ফারিহা নওশীন

একাবিংশ শতাব্দী চলছে। মানবজাতির ইতিহাসের প্রযুক্তির উৎকর্ষে শীর্ষে রয়েছে পৃথিবী। প্রযুক্তির উৎকর্ষ থাকলেও মানুষের বায়াস আর প্রেজুডিসের কতটুকু উৎকর্ষ সাধন হয়েছে তা বলা মুশকিল। এই শতাব্দীতে এসেও বলা হয়ে থাকে নারীরা বিজ্ঞান, গণিতের মতো বিষয়গুলোতে দুর্বল। কবে ঠিক কোথা থেকে এই ধারণা এসেছে তা বলা মুশকিল তবে এতটুকু বলা যেতে পারে তবে এটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রায়শই হাজির হয় সোশাল মিডিয়া পাব্লিকেশনে!
মোটাদাগের পাব্লিক পার্সেপশন যদি ধরা হয় তাহলে এখনও বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে নারীরা বিজ্ঞান পারেনা এই ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে। নারীরা পারেনা এই মন্তব্যে আসার আগে সাংখ্যিক হিসাব যদি করি তবে দেশের এখন মাত্র ১৪ শতাংশ নারী বিজ্ঞান প্রযুক্তি প্রকৌশল গণিত (এসটিইএম) বিষয়গুলোতে পড়াশোনা করে। অর্থাৎ এসটিইএমে পড়াশোনা করা নারীর সংখ্যাটাই উল্লেখযোগ্য হারে কম। কেন কম সেই প্রশ্নে পরে যাব। প্রথমে বলবো মাত্র ১৪ শতাংশ নারী কী করছে।
২০২১ সালে এশিয়ান সায়েন্টিস্ট-এর ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় ৩ বাংলাদেশি নারী বিজ্ঞানী নির্বাচিত হয়েছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনজন তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনজনের একজন সালমা সুলতানা যিনি পশু চিকিৎসা ও শিক্ষায় অবদানের জন্য নরম্যান ই বোরল্যাগ অ্যাওয়ার্ড এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ ফাউন্ডেশনের স্বীকৃতি পান।
দ্বিতীয়জন সায়মা সাবরিনা ন্যানোম্যাটেরিয়্যালের ব্যবহার নিয়ে গবেষণার জন্য ২০২০ সালে ওডব্লিউএসডি-এলসেভিয়ের ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড ফর আর্লি ক্যারিয়ার ওমেন সায়েন্টিস্ট ইন দ্য ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড পুরস্কার প্রাপ্ত হন। তৃতীয়জন ফেরদৌসী কাদরী উন্নয়নশীল বিশ্বে শিশুদের সংক্রামক রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধে বৈশ্বিক টিকাদান কর্মসূচিতে তার অবদানের জন্য ২০২০ সালে ল’রিয়েল-ইউনেসকো ফর ওমেন ইন সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড পান।
পরে ২০২৩ সালে আরো দুজন নারী বিজ্ঞানী এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। অণুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী।
অনুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা ‘লাইফ সায়েন্সে’ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তালিকায় স্থান পেয়েছেন। চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস শিশুদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে আক্রমণ করে—সেঁজুতি সাহার গবেষণায় সেটা উঠে এসেছে। অন্যদিকে গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী ‘সাস্টেইন্যাবিলিটি’ খাতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। এই পুরস্কারটি দেওয়া শুরু হয় ২০১৬ সাল থেকে।
যদিও বাংলাদেশের নারীরা বিজ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনায় অংশগ্রহণ কম করছে, তবু তাদের অর্জনের খাতা একেবারে হালকা না। মাত্র ১৪ শতাংশ নারী থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণা ও গবেষক বাংলাদেশ পেয়েছে। এমনকি বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহার প্রতিষ্ঠান চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচন করেন। এই উদাহরণগুলো দুই একটা চিত্র। এমন অসংখ্য নারী গবেষক ও বিজ্ঞানী রয়েছেন যারা নানাভাবে সমৃদ্ধ করছেন দেশকে।
তাহলে প্রশ্ন নারীরা এত কম বিজ্ঞানমুখী কেন হচ্ছে? কিংবা এসটিইএমে পড়াশোনা করা নারীদের সংখ্যা কম কেন! এই প্রশ্নের উত্তরে ফিরতি প্রশ্ন চলে আসে।
বাংলাদশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের শিক্ষা কতটা সহজলভ্য এবং সর্বোপরি বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ কতটা রয়েছে সেটা দেখা যাক। ২০২০ সালে কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বাংলাদেশি এক তরুণী, নাম তনিমা তাসনিম অনন্যা। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাগাজিন সায়েন্স নিউজ শীর্ষ ১০ বিজ্ঞানীর তালিকায় সে বছর বাছাই করেছিলো তাকে। ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে গল্প শুনে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে তাঁর। মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর মধ্যে।
বাংলাদেশে এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে তনিমা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং সেখানে পড়াশোনা করেন। তিনি পরে নাসা ও সার্নে ইন্টার্ন করেন। তারপর ডার্টমাউথ কলেজে পোস্টডক্টোরাল গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এই আগ্রহ এবং মেধা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যবহার করতে পারেনি।
উপমহাদেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী বসু যখন ১৮৮৬ সালে চিকিৎসা শাস্ত্র পড়তে আসলেন তখন ও তাঁকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। তাঁর জন্যই নারীদের জন্য কলেজ খুলতে হয়েছিলো। অর্থাৎ তাঁর এই পথটা সহজ ছিলো না। কিন্তু মেধা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। সেই পথ ধরে এখন হাজার হাজার নারী এই উপমহাদেশে চিকিৎসক হয়। কিন্তু প্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতা বাংলাদেশের নারীদের আজন্ম সঙ্গী।
প্রথমত নারীদের প্রাথমিক শিক্ষা নেওয়ার হার মোটামুটি সমপর্যায়ে থাকলেও মাধ্যমিক পর্যন্ত আসতে আসতে ঝরে পড়ার লক্ষণ দেখা যেতে থাকে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে নারীদের বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি। এরপর আসে মানসম্মত শিক্ষা। শহর অঞ্চলে কিছু পরিমাণ মানসম্মত শিক্ষা প্রতুল হলেও গ্রাম অঞ্চলে এই অনুপাত একবারেই কম। মেয়েদের বেসিক শিক্ষাই যেখানে বার্ডেন হয়ে দাড়ায় সেখানে বিজ্ঞান পড়া আরো কষ্টসাধ্য। কেননা বিজ্ঞান পড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল একই সঙ্গে নারী হিসেবে প্রেজুডিসের শিকার হয়ে প্রথমেই তাকে যুদ্ধ শুরু করতে হয় কয়েক কদম পিছনে থেকে।
প্রথম স্ট্রাগল থাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার,সমাজের কটাক্ষ উপেক্ষা করে ১২ বছর প্রতিদিন স্কুল-কলেজ যাতায়াত করতে হয়, সমাজের দেওয়া নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করে এরপর সময় বের করে পড়াশোনা করতে হয়। কখনো বাহ্যিক সাহায্য থাকে, কখনো থাকেনা। এরপরের ধাপে অর্থনৈতিকভাবে তাঁকে স্বচ্ছল হতে হয়। কারণ বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়তে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক নানান ইকুয়েপমেন্টসের দরকার পড়ে।
কখনো মফস্বল কিংবা গ্রাম অঞ্চলে নির্দিষ্ট বিষয়ে পারদর্শী শিক্ষকের অভাব থাকে। ব্যয়ের বিবেচনায় নারী শিক্ষার্থীদের বড় অংশ চাইলেও বিজ্ঞান পড়তে পারেনা। এই সমস্ত ধাপ অতিক্রম করে উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞানে নারীদের অংশগ্রহণ থাকে সামান্যই। প্রাত্যাহিক গৃহস্থালির জীবনযাত্রায় পুরুষের থেকে নারীর দায়িত্ব থাকে কয়েকগুণ বেশি। দায়িত্ব সামলে গবেষণামুখী হওয়া এবং গবেষণায় সময় দেওয়া দুইটি প্যারালাল জীবন যাপন করতে হয় তাদের, সাথে থাকে সন্তান পালনের মতো গুরু দায়িত্ব। এই ত্রিমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বাধা পেরিয়ে নারীকে যেতে হয়।
প্রশ্ন আসে, নারীদের এই চিত্র সবখানেই এক কিনা। ইকুয়াল অপরচুনিটি পাওয়া নারীদের সংখ্যা হাতে গোণা। বড় শহর ও মফস্বল শহরের শিক্ষিত বাবা-মা বাংলাদেশে প্রিভিলেজই ধরা যেতে পারে। কেননা ২০২২ সালের সর্বশেষ জনমিতি অনুযায়ী মোট ৫১ শতাংশ নারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিংহভাগই গ্রাম অঞ্চলে বসবাস করে, এবং গ্রাম অঞ্চলেই নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহ প্রবণতা বেশি।
এছাড়াও উচ্চশিক্ষা-পরবর্তী বিজ্ঞানমুখী গবেষণার সুযোগ বাংলাদেশে কম। বহির্বিশ্বে শিক্ষা গ্রহণ করতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও থাকে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চাপ। এই সমস্ত বাধা মোকাবেলার মতো মানসিক শক্তি সব মেধাবী আর আগ্রহী নারীদের থাকবে কিংবা থাকতে পারে এটা আশা করাও বোকামি। এগুলো বিবেচনা করে নারীরা যখন সিদ্ধান্ত নেয় সহজেই কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করা যায়, তখন তাদের বলা হয়, নারীরা বিজ্ঞান-গণিত পারেনা! প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা যেখানে নেই, সেখানে সেরিব্রাল অপরচুনিটিও সমানভাবে পাওয়াটাই নারীদের জন্য আশাতীত ঘটনা।
তবে হ্যাঁ আশার কথা হচ্ছে, মাত্র ১৪ শতাংশ নারীর মধ্যে যখন আমরা ফেরদৌস কাদেরী, সেঁজুতি সাহা বা গাওসিয়া চৌধুরীদের পেয়ে যাই তখন সেখানে নিকট ভবিষ্যতে মেরী কুরিদের জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটা মেয়ে ফেরদৌস কাদেরী, সেজুতি সাহাদের মতো পরিবারে জন্মগ্রহণ করেনি।
রাষ্ট্র যদি চায় নারীদের থেকে বিজ্ঞানী, গবেষক বের করে আনতে হবে, তবে তাকে সবথেকে ভালো পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষককে নিয়োগ দিতে হবে খাগড়াছড়ির পাহাড়ের নাম না জানা এক মাধ্যমিক স্কুলে, সবথেকে ভালো ল্যাব ফ্যাসিলিটিস দিতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে ১৫ বছর বয়সে ভুয়া জন্মসনদ দেখিয়ে যেন তাঁর বিয়ে না হয়ে যায়। তনিমার মতো যেসব নারীরা স্বপ্ন দেখে তাদের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান করে দিতে হবে, কানিজ ফাতেমার মতো পাইলটদের মেধাকে ইক্যুয়ালি রেস্পেক্ট দেওয়ার মতো নিয়োগ কর্তাদের নিয়োগ করতে হবে।

একাবিংশ শতাব্দী চলছে। মানবজাতির ইতিহাসের প্রযুক্তির উৎকর্ষে শীর্ষে রয়েছে পৃথিবী। প্রযুক্তির উৎকর্ষ থাকলেও মানুষের বায়াস আর প্রেজুডিসের কতটুকু উৎকর্ষ সাধন হয়েছে তা বলা মুশকিল। এই শতাব্দীতে এসেও বলা হয়ে থাকে নারীরা বিজ্ঞান, গণিতের মতো বিষয়গুলোতে দুর্বল। কবে ঠিক কোথা থেকে এই ধারণা এসেছে তা বলা মুশকিল তবে এতটুকু বলা যেতে পারে তবে এটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রায়শই হাজির হয় সোশাল মিডিয়া পাব্লিকেশনে!
মোটাদাগের পাব্লিক পার্সেপশন যদি ধরা হয় তাহলে এখনও বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে নারীরা বিজ্ঞান পারেনা এই ধারণা বদ্ধমূল রয়েছে। নারীরা পারেনা এই মন্তব্যে আসার আগে সাংখ্যিক হিসাব যদি করি তবে দেশের এখন মাত্র ১৪ শতাংশ নারী বিজ্ঞান প্রযুক্তি প্রকৌশল গণিত (এসটিইএম) বিষয়গুলোতে পড়াশোনা করে। অর্থাৎ এসটিইএমে পড়াশোনা করা নারীর সংখ্যাটাই উল্লেখযোগ্য হারে কম। কেন কম সেই প্রশ্নে পরে যাব। প্রথমে বলবো মাত্র ১৪ শতাংশ নারী কী করছে।
২০২১ সালে এশিয়ান সায়েন্টিস্ট-এর ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় ৩ বাংলাদেশি নারী বিজ্ঞানী নির্বাচিত হয়েছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনজন তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনজনের একজন সালমা সুলতানা যিনি পশু চিকিৎসা ও শিক্ষায় অবদানের জন্য নরম্যান ই বোরল্যাগ অ্যাওয়ার্ড এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ ফাউন্ডেশনের স্বীকৃতি পান।
দ্বিতীয়জন সায়মা সাবরিনা ন্যানোম্যাটেরিয়্যালের ব্যবহার নিয়ে গবেষণার জন্য ২০২০ সালে ওডব্লিউএসডি-এলসেভিয়ের ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড ফর আর্লি ক্যারিয়ার ওমেন সায়েন্টিস্ট ইন দ্য ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড পুরস্কার প্রাপ্ত হন। তৃতীয়জন ফেরদৌসী কাদরী উন্নয়নশীল বিশ্বে শিশুদের সংক্রামক রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধে বৈশ্বিক টিকাদান কর্মসূচিতে তার অবদানের জন্য ২০২০ সালে ল’রিয়েল-ইউনেসকো ফর ওমেন ইন সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড পান।
পরে ২০২৩ সালে আরো দুজন নারী বিজ্ঞানী এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। অণুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী।
অনুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা ‘লাইফ সায়েন্সে’ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তালিকায় স্থান পেয়েছেন। চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস শিশুদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে আক্রমণ করে—সেঁজুতি সাহার গবেষণায় সেটা উঠে এসেছে। অন্যদিকে গাওসিয়া ওয়াহিদুন্নেছা চৌধুরী ‘সাস্টেইন্যাবিলিটি’ খাতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। এই পুরস্কারটি দেওয়া শুরু হয় ২০১৬ সাল থেকে।
যদিও বাংলাদেশের নারীরা বিজ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনায় অংশগ্রহণ কম করছে, তবু তাদের অর্জনের খাতা একেবারে হালকা না। মাত্র ১৪ শতাংশ নারী থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণা ও গবেষক বাংলাদেশ পেয়েছে। এমনকি বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহার প্রতিষ্ঠান চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচন করেন। এই উদাহরণগুলো দুই একটা চিত্র। এমন অসংখ্য নারী গবেষক ও বিজ্ঞানী রয়েছেন যারা নানাভাবে সমৃদ্ধ করছেন দেশকে।
তাহলে প্রশ্ন নারীরা এত কম বিজ্ঞানমুখী কেন হচ্ছে? কিংবা এসটিইএমে পড়াশোনা করা নারীদের সংখ্যা কম কেন! এই প্রশ্নের উত্তরে ফিরতি প্রশ্ন চলে আসে।
বাংলাদশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের শিক্ষা কতটা সহজলভ্য এবং সর্বোপরি বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ কতটা রয়েছে সেটা দেখা যাক। ২০২০ সালে কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বাংলাদেশি এক তরুণী, নাম তনিমা তাসনিম অনন্যা। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাগাজিন সায়েন্স নিউজ শীর্ষ ১০ বিজ্ঞানীর তালিকায় সে বছর বাছাই করেছিলো তাকে। ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে গল্প শুনে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে তাঁর। মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর মধ্যে।
বাংলাদেশে এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে তনিমা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং সেখানে পড়াশোনা করেন। তিনি পরে নাসা ও সার্নে ইন্টার্ন করেন। তারপর ডার্টমাউথ কলেজে পোস্টডক্টোরাল গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এই আগ্রহ এবং মেধা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যবহার করতে পারেনি।
উপমহাদেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী বসু যখন ১৮৮৬ সালে চিকিৎসা শাস্ত্র পড়তে আসলেন তখন ও তাঁকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। তাঁর জন্যই নারীদের জন্য কলেজ খুলতে হয়েছিলো। অর্থাৎ তাঁর এই পথটা সহজ ছিলো না। কিন্তু মেধা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। সেই পথ ধরে এখন হাজার হাজার নারী এই উপমহাদেশে চিকিৎসক হয়। কিন্তু প্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতা বাংলাদেশের নারীদের আজন্ম সঙ্গী।
প্রথমত নারীদের প্রাথমিক শিক্ষা নেওয়ার হার মোটামুটি সমপর্যায়ে থাকলেও মাধ্যমিক পর্যন্ত আসতে আসতে ঝরে পড়ার লক্ষণ দেখা যেতে থাকে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে নারীদের বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি। এরপর আসে মানসম্মত শিক্ষা। শহর অঞ্চলে কিছু পরিমাণ মানসম্মত শিক্ষা প্রতুল হলেও গ্রাম অঞ্চলে এই অনুপাত একবারেই কম। মেয়েদের বেসিক শিক্ষাই যেখানে বার্ডেন হয়ে দাড়ায় সেখানে বিজ্ঞান পড়া আরো কষ্টসাধ্য। কেননা বিজ্ঞান পড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল একই সঙ্গে নারী হিসেবে প্রেজুডিসের শিকার হয়ে প্রথমেই তাকে যুদ্ধ শুরু করতে হয় কয়েক কদম পিছনে থেকে।
প্রথম স্ট্রাগল থাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার,সমাজের কটাক্ষ উপেক্ষা করে ১২ বছর প্রতিদিন স্কুল-কলেজ যাতায়াত করতে হয়, সমাজের দেওয়া নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করে এরপর সময় বের করে পড়াশোনা করতে হয়। কখনো বাহ্যিক সাহায্য থাকে, কখনো থাকেনা। এরপরের ধাপে অর্থনৈতিকভাবে তাঁকে স্বচ্ছল হতে হয়। কারণ বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়তে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক নানান ইকুয়েপমেন্টসের দরকার পড়ে।
কখনো মফস্বল কিংবা গ্রাম অঞ্চলে নির্দিষ্ট বিষয়ে পারদর্শী শিক্ষকের অভাব থাকে। ব্যয়ের বিবেচনায় নারী শিক্ষার্থীদের বড় অংশ চাইলেও বিজ্ঞান পড়তে পারেনা। এই সমস্ত ধাপ অতিক্রম করে উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞানে নারীদের অংশগ্রহণ থাকে সামান্যই। প্রাত্যাহিক গৃহস্থালির জীবনযাত্রায় পুরুষের থেকে নারীর দায়িত্ব থাকে কয়েকগুণ বেশি। দায়িত্ব সামলে গবেষণামুখী হওয়া এবং গবেষণায় সময় দেওয়া দুইটি প্যারালাল জীবন যাপন করতে হয় তাদের, সাথে থাকে সন্তান পালনের মতো গুরু দায়িত্ব। এই ত্রিমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বাধা পেরিয়ে নারীকে যেতে হয়।
প্রশ্ন আসে, নারীদের এই চিত্র সবখানেই এক কিনা। ইকুয়াল অপরচুনিটি পাওয়া নারীদের সংখ্যা হাতে গোণা। বড় শহর ও মফস্বল শহরের শিক্ষিত বাবা-মা বাংলাদেশে প্রিভিলেজই ধরা যেতে পারে। কেননা ২০২২ সালের সর্বশেষ জনমিতি অনুযায়ী মোট ৫১ শতাংশ নারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিংহভাগই গ্রাম অঞ্চলে বসবাস করে, এবং গ্রাম অঞ্চলেই নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহ প্রবণতা বেশি।
এছাড়াও উচ্চশিক্ষা-পরবর্তী বিজ্ঞানমুখী গবেষণার সুযোগ বাংলাদেশে কম। বহির্বিশ্বে শিক্ষা গ্রহণ করতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও থাকে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চাপ। এই সমস্ত বাধা মোকাবেলার মতো মানসিক শক্তি সব মেধাবী আর আগ্রহী নারীদের থাকবে কিংবা থাকতে পারে এটা আশা করাও বোকামি। এগুলো বিবেচনা করে নারীরা যখন সিদ্ধান্ত নেয় সহজেই কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করা যায়, তখন তাদের বলা হয়, নারীরা বিজ্ঞান-গণিত পারেনা! প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা যেখানে নেই, সেখানে সেরিব্রাল অপরচুনিটিও সমানভাবে পাওয়াটাই নারীদের জন্য আশাতীত ঘটনা।
তবে হ্যাঁ আশার কথা হচ্ছে, মাত্র ১৪ শতাংশ নারীর মধ্যে যখন আমরা ফেরদৌস কাদেরী, সেঁজুতি সাহা বা গাওসিয়া চৌধুরীদের পেয়ে যাই তখন সেখানে নিকট ভবিষ্যতে মেরী কুরিদের জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটা মেয়ে ফেরদৌস কাদেরী, সেজুতি সাহাদের মতো পরিবারে জন্মগ্রহণ করেনি।
রাষ্ট্র যদি চায় নারীদের থেকে বিজ্ঞানী, গবেষক বের করে আনতে হবে, তবে তাকে সবথেকে ভালো পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষককে নিয়োগ দিতে হবে খাগড়াছড়ির পাহাড়ের নাম না জানা এক মাধ্যমিক স্কুলে, সবথেকে ভালো ল্যাব ফ্যাসিলিটিস দিতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে ১৫ বছর বয়সে ভুয়া জন্মসনদ দেখিয়ে যেন তাঁর বিয়ে না হয়ে যায়। তনিমার মতো যেসব নারীরা স্বপ্ন দেখে তাদের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান করে দিতে হবে, কানিজ ফাতেমার মতো পাইলটদের মেধাকে ইক্যুয়ালি রেস্পেক্ট দেওয়ার মতো নিয়োগ কর্তাদের নিয়োগ করতে হবে।

ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর অষ্টম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। প্রতি বুধবার চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
১৫ মিনিট আগে
সাধারণভাবে আমরা সবাই জানি, ক্যামেরা নিরাপদ রাখতে একটি ভালো ক্যামেরা ব্যাগ বা কেস ব্যবহার করা উচিত। এতে ক্যামেরা ধুলো, আঘাত বা আঁচড় থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু শুধু ব্যাগে রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অনেক সময় এমন কিছু ছোট ছোট বিষয় থাকে, যেগুলো আমরা গুরুত্ব দিই না, অথচ সেগুলোই ক্যামেরার বড় ক
৩ ঘণ্টা আগে
আপনি কি জানেন এই রুহ আফজা প্রথম তৈরি করা হয়েছিল প্রচন্ড গরমে রোগীদের সতেজ রাখার সিরাপ হিসেবে? প্রথমবার যে মানুষেরা রুহ আফজার স্বাদ নিয়েছিলেন, তাঁরা জানতেন না ওই শরবতে ঠিক কী কী ছিল। তবু এর স্বাদ আর সুবাস মানুষের মনে জায়গা করে নেয় খুব দ্রুত।
১৫ ঘণ্টা আগে
মানসিক চাপ জীবনেরই অংশ, কিন্তু একে বাড়তে দেওয়া যাবে না। আজ থেকেই এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো নিজের জীবনে প্রয়োগ করে দেখুন, জীবনটা অনেক বেশি হালকা আর আনন্দময় মনে হবে।
২০ ঘণ্টা আগে