তাহসিনা এনাম তৃষা

বাংলা ভাষায় এমন নাম খুব কমই আছে যেগুলো নিজেই একেকটি বিশেষণে পরিণত হয়েছে। আমরা যখন কাউকে ব্যতিক্রমী মেধাবী বলতে চাই, তখন তাকে ‘আইনস্টাইন’ বলি। কেউ যখন প্রেমে মগ্ন থাকে, তাকে ‘রোমিও’ বলি। কিন্তু মীর জাফরের চেয়ে বড় উদাহরণ আর কেউ হতে পারে না, যার নাম ভারতীয় উপমহাদেশে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মীর জাফর আজও মানুষের মনে প্রবলভাবে বেঁচে আছেন। তবে কোনো শাসক, সামরিক সেনাপতি বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নয়, তিনি বেঁচে আছেন বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবে। তাঁর গল্পটি ইতিহাসের দেওয়া এই সাধারণ তকমাটির চেয়েও অনেক বেশি জটিল। মীর জাফর কীভাবে বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠলেন, তা বুঝতে হলে আঠারো শতকের মুর্শিদাবাদের উত্তাল রাজনীতিতে ফিরে যেতে হবে।
১৭৫৬ সালে নবাব আলিবর্দী খাঁ মারা যাওয়ার পর বাংলার সিংহাসনে বসেন তাঁর নাতি সিরাজউদ্দৌলা। তরুণ এবং স্বীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সিরাজ উত্তরাধিকার সূত্রে কেবল বিশ্বের অন্যতম ধনী একটি প্রদেশই পাননি, তিনি তাঁর দরবারে একগুচ্ছ উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী-পুরুষও পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আলিবর্দী খাঁর বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম। তিনি ছিলেন অগাধ সম্পদের মালিক, দরবারে ছিল তাঁর প্রভূত প্রভাব। ফলে সিরাজের সিংহাসন আরোহণ তিনি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। তিনি অচিরেই নবারের বিরোধিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
ঘসেটি বেগম একা ছিলেন না। সিরাজের প্রতি অসন্তোষ বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাত শ্রেণির বড় একটি অংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। জগৎ শেঠের মতো শক্তিশালী ব্যাংকার পরিবার, প্রভাবশালী দরবারী, সামরিক সেনাপতি এবং ধনী বণিকদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ক্ষোভ ছিল। কেউ রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর ভয়ে ছিলেন, কেউ আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায়, আবার অনেকেই তরুণ নবাবের খামখেয়ালি মেজাজকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন মীর জাফর আলী খান। তিনি কোনো বহিরাগত ছিলেন না। তিনি ছিলেন নবাবেব সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ সামরিক সেনাপতি এবং বৈবাহিক সূত্রে আলিবর্দী খাঁর আত্মীয়। বাংলার প্রশাসনে তিনি অন্যতম উচ্চপদে আসীন ছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, মর্যাদা ও প্রভাব—সবই ছিল। সম্ভবত এটিই ছিল মূল সমস্যা।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতার মূলে থাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সিরাজ যখন ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করছিলেন, তাঁর চারপাশে অসন্তুষ্ট অভিজাতদের একটি জোট গড়ে ওঠে। তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার: সিরাজকে সরাতে হবে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্রুত এই সুযোগটি লুফে নেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় এসেছিল বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। কিন্তু আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ শিখেছিল: সামরিক শক্তির চেয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজ্য জয় করা অনেক সহজ।
সেই পাঠেরই চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছিল পলাশীতে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ শুরু হয়। যদিও এটি একটি সামরিক যুদ্ধ হিসেবে স্মরণীয়, তবে এটি একইভাবে ছিল আনুগত্য ও বিশ্বাসঘাতকতার লড়াই। মীর মদন এবং মোহনলালের মতো সেনাপতিরা যখন নবাবের পক্ষে বীরত্বের সঙ্গে লড়ছিলেন, মীর জাফরের অধীনে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ তখন ছিল নিষ্ক্রিয়। মাঝে মাঝে ইতিহাস বদলে যায় কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমে, আবার কখনো বদলে যায় ‘পদক্ষেপ না নেওয়ার’ বা নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে।

পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ধরা পড়েন এবং অল্প সময় পরেই তাঁকে হত্যা করা হয়। এদিকে মীর জাফর হন বাংলার নবাব। অনেকের কাছে এটি একটি সফল ষড়যন্ত্রের গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু ট্র্যাজেডিটি আসলে এখানেই শুরু।
সিংহাসনে বসার পর মীর জাফর দ্রুতই বুঝতে পারেন, ক্ষমতার পুরস্কার এবং প্রকৃত ক্ষমতা এক জিনিস নয়। যে চুক্তির বিনিময়ে তিনি সিংহাসন পেয়েছিলেন, তার মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিপুল পরিমাণ অর্থ, উপহার, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং রাজনৈতিক ছাড় দাবি করতে থাকে। বাংলার কোষাগার থেকে সম্পদ কোম্পানির হাতে চলে যেতে থাকে। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা প্রশাসনে হস্তক্ষেপ শুরু করেন। মীর জাফরের কাছে ছিল সিংহাসন, কিন্তু কোম্পানির কাছে ছিল কর্তৃত্ব। এক অর্থে তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম ‘পুতুল নবাব’।
তবে গল্পের একটি উপেক্ষিত দিক হলো, মীর জাফর নিজেও এক সময় এই ব্যবস্থার কারণে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। যে ব্রিটিশ প্রভাবে তিনি ক্ষমতায় বসেছিলেন, সেই প্রভাবই তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছিল। জানা যায়, তিনি বিকল্প জোটের সন্ধান করেছিলেন এবং কোম্পানির আধিপত্য কমানোর পথ খুঁজছিলেন। শাসক ও পৃষ্ঠপোষকের সম্পর্ক ক্রমে তিক্ত হতে থাকে। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। কোম্পানির কাছে মীর জাফর কোনো লক্ষ্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম মাত্র।
যখন তিনি আর ব্রিটিশদের চাহিদা মেটাতে পারছিলেন না, তখন তিনি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন। ১৭৬০ সালে ব্রিটিশদের চাপে তিনি ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর জামাতা মীর কাসিমকে গভর্নর হেনরি ভ্যানসিটার্টের সমর্থনে নবাব করা হয়।
তবে ইতিহাসে আরও একটি মোড় বাকি ছিল। মীর কাসিম মীর জাফরের মতো ছিলেন না। তিনি প্রকৃত কর্তৃত্ব প্রয়োগে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি প্রশাসনে ব্রিটিশ হস্তক্ষেপ মানতে অস্বীকার করেন। তিনি অযোধ্যার নবাব এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে একটি সামরিক জোট গঠন করেন। ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর উভয় পক্ষ বক্সারের যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়।
ব্রিটিশরা পুনরায় মীর জাফরকে সিংহাসনে বসায়। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: নবাব কে হলেন তার চেয়ে বড় কথা হলো তিনি কতটা ‘দরকারী। তাই তিনি সেই ক্ষমতা আর ফিরে পাননি যা তিনি একবার ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
১৭৬৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মীর জাফর মারা যান। মুর্শিদাবাদের জাফরাগঞ্জ কবরস্থানে তাঁর সমাধি রয়েছে। তাঁর সেই বাসভবনটি আজও মানুষের কাছে ‘নিমক হারাম দেউড়ি’ বা ‘বিশ্বাসঘাতকের তোরণ’ নামে পরিচিত। ইতিহাসের খুব কম ব্যক্তিত্বই পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে এত কঠোর রায় পেয়েছেন। মীর জাফর ছিলেন একজন সৈনিক, একজন দরবারী এবং একজন নবাব। তিনি বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ প্রভাবের সহযোগী এবং সমালোচক—উভয়ই ছিলেন। তবুও ইতিহাস তাঁর সব পরিচয় মুছে দিয়েছে। ২৫০ বছরেরও বেশি সময় পর মীর জাফরের ওপর ইতিহাসের রায় অপরিবর্তিত রয়েছে: তিনি একজন ‘বিশ্বাসঘাতক’।

বাংলা ভাষায় এমন নাম খুব কমই আছে যেগুলো নিজেই একেকটি বিশেষণে পরিণত হয়েছে। আমরা যখন কাউকে ব্যতিক্রমী মেধাবী বলতে চাই, তখন তাকে ‘আইনস্টাইন’ বলি। কেউ যখন প্রেমে মগ্ন থাকে, তাকে ‘রোমিও’ বলি। কিন্তু মীর জাফরের চেয়ে বড় উদাহরণ আর কেউ হতে পারে না, যার নাম ভারতীয় উপমহাদেশে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মীর জাফর আজও মানুষের মনে প্রবলভাবে বেঁচে আছেন। তবে কোনো শাসক, সামরিক সেনাপতি বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নয়, তিনি বেঁচে আছেন বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবে। তাঁর গল্পটি ইতিহাসের দেওয়া এই সাধারণ তকমাটির চেয়েও অনেক বেশি জটিল। মীর জাফর কীভাবে বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠলেন, তা বুঝতে হলে আঠারো শতকের মুর্শিদাবাদের উত্তাল রাজনীতিতে ফিরে যেতে হবে।
১৭৫৬ সালে নবাব আলিবর্দী খাঁ মারা যাওয়ার পর বাংলার সিংহাসনে বসেন তাঁর নাতি সিরাজউদ্দৌলা। তরুণ এবং স্বীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সিরাজ উত্তরাধিকার সূত্রে কেবল বিশ্বের অন্যতম ধনী একটি প্রদেশই পাননি, তিনি তাঁর দরবারে একগুচ্ছ উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী-পুরুষও পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আলিবর্দী খাঁর বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম। তিনি ছিলেন অগাধ সম্পদের মালিক, দরবারে ছিল তাঁর প্রভূত প্রভাব। ফলে সিরাজের সিংহাসন আরোহণ তিনি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। তিনি অচিরেই নবারের বিরোধিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
ঘসেটি বেগম একা ছিলেন না। সিরাজের প্রতি অসন্তোষ বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাত শ্রেণির বড় একটি অংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। জগৎ শেঠের মতো শক্তিশালী ব্যাংকার পরিবার, প্রভাবশালী দরবারী, সামরিক সেনাপতি এবং ধনী বণিকদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ক্ষোভ ছিল। কেউ রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর ভয়ে ছিলেন, কেউ আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায়, আবার অনেকেই তরুণ নবাবের খামখেয়ালি মেজাজকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন মীর জাফর আলী খান। তিনি কোনো বহিরাগত ছিলেন না। তিনি ছিলেন নবাবেব সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ সামরিক সেনাপতি এবং বৈবাহিক সূত্রে আলিবর্দী খাঁর আত্মীয়। বাংলার প্রশাসনে তিনি অন্যতম উচ্চপদে আসীন ছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, মর্যাদা ও প্রভাব—সবই ছিল। সম্ভবত এটিই ছিল মূল সমস্যা।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতার মূলে থাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সিরাজ যখন ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করছিলেন, তাঁর চারপাশে অসন্তুষ্ট অভিজাতদের একটি জোট গড়ে ওঠে। তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার: সিরাজকে সরাতে হবে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্রুত এই সুযোগটি লুফে নেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় এসেছিল বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। কিন্তু আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ শিখেছিল: সামরিক শক্তির চেয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজ্য জয় করা অনেক সহজ।
সেই পাঠেরই চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছিল পলাশীতে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ শুরু হয়। যদিও এটি একটি সামরিক যুদ্ধ হিসেবে স্মরণীয়, তবে এটি একইভাবে ছিল আনুগত্য ও বিশ্বাসঘাতকতার লড়াই। মীর মদন এবং মোহনলালের মতো সেনাপতিরা যখন নবাবের পক্ষে বীরত্বের সঙ্গে লড়ছিলেন, মীর জাফরের অধীনে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ তখন ছিল নিষ্ক্রিয়। মাঝে মাঝে ইতিহাস বদলে যায় কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমে, আবার কখনো বদলে যায় ‘পদক্ষেপ না নেওয়ার’ বা নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে।

পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ধরা পড়েন এবং অল্প সময় পরেই তাঁকে হত্যা করা হয়। এদিকে মীর জাফর হন বাংলার নবাব। অনেকের কাছে এটি একটি সফল ষড়যন্ত্রের গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু ট্র্যাজেডিটি আসলে এখানেই শুরু।
সিংহাসনে বসার পর মীর জাফর দ্রুতই বুঝতে পারেন, ক্ষমতার পুরস্কার এবং প্রকৃত ক্ষমতা এক জিনিস নয়। যে চুক্তির বিনিময়ে তিনি সিংহাসন পেয়েছিলেন, তার মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিপুল পরিমাণ অর্থ, উপহার, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং রাজনৈতিক ছাড় দাবি করতে থাকে। বাংলার কোষাগার থেকে সম্পদ কোম্পানির হাতে চলে যেতে থাকে। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা প্রশাসনে হস্তক্ষেপ শুরু করেন। মীর জাফরের কাছে ছিল সিংহাসন, কিন্তু কোম্পানির কাছে ছিল কর্তৃত্ব। এক অর্থে তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম ‘পুতুল নবাব’।
তবে গল্পের একটি উপেক্ষিত দিক হলো, মীর জাফর নিজেও এক সময় এই ব্যবস্থার কারণে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। যে ব্রিটিশ প্রভাবে তিনি ক্ষমতায় বসেছিলেন, সেই প্রভাবই তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছিল। জানা যায়, তিনি বিকল্প জোটের সন্ধান করেছিলেন এবং কোম্পানির আধিপত্য কমানোর পথ খুঁজছিলেন। শাসক ও পৃষ্ঠপোষকের সম্পর্ক ক্রমে তিক্ত হতে থাকে। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। কোম্পানির কাছে মীর জাফর কোনো লক্ষ্য ছিলেন না, তিনি ছিলেন লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম মাত্র।
যখন তিনি আর ব্রিটিশদের চাহিদা মেটাতে পারছিলেন না, তখন তিনি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন। ১৭৬০ সালে ব্রিটিশদের চাপে তিনি ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর জামাতা মীর কাসিমকে গভর্নর হেনরি ভ্যানসিটার্টের সমর্থনে নবাব করা হয়।
তবে ইতিহাসে আরও একটি মোড় বাকি ছিল। মীর কাসিম মীর জাফরের মতো ছিলেন না। তিনি প্রকৃত কর্তৃত্ব প্রয়োগে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি প্রশাসনে ব্রিটিশ হস্তক্ষেপ মানতে অস্বীকার করেন। তিনি অযোধ্যার নবাব এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সঙ্গে একটি সামরিক জোট গঠন করেন। ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর উভয় পক্ষ বক্সারের যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়।
ব্রিটিশরা পুনরায় মীর জাফরকে সিংহাসনে বসায়। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: নবাব কে হলেন তার চেয়ে বড় কথা হলো তিনি কতটা ‘দরকারী। তাই তিনি সেই ক্ষমতা আর ফিরে পাননি যা তিনি একবার ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
১৭৬৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মীর জাফর মারা যান। মুর্শিদাবাদের জাফরাগঞ্জ কবরস্থানে তাঁর সমাধি রয়েছে। তাঁর সেই বাসভবনটি আজও মানুষের কাছে ‘নিমক হারাম দেউড়ি’ বা ‘বিশ্বাসঘাতকের তোরণ’ নামে পরিচিত। ইতিহাসের খুব কম ব্যক্তিত্বই পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে এত কঠোর রায় পেয়েছেন। মীর জাফর ছিলেন একজন সৈনিক, একজন দরবারী এবং একজন নবাব। তিনি বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ প্রভাবের সহযোগী এবং সমালোচক—উভয়ই ছিলেন। তবুও ইতিহাস তাঁর সব পরিচয় মুছে দিয়েছে। ২৫০ বছরেরও বেশি সময় পর মীর জাফরের ওপর ইতিহাসের রায় অপরিবর্তিত রয়েছে: তিনি একজন ‘বিশ্বাসঘাতক’।
.png)

নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা রক্ষা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিরোধের মহাকাব্য। বর্তমান বাংলাদেশের সঙ্গে সিরাজউদ্দৌলার সম্পর্ক অতি গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য।
৩ ঘণ্টা আগে
একজন তরুণ ডাক্তার, যিনি বেছে নিয়েছিলেন মানুষের মুক্তির পথ। প্রথাগত পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার বদলে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। আর তা দেশ, কাল আর সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া, কিউবা বিপ্লবের অন্যতম মহানায়ক, আর কঙ্গো ও বলিভিয়ায় বিপ্লবের অগ্নিস্ফুল
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যেগুলো শুধু একটি যুদ্ধ বা একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর ফলে একটি জাতির ভাগ্য বদলে গেছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ ঠিক তেমনই একটি ঘটনা।
৪ ঘণ্টা আগে
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার পলাশীর আমবাগানে কয়েক ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা। এই পরাজয় বদলে দিয়েছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস। পলাশীর যুদ্ধে হারের কারণেই ভারতবর্ষ ইংরেজদের হাতে চলে যায়।
৪ ঘণ্টা আগে