পৃথিবীকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করি কেন

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ১৯: ৩২
এআই জেনারেটেড ছবি

মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার এলেই পৃথিবীর বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও ‘মা দিবস’ ঘিরে শুরু হয় বিশেষ আয়োজন। রেস্তোরাঁর অফার, অনলাইন ক্যাম্পেইন, ফুলের দোকানে ভিড়, ফেসবুকে দীর্ঘ আবেগঘন পোস্ট— সব মিলিয়ে দিনটি যেন ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে বেশি একটি সামাজিক ও বাণিজ্যিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যেন মায়ের প্রতি ভালোবাসার চেয়ে বাণিজ্যিক দিকটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘মা’ ধারণাটি কি আদৌ এত সরল, এত সীমাবদ্ধ?

ইতিহাস বলছে, না।

কারণ মানুষ মাকে শুধু একজন নারী, একজন অভিভাবক কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের জায়গায় দেখেনি। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ পৃথিবীকেও ‘মা’ বলে ডেকেছে। এমনকি বহু প্রাচীন ধর্ম, পুরাণ ও সংস্কৃতিতে পৃথিবীকে জীবন্ত এক মাতৃসত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে— যে জন্ম দেয়, আশ্রয় দেয়, টিকিয়ে রাখে এবং বিনিময়ে খুব কমই কিছু দাবি করে। ঠিক আমাদের মায়ের মতো।

অদ্ভুতভাবে, এই ধারণাটিই আজকের পৃথিবীতে নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসছে।

আধুনিক ‘মাদার্স ডে’র ইতিহাস শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯০৮ সালে আনা জার্ভিস নামে এক নারী তার মা অ্যান রিভস জার্ভিসের স্মরণে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি পালন করেন। তার মা ছিলেন সমাজকর্মী, যিনি নারীর স্বাস্থ্য, পরিচর্যা এবং গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক পুনর্গঠনে কাজ করেছিলেন। পরে ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে জাতীয় ‘মাদার্স ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মজার বিষয় সম্ভবত এখানেই। যে নারী দিনটি শুরু করেছিলেন, তিনিই পরবর্তী সময়ে এর সবচেয়ে বড় সমালোচকে পরিণত হন। ওয়াশিংটন পোস্ট, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও টাইম ম্যাগাজিনের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনা জার্ভিস মনে করতেন মাদার্স ডে ধীরে ধীরে আবেগ থেকে সরে গিয়ে ব্যবসায়িক উৎসবে পরিণত হচ্ছে। ফুল, গ্রিটিং কার্ড ও উপহারের বাজারে ‘মা’ যেন এক ধরনের বাণিজ্যের প্রতীক হয়ে উঠছিল। জীবনের শেষ দিকে তিনি এমনকি মাদার্স ডে বাতিলের আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন।

তবে মাকে ঘিরে মানুষের আবেগ মাদার্স ডের বহু আগের। ইতিহাসবিদদের মতে, কৃষিনির্ভর সভ্যতাগুলো প্রকৃতিকে সবসময় নারীরূপে কল্পনা করত। কারণ তাদের কাছে পৃথিবী ছিল খাদ্যের উৎস, জীবনের উৎস এবং টিকে থাকার একমাত্র ভরসা। জন্মদানের ক্ষমতার সঙ্গে পৃথিবীর উর্বরতাকে মিলিয়ে তারা পৃথিবীকে ‘মা’ হিসেবে দেখত।

প্রাচীন গ্রিক পুরাণে পৃথিবীর দেবীর নাম ছিল ‘গাইয়া’। ব্রিট্যানিকায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাইয়াকে সকল জীবনের আদি জননী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তিনি শুধু পৃথিবী নন, বরং দেবতা, মানুষ ও প্রকৃতির উৎস। গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল, আকাশ, সমুদ্র এবং পাহাড়— সবকিছুর জন্ম গাইয়ার ভেতর থেকেই।

একইভাবে রোমান সভ্যতায় পৃথিবীকে বলা হতো ‘টেরা মেটার’ বা মাদার আর্থ। ‘টেরা’ শব্দ থেকেই পরবর্তীতে ‘টেরিস্টেরিলাল’ বা পৃথিবীসংক্রান্ত শব্দের উৎপত্তি। রোমানদের কাছে পৃথিবী শুধু ভূমি ছিল না। তাদের কাছে এটি ছিল এমন এক মাতৃসত্তা, যিনি মানুষকে খাদ্য ও আশ্রয় দেন।

দক্ষিণ আমেরিকার আন্দীয় অঞ্চলে ‘পাচামামা’ ধারণা আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও ব্রিট্যানিকা-এর তথ্যমতে, ইনকা সভ্যতায় পাচামামা ছিলেন উর্বরতা, ফসল ও জীবনের দেবী। কৃষকরা বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীকে সম্মান না করলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবে। তাই জমিতে বীজ বোনার আগেও পৃথিবীর উদ্দেশে উৎসর্গ দেওয়ার প্রচলন ছিল।

মজার বিষয় হলো, পৃথিবীকে ‘মা’ হিসেবে দেখার এই ধারণা কেবল পুরাণ বা ধর্মীয় কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আধুনিক পরিবেশ আন্দোলনেও ‘মাদার আর্থ’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকের পরিবেশবাদী আন্দোলনের সময় পৃথিবীকে জীবন্ত একটি সিস্টেম হিসেবে দেখার ধারণা জনপ্রিয় হয়। বিজ্ঞানী জেমস লাভলকের ‘গাইয়া হাইপোথিসিস’ অনুযায়ী, পৃথিবী ও এর জীববৈচিত্র্য একসঙ্গে এমনভাবে কাজ করে যেন এটি একটি সেলফ রেগুলেটিং লিভিং অর্গানিজম। যদিও এটি পুরোপুরি আধ্যাত্মিক ধারণা নয়, তবুও ‘গাইয়া’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছিল পৃথিবীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে বোঝানোর জন্য।

দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতিতেও ‘মা’ ধারণাটি বহুস্তরীয়। ‘মাতৃভাষা’, ‘মাতৃভূমি’, ‘মা মাটি মানুষ’— এসব শব্দ শুধু অলংকার নয়, বরং সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বের অংশ। মানুষ সবসময় মায়ের সঙ্গে নিরাপত্তা, সহনশীলতা ও নিঃস্বার্থ দেওয়ার সম্পর্ক তৈরি করেছে। পৃথিবীকেও তাই ‘মা’ বলা হয়েছে।

কিন্তু এখানেই আসে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।

যে পৃথিবীকে মানুষ ‘মা’ বলে ডাকে, সেই পৃথিবীকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে মানুষ। বন উজাড়, নদী দূষণ, অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন— সবকিছু যেন ‘মাদার আর্থ’-এর শরীরে জমতে থাকা ক্ষত।

একইভাবে, পরিবার ও সমাজেও বহু নারীর শ্রম অদৃশ্য থেকে যায়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি অবৈতনিক কাজ করেন। রান্না, সন্তান পালন, বয়স্কদের যত্ন, মানসিক সাপোর্ট— এই শ্রমের বড় অংশই অর্থনৈতিক মূল্যায়নের বাইরে থেকে যায়।

হয়তো এ কারণেই ‘মা’ এবং ‘মাদার আর্থ’ ধারণা একে অপরের এত কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। দুজনেই টিকিয়ে রাখে, নীরবে দিয়ে যায়, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃতও হয় তারাই।

আজকের পৃথিবীতে ‘মাদার্স ডে’ হয়তো অনেকটাই সোশ্যাল মিডিয়ার এস্থেটিকের অংশ। কিন্তু ‘মাদার আর্থ’ ধারণা এখনও মানুষের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে যায়— মানুষ কি সত্যিই সেই সত্তাগুলোর মূল্য বোঝে, যাদের ওপর তার পুরো অস্তিত্ব নির্ভর করে?

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত