পাচারে বিলুপ্ত বনরুই, অজানা জীবন উন্মোচনে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

উদ্ধার হওয়া বনরুইয়ের অজানা জীবন উন্মোচন করছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা। মঙ্গাবে নিউজ থেকে নেওয়া ছবি

চায়নিজ প্যাঙ্গোলিন বা বনরুই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে অন্যতম। শিকারিদের দৌরাত্ম্যে এই অতি বিপন্ন প্রাণীটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এদের শরীর শক্ত বর্মে ঢাকা, মুখ লম্বা এবং এদের শরীরের সমান লম্বা একটি আঠালো জিভ আছে। এই জিভ দিয়েই তারা মাটির গভীরে থাকা পিঁপড়া ও উইপোকার বাসা খুঁজে বের করে খায়। দিনের বেলা এরা বনের মাটির নিচে গভীর গর্ত খুঁড়ে ঘুমায়। লাজুক প্রকৃতির এই প্রাণীটি যেকোনো পরিবেশের সঙ্গে খুব সহজেই মিশে যেতে পারে।

সারা বিশ্বে এদের মোট সংখ্যা কত, তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। তবে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) এদের ‘অতি বিপন্ন’ প্রাণীর তালিকায় রেখেছে। শিকার, বন উজাড় এবং বাসস্থান হারানোর ফলে এরা আজ হারিয়ে যাচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে চীনে ব্যাপকভাবে শিকার করার কারণে সেখান থেকে এই প্রজাতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে শিকারিদের মূল নজর এখন ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনগুলোর দিকে।

বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই বনরুইয়ের এই প্রজাতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এমনটাই জানিয়েছেন ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শাহরিয়ার সিজার রহমান। সিসিএ বাংলাদেশভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা, যারা বাংলাদেশে বনরুই ট্র্যাকিংয়ের এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সিজার রহমান জানান, আসল সমস্যা হলো কেউ জানে না আমাদের বনে ঠিক কতগুলো বনরুই আছে। তাদের ওপর নজর রাখার সঠিক উপায় কী, তাও অনেকের অজানা।

২০১৭ সালে সিজার রহমান বাংলাদেশে বনরুই নিয়ে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গবেষণা থেকে জানা যায়, যেসব এলাকায় আগে চাইনিজ বনরুই প্রচুর সংখ্যায় ছিল, সেখানে এরা দিন দিন বিরল হয়ে যাচ্ছে।

একটি চায়নিজ বনরুই প্রতি রাতে হাজার হাজার উইপোকা বা কীটপতঙ্গ খেয়ে ফেলতে পারে। সিজার রহমান বলেন, এই পর্যবেক্ষণগুলো প্রমাণ করে যে বনের পরিবেশ রক্ষায় এই প্রজাতির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া জুড়ে তাদের বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

উদাহরণ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার কথা বলা যায়। এই সীমান্ত অঞ্চলটি বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত। সিজার রহমান আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে এই প্রাণী একপ্রকার বিলুপ্তই হয়ে গেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ বন বিভাগ পাচারকারীদের কাছ থেকে দুটি চায়নিজ বনরুই উদ্ধার করে। এর মধ্যে একটি মাদি বনরুই উদ্ধার হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে এবং একটি পুরুষ বনরুই ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। এদের শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে সিসিএ পরিচালিত ‘জানকিছড়া বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্রে’ আনা হয়। সিজার রহমান জানান, এই উদ্ধার হওয়া বনরুইগুলোই প্রজাতিটি নিয়ে গবেষণার এক দারুণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

গবেষকদের মূল লক্ষ্য ছিল বনের ভেতর এদের চলাফেরার ধরণ এবং মাটির নিচে গর্ত ব্যবহারের রহস্য উন্মোচন করা। তবে বনরুইয়ের লাজুক স্বভাবের কারণে এদের খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন, তাই গবেষকদের বিভিন্ন উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়েছে।

বনে ছেড়ে দেওয়ার আগে চিকিৎসকেরা বনরুই দুটিকে ভালোভাবে পরীক্ষা করেন। এরা কোনো আঘাত পেয়েছে কি না বা মানসিক চাপে আছে কি না, তা যাচাই করা হয়। এছাড়া এদের ডিহাইড্রেশন বা শরীরের পানির অভাব দূর করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। গবেষণার স্বার্থে চিকিৎসকেরা বনরুইয়ের লেজের গোড়ার আঁশের সঙ্গে ছোট ‘ভিএইচএফ রেডিও ট্রান্সমিটার’ লাগিয়ে দেন। এর ফলে বনরুইগুলো যখন বনের নতুন পরিবেশে ঘুরে বেড়াবে, তখন গবেষকেরা তাদের পিছু নিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

শুরুর দিকে গবেষণার কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। মাঠ পর্যায়ের দলটিকে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত সদ্য মুক্ত হওয়া বনরুইগুলোর পেছনে ঘুরতে হতো। তাদের সব আচরণ ও স্বভাব নোট করে রাখতে হতো। শাহরিয়ার সিজার রহমানের মতে, বনের ভেতর নতুন কোনো গর্ত খুঁজে নিয়ে স্থায়ীভাবে থিতু হতে বনরুইগুলোর প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগেছিল।

দিনের বেলা এরা কোথায় বিশ্রাম নেয়, তা নিশ্চিত হওয়ার পর গবেষকদের কাজ কিছুটা সহজ হয়। তারা সেই গর্তের মুখে ‘ক্যামেরা ট্র্যাপ’ বা স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসিয়ে দেয় এবং রাতে ভিএইচএফ রেডিও দিয়ে নজরদারির সময় কমিয়ে আনে। ১,২৫০ হেক্টরের পুরো এলাকায় তারা গর্তের উপস্থিতির ওপর জরিপ চালায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ওই এলাকায় আরও অন্তত ছয়টি বন্য বনরুই বসবাস করছে।

বনে ছাড়ার পর দেখা গেল, প্রতিটি বনরুই তুলনামূলকভাবে ছোট একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা চেনা পরিবেশের ভেতরেই নিজেদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ রাখছে। এই তথ্য গবেষকদের বেশ অবাক করেছে। কারণ এর আগের অন্যান্য প্রজাতির গবেষণায় দেখা গেছে, বনের নতুন পরিবেশে ছাড়লে প্রাণীরা অনেক দূরে দূরে ঘুরে বেড়ায়। এতে প্রাণীদের প্রচুর শক্তি নষ্ট হয়, যা অনেক সময় তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

বনে ছাড়ার পর দেখা গেল, প্রতিটি বনরুই তুলনামূলকভাবে ছোট একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা চেনা পরিবেশের ভেতরেই নিজেদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ রাখছে। এই তথ্য গবেষকদের বেশ অবাক করেছে। কারণ এর আগের অন্যান্য প্রজাতির গবেষণায় দেখা গেছে, বনের নতুন পরিবেশে ছাড়লে প্রাণীরা অনেক দূরে দূরে ঘুরে বেড়া

নজরদারির সময় একটি দারুণ মুহূর্ত স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরায় ধরা পড়ে। সেখানে দেখা যায়, একটি বন্য পুরুষ বনরুই মুক্ত করা মাদি বনরুইয়ের গর্তে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। এতে গবেষকরা খুবই আশাবাদী; তারা আশা করছেন, শিগগির ক্যামেরার ফ্রেমে বনরুইয়ের ছানাও দেখা যাবে। ট্র্যাকিং থেকে আরও জানা গেছে, এরা নতুন গর্ত খোঁজার চেয়ে পুরোনো গর্ত ব্যবহার করতেই বেশি পছন্দ করে। সিজার রহমান বলেন, অনেক সময় গর্ত পুরোনো দেখে মনে হতে পারে সেখানে কোনো প্রাণী নেই, কিন্তু আসলে সেখানে বনরুই থাকতে পারে। তাই এদের সঠিক সংখ্যা জানতে একাধিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা জরুরি।

ক্যামেরা ট্র্যাপের ছবি থেকে দেখা গেছে, এই বনরুইগুলো খুব সহজেই বন্য পরিবেশের সঙ্গে মিশে গেছে। তারা অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীদের সঙ্গেও গর্ত ভাগাভাগি করে থাকতে পারে। এ ছাড়া গর্তের মুখের নতুন মাটিতে হরিণ, বুনো শুকরকে নাক ডলে পোকা-মাকড় খুঁজতে দেখা গেছে।

একটি চায়নিজ বনরুই প্রতি রাতে হাজার হাজার উইপোকা বা কীটপতঙ্গ খেয়ে ফেলতে পারে। সিজার রহমান বলেন, এই পর্যবেক্ষণগুলো প্রমাণ করে যে বনের পরিবেশ রক্ষায় এই প্রজাতির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া জুড়ে তাদের বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এই ট্র্যাকিং গবেষণা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলেও, আইইউসিএন-এর বনরুই বিশেষজ্ঞ গ্রুপের এশিয়া অঞ্চলের ‘ভাইস চেয়ার’ কুমার পৌডেল কিছুটা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, উদ্ধার হওয়া বনরুইদের আচরণ দেখে পুরো প্রজাতির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ পাচারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া এই প্রাণীগুলোর আসল বাসস্থান কোথায় বা এরা নতুন পরিবেশে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। ফলে তাদের আচরণে কিছুটা অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে।

কুমার পৌডেলের মতে, বনরুইয়ের টিকে থাকা নির্ভর করছে এদের অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করার ওপর। চীন ও ভিয়েতনামে এদের যে বিশাল চাহিদা, তা কমাতেই হবে। কঠোর আইন প্রয়োগ ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বনের আশেপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে সচেতন করা জরুরি। শিকার করার চেয়ে এই প্রাণীদের রক্ষা করলে তারা কীভাবে লাভবান হবে, সেই পথ আমাদের দেখাতে হবে।

সিজার রহমান জানান, দীর্ঘমেয়াদে সিসিএ-এর লক্ষ্য হলো উদ্ধার হওয়া বনরুইদের আরও প্রত্যন্ত ও দুর্গম বনাঞ্চলে ছেড়ে দেওয়া। যেসব এলাকায় বনের সুরক্ষা কম এবং এখনো শিকারের ভয় আছে, সেখানে তারা কাজ করতে চান। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি কচ্ছপ রক্ষার একটি সফল মডেল তাদের হাতে রয়েছে। সেখানে সাবেক শিকারিদেরই বনের পাহারাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা এখন বন পাহারা দেয়। তবে বনরুইয়ের ক্ষেত্রে কুমার পৌডেল এই পদ্ধতিতে কিছুটা ঝুঁকি দেখছেন। কারণ, বনরুই পাচার থেকে যে পরিমাণ অর্থ আসে, তা বন সংরক্ষণের আর্থিক সুবিধার চেয়ে অনেক বেশি। তাই স্থানীয়দের শতভাগ সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়া বনরুইয়ের ক্ষেত্রে বেশ কঠিন হতে পারে।

সিসিএ আপাতত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেই তাদের ট্র্যাকিং গবেষণা চালিয়ে যাবে। জায়গাটি যাতায়াতের সুবিধাজনক হওয়ায় এটি গবেষণার জন্য বেশ উপযুক্ত। সিজার রহমান দৃঢ়ভাবে বলেন, বনরুই রক্ষায় ট্র্যাকিং বা পিছু নেওয়া এক অত্যন্ত শক্তিশালী পদ্ধতি। প্রতিদিন মাঠে নেমে একটি বনরুইয়ের ওপর নজর রাখার অর্থ হলো, একই সঙ্গে তার বাসস্থান এবং পুরো প্রজাতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করা।

  • মঙ্গাবে নিউজ থেকে অনুবাদ করেছেন ফাবিহা বিনতে হক
Ad 300x250

সম্পর্কিত