ কাটাতে চাইছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে চীন ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিদেশীয় জোট গড়ার চেষ্টা করছে।
নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তান কী ভাবছে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রধান দুই দলের যারাই আসুক ইসলামাবাদ খুশি হবে। তবে তাদের প্রথম পছন্দ নিঃসন্দেহে জামায়াত। এই অঞ্চলে পাকিস্তানই জামায়াত সরকারকে সবচেয়ে বেশি স্বাগত জানাবে।
বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও পাকিস্তান সেটা মেনে নেবে বলে কুগেলম্যানের ধারণা। তবে তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখবে যাতে বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে না যায়। সেটা হলে ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক সব চেষ্টা বিফলে যাবে।
কুগেলুম্যান আরও মনে করেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলেও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি নিজের স্বার্থে দিল্লির সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করে নিতে পারে। তারা সরাসরি সংঘাতে জড়াবে না। অন্যদিকে বিএনপি সব দিকেই ভারসাম্য রাখবে। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খোলা রাখবে ঠিকই কিন্তু তাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবে না। তাদের নীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি শক্তির দিকে না ঝুঁকে সবার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে চায়। একাত্তরে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও ১৯৭৫ সালের পর থেকে তারা ঢাকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বেইজিং সব সময়ই দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার নীতিতে বিশ্বাসী।
হাসিনার আমলে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু অর্থনৈতিক চুক্তি হয়েছিল। ইউনূসের সময়েও সেই ধারা অব্যাহত আছে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে চীনের কাছ থেকে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বা ২১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঋণ ও অনুদান নিশ্চিত করেছে। অবকাঠামো খাতে আরও চীনা বিনিয়োগ টানার চেষ্টাও চলছে।
মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল সামাল দিতেও চীন বাংলাদেশকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কক্সবাজারে এই বিশাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। গত বছর চীন সফরের সময় ইউনূস যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও আলোচনা করেছিলেন। তবে তা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলেন, চীন হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনাকে বাস্তবতার চোখে দেখছে। বেইজিং অন্তর্বর্তী সরকারকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। নতুন বাস্তবতায় তারা সবার আগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি বলেন চীনের এই বন্ধুত্বের কারণে ঢাকার বর্তমান প্রশাসন বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছে। হাসিনার আমলের চেয়েও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে। ভোটের পর যারাই ক্ষমতায় আসুক এই সম্পর্ক অটুট থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।
চীনও বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বেশ সক্রিয়। গত এক বছরে চীনা নেতারা বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গত বছরের এপ্রিলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এক জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদল জামায়াত নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর জুনে চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান উইডং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই বৈঠকেই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
কুগেলম্যান বলেন, চীন এই নির্বাচন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। কারণ তারা বাংলাদেশকে তাদের বাণিজ্যের অন্যতম চাবিকাঠি মনে করে। বেইজিংয়ের কাছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা নিরাপত্তাজনিত কোনো কারণে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ুক।
রেজওয়ানের মতে দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতেও এই নির্বাচন চীনের জন্য জরুরি। কারণ এই অঞ্চলটিকে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রভাব বলয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারতের মতো চীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। এমনকি হাসিনার শাসনকালেও তারা বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল।
নির্বাচনের ফলাফলের ক্ষেত্রে চীন কাউকে আলাদা করে সমর্থন দিচ্ছে না। যারাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে চীন তাদের পূর্ণ সমর্থন দেবে। পাশাপাশি অন্য বড় দলগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখবে। বেইজিং সব পক্ষের সঙ্গেই কাজ করতে পছন্দ করে। তবে তাদের আসল চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনে বিজয়ী দলের ওপর মার্কিন প্রভাব ঠেকানো।

পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করেছে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও তারা ভারতের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ম্যাচ বয়কট করবে। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সেই ম্যাচ এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষে এসে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও তথ্য প্রবাহের জগতে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া জনসম্মক্ষে প্রকাশ করেছে।
১ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (বিচার বিভাগ) গত শুক্রবার জেফরি এপস্টেইন সম্পর্কিত ৩০ লাখ পৃষ্ঠার গোপন নথি, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি ও দুই হাজার ভিডিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে।
২ দিন আগে
আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছেন যে ইরানকে দ্রুত আলোচনায় ফিরতে হবে। নইলে নতুন পারমাণবিক চুক্তির সুযোগ শেষ হয়ে যাবে।
৪ দিন আগে