ad

সুমন সাজ্জাদের লেখা

আগস্টের একদিন

স্ট্রিম গ্রাফিক

৫ আগস্ট ২০২৪। সকাল ১১টা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানুষের ভিড়, মিছিল আর স্লোগান। দেশজুড়ে তখন খুনের বন্যা। যা দেখিনি, তা-ই দেখছি—চোখের সামনে। দলে দলে কোত্থেকে আসছে এত মানুষ? ভেতরে ভেতরে একটা অভ্যুত্থান ঘটে গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সেই সমবেত প্রতিরোধে সেদিন শামিল হয়েছিল আশপাশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা; মিছিল যখন এগিয়ে যাচ্ছে তার পেছন পেছন যোগ দিয়েছে ইপিজিডের শ্রমজীবী মানুষ। কেন? কী চায় তারা? আমি ভাবি। উনসত্তর বা নব্বইয়েও কি এমন হয়েছিল? হতে পারে।

মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে। মাথার ওপরে উড়ছে ড্রোন। তুলে নিচ্ছে মানুষের মুখ ও মুখশ্রী। রাস্তার পাশ থেকে হাত নাড়ছে শত শত মানুষ। বাড়িগুলোর ছাদ, জানালা আর বারান্দায় উৎসুক চোখ। তারা চিৎকার করে সমর্থন জানাচ্ছেন।

বেলা বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে মিছিল। সবাই উদ্বিগ্ন। গতকাল ৯৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। কিছু কি ঘটবে? হাসিনা কি ক্ষমতা থেকে নামবেন? আন্দোলনে কি মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরাই প্রবল? বিকল্প আসলে কে? সেনাবাহিনী কি সমর্থন দেবে? সব প্রশ্নের জবাব খুঁজে আন্দোলন হয় না, ইতিহাসও বদলায় না।

বাংলাদেশে অনেক কিছুই ঘটে; কেবল শাসকদের মনের পরিবর্তন ঘটে না। তবু আশাবাদী হই। মনে হয়—শেষ কামড়। একুশের কবিতায় হাসান হাফিজুর রহমান লিখেছিলেন, ‘আমরা ফ্যারাউনের আয়ুর শেষ কটি বছরের ঔদ্ধত্যের মুখোমুখি।’ তেমনই একটি শাসন আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে স্ফিংসের মতো। আমরা কি পারব?

মোটর সাইকেলে করে ছেলেরা গিয়েছে পরিস্থিতি বুঝতে। ফিরে এসে তারা বলল, সাভারের অবস্থা খারাপ। সকালের পর আর কেউ ঢাকায় যেতে পারেনি। রেডিও কলোনিতেও গুলি হয়েছে। কয়েকজন মারা গেছে। আহা, কে মারা গেল, কার ছেলে, কে জানে। আমাদের যে কারও গায়েই গুলি এসে লাগতে পারে। সতর্ক পদক্ষেপে তবু এগোতে থাকি।

বিকেলের আলো মরে এসেছে। শহিদ মিনারে এখন একটা লাশ আসবে। আমি সেই লাশটার অপেক্ষা করছি। দূর থেকে দেখলাম লাশ এল। গোল হয়ে সবাই লাশটা দেখছে। আমি ঘুরে ঘুরে লাশকে আবর্তন করা বৃত্তটাকে দেখছি। শহিদ মিনার চত্বরে কত অচেনা মানুষ।

অনেকে ব্যানার হাতে ছবি তোলায় ব্যস্ত। ভবিষ্যতে যদি কাজে লাগে। কিন্তু দৈবের বশে ভবিষ্যৎ যদি ঝরঝরে হয়ে যায় এই ছবিয়াল বাহিনীর অবস্থা কী হবে। মেরে ‘তক্তা’ বানিয়ে দেবে। শুনতে পাই, ‘ডিম ভরে দেওয়া’ বলে একটি ব্যাপার আছে। সেটাও ঘটতে পারে। গুম করে আয়নাঘরে চালান দিয়ে দিতে পারে। কেউ কেউ ক্যাটওয়াক করে দুই আঙুলে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে ছবি তুলে দুই কদম হেঁটে বিদায় নিল। চেয়ে চেয়ে দেখলাম।

সিএন্ডবি, বিপিএসিটিসি, রেডিও কলোনি, সিআরপি, সাভার নিউমার্কেট, কাঁচাবাজার। যেতে যেতে থামি। গ্রামের ভেতর দিয়ে গিয়ে ঘুরে ঘুরে আগাম খবর নিয়ে ছেলেরা আসে, সাবধান করে। আমি উঁচু দালানগুলোর দিকে তাকাই। ছাদ থেকে গুলি হবে কি, আল্লাহ মালুম। প্রতিদিনই মরছে নিরীহ মানুষ। কেউ কেউ ঢাকার খবর বলে। গুলি হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। যেন মরবার প্রস্তুতি নিয়েই সবাই বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে।

কেন বের হয়েছি আমি? কী চাই আমি? ভাবনার কুয়াশা জমাট বাধে। বুঝতে পারি, রুদ্ধশ্বাস একটা সময়ের ভেতর আটকে পড়েছি আমরা। কোনো শব্দ দিয়েই সেই সময়টিকে ধরা যাচ্ছে না। কেউ বলছে ‘ফ্যাসিবাদ’, কেউ বলছে ‘কর্তৃত্ববাদ’। পেটে ক্ষুধা নিয়ে আর পিঠে লাথি খেয়ে থিওরি কপচাতে আমার খুব বেশি ভালো লাগে না। সপ্তাহ খানেক আগে এক অধ্যাপকের সঙ্গে তর্ক হয়েছে—শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসন ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসন কিনা। তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলেছিলেন। রেগেমেগে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ফ্যাসিবাদ কাকে বলে? আমি শুধু বুঝতে পেরেছি দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। এও বুঝতে পেরেছি, মানুষের ‘অহং’-এর গায়ে লাথি মারতে নেই। হাসিনা লাথি মেরেছেন। আর তাই আমাদের পিঠের দাগগুলো কোনোমতেই মোছা যাচ্ছে না।

আমার চেনা জানা অনেককেই ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হতে দেখেছি। ৫ আগস্টে মিছিলের সামনে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ছিল তাদের মুখ। দুদিন আগে এক অটোওয়ালা আকণ্ঠ গালি দিচ্ছিল এক মন্ত্রীকে। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? মুদ্রণ-অযোগ্য একরাশ গালি দিয়ে অটোওয়ালা বললেন, ‘অটোর ব্যাটারিগুলার দাম বাড়াইছে এইসব… মন্ত্রী আর তার শাগরেদরা।’ অবারিত স্রোতের মতো ঝরে পড়ছিল আটোওয়ালার ক্রোধ।

অনেক রোদ। সাভারের কাঁচাবাজারের কাছে মিছিল থামল। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক শিক্ষার্থীরা বলল, ‘স্যার, আপনারা এখানে দাঁড়ান। আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে আসি। অন্তত জানাই যে, এখানে শিক্ষকরা আছেন।’ পরিস্থিতি বুঝে ওরা আরও বলল, ‘আমরা বলব যে আমরা শুধু মিছিল নিয়ে সাভার পেরিয়ে ঢাকায় যাব। কোনো ভাঙচুর হবে না। পুলিশ যেন গুলি না করে। পুলিশের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই।’ আমরা বললাম, তোমাদের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষক থাকলে ভালো হয়।’

ছাত্রদের সঙ্গে হাত উঁচিয়ে সারেন্ডার করার ভঙ্গিতে আমরা কয়েকজন এগোতে থাকলাম। বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের সাভার প্রতিনিধিরা চিৎকার করে পুলিশকে বলছিলেন, ‘উনারা টিচার। গুলি কইরেন না। কইরেন না। স্যাররা কথা বলবেন।’

পুলিশেরা ঝাঁক ধরে নড়েচড়ে উঠল। খটখট শব্দ। সক্রিয় হচ্ছে তাদের অস্ত্র। একটু পর উড়তে উড়তে ছিটকে পড়ল টিয়ারশেল। পুলিশ যখন তাদের এই ছোটখাটো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে আমরা তখনও হাত উঁচিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছি। পুলিশ এগিয়ে আসছে। কাছেই এসে পড়ল আরও কয়েকটি টিয়ারশেল। ফট ফট ফট শব্দ হলো। রাবার বুলেট? একজন বললেন, ‘নাহ। এখন সত্যিকারের গুলি ছোড়া হচ্ছে। সরে যেতে হবে।’

গুলি না করা হলেও আমাদের সরে যেতে হতো। টিয়ারশেলের ভয়ানক ধোঁয়া ঢুকে পড়েছে নাক ও চোখের ভেতর। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ছে পানি। পুড়ে যাচ্ছে হাতের চামড়া। চামড়া কেন পুড়ছে—এই নিয়ে হঠাৎ বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসা মাথায় এলো। সমাধান করার আগেই আরও কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ। ইঁদুরের মতো দৌড়ে ঢুকে গেলাম এক গলির ভেতর। মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম মিছিল থেকে। কে যে কোথায়। কামারশালার হাঁপরের মতো হাঁপাচ্ছি। ধোঁয়া ফুসফুসে ঢুকে ভয়ানক যন্ত্রণা শুরু করে দিয়েছে। শ্বাস নিতে পারছি না। খানিকটা মৃত্যুবোধ হলো।

একজন এল পাঁচ-দশ কেজি মিষ্টি নিয়ে। জোর হাত করে নিজের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইল। কিন্তু এই ‘উপসংহার’-এ ‘ভূমিকা’র কথা এলো কেন? উপস্থিত সুধীজনদের মধ্যে ক্ষমাকারী কে? বুঝলাম, কিশোর কুমারের গানের চেয়েও দ্রুত গতিতে ‘পৃথিবী বদলে গেছে’, তাই যা দেখছি তা নতুন লাগছে। যেদিকে বৃষ্টি সেদিকেই ছাতা।

কোথায় দাাঁড়িয়ে আছি আমি? বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল বুঝতে যে, এটা সাভারের বাজার রোড। যোগেশ মিষ্টান্ন ভান্ডার—এ জীবনে এখান থেকে অনেক বার মিষ্টি আর আমিত্তি কিনেছি। অটো আর রিকশার ভিড়ে এই রাস্তায় হাঁটা যায় না। আজ মানুষের কোনো আনাগোনা নেই। ফুটপাথে কেউ বসে নেই। তাই অচিন অচিন লাগছে। একটু দূরে পাগলনাথের ইলেকট্রিক জিনিসপত্রের দোকান। যোগেশ আর পাগলনাথের ম্যানেজার দুজনের মুখ ভেসে উঠল। কোথায় আছে মানুষ দুটো?

ছোট্ট একটা দোতলা দোকানের ওপর থেকে কে যেন টিস্যু পেপার আর কাগজ ফেলছে। টপ করে একটা পানির বোতল পড়ল। একজন একটা গ্যাসলাইটার ফেলল। আমি ওপরের দিকে তাকালাম। এই দালান কিংবা এই বাড়িটা কিংবা এই দোকানের ওপর সাজিয়ে তোলা সংসার আগে তো কখনো দেখি নি। আমি দুটি বাচ্চার মুখ দেখলাম। পর্দার আড়াল থেকে চোখ বের করে আমাদের দেখছে।

ধাওয়া খাওয়া কয়েকজন তরুণ সিসি ক্যামেরা ভাঙছে। এরা আমাদের ‘আন্দোলনতুতো ভাই’। একটু আগে একসাথে গুলি খাওয়ার হাত থেকে বেঁচেছি। হুড়মুড় করে ডিভাইডার পার হয়েছি। বললাম, ‘ভাই, থাক, ভাইঙেন না।’ একজন বললেন, ‘আমরা এই মহল্লায় থাকি, এইসব দোকানেই কাজকাম করি। সব ঠিকঠাক হইয়া গেলে হেগো দোকানেই কাম করতে আহুম। তহন তো চিনা ফালাইবো। আর তহন তো আপনেরা থাকবেন না।’ বলে দুমড়ে মুচড়ে ক্যামেরাগুলো ভেঙে ফেলল। আমি তাদের যুক্তি মেনে নিলাম।

আমার চোখে টিয়ারশেলের জ্বলুনি। চোখ ঘষতে ঘষতে চারপাশ দেখছি। কাগজ আর টিস্যু পেপার পুড়িয়ে গোল হয়ে ধোঁয়া নিচ্ছে কয়েকজন। একেবারে ‘হিরোইঞ্চি’দের মতো করে। কী কাণ্ড! আমাকে ডেকে একজন বললেন, ‘ভাই, চোখে ধোঁয়া নেন। টিয়ারশেলের ধক থাকব না।’ আমিও ধোঁয়া নিলাম। দারুণ ওষুধ। বিষ দিয়ে বিষনাশ। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম লাইটারের ম্যাজিক। সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবলাম, চোখের ভ্রু আর পাপড়ি পুড়ে গেলে আমাকে কী ভয়ানক দেখাবে!

এক গলি পেরিয়ে আরেক গলি। প্রতিটি মোড়ে কিছু-না-কিছু মানুষ। ভয়াবহ বিপদের সময়ও এদেশে উৎসাহী মানুষ থাকে। যাদের কাজ হলো দেখা, শোনা ও বলা। এরা গুজবও বলে, সত্যও বলে। এরকম লোকেরা বলছে, ‘সাভার নিউমার্কেটের সামনে গুলি হইছে।’ সেই গুলির শব্দই আমরা শুনেছি। ছাদ থেকে গুলি। ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমাদের কয়েকজন সহকর্মীও সেখানে ছিলেন। ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ। যোগাযোগের উপায় নেই। কী করি?

বারবার মোবাইলে চেক করি। নেটওয়ার্ক নেই। ইন্টারনেট নেই। দেশের কোনো খবর জানি না। একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসি। আরও লোকজন জড়ো হয়েছে। তারা সবাই হত্যার কথা বলে। অঢেল রক্তপাত আর বীভৎসতার কথা বলে। আমার লোককথার রাক্ষসীর কথা মনে পড়ে।

সব যোগাযোগ যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন মানুষের গল্প ও কল্পনা যোগাযোগ করতে শুরু করে। সত্য-মিথ্যার আকারে আমাদের কাছে পৌঁছুতে থাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শহিদ হওয়ার গল্প। চেনা-অচেনা সবাই সমবেত হতে থাকে সেই গল্প শুনতে। চা খেতে খেতে আমরা ঘড়ি দেখি।

হঠাৎ কে যেন চিৎকার করে বলে, ‘হাসিনা ভাগছে। ইন্ডিয়া গেছে গা।’ আমার বিশ্বাস হয় না। ‘হাসিনা তো পালায় না’। তবু হাসিনারা পালিয়ে যায়। হাসিনাদের পালাতে হয়। মানুষখেকো শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটে।

খেয়াল করি, মোবাইলে মেসেজ আসতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে গুলির শব্দ। গলি থেকে দৌড়ে এসে সব মানুষ রাস্তায়। বুকে, মাথায়, হাতে জড়িয়ে আছে লাল-সবুজ পতাকা। কোলাকুলি করছে, জড়িয়ে ধরছে। অথচ আজ তো ঈদ নয়। তবু মনে হচ্ছে ঈদের আনন্দ। আমরা হেঁটে হেঁটে ঢাকার দিকে এগোতে থাকি। ইচ্ছে ছিল ঢাকার বিপুল বিশাল জনস্রোতে মিশে যাব। কিন্তু তার আগেই আবারও গুলির শব্দ। মানুষের চিৎকার। দেখতে পেলাম মোটর সাইকেলে কোলের ওপর ঝুলে আছে গুলি খাওয়া এক তরুণ অথবা কিশোর। আরেকজনকে নিয়ে যাওয়া হলো রিকশায়। মাথায় শরীরে লেগে আছে তাজা রক্ত। আমার সঙ্গীদের অনেকেই কেঁদে ফেলল। শুনলাম ওই ছেলেটিও আমাদের মিছিলে ছিল।

৫ আগস্ট সরকার পতনের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে ছাত্র-জনতার সমাগম। ছবি: সুমন সাজ্জাদ
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে ছাত্র-জনতার সমাগম। ছবি: সুমন সাজ্জাদ

আমি বারবার আকাশের দিকে তাকাই। পাখি খুঁজি। আকাশটাকেই মনে হচ্ছে ‘মুক্তি’। একটা অটোতে করে রওনা হলাম ক্যাম্পাসের দিকে। মাটিতে হাঁটু মুড়ে কেউ কেউ সিজদা দিচ্ছে। দোয়া করছে। বলছে, নাজাত। রাস্তায় অজস্র মানুষ। এই মিছিল আনন্দের। সবার মুখে হাসি। হাত নেড়ে সবাই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। আমিও চিৎকার করলাম। আচমকা নিজেকে বোকাবোকা আর শিশুশিশু লাগল। লজ্জা পেলাম। পরে মনে হলো, নাহ ঠিকই আছে। মোবাইলের ক্যামেরায় আমি বেশ কিছু চলন্ত দৃশ্য তুলে নিলাম।

ততোক্ষণে গণভবনের দিকে ছুটে গেছে ক্যাম্পাসের বাস। ছাত্র-ছাত্রীরা তুমুল উল্লাস করতে করতে ছুটে গেলো ঢাকার দিকে। আমার রাজধানী শহরের জন-প্লাবন দেখার ইচ্ছা ছিল। ঐতিহাসিক কোনো মুহূর্তকে ক্যামেরার চোখ দিয়ে না দেখে নিজের চোখ দিয়ে দেখার মধ্যে একধরনের আনন্দ আছে। আমার সেই আনন্দটা পাওয়া হলো না।

ক্যাম্পাসে ফিরতেই দেখি শহিদ মিনার চত্বর ভরে গেছে। মানুষ আর মানুষ। সবাই হাত মিলাচ্ছে—যেন শান্তি, শান্তি, শান্তি। একজন এল পাঁচ-দশ কেজি মিষ্টি নিয়ে। জোর হাত করে নিজের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইল। কিন্তু এই ‘উপসংহার’-এ ‘ভূমিকা’র কথা এলো কেন? উপস্থিত সুধীজনদের মধ্যে ক্ষমাকারী কে? বুঝলাম, কিশোর কুমারের গানের চেয়েও দ্রুত গতিতে ‘পৃথিবী বদলে গেছে’, তাই যা দেখছি তা নতুন লাগছে। যেদিকে বৃষ্টি সেদিকেই ছাতা। ভাবলাম, গণঅভ্যুত্থান এত দ্রুতই মহাশয়কে দিয়ে পাঁচ কেজি মিষ্টি প্রসব করিয়ে নিল। মিষ্টি দেখে আমি দূরে সরে গেলাম। মহুয়া তলাটাকেই কলুষিত মনে হতে লাগল।

বিকেলের আলো মরে এসেছে। শহিদ মিনারে এখন একটা লাশ আসবে। আমি সেই লাশটার অপেক্ষা করছি। দূর থেকে দেখলাম লাশ এল। গোল হয়ে সবাই লাশটা দেখছে। আমি ঘুরে ঘুরে লাশকে আবর্তন করা বৃত্তটাকে দেখছি। শহিদ মিনার চত্বরে কত অচেনা মানুষ।

কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বাদ মাগরিব জানাজা হবে। হেঁটে হেঁটে সেদিকে গেলাম। কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। দূরে কোথাও আবারও গুলির শব্দ শুনলাম। তখনও আতঙ্ক কাটে নি। কানাঘুষা চলছে—সশস্ত্র পুলিশেরা গুলি করতে করতে পালাচ্ছে। পালাক আর না পালাক, বোঝা যাচ্ছে বিকল হয়ে পড়েছে রাষ্ট্র। জানাজা শেষ হলো।

একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘মির্জাপুর যাবো কোন দিক দিয়ে?’ তাকিয়ে দেখলাম ভাঙাচোরা চেহারায় এক তরুণ। বোঝা গেল চোখে কম দেখেন। জিজ্ঞেস করলাম, কোন মির্জাপুর?

—টাঙ্গাইল মির্জাপুর।

—এত দূর থেকে আপনি আসছেন?

—হ্যাঁ, গাড়ি ছিল না, সাইকেল চালিয়ে আসছি।

—সাইকেলে?

—হ্যাঁ।

—সন্ধ্যা হয়ে গেছে। যেতে সমস্যা হবে তো।

—থাকা যাবে কোথাও?

—যাবে হয়তো। কিন্তু…এখনও তো ছাত্ররা ঠিকঠাক উঠতে পারে নাই।…

—ওহ। সাইকেলে যেতে পারব। সমস্যা হবে না হয়তো। রাস্তাটা চিনায়া দিলেই হবে।

—আসছেন কীভাবে?

—মিছিলের পেছন পেছন কোন রাস্তা দিয়ে যেন চলে আসছি… সন্ধ্যা তো, তাই একটু…

মির্জাপুর থেকে গোড়াই, কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, বারইপাড়া, কবিরপুর, জিরানি, শ্রীপুর, ইপিজেড, বাইপাইল পেরিয়ে সাভার। এতোটা পথ সাইকেলে চলে এসেছেন। ছাত্রদের ডেকে বললাম, ‘উনাকে একটু রাস্তা বুঝিয়ে দাও। নয়তো কোথাও থাকার বন্দোবস্ত করা যায় কিনা দেখো।’ মির্জাপুর থেকে আসা সেই তরুণটি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমি তাঁর দীর্ঘ যাত্রাপথের কথা ভাবছি।

সন্ধ্যা ফুরিয়ে রাত। আজ রাত ভয়ঙ্কর রাত। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই। সুনসান স্তব্ধতায় বাড়ি ফিরছি। জনতার যে ঢেউ বঙ্গোপসাগরের মতো উত্তাল হয়ে উঠেছিল তার চূড়া ধীরে ধীরে নেমে আসছে। বাংলাদেশকে মনে হচ্ছে জোয়ার ফুরিয়ে যাওয়া সমুদ্রের মতো—ঢেউহীন। এখন সবাই ফিরে যাবে যার যার ঘরে। পড়ে থাকবে ধ্বংসের স্মৃতি, রক্তের দাগ আর অবশিষ্ট শবচিহ্ন। আমার খুব হাহাকার হলো। এরপর গন্তব্য কী?

  • সুমন সাজ্জাদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও লেখক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত