পলাশী দিবস

২৬৯ বছর পরেও মানুষ কেন পলাশীর যুদ্ধ মনে রেখেছে

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যেগুলো শুধু একটি যুদ্ধ বা একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর ফলে একটি জাতির ভাগ্য বদলে গেছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ ঠিক তেমনই একটি ঘটনা।

এটি ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার একটি সংঘর্ষ। কিন্তু এর প্রভাব পড়েছিল প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর। তাই ২৬৯ বছর পেরিয়ে গেলেও পলাশীর যুদ্ধের ইতিহাস, রাজনীতি আজও জনমনে সমানভাবে আলোচিত।

কী ঘটেছিল সেদিন

পলাশীর যুদ্ধ হয়েছিল বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে। কাগজে-কলমে এটি ছিল একটি সামরিক সংঘর্ষ। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ক্ষমতা, বাণিজ্যিক স্বার্থ, ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতার জটিল সমীকরণ। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যবহর রবার্ট ক্লাইভের (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) সৈন্যবহরের চেয়ে সংখ্যায় ছিল কয়েক গুণ বেশি। খালি চোখে দেখলে নবাবের জেতার সম্ভবনাই যুতসই ছিল।

কিন্তু ইতিহাসবিদেরা বলছেন, সেদিন নবাবের সেনাপতি মীরজাফর, জগৎ শেঠ, রায়দুর্লভ ও ঘষেটি বেগমের মতো বিশ্বস্ত প্রভাবশালীরা গোপনে ক্লাইভের সঙ্গে চক্রান্তে লিপ্ত ছিলেন। যুদ্ধের দিন মীরজাফরের বিশাল বাহিনী কার্যত নিষ্ক্রিয় থেকে যায়, আর সিরাজ একা লড়াই করে পরাজিত হন। এই ঘটনা বাংলার সম্মিলিত মনে এক স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছিল। একটা জাতি বহিঃশত্রুর হাতে নয়, বরং নিজের ঘরের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায় পরাজিত হয়েছিল। ‘মীরজাফর’ নামটি তাই আজও বাংলা ভাষায় বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বাংলার স্বাধীনতার অবসানের প্রতীক

সিরাজউদ্দৌলাকে ‘বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব’ বলা হয়। যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে তাঁর শাসনক্ষমতা ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভিন্নমত আছে। পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর বাংলার রাজনৈতিক স্বাধীনতা দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে বাংলার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, পরে প্রশাসনিক ক্ষমতাও নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। এর ধারাবাহিকতায় পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ ধীরে ধীরে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়। এই কারণেই অনেক ইতিহাসবিদ পলাশীকে কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হিসেবে দেখেন।

মীর জাফর। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া
মীর জাফর। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

তখন বিশ্বের মধ্যে বাংলা ছিল অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। মসলিন বস্ত্র, কৃষি উৎপাদন ও বাণিজ্যে সুনাম ছিল বিশ্বজুড়ে। ইতিহাসবিদদের মতে, পলাশীর পরাজয়ের পর থেকে এই সম্পদ নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্রিটেনে পাচার হতে থাকে, যাকে অনেকে ‘সম্পদ নিষ্কাশন’ তত্ত্ব বলে ব্যাখ্যা করেন। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। অনেক ইতিহাসবিদ এই দুর্ভিক্ষের পেছনে কোম্পানির শোষণমূলক রাজস্বনীতিকে দায়ী করেন।

অর্থনীতির মোড় ঘুরে যায়

পলাশীর যুদ্ধের আগে বাংলা ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। মসলিন, রেশম, নীল, চিনি ও বিভিন্ন হস্তশিল্পের জন্য বাংলার সুনাম ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। পলাশী যুদ্ধের পর কোম্পানি রাজস্ব আদায় ও বাণিজ্যের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ধীরে ধীরে সম্পদ বাংলা থেকে ব্রিটেনে প্রবাহিত হতে থাকে। বহু দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষকদের ওপর বাড়তে থাকে করের চাপ। অনেক অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ মনে করেন, পলাশীর পর থেকেই বাংলার অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা ঘটে।

যে যুদ্ধ ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছে

বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যেগুলোর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছেছে। পলাশীর যুদ্ধও তেমন একটি ঘটনা। যদি এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা জয়ী হতেন, তাহলে ব্রিটিশদের ভারত জয়ের ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। যদিও বিকল্প ইতিহাস যা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন, তবুও ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন, পলাশীর ফলাফল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

জাতীয় চেতনার অংশ হয়ে ওঠা

ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে যখন উপমহাদেশে স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হয়, তখন পলাশীর যুদ্ধ এক প্রতীকী তাৎপর্য পায়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ দুই অঞ্চলেই সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও গণআলোচনায় পলাশীর যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে স্বাধীনতা, দেশপ্রেম, নেতৃত্ব, ঐক্য এবং বিশ্বাসঘাতকতার আলোচনায় এই যুদ্ধ বারবার উদাহরণ হয়ে ফিরে আসে। নবীনচন্দ্র সেনের কাব্য থেকে শুরু করে অসংখ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস ও নাট্যরচনায় এই ঘটনা ফিরে এসেছে, প্রতিবারই নতুন প্রজন্মের কাছে এই স্মৃতি পুনর্জাগরিত হয়েছে। শুধু ইতিহাসের শিক্ষার্থী নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও এটি একটি পরিচিত অধ্যায়।

রাজনৈতিক শিক্ষার অংশ পলাশীর যুদ্ধ

পলাশীর যুদ্ধ আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা দেয়। অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং ক্ষমতার লড়াই কখনো কখনো বাইরের শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করে। এ কারণেই বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা, প্রবন্ধ কিংবা টকশো বিশ্লেষণে ‘আরেকটি পলাশী যেন না হয়’ এমন মন্তব্য শোনা যায়। অর্থাৎ পলাশী এখন শুধু অতীতের ঘটনা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তাও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অনুসারীদের জন্য।

ইতিহাসের বিতর্ক এখনো চলমান

পলাশীর যুদ্ধ নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই বিষয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, পলাশীকে অতিরিক্ত নাটকীয় ও একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সিরাজউদ্দৌলার শাসন বহু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত ছিল এবং মীরজাফরদের চক্রান্ত সেই বিদ্যমান দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে মাত্র। পাশাপাশি কেউ কেউ সিরাজউদ্দৌলাকে অদূরদর্শী শাসক হিসেবে মনে করেন। আবার কেউ কেউ তাঁকে বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকও মনে করেন। এই চলমান বিতর্ক পলাশীর যুদ্ধকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে।

কেন মানুষ এখনো মনে রাখে

পলাশীর যুদ্ধ মানুষের কাছে শুধু একটি পরাজয়ের স্মৃতি নয়। এই যুদ্ধকে মনে রাখা হয় কারণ এটি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় এনেছিল। এখান থেকেই উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। বিশ্বাসঘাতকতা ও অভ্যন্তরীণ বিভেদের প্রতীক হিসেবে এটি এখনো প্রাসঙ্গিক। বাংলার অর্থনীতি ও সমাজ, সংস্কৃতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছিল। জাতীয় পরিচয়, স্বাধীনতা ও ইতিহাসচর্চার সঙ্গে এই ঘটনা গভীরভাবে যুক্ত।

পলাশী কেবল একটি যুদ্ধক্ষেত্রের নাম নয়। এটি বাংলার ইতিহাসে এমন এক প্রতীক, যেখানে স্বাধীনতার অবসান, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং বিদেশি শাসনের সূচনা একই সুতোয় গাঁথা। ইতিহাসের অনেক ঘটনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু যে ঘটনা একটি জাতির আত্মপরিচয়কে বদলে দেয়, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। পলাশীর আমবাগান তাই ইতিহাসের একটি স্থান নয়, বাঙালির সম্মিলিত স্মৃতির এক স্থায়ী প্রতীক।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত