জাপানে ট্রেন লেট না করার ‘সায়েন্স’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ২১: ২২
ট্রেন কয়েক সেকেন্ড দেরি করলেও রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের কাছে ক্ষমা চায়। সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের রেলস্টেশনগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, যাত্রীরা ট্রেনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। ‘ট্রেন লেট’ অর্থাৎ ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে স্টেশনে পৌঁছায়। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এমন সমস্যা দেখা যায়। তবে জাপান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সেখানে ট্রেন কয়েক সেকেন্ড দেরি করলেও রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের কাছে ক্ষমা চায়।

জাপানের ট্রেন সাধারণত ঠিক সময়ে চলাচল করে। এর পেছনে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, সঠিক সময়সূচি এবং সময় মেনে চলার সংস্কৃতি। রেলকর্মীদের কঠোর প্রশিক্ষণও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাপানের বিখ্যাত বুলেট ট্রেন নেটওয়ার্ক তোকাইদো শিনকানসেন বিশ্বের অন্যতম সময়নিষ্ঠ রেলব্যবস্থা। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এই ট্রেন গড়ে মাত্র ২৪ সেকেন্ড দেরি করেছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রেন দেরিতে আসার সময় কিছুটা বেড়েছে। তবুও জাপানের রেল ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে বেশ সমাদৃত।

শিনকানসেন ট্রেন কতটা দেরিতে আসছে, তার হিসাব মিনিটে হয় না। হয় সেকেন্ডের কাঁটায়। রেল কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ পরিকল্পনা, জাপানি প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির দারুণ সমন্বয়ে এটি হয়ে থাকে। পাশাপাশি জাপানের রেলব্যবস্থার রয়েছে দেড় শতাব্দীরও বেশি ইতিহাস।

এ ছাড়া জাপানি সংস্কৃতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ‘অনিশ্চয়তা এড়িয়ে চলা’। বলা হয়, জাপানিরা ভবিষ্যৎকে সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা ঝুঁকি তারা এড়াতে চায়। এই মানসিকতা থেকেই তৈরি হয় সুষ্ঠু পরিকল্পনা।

এর শুরুটা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। তখন জাপান দ্রুত আধুনিক হয়ে উঠছিল। সেসময় জাপানিরা পশ্চিমা সময় গণনার পদ্ধতি গ্রহণ করে। এর আগে তারা পুরোনো পদ্ধতিতে সময় মাপত। তখন ধূপঘড়ি ব্যবহার করা হতো এবং দিন-রাতকে অসমান ভাগে ভাগ করা ছিল প্রচলিত নিয়ম। পরে যান্ত্রিক ঘড়ির ব্যবহার শুরু হলে সময় মাপার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে। এর ফলে জাপানি সমাজে সময়নিষ্ঠার অভ্যাস আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে রেলের নির্মাণ শুরু হয়। ১৮৭২ সালে জাপানে প্রথম রেলপথ চালু হয়। লাইনটি ছিল শিমবাশি থেকে ইয়োকোহামা পর্যন্ত। এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে। জাপানের রেল যোগাযোগ ইতিমধ্যে ১৫০ বছর পার করে ফেলেছে। ফলে নির্বিঘ্নে ট্রেন চালানোর দক্ষতা তাদের আছে। মূলত সময় ও দক্ষতা মিলেই জাপানের সফল রেল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

এ ছাড়া জাপানি রেলওয়ে প্রযুক্তি ব্যবহারে সবসময় এগিয়ে। তারা দক্ষতা বাড়াতে নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসে। ১৯৭২ সালে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তখন জাপানিজ ন্যাশনাল রেলওয়ে ‘প্রোগ্রামড রুট কন্ট্রোল’ নামের সিস্টেম চালু করে। এটি ট্রেনের সময়সূচির মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে কাজ করে। ট্রেন সময়মতো চলাচলের ক্ষেত্রে এই সিস্টেম বেশ সফল।

এর মধ্যে একটি সিস্টেম হলো ‘অ্যাটস’। পুরো নাম অটোনোমাস ডিসেন্ট্রালাইজড ট্রান্সপোর্ট অপারেশন কন্ট্রোল। আরেকটি প্রযুক্তির নাম হলো ‘কসমস’ বা কম্পিউটারাইজড সেফটি, মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন সিস্টেম। এটি মূলত শিনকানসেন ট্রেনের জন্য তৈরি। প্রতিদিন অসংখ্য ট্রেনের সঠিক চলাচল নিশ্চিত করতে এই সিস্টেম দুটো কাজ করে।

জাপানের নাগরিকরা নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সংগৃহীত ছবি
জাপানের নাগরিকরা নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সংগৃহীত ছবি

‘অ্যাটস’ ট্রেনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। ফলে ট্রেন যথাযথ সময় স্টেশনে এসে পৌঁছায়। অন্যদিকে ‘কসমস’ নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর নজর রাখে। শিনকানসেন ট্রেনের সময়নিষ্ঠার এত সুনাম মূলত এই দুই প্রযুক্তির অবদান। তবে এখানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি যেমন আছে, মানুষের নজরদারিও রয়েছে। প্রযুক্তি এবং দক্ষ কর্মী দুই-ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু রেল কর্তৃপক্ষই যে সময়ানুবর্তিতা দেখায়, তা কিন্তু নয়। যাত্রীরাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জাপানি সংস্কৃতিতে সময়ের মূল্য অনেক বেশি। সময়নিষ্ঠার ব্যাপারে তারা সবসময়ই বেশ সচেতন। রেল ব্যবস্থাও এর বাইরে নয়। ঐতিহাসিকভাবে জাপান একটি সম্মিলিত সমাজ। জাপানিরা সাধারণত বৃহত্তর স্বার্থে সবাই এক হয়ে কাজ করার চেষ্টা করে। এই মানসিকতা সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে যেকোনো কাজ সময়মতো করতে।

এ ছাড়া জাপানি সংস্কৃতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ‘অনিশ্চয়তা এড়িয়ে চলা’। বলা হয়, জাপানিরা ভবিষ্যৎকে সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা ঝুঁকি তারা এড়াতে চায়। এই মানসিকতা থেকেই তৈরি হয় সুষ্ঠু পরিকল্পনা। ফলে জাপানি যাতায়াত ব্যবস্থায় নির্ভুল সময়সূচি তৈরি হয়েছে। জাপানের নাগরিকরা নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সময়সূচী বজায় রাখতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যাতে যেকোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়ানো সহজ হয়।

আরেকটি বিষয় হলো জাপানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যেও পড়ে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয় জাপানিদের। এই কারণে শৃঙ্খলা তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তারা সবসময় নিখুঁতভাবে কাজ করতে চান। ভালো কাজ করাকে অগ্রাধিকার দেন বলে নিজেদের সামাজিক অ্যাজেন্ডা তারা রেলওয়েতে আনেন না। সাধারণত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলেও রেল ব্যবহার হয় না। এসব মিলেই জাপানের রেলব্যবস্থা আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে পরিচিত।

  • সায়েন্স এবিসি অবলম্বনে
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত