যুদ্ধে দুর্বিষহ প্রবাসজীবন

খালি হাতে দেশে ফেরার ভয় ওমানপ্রবাসী রনি মিয়ার, দুশ্চিন্তায় পরিবার

প্রবাসী রনি মিয়া ও আক্রান্ত ওমান। স্ট্রিম কোলাজ

প্রবাসী রনি মিয়া (৩৮) থাকেন ওমানের বন্দরনগরী সালালায়। দেশটির রাজধানী থেকে হাজার কিলোমিটার দূরের এই শহরে আছেন ১২ বছর ধরে। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আল-হাফা সৈকতে সময় কাটাতে পছন্দ করেন তিনি। গত ১২ মার্চ সালালা বন্দরে তেলের ডিপোতে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এরপর অন্তত এক মাস ছুটির দিনে সৈকতে যাননি তিনি। নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকায় ঘরেই ছুটির দিনগুলো কেটেছে তাঁর। পরিস্থিতি যদি বড় যুদ্ধের দিকে মোড় নেয়, তবে জীবন-জীবিকা হারিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরতে হতে পারে—এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে রনির।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এ জন্য ওমানের বিমান বন্দর ও ঘাঁটি ব্যবহারের অভিযোগে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তিনটি তেল মজুদাগারে হামলা চালায় ইরান। সর্বপ্রথম ৬ মার্চ ওমানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বুকুম বন্দর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। সর্বশেষ ৪ মে মোসান্দাম শহরে ডুবাইর ফোজিরা তেলের ডিপোতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে ছুটির দিনে হাফা সৈকতে প্রায় ২০ হাজার লোকের সমাগম হয় বলে জানান রনি মিয়া। ওমানিরাও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সেখানে সময় কাটাতে আসেন। কিন্তু সালালা বন্দরে হামলার পর থেকে সৈকত প্রায় লোকশূন্য হয়ে পড়ে। ফাঁকা পড়েছিল সৈকতের হোটেল-মোটেল, রিসোর্টগুলো। এসব প্রতিষ্ঠান তাঁদের কোম্পানির পণ্য ব্যবহার করে। ফলে তাঁদের বিক্রিও যায় কমে। এতে চাপা উদ্বেগ কাজ করছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভেতর।

ওমানের সালালা বন্দরে পরিশোধিত তেলের ডিপো জ্বলছে। সংগৃহীত ছবি
ওমানের সালালা বন্দরে পরিশোধিত তেলের ডিপো জ্বলছে। সংগৃহীত ছবি

রনি বলেন, ‘এখানকার শান্তি আর নিরাপত্তার ওপর আমাদের জীবন ও জীবিকা সরাসরি নির্ভরশীল। পোর্টের কাছাকাছি যখন উত্তেজনা বা হামলার খবর আসছিল, তখন মনে হচ্ছিল— পরিস্থিতি যদি বড় যুদ্ধে মোড় নেয়, তবে আমাদের মতো প্রবাসীদের জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’

এক দশকের বেশি সময় ধরে সালালায় কমার্শিয়াল মার্কেটে কাজ করেছেন রনি। বর্তমানে একটি কোম্পানিতে বিক্রয়কর্মীর কাজ করেন। অর্ডার অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে পণ্য পৌঁছে দেওয়াই তাঁর কাজ। সালালা বন্দরে হামলার পর হাফা সৈকত এলাকার হোটেল-মোটেলে পণ্য পৌঁছে দিতে নিরাপত্তা শঙ্কা বোধ করতেন তিনি।

রনি জানান, হামলার পর পেশাগত অনিশ্চয়তা ছাড়াও হঠাৎ দেশে ফেরত যাওয়া ভয় কাজ করছিল। এই বয়সে দেশে ফিরলে শূন্য থেকে নতুনভাবে ক্যারিয়ার শুরু করাটা পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ মনে হতো তাঁর। তিনি বলেন, ‘তখন সবচেয়ে বড় ভয়টা ছিল— এত বছরের পরিশ্রম আর তিল তিল করে গড়ে তোলা ক্যারিয়ার কি তবে মাঝপথেই শেষ হয়ে যাবে? অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেশে ফিরতে হবে কি না, সেই দুশ্চিন্তাটা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।’

ইরানের হামলায় আক্রান্ত স্থানগুলো ছবি তুলতে ওমান কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা। সংগৃহীত ছবি
ইরানের হামলায় আক্রান্ত স্থানগুলো ছবি তুলতে ওমান কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা। সংগৃহীত ছবি

রনি মিয়া জানান, সালালায় তেলের ডিপোর সরাসরি সমুদ্রে জাহাজে পরিশোধিত তেল ভরা হয়। সেখানে হামলার পর তেলের মজুতে কয়েকদিন ধরে আগুন জ্বলেছে। নেভানোর চেষ্টা করলে শহরের আশপাশে বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় সেই চেষ্টা করেনি কর্তৃপক্ষ। সবাইকে ওই এলাকায় এড়িয়ে চলতে বলে নগর কর্তৃপক্ষ। ওই এলাকায় ফোনে ছবি তোলা, ভিডিও ধারণে নিষেধাজ্ঞা সংবলিত বিলবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এসব ছবি-ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাড়লে তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ঘটনায় সাতজন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জেনেছেন রনি মিয়া। তাঁদের কয়েকজন এখনো বন্দি বলে তিনি জানেন। এছাড়া কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর দেশেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রনি জানান, এ সময় ফোনে কথা বলায়ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল। তাঁদের কথা বলতেও হতো খুব সাবধানে। বোম, ড্রোন, বিস্ফোরণ, হামলা— এসবের বদলে সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করতেন।

রনি মিয়ার বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বারুয়াখালী গ্রামে। বাবা মারা গেছেন দশ বছর আগে। দুই বছর আগে মায়ের মৃত্যুর খবরে দেশে এসেছিলেন। একমাত্র বড় বোন-ভগ্নিপতিই এখন তাঁর অভিভাবক। তাঁর স্ত্রী রীতা আক্তার গ্রামে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ওমানে হামলার খবরে উদ্বিগ্ন ছিলেন তাঁরা।

সালালা শহরের আল-হাফা সৈকত এলাকা। সংগৃহীত ছবি
সালালা শহরের আল-হাফা সৈকত এলাকা। সংগৃহীত ছবি

শিক্ষিকা রীতা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীকে নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে গেছে সেই সময়গুলো। তাঁর সাথে যেভাবে সম্ভব যোগাযোগের চেষ্টা করতাম, তাঁকে নিরাপদস্থানে থাকার পরামর্শ দিতাম। তিনি হঠাৎ দেশে চলে এলে, আমাদের সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হতো। এসব নিয়ে অনেক চিন্তিত ছিলাম।’ এখন সেখানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও নিরুদ্বেগ নন পরিবারের সদস্যরা।

যুদ্ধের সময় একটি মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে সহপাঠী ও প্রবাসী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন রনি। সেই গ্রুপের একজন কুয়েত প্রবাসী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘তখন আরবের সব দেশের অবস্থা খারাপ ছিল। রনিসহ আমরা কয়েকজন স্কুল বন্ধু একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে মেসেজে ও ভিডিও কলে পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতাম। শুধু যুদ্ধ নিয়ে নয়, বন্ধু হিসেবে বিস্তর বিষয় নিয়ে কথা হতো। উদ্বিগ্ন পরিস্থিতির মধ্যে এটা আমাদের খানিকটা মানসিক স্বস্তিও দিত।’

এদিকে ইরানের হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমদানির প্রভাব পড়েছে ওমানেও। রনি মিয়া সেখানে শতভাগ আমদানিনির্ভর একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। চীন থেকে পণ্য আনে তারা। আগে প্রতি কন্টেইনার পণ্য আমদানিতে (জাহাজ ভাড়া, পোর্টে মাল খালাস, সংশ্লিষ্ট খরচসহ) ব্যয় হতো ১ হাজার ওমানি রিয়াল (বাংলাদেশি প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা)। যুদ্ধ শুরুর পর তা এখন বেড়ে ২ হাজার ওমানি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে তাঁদের কোম্পানি আমদানি স্থগিত রেখেছে। কিন্তু আমদানি না হলে তাঁদের কাজও এক সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে।

মোসান্দদাম শহরে ডুবাইর ফোজিরা তেলের ডিপোতে হামলর পর জ্বলছে। সংগৃহীত ছবি
মোসান্দদাম শহরে ডুবাইর ফোজিরা তেলের ডিপোতে হামলর পর জ্বলছে। সংগৃহীত ছবি

উপসাগরীয় এলাকায় চলমান উত্তেজনার মধ্যে ওমানে বিমান সীমিত আকারে চালু আছে, তবে আগের চেয়ে ভাড়া দ্বিগুণ। তা ছাড়া রিটার্ন টিকিট ইস্যু করা হচ্ছে না। ফলে প্রবাসী যারা দেশে যাচ্ছেন, তাদের ফেরত আসার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

প্রবাসী রনি মিয়া বলেন, ‘পরিস্থিতির শিকার হয়ে খালি হাতে দেশে ফেরা একজন প্রবাসীর জন্য শুধু আর্থিক নয়, বড় ধরনের মানসিক যন্ত্রণারও কারণ। সমাজ ও পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ভয়টা সবসময় তাড়া করে বেড়ায়।’

তা ছাড়া ওমানে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু পরিকল্পনা আছে রনি মিয়ার। সব ঠিক থাকলে স্ত্রীকেও ওমানে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন তিনি। যুদ্ধ বেড়ে গেলে সেই সব স্বপ্ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

প্রবাসী রনি মিয়া বলেন, ‘একজন প্রবাসী হিসেবে আমাদের জীবন সবসময়ই বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে যুক্ত। সালালা পোর্টের সেই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল যে, শান্তি না থাকলে আমাদের রুটি-রুজি এবং স্বপ্ন— সবই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তবে ওমান সরকারের স্থিতিশীলতা এবং পরিস্থিতির ওপর আমাদের আস্থা ছিল বলেই আমরা ধৈর্য ধরেছি।’

সম্পর্কিত