ad

জুলাই গণঅভ্যুত্থান যখন গবেষণার বিষয়

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৫৬
জুলাই গণঅভ্যুত্থান যখন গবেষণার বিষয়। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকেই রয়েছে লাখো মানুষের আত্মত্যাগ, আন্দোলন সংগ্রাম আর তরুণদের অদম্য সাহসিকতার গল্প। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এদেশের ইতিহাসে যুক্ত হয় নতুন অধ্যায়। আন্দোলনের সময় যেমন তৈরি হয়েছে অসংখ্য প্রতিরোধের গল্প, তেমনি জন্ম নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক ভাষা, বদলে গেছে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ধরন।

চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান নিয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু গবেষণা হয়েছে। আজকের লেখায় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তিনটি গবেষণা নিয়ে আলোচনা করব। গবেষণাগুলোতে এই গণঅভ্যুত্থানকে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন।

‘নাটক কম কর পিও’ যেখানে প্রতিবাদের ভাষা

গণঅভ্যুত্থানে ব্যবহৃত ডিজিটাল কন্টেন্ট নিয়ে গবেষণা করেছেন ড. আনাস আনসার। এই গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, জেন-জি প্রজন্মের এই আন্দোলনের কৌশল বেশ আলাদা। ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যেমন রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়েছেন, তেমনি সোশ্যাল মিডিয়াতেও সরব ছিলেন। তাদের প্রতিবাদের ধরণ আলাদা, আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াও ভিন্ন।

গবেষণাটি গুণগত পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে। এখানে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ফেসবুক, টিকটক, টেলিগ্রাম এবং ইনস্টাগ্রামের বিপুল ডিজিটাল কনটেন্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি সংবাদপত্র, কার্টুন, গ্রাফিতি এবং ভিডিও ফুটেজও গবেষণার উপাত্ত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সমালোচনাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ধীরে ধীরে ক্ষোভ জমতে থাকে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সেই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে। শেখ হাসিনার ‘রাজাকার’ বিষয়ক মন্তব্য আন্দোলনে নতুন মোড় আনে। শিক্ষার্থীরা এই শব্দকেই ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে নতুন নতুন স্লোগান, গান ও পোস্টার। ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’, ‘এক দুই তিন চার, হাসিনা তুই গদি ছাড়’ এমন সব স্লোগান মুহূর্তেই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলে আন্দোলনের ভাষাও বদলে যায়। শহরের অলিগলি ভরে যায় প্রতিবাদী গ্রাফিতিতে। ‘স্বৈরাচারের আয়নাঘরে আমার ভাইকে নিয়ে যেতে দেব না’ কিংবা ‘হাসিনা তুই ছাত্র খুনি’—এমন লেখাগুলো এখনও শহরের দেয়ালে দেয়ালে দেখা যায়।

এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রাফিতি ও কার্টুনও আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘নাটক কম কর পিও’ কিংবা ‘হীরক রাজার দেশে’ ফেরত আসে নতুন অর্থে। শেখ হাসিনার মুখ এঁকে তাতে লেখা হয়, দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খানখান। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় ব্যবহৃত এই উক্তি তখন বাস্তবতার সঙ্গে মিশে যায়।

একই সময়ে ‘আওয়াজ উঠা’ ‘কথা ক’ গানে জেগে উঠে ছাত্র-জনতা। এর পাশাপাশি আরতও অনেক গান রচিত হয়। এসব গান তরুণদের মানসিকভাবে একত্রিত রাখে ও শক্তি যোগায়।

গবেষণাটি আরও দেখায়, শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। একইভাবে ‘৩৬ জুলাই’ ক্যালেন্ডার আন্দোলনের স্মৃতিকে নতুনভাবে ধারণ করে।

এ ছাড়া এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতি। এখানে একজন নয়, সবাই ছিল বিকল্প, সবাই নিজেকে নেতা মনে করে আন্দোননের গতি বাড়িয়েছেন। গবেষকের মতে, এই বিকেন্দ্রীকৃত নেতৃত্ব সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার জন্য আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তোলে।

আন্দোলনে নিহত শহীদের মধ্যে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি

দ্বিতীয় গবেষণাটি করেছেন মোহাম্মদ সোহেল ও মো. রাহাতুল মাওলা রাহাত। তাঁরা দেখিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষ।

গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় চারটি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন করা হয়। এতে ২৮ জন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষ অংশ নেন। পাশাপাশি ১২ জন সাধারণ মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রিকশাচালক, হকার, দোকানদার, গৃহিণী, দিনমজুর এবং পোশাকশ্রমিক। পরিমাণগত তথ্য সংগ্রহ করা হয় প্রথম আলো, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন থেকে। গবেষণায় দেখা যায়, এটিকে অনেকে শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মনে করলেও জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণে এই অভ্যুত্থান সফল হয়েছে।

সরকারি গেজেট বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত প্রথম আলোর এক রিপোর্ট বলছে, আন্দোলনে নিহত ৮৪৪ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের সংখ্যা ২৮৪ জন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৬৯ জন। রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছেন অনেক সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষও। তাঁরা কোনো সরকারি চাকরিতে সমতার আশায় আন্দোলনে আসেননি, এসেছিলেন দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্ম হতে।

রিকশাচালকেরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। অনেকেই বিনা ভাড়ায় সেবা দিয়েছেন। কেউ কেউ নিজের রিকশাও হারিয়েছেন। ছোট দোকানদারেরা দোকানের শাটার খুলে আহত আন্দোলনকারীদের আশ্রয় দিয়েছেন। পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেটের মধ্যেও তারা পাশে দাঁড়িয়েছেন। গৃহিণীরা ঘরে খাবার রান্না করেছেন। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। আন্দোলনকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করেছেন। গবেষকদের মতে, এসব মানুষ কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশে রাজপথে নামেননি। সামাজিক ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশাই তাদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

আন্দোলনকারীদের মনের খবর রাখছে কে?

তৃতীয় গবেষণাটি করেছেন মিনহাজুর রহমান রিজভী এবং তাঁর সহকর্মীরা। তাঁরা আন্দোলনের পর বেঁচে ফেরা মানুষদের মানসিক অবস্থা নিয়ে গবেষণা করেছেন। রাজপথের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা জীবনে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, সেটিই ছিল এই গবেষণার মূল বিষয়। গবেষণায় জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তিনটি বিস্তারিত কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উপাত্ত এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণও ব্যবহার করা হয়েছে।

ফলাফল ছিল উদ্‌বেগজনক। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার আহত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ বিষণ্নতায় ভুগছেন। ৬৪ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে দেখা গেছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডির লক্ষণ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। আহত আন্দোলনকারীদের ৭৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার বিষণ্নতায় আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৭ শতাংশের অবস্থা গুরুতর। ঘটনার পাঁচ থেকে ছয় মাস পরও অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনলেই শরীর কেঁপে ওঠে। পুলিশের গাড়ি দেখলেই ফিরে আসে গুলির স্মৃতি। গবেষণায় কয়েকজন আন্দোলনকারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

মিরপুরের বাসিন্দা ‘রাজি’ (ছদ্মনাম) আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। আন্দোলন সফল হলেও তিনি মানসিক শান্তি ফিরে পাননি। রাতভর জেগে থাকেন। অনেক সময় তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারেন না। ভোর হওয়ার আগে তাঁর চোখে ঘুম আসে না। সামান্য কারণেও তিনি রেগে যান বা মেজাজ হারিয়ে ফেলেন।

আরেক শিক্ষার্থী ‘সাইমা’ (ছদ্মনাম) ধানমন্ডির সহিংসতা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। এক মাস পরও স্টার কাবাবের সামনে দিয়ে গেলে তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে রক্তাক্ত সেই দৃশ্য। হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণের শব্দ বা গাড়ির চাকা ফাটার আওয়াজ শুনলেই মনে হয় আবার গুলি শুরু হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি পিটিএসডির একটি পরিচিত লক্ষণ।

‘সাব্বির’ (ছদ্মনাম) নামে আরেক শিক্ষার্থী এখনও পুলিশি অভিযানের ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেননি। রাস্তা দিয়ে পুলিশের গাড়ি গেলেই তিনি লুকিয়ে দেখেন, তাঁকে ধরতে আসছে কি না। কয়েক মাস পরও এই আতঙ্ক তাঁর জীবন থেকে দূর হয়নি। গবেষকদের মতে, সহযোদ্ধার মৃত্যু নিজের চোখে দেখা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। সেই ক্ষত শুধু শরীরে নয়, মনে রয়ে যায় বহু বছর। অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত উদ্‌বেগে ভুগছেন। মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না। স্বাভাবিক পড়াশোনা বা কাজে ফিরতেও কষ্ট হচ্ছে। এই মানসিক সংকট শুধু ব্যক্তির নয়। এর প্রভাব পড়েছে পরিবারেও। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালাতে গিয়ে অনেক পরিবার তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় খরচ করেছে। কেউ কেউ অর্থনৈতিক সংকটেও পড়েছেন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত