সাতক্ষীরা

মাছের ঘেরের আইলে সবজিতে সম্ভাবনা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সাতক্ষীরা

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১৪: ১৫
নিচে মাছের ঘের, পাড়জুড়ে বেড়ে উঠেছে সবজির চারা। সাতক্ষীরায় এখন এমন দৃশ্যের দেখে মিলছে নিয়মিতই। ছবি: স্ট্রিম

সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়ক ধরে তালা উপজেলার দিকে এগোতেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। সড়কের দুই পাশে যতদূর চোখ যায়, মাছের ঘের। আর সেই ঘেরের পাড়জুড়ে সবুজের মেলা। কোথাও মাচায় ঝুলছে লাউ-কুমড়া, কোথাও করলা ও বরবটি। আইলের ফাঁকে ফাঁকে শোভা পাচ্ছে ঢেঁড়শ, পুঁইশাক ও কলাগাছ।

একসময় যে ঘেরের আইল ছিল মূলত জমির সীমানা, এখন সেটিই হয়ে উঠেছে অনেক কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস। মাছের সঙ্গে একই ঘেরে সবজি চাষ করে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করছেন তাঁরা। স্থানীয়ভাবে ‘সাথি ফসল’ হিসেবে শুরু হওয়া এই চাষাবাদ এখন সাতক্ষীরার অনেক এলাকায় নিয়মিত কৃষিকাজে পরিণত হয়েছে।

Sathkhira-3

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় ৮৭৫ হেক্টর ঘেরের আইলে সবজি চাষ করা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৯ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হিসাবে এ মৌসুমে প্রায় ১৬ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।

ঘেরের আইলে চাষ হচ্ছে লাউ, কুমড়া, করলা, বরবটি, শসা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঢেঁড়শ ও পুঁইশাকসহ নানা ধরনের সবজি। কোথাও ঘেরের চারপাশে বাঁশ ও জালের সাহায্যে তৈরি হয়েছে ঝুলন্ত মাচা। পানির ওপর দিয়ে সেই মাচায় লতিয়ে উঠেছে সবজির গাছ। নিচে মাছ, ওপরে সবজি— একই জায়গায় হচ্ছে দুই ধরনের উৎপাদন।

ঘেরের পাড়ে বাড়তি আয়

তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামের ঘের মালিক ইসরাইল হোসেনের ঘেরের আয়তন ১৬ একর। আগে যেখানে মাছ চাষই ছিল তাঁর মূল পেশা, সেখানে এখন ঘেরের তিন পাশজুড়ে সবজিরও চাষ করছেন তিনি।

ইসরাইল জানান, সবজি চাষে তাঁর খরচ হয়েছে আনুমানিক ৭০ হাজার টাকা। আবহাওয়া ও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার সবজি বিক্রির আশা করছেন তিনি।

তাঁর ঘের থেকে কিছুটা দূরেই একই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছেন ঘের ব্যবসায়ী মোহর আলী। এক একর ঘেরের চারপাশে ডাবল পদ্ধতিতে মাচা তৈরি করেছেন তিনি।

Sathkhira-4

মোহর আলীর হিসাবে, মাছের পাশাপাশি এই সবজি চাষ তাঁকে বাড়তি মুনাফার সুযোগ দিচ্ছে। এ মৌসুমে সবজি বিক্রি করে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকার বেশি লাভের আশা করছেন তিনি।

শুধু বড় ঘেরের মালিকেরাই নন, ছোট কৃষকেরাও এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। কারণ, ঘেরের আইলের জন্য আলাদা জমি দরকার হচ্ছে না। মাছের জন্য ব্যবহৃত জমির পাশের অব্যবহৃত অংশটুকুই হয়ে উঠছে সবজির নতুন উৎপাদনক্ষেত্র।

ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক

তবে সবজি উৎপাদন বাড়লেও স্বস্তিতে নেই কৃষক। মাঠে যে দামে সবজি বিক্রি করছেন, বাজারে সেই সবজির দাম প্রায় দ্বিগুণ—এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে তাঁদের।

তালা উপজেলার মিঠাবাড়ী এলাকার কৃষক সুমন বলেন, ‘যে সবজি আমরা খেত থেকে ৩০-৩৫ টাকা কেজিতে পাইকারদের কাছে বিক্রি করি, সেটাই খুচরা বাজারে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়। আমরা মাঠে পরিশ্রম করে সবজি উৎপাদন করি। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি, আমাদের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে খুচরা দামের বিশাল পার্থক্য।’

কৃষকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে সরাসরি পাইকার বা বড় বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কম। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছেই তুলনামূলক কম দামে সবজি বিক্রি করতে হয় তাঁদের। এতে উৎপাদনের খরচ ও শ্রমের তুলনায় ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না তারা।

সাত উপজেলায় হচ্ছে চাষ

সাতক্ষীরার প্রায় সব উপজেলাতেই ঘেরের আইলে সবজি চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৪০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে সদর উপজেলায়। তালায় ১৬৫ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১৩৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ৮০ হেক্টর, শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৫৫ হেক্টর এবং দেবহাটায় ২০ হেক্টর ঘেরের আইলে সবজি চাষ হয়েছে।

Sathkhira-2

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্ষাকালীন সবজির পাশাপাশি অনেকে আগাম শীতকালীন সবজির প্রস্তুতিও শুরু করেছেন। মাচায় লতানো সবজির পাশাপাশি আইলে তৈরি হচ্ছে নতুন বেড। কৃষকেরা বলছেন, মৌসুমভেদে সবজির ধরন বদলালেও ঘেরের আইল এখন সারা বছরই কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।

এই পদ্ধতিকে উৎসাহ দিচ্ছে কৃষি বিভাগও। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, জেলার অধিকাংশ ঘেরের পাড়েই এখন সবজি চাষ হচ্ছে। আগাম মৌসুমে উৎপাদিত লাউ, শিম, শসা ও বরবটি বাজারে আসতে শুরু করেছে। কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন। উৎপাদন বাড়াতে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

মাছের জেলা, সম্ভাবনা আছে সবজিতেও

সাতক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে চিংড়ি চাষের জন্য পরিচিত। তবে ঘেরের আইলে সবজি চাষ সেই পরিচিতির সঙ্গে যোগ করছে নতুন মাত্রা। একই জমিতে মাছ ও সবজি উৎপাদনের ফলে বাড়ছে জমির ব্যবহার, তৈরি হচ্ছে বাড়তি আয়ের সুযোগ।

জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, গত কয়েক বছরে ঘেরের আইলে সবজি চাষে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। পদ্মা সেতুর কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সবজি পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে কৃষকেরা ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমেছে।

তিনি জানান, জেলার মোট সবজি উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে মাছের ঘেরের আইল থেকে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে। বাজারে কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পানিতে মাছ, পাড়ে সবজি একই জমিকে দুইভাবে কাজে লাগানোর এই পদ্ধতি বদলে দিচ্ছে সাতক্ষীরার অনেক কৃষকের হিসাব। তবে, উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ঘেরের আইলের এই সবুজ সম্ভাবনা আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত