leadT1ad

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

বাঁধনের বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং দেখে ‘কৌতূহল’, সেখান থেকেই ১০০ বার রক্তদান মশিউরের

বাঁধনের বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং দেখে ‘কৌতূহল’, সেখান থেকেই ১০০ বার রক্তদান মশিউরের। স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা মনে আছে? চারপাশে নতুন জগৎ, নতুন সব মানুষ আর হাজারো স্বপ্নের হাতছানি। ঠিক তেমনি এক বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পা রেখেছিলেন পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী মশিউর রহমান। ক্যাম্পাসে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ল একদল তরুণের দিকে। ব্যানারের নিচে দাঁড়িয়ে তাঁরা রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করছেন, তাও আবার একদম বিনামূল্যে। তখন ব্লাড গ্রুপ নির্ণয়ের এমন উদ্যোগ সচরাচর দেখা যেত না। ব্যানারটিতে লেখা একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের নাম—‘বাঁধন’।

এই দৃশ্য দেখে মশিউরের মনে পড়ে গেল পুরোনো এক স্মৃতির কথা। কিছুদিন আগেই তিনি যখন ফার্মগেটে ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করছিলেন, তখন দেখেছিলেন একদল লোক ব্লাড গ্রুপিং করছে। তবে তাঁরা প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে ফি নিচ্ছিলেন। নিজের রক্তের গ্রুপ জানার খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সেদিন মানিব্যাগ সঙ্গে না থাকায় তিনি তা জানতে পারেননি।

স্বভাবতই ক্যাম্পাসে ‘বাঁধন’-এর কর্মীদের এই নিঃস্বার্থ কাজ দেখে মশিউর একটু থমকে গেলেন। ভাবলেন, ‘যে কাজের জন্য বাইরে ৫০ টাকা করে নিচ্ছে, এরা কেন তা বিনামূল্যে করে দিচ্ছে? এদের উদ্দেশ্য কী?’ ১০০ বার রক্তদানকারী মশিউর রহমানের সঙ্গে কথা হচ্ছিল এই স্মৃতি নিয়েই। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘বাঁধন’-এর সঙ্গে যুক্ত।

‘কৌতূহল’ থেকে মশিউর যুক্ত হন বাঁধনের সঙ্গে

বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ জানার কৌতূহল থেকেই মূলত ‘বাঁধন’-এর প্রতি মশিউরের আগ্রহের জন্ম। এই বিষয়টি তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। সেই কৌতূহল আর খটকা থেকেই মশিউর ‘বাঁধন’-এর একজন হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এক পর্যায়ে তিনি বাঁধন কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি হিসেবেও নেতৃত্ব দেন।

এই সংকট নিরসনে মশিউর রহমান একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা ভাবেন। তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত পাঠ্যপুস্তকে রক্তদানের সচেতনতা ও গুরুত্ব নিয়ে গল্প বা প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা। এতে শৈশব থেকেই শিশুরা এই মানবিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হবে এবং ভবিষ্যতে তারা স্বেচ্ছায় রক্তদানে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

মশিউরের প্রথম রক্তদানের অভিজ্ঞতা হয় ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। দিনটি লিপ ইয়ারের হওয়ায় তারিখটা তাঁর আজও মনে আছে। ক্লাসে বসে থাকার সময় হঠাৎ বাঁধনের এক সদস্য এসে খবর দিলেন, জন্ডিসে আক্রান্ত একজন রোগীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে রক্ত প্রয়োজন। মশিউর আগ্রহী হলেন। শিক্ষকও ক্লাসের উপস্থিতির নম্বর দেওয়ার কথা বলে তাঁকে উৎসাহিত করলেন। প্রথম বর্ষের ছাত্র মশিউর খুব খুশি মনেই প্রথমবারের মতো রক্ত দিতে বেরিয়ে পড়লেন।

কীভাবে ১০০ বার রক্ত দিতে পারলেন

রক্ত দেওয়ার নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে, যা আমরা অনেকেই জানি। সাধারণত একবার সম্পূর্ণ রক্ত বা ‘হোল ব্লাড’ দিলে পরবর্তী তিন থেকে চার মাস অপেক্ষা করতে হয়। তাই হিসাব করলে দেখা যায়, নিয়মিত রক্ত দিয়ে অল্প সময়ে ১০০ বার রক্ত দেওয়া বেশ কঠিন। কিন্তু মশিউর রহমান জানালেন ভিন্ন এক পদ্ধতির কথা।

শুরুতে মশিউর ‘হোল ব্লাড’ দিলেও পরবর্তীতে জানতে পারেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক পদ্ধতি ‘এফেরেসিস’ সম্পর্কে। এই পদ্ধতিতে মেশিনের সাহায্যে রক্ত থেকে কেবল প্রয়োজনীয় উপাদান, যেমন প্লাটিলেট বা প্লাজমা রেখে বাকি রক্ত আবার দাতার শরীরে ফেরত দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে রক্ত দিলে শরীর দ্রুত তা রিকভার করে নেয়। ফলে প্রতি ৭ থেকে ১৫ দিন পরেই একজন রক্তদাতা আবার রক্ত দিতে পারেন।

তবে মশিউর রহমান জানান, এফেরেসিস সবাই চাইলেই দিতে পারেন না। এ জন্য শরীরের রক্তের প্লাটিলেট কাউন্ট এবং শারীরিক ফিটনেসের কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। মশিউর সেই সব শর্তে উত্তীর্ণ হন। আর তখনই তাঁর মনে টার্গেট তৈরি হয় জীবনে ১০০ বারের বেশি রক্ত দেবেন। এটিকে তিনি বলেন, ‘ভালো কাজের প্রতিযোগিতা।’

রক্তদানের এই মানবিক যাত্রায় র কোনো ব্যক্তিগত নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নেই। রক্ত দিতে গিয়ে তাঁর কখনো মাথা ঘোরানো, পড়ে যাওয়া বা জ্বরের মতো সমস্যাও হয়নি। তিনি বলেন, ‘রক্ত দেওয়া নিয়ে আমাদের ভেতরে যে ভয় কাজ করে, তা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু রক্ত দিলে কোনো উপকার ছাড়া অপকার হয় না। অপকার বলতে একটু সময় নষ্ট হতে পারে আর সামান্য সুঁইয়ের খোঁচা। এ ছাড়া আর কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।’

রক্তদান নিয়ে যেসব ট্যাবু আছে

আমাদের সমাজে রক্তদান নিয়ে সচেতনতা আগের চেয়ে বাড়লেও, এখনো কিছু কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা বা ট্যাবু রয়ে গেছে। মশিউর রহমান ‘বাঁধন’-এর কর্মী হিসেবে মাঠে কাজ করতে গিয়ে এমন অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। একবার তিনি একজন ডোনারকে রক্ত দেওয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু রোগীর আত্মীয়-স্বজন যখন জানতে পারলেন, রক্তদাতার ধর্ম ভিন্ন, তখন তাঁরা রক্ত নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান।

১০০ বার রক্তদান করেছেন মশিউর রহমান।
১০০ বার রক্তদান করেছেন মশিউর রহমান।

এমন আরেকটি ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় মশিউরকে। এক প্রসূতি মায়ের জন্য রক্তদাতার প্রয়োজন ছিল। রক্তদাতাকে নিয়ে যাওয়ার পর রোগীর আত্মীয়রা অদ্ভুত এক যুক্তিতে বেঁকে বসেন। তাঁদের ধারণা ছিল, ‘ডোনারের গায়ের রঙ ফর্সা না হলে বাচ্চা ফর্সা হবে না!’ এমন অবাস্তব ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তি শুনে অবাক হতে হয়। অবশ্য পরে দীর্ঘ সময় বুঝিয়ে তাঁদের রক্ত দিতে রাজি করানো সম্ভব হয়েছিল।

এ ছাড়া রক্ত দেওয়া নিয়ে অনেকের ধারণা, রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যায় বা রক্ত কমে যায়। মশিউর রহমান এই ভয়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, সাধারণত একজন সুস্থ মানুষের শরীরে যে পরিমাণ রক্ত থাকে, তা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি।

মশিউর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা যখন রক্ত দেই, তখন মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ এমএল রক্ত নেওয়া হয়। আমরা যদি রক্ত না-ও দেই, চার-মাস পর পর আমাদের শরীরের রক্তকণিকাগুলো এমনিতেই প্রাকৃতিক নিয়মে ভেঙে যায় এবং নতুন সেল তৈরি হয়। তাই রক্ত দিলে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং একজন মানুষের জীবন বাঁচে।’

বাংলাদেশের ব্লাড ট্রান্সফিউশন সিস্টেম নিয়ে মশিউরের ক্ষোভ

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর রক্ত সঞ্চালন বা ব্লাড ট্রান্সফিউশন ব্যবস্থার মান নিয়ে মশিউর রহমান বেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বড় বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে রক্ত সঞ্চালনের পরিবেশ ও সেবার মান অত্যন্ত নাজুক। মশিউরের মতে, হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা রক্তদাতাদের রক্ত দিতে একপ্রকার ‘নিরুৎসাহিত’ করে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অনেক সময় রক্তদাতারা একবার অভিজ্ঞতা হওয়ার পর আর দ্বিতীয়বার রক্ত দিতে আগ্রহী হন না।

সরকারি হাসপাতালের উল্টো চিত্র দেখা যায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। মশিউর রহমানের মতে, রক্ত সঞ্চালনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণত ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয়। অথচ বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে।

কৌতূহল আর খটকা থেকেই মশিউর ‘বাঁধন’-এর একজন হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এক পর্যায়ে তিনি বাঁধন কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি হিসেবেও নেতৃত্ব দেন।

র আক্ষেপ, ‘বাংলাদেশের ডোনাররা অতিরিক্ত মাত্রায় মোটিভেটেড বা উৎসাহিত না হলে এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে রক্তদান চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব।‘র আক্ষেপ, ‘বাংলাদেশের ডোনাররা অতিরিক্ত মাত্রায় মোটিভেটেড বা উৎসাহিত না হলে এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে রক্তদান চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব।‘

এই সংকট নিরসনে মশিউর রহমান একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা ভাবেন। তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত পাঠ্যপুস্তকে রক্তদানের সচেতনতা ও গুরুত্ব নিয়ে গল্প বা প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা। এতে শৈশব থেকেই শিশুরা এই মানবিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হবে এবং ভবিষ্যতে তারা স্বেচ্ছায় রক্তদানে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ব্লাড ব্যাগ কিনে রক্ত দিয়ে এসেছেন

রক্ত দিতে গিয়ে মশিউর মানুষের উদাসীনতা যেমন দেখেছেন, তেমনি পেয়েছেন বহু মানুষের ভালোবাসা। কোনো সংকটাপন্ন মানুষকে রক্ত দেওয়ার পর রোগীর স্বজনদের মুখে যে ‘স্বস্তির হাসি’ ফুটে ওঠে, তা-ই রক্তদানের সাময়িক ক্লান্তি দূর করার জন্য যথেষ্ট। মশিউর বলেন, রক্তদাতারা কোনো বিনিময় বা প্রশংসার লোভে রক্ত দেন না। কিন্তু মশিউর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, অনেক রোগীর লোক এমন আচরণ করেন যেন রক্ত পাওয়াটা তাঁদের আইনি অধিকার!

তবে সব মানুষ এক রকম নয়। একবার এক ব্যক্তির স্ত্রীর প্রসবের জন্য মশিউর রক্ত দিয়েছিলেন। এর ঠিক এক বছর পর, সেই ব্যক্তি ফোন করে বলেন, ‘ভাই, আপনি না এলে আমি আমার মেয়ের জন্মদিনের কেক কাটব না।’

আবার এমনও রাত গেছে, যখন রোগীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক, কিন্তু রোগীর আত্মীয়দের ওষুধ বা রক্তের ব্যাগ কেনার মতো টাকা ছিল না। তখন নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ব্লাড ব্যাগ কিনে রক্ত দিয়ে এসেছেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত