leadT1ad

এপস্টেইন ফাইল কী, কেন এত আলোচনা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

এপস্টেইন ফাইল কী, কেন এত আলোচনা। স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (বিচার বিভাগ) গত শুক্রবার জেফরি এপস্টেইন সম্পর্কিত ৩০ লাখ পৃষ্ঠার গোপন নথি, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি ও দুই হাজার ভিডিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা আইনি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এই ফাইলগুলো প্রকাশ্যে আনা হলো। এসব নথিতে লুকিয়ে আছে বিশ্বখ্যাত রাজনীতিক, বিলিয়নিয়ার এবং এমনকি রাজপরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন অপরাধকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ। জেফরি এপস্টেইন কীভাবে বছরের পর বছর ক্ষমতা ও অর্থের জোরে নিজের অপরাধের জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন, তার এক ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে এই দলিলগুলোতে। নতুন এই তথ্যভাণ্ডার বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

ফাইলগুলোতে কী আছে

এই বিশাল তথ্যের স্তূপে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হলো খসড়া অভিযোগপত্র বা ‘ড্রাফট ইনডিক্টমেন্ট’, যা আগে কখনো দাখিল করা হয়নি। সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব ফ্লোরিডার কৌঁসুলিরা ২০০৭ সালের দিকে এই ৬০ দফার অভিযোগ প্রস্তুত করেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে এপস্টেইন ও তাঁর তিনজন অজ্ঞাত সহযোগী মিলে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক কাজে প্রলুব্ধ করেছেন।

নথি অনুযায়ী, এই সহযোগীরা এপস্টেইনের কর্মী ছিলেন। তাঁদের কাজ ছিল মেয়েদের পাম বিচের বিলাসবহুল বাড়িতে নিয়ে আসা ও ‘ম্যাসাজ’ বা অন্যান্য অজুহাতে তাঁদের বেডরুমে পাঠানো। অভিযোগপত্রে ১৯ জন নাবালিকা মেয়ের নাম রয়েছে, যাদের অনেকের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। কিন্তু ২০০৭ সালে ফেডারেল প্রসিকিউটররা এই মামলা আদালতে তোলেননি। বরং এক বিতর্কিত ‘নন-প্রসিকিউশন এগ্রিমেন্ট’ বা সমঝোতার মাধ্যমে এপস্টেইনকে বড় সাজা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

কে এই জেফরি এপস্টেইন

১৯৫৩ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জেফরি এপস্টেইনের জন্ম। ১৯৯০-এর দশকে হেজ ফান্ড পরিচালক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। ধনী ও ক্ষমতাধরদের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিতর্কিত জীবনধারার কারণে জেফরি দ্রুতই আলোচনায় চলে আসেন। ২০০৫ সালে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে জুলাইয়ে মানবপাচার ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন জেফরি।

এপস্টেইন একবার দাবি করেন, তার কাছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য তথ্য আছে এবং তিনি চাইলে ‘তাকে ধ্বংস করে দিতে পারেন।’ ছবি: সংগৃহীত।
এপস্টেইন একবার দাবি করেন, তার কাছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য তথ্য আছে এবং তিনি চাইলে ‘তাকে ধ্বংস করে দিতে পারেন।’ ছবি: সংগৃহীত।

৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এপস্টেইনের সঙ্গে একাধিক ছবিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখা গেছে। এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, এসব মামলার বিষয় প্রকাশ্যে আসার অনেক আগেই তিনি জেফরির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।

গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক দিন পরেই ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট কারাগারে সন্দেহজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন জেফরি। গত বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (এফবিআই) প্রতিবেদনে বলা হয়, এপস্টেইনকে জেলে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে অনেকেই বিশ্বাস করেন, ধনী ও ক্ষমতাধরদের সঙ্গে এপস্টেইনের সম্পর্ক ধামাচাপা দিতে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, তিনি আত্মহত্যা করেননি।

তালিকায় উঠে আসা রথী-মহারথীরা

এপস্টেইন কেলেঙ্কারির এই নতুন অধ্যায়ে বিশ্বনেতাদের অনেকের নাম উঠে এসেছে। সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে এসেছে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রসঙ্গ। যদিও বিচার বিভাগ পরিষ্কার করেছে যে কিছু অভিযোগ ভিত্তিহীন ও বেনামি ফোন কলের ওপর ভিত্তি করে ছিল, কিন্তু এফবিআইয়ের ফাইলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা কিছু অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে।

একটি ফাইলে দেখা যায়, সাবেক মার্কিন অর্থমন্ত্রী এবং হার্ভার্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট ল্যারি সামার্স ও এপস্টেইনের মধ্যে বেশ কিছু ইমেইল বিনিময় হয়েছিল। সেখানে তাঁরা ট্রাম্পকে নিয়ে কটু মন্তব্য ও গালগল্প করছিলেন। এক ইমেইলে এপস্টেইন ট্রাম্পকে ‘বুদ্ধিহীন’ বা নির্বোধ বলে অভিহিত করেছেন। অন্য একটি ইমেইলে তিনি ট্রাম্পের কথিত কোকেন ব্যবহারের জল্পনাকেও ‘পুরোপুরি ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ল্যারি সামার্স সম্প্রতি তাঁর এই যোগাযোগ বা বন্ধুত্বের জন্য লজ্জিত হওয়ার কথা জানিয়ে হার্ভার্ডে শিক্ষকতা থেকে বিরতি নিয়েছেন।

শুধু ট্রাম্প বা সামার্স নন, প্রযুক্তি বিশ্বের টাইকুন বিল গেটস ও ইলন মাস্কের নামও এই ফাইলে পাওয়া গেছে। একটি খসড়া ইমেইলে এপস্টেইন অভিযোগ করেছেন যে, মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও সেখানে পরকীয়া বা অনৈতিক সম্পর্কের যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। ইলন মাস্কের সঙ্গে এপস্টেইনের ইমেইল চালাচালি নিয়েও হইচই পড়েছে। ২০১২ সালে মাস্ক জানতে চেয়েছিলেন এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে সবচেয়ে বন্য বা ‘ওয়াইল্ডেস্ট পার্টি’ কবে হবে। মাস্ক অবশ্য দাবি করেছেন তিনি সেখানে যাননি। কিন্তু এই কথোপকথন তাঁদের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ দেয়। ব্রিটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসনও এপস্টেইনের অতিথি হয়েছিলেন ও তাঁর ‘হারেম’ নিয়ে আসার কথা বলে ইমেইল করেছিলেন।

বাকিংহাম প্যালেস ও সাবেক রাজপুত্র অ্যান্ড্রু

এপস্টেইন নথিতে যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের জন্যও অস্বস্তিকর বার্তা রয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু (মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর) ২০১০ সালে গৃহবন্দি বা হাউস অ্যারেস্ট থেকে মুক্তির পর এপস্টেইনকে বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অথচ তিনি আগে দাবি করেছিলেন যে ২০০৮ সালে এপস্টেইনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।

ইমেইলে দেখা যায়, অ্যান্ড্রু এপস্টেইনকে জিজ্ঞাসা করছেন গৃহবন্দি দশা থেকে মুক্তি পাওয়াটা কতটা আনন্দের। এমনকি এক রাশিয়ান তরুণীর সঙ্গে ডিনারের ব্যবস্থাও করে দিতে চেয়েছিলেন এপস্টেইন, যা গ্রহণ করতে অ্যান্ড্রু বেশ আগ্রহী ছিলেন। এসব তথ্য সামনে আসার পর যুক্তরাজ্যে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

মোদী ও মীরা নায়ার

এই নথির ঢেউ আছড়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়ও। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে এপস্টেইনের একটি ইমেইলের সারাংশ সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুলেছে। ২০১৭ সালের একটি ইমেইলে এপস্টেইন লিখেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী ইসরায়েলে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার জন্য ‘নাচ-গান’ করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি সাগরিকা ঘোষ এই বক্তব্যকে ‘চমকপ্রদ ও লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে সরকারের কাছে স্পষ্টীকরণের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ারের নামও এই নথিতে পাওয়া গেছে। নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির মা মীরা নায়ার ২০০৯ সালে এপস্টেইনের সহযোগী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বাড়িতে তাঁর সিনেমা ‘অ্যামেলিয়া’র প্রিমিয়ার পরবর্তী এক পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন। ওই পার্টিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও আমাজনের প্রধান জেফ বেজোসও উপস্থিত ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ আছে। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে, এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক কেবল রাজনীতি বা ব্যবসা নয়, বরং সংস্কৃতি ও বিনোদন জগৎ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া ও পদত্যাগ

নথি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে এর রাজনৈতিক অভিঘাত দেখা দিতে শুরু করেছে। স্লোভাকিয়ার রাজনীতিতে বড় ঝড় বয়ে গেছে। দেশটির একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকের নাম এই নথিতে আসার পর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এপস্টেইনের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। এই ঘটনা ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য তাদের দেশের নাগরিকদের এই কেলেঙ্কারিতে সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখার জন্য চাপ অনুভব করছে।

মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংস্থাগুলো দাবি করছে যে, নথিতে উঠে আসা প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। তারা বলছে, এপস্টেইনের ভিকটিম বা নির্যাতনের শিকার নারীরা এতদিন বিচার পাননি, বরং প্রভাবশালীরা টাকার জোরে পার পেয়ে গেছেন। এই নতুন দলিলগুলো প্রমাণ করে যে, অপরাধের সঙ্গে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতাধররা যুক্ত ছিলেন। বিচার বিভাগ যদিও কোনো নির্দিষ্ট ‘ক্লায়েন্ট লিস্ট’ থাকার কথা অস্বীকার করেছে, কিন্তু হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথিতে থাকা নামগুলোই কার্যত সেই তালিকা তৈরি করে দিয়েছে।

এপস্টেইন ২০১৯ সালে জেলেই আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যু নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও, এই ফাইলগুলো তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর পাপের সাম্রাজ্যকে উন্মোচিত করে দিচ্ছে। ৩ মিলিয়ন পৃষ্ঠার এই নথির প্রতি পাতা যেন এক গোপন অধ্যায়ের চাবি, যেখানে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতা, অর্থ আর বিকৃত রুচির এক অশুভ আঁতাত।

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে এপস্টেইন ফাইল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আইনের শাসন ও নৈতিকতা অনেক সময় সমাজের ওপরতলার মানুষদের স্পর্শ করতে পারে না। তবে এই উন্মোচন হয়তো ভুক্তভোগী নারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, কারণ এতদিন যেসব সত্য ধামাচাপা ছিল, তা আজ বিশ্বের সামনে উন্মুক্ত।

আগামী দিনগুলোতে এই তথ্যের ভিত্তিতে আরও অনেক রথী-মহারথীর পতন হতে পারে ও অনেক নতুন তদন্তের দরজা খুলে যেতে পারে। এপস্টেইন মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া তথ্যের বিস্ফোরণ এখনো চলছে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্স ও সিএনএন

Ad 300x250

সম্পর্কিত