মাহজাবিন নাফিসা

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার পলাশীর আমবাগানে কয়েক ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা। এই পরাজয় বদলে দিয়েছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস। পলাশীর যুদ্ধে হারের কারণেই ভারতবর্ষ ইংরেজদের হাতে চলে যায়।
পলাশীর যুদ্ধকে সাধারণত সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং ইংরেজের উত্থানের গল্প হিসেবে দেখা হয়। তবে এর যে তাৎপর্যটি বাদ পড়ে যায় তা হলো, এই যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার শাসনভার শুধু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায় তা-ই নয়, শুরু হয়েছিল এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মাত্র একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বাংলার প্রকৃত শাসকে পরিণত হয় এবং এর হাত ধরে এই শাসনভার চলে যায় সরাসরি ইংরেজ সরকারের কাছে।
আমাদের দেশে এখন অনেক বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে আসে। তারা সরকারকে কিছু কর দেয়ার মাধ্যমে এই সুযোগ পায়। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শুরুটাও একইভাবে হয়েছিল। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের কার্যক্রম শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, ক্রমশ তারা বাংলার ক্ষমতা দখলের দিকে মনোযোগ দেয়।
যখন কোম্পানি ছিল শুধু বণিক
১৬০০ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য। মসলা, রেশম, সুতি কাপড় ও অন্যান্য পণ্যের ব্যবসার জন্য তারা ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। মুঘল সম্রাটদের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে কারখানা ও বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বাংলা ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ঢাকার মসলিন, মুর্শিদাবাদের রেশম, বাংলার সুতি কাপড় ও কৃষিপণ্য ইউরোপে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছিল। ফলে কোম্পানির কাছে বাংলা শুধু একটি প্রদেশ ছিল না, বরং বিপুল মুনাফার উৎস ছিল।
কিন্তু ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির আরেকটি শক্তি গড়ে উঠতে থাকে। সেটি ‘নিজস্ব সেনাবাহিনী’। প্রথমে ইংরেজরা দাবি করে, বাণিজ্যকেন্দ্র রক্ষাই এই বাহিনীর কাজ। তবে এর আড়ালে এই বাহিনী ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। তখন কোম্পানি শুধু ব্যবসায়ী নয়, রাজনীতির মাঠেও আবির্ভূত হতে শুরু করে।
সিরাজউদ্দৌলা ও সংঘাতের শুরু
নবাব আলীবর্দী খাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাব হন সিরাজউদ্দৌলা। ক্ষমতায় এসেই তিনি দেখতে পান, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁর অনুমতি ছাড়াই কলকাতায় দুর্গ মেরামত করে শক্তি বৃদ্ধি করছে। এছাড়াও বিভিন্নভাবে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।
সিরাজ এসব কর্মকাণ্ডকে নবাবি কর্তৃত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে কোম্পানি চায় তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখতে। এই দ্বন্দ্ব দ্রুত সংঘাতে রূপ নেয়।
কোম্পানির কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, সামরিক শক্তির পাশাপাশি নবাবি দরবারের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও পারিবারিক কলহকে কাজে লাগানো গেলে তাদের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। ফলে শুরু হয় গোপন যোগাযোগ, দরকষাকষি ও ষড়যন্ত্র।

পলাশীর যুদ্ধ
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পক্ষে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার সৈন্য ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার পদাতিক, ১৫ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য এবং ৫৩টি কামান ছিল।
অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার ১০০ জন। এর মধ্যে ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় সৈন্য ছিল ৯৫০ জনের মতো, আর বাকি প্রায় ২ হাজার ১৫০ জন ছিল দেশীয় ভারতীয় সিপাহী ও গোলন্দাজ।
এই অল্প সংখ্যক সৈন্যকে সহজেই পরাজিত করতে পারত নবাবের বাহিনী। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এই বিশাল বাহিনীর একটি বড় অংশ যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ছিল। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী জয়লাভ করে এবং সিরাজউদ্দৌলার শাসনের অবসান ঘটে।
তবে পলাশী যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধের পর কোম্পানি নিজে বাংলার সিংহাসনে বসেনি। মীর জাফরকে নবাব বানানো হয়। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল, বাংলায় এখনো নবাবই শাসন করছেন। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা ছিল ইংরেজ কোম্পানির হাতে। এটাই ছিল কোম্পানির কৌশল। তারা সরাসরি শাসনের দায় নিতে চায়নি, কিন্তু শাসনের সুবিধা ভোগ করতে চেয়েছিল।
পুতুল নবাবের রাজনীতি
মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসানোর পর কোম্পানি বিপুল অর্থ, উপঢৌকন এবং বাণিজ্যিক সুবিধা দাবি করে। যুদ্ধের ব্যয় মেটানো, কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা এবং কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য নবাবের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়তে থাকে।
কিছুদিনের মধ্যেই মীর জাফর কোম্পানির প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হন। তখন কোম্পানি তাঁকে সরিয়ে মীর কাসিমকে নবাব বানায়। মীর কাসিম ছিলেন অপেক্ষাকৃত দক্ষ ও স্বাধীনচেতা শাসক। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার এবং সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। তিনি কোম্পানির অযৌক্তিক বাণিজ্যিক সুবিধার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ফলস্বরূপ সংঘাত আবার শুরু হয়।
মীর কাসিমের প্রতিরোধ ও বক্সারের যুদ্ধ
মীর কাসিম বুঝতে পেরেছিলেন যে কোম্পানি শুধু ব্যবসা করতে চায় না। তারা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও চায়। তাই তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
কোম্পানির সঙ্গে সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে তিনি মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় এবং আওধের নবাব শুজাউদ্দৌলার সঙ্গে জোট গঠন করেন। কিন্তু ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে এই জোট পরাজিত হয়।
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, বাংলার ওপর কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বক্সারের যুদ্ধ পলাশীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই যুদ্ধের পর কোম্পানির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধের সম্ভাবনা অনেকটাই শেষ হয়ে যায়।
১৭৬৫: যখন বণিক হলো রাজস্বের মালিক
পলাশী যুদ্ধের আট বছর পর আসে সেই ঘটনা, যা কোম্পানির প্রকৃত রূপান্তর সম্পন্ন করে। ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার প্রদান করেন।
শুনতে এটি প্রশাসনিক একটি সিদ্ধান্ত মনে হলেও বাস্তবে এর অর্থ একদমই ভিন্ন। একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব বা কর সংগ্রহের ক্ষমতা। যে প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে, প্রকৃত ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত তার হাতেই থাকে।
দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার বিপুল সম্পদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। নবাবের পদ তখনও ছিল, কিন্তু তিনি ক্রমশ আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী শাসকে পরিণত হন। বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পদের কেন্দ্র কার্যত কোম্পানির হাতে চলে যায়।

দ্বৈত শাসনের বাস্তবতা
দেওয়ানি পাওয়ার পর কোম্পানি একটি বিশেষ ব্যবস্থা চালু করে, যাকে ইতিহাসে ‘দ্বৈত শাসন’ বলা হয়। এ ব্যবস্থায় নবাব প্রশাসনিক ও বিচারিক দায়িত্বের প্রতীকী কর্তৃত্ব ধরে রাখেন। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকে কোম্পানির হাতে। ফলে দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে বিচ্ছেদ তৈরি হয়। জনগণের কাছে জবাবদিহির দায় ছিল নবাবের, কিন্তু অর্থের নিয়ন্ত্রণ ছিল কোম্পানির।
এই ব্যবস্থায় কোম্পানি শাসনের সুবিধা পেলেও তার কোনো দায় নিতে হতো না। এই সুযোগে ইংরেজরা প্রজাদের ওপর খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়।
বাংলার সম্পদ কোথায় গেল
পলাশী যুদ্ধের আগে কোম্পানি বাংলা থেকে পণ্য কিনত। অর্থাৎ তাদের ইউরোপ থেকে টাকা এনে এখানে ব্যয় করতে হতো। কিন্তু দেওয়ানির পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
এরপর কোম্পানি বাংলা থেকেই রাজস্ব সংগ্রহ করছে এবং সেই অর্থ দিয়েই বাংলার পণ্য কিনছে। অর্থাৎ নিজের পকেট থেকে অর্থ ব্যয় না করেই তারা বিপুল সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছিল।
এর ফলে বাংলার সম্পদ ধীরে ধীরে ইউরোপমুখী হতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে অনেক অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ এই প্রক্রিয়াকে ‘ড্রেইন অব ওয়েলথ’ বা সম্পদ নিঃসরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বাংলার কৃষক, তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা ক্রমশ নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে স্থানীয় অর্থনীতির চেয়ে কোম্পানির মুনাফা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের দীর্ঘ প্রভাব
পলাশীর যুদ্ধকে আমরা বিশ্বাসঘাতকতার গল্প হিসেবেই জানি। নিঃসন্দেহে মীর জাফর ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করলে এর পেছনের বড় ছবিটি দেখা যায় না।
পলাশীর পেছনে ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, নবাবি দরবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ইউরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, কোম্পানির সামরিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের জটিল সমন্বয়। ১৭৫৭ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ার দরজা খুলে দেয়, আর ১৭৬৫ সালের দেওয়ানি সেই রূপান্তরকে প্রায় সম্পূর্ণ করে।
২৩ জুন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। সেই অধ্যায়ের পরিণতিতে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী শাসকে পরিণত হয় এবং পরবর্তী প্রায় ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার পলাশীর আমবাগানে কয়েক ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা। এই পরাজয় বদলে দিয়েছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস। পলাশীর যুদ্ধে হারের কারণেই ভারতবর্ষ ইংরেজদের হাতে চলে যায়।
পলাশীর যুদ্ধকে সাধারণত সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং ইংরেজের উত্থানের গল্প হিসেবে দেখা হয়। তবে এর যে তাৎপর্যটি বাদ পড়ে যায় তা হলো, এই যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার শাসনভার শুধু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায় তা-ই নয়, শুরু হয়েছিল এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মাত্র একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বাংলার প্রকৃত শাসকে পরিণত হয় এবং এর হাত ধরে এই শাসনভার চলে যায় সরাসরি ইংরেজ সরকারের কাছে।
আমাদের দেশে এখন অনেক বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে আসে। তারা সরকারকে কিছু কর দেয়ার মাধ্যমে এই সুযোগ পায়। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শুরুটাও একইভাবে হয়েছিল। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের কার্যক্রম শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, ক্রমশ তারা বাংলার ক্ষমতা দখলের দিকে মনোযোগ দেয়।
যখন কোম্পানি ছিল শুধু বণিক
১৬০০ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য। মসলা, রেশম, সুতি কাপড় ও অন্যান্য পণ্যের ব্যবসার জন্য তারা ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। মুঘল সম্রাটদের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে কারখানা ও বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বাংলা ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ঢাকার মসলিন, মুর্শিদাবাদের রেশম, বাংলার সুতি কাপড় ও কৃষিপণ্য ইউরোপে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছিল। ফলে কোম্পানির কাছে বাংলা শুধু একটি প্রদেশ ছিল না, বরং বিপুল মুনাফার উৎস ছিল।
কিন্তু ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির আরেকটি শক্তি গড়ে উঠতে থাকে। সেটি ‘নিজস্ব সেনাবাহিনী’। প্রথমে ইংরেজরা দাবি করে, বাণিজ্যকেন্দ্র রক্ষাই এই বাহিনীর কাজ। তবে এর আড়ালে এই বাহিনী ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। তখন কোম্পানি শুধু ব্যবসায়ী নয়, রাজনীতির মাঠেও আবির্ভূত হতে শুরু করে।
সিরাজউদ্দৌলা ও সংঘাতের শুরু
নবাব আলীবর্দী খাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাব হন সিরাজউদ্দৌলা। ক্ষমতায় এসেই তিনি দেখতে পান, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁর অনুমতি ছাড়াই কলকাতায় দুর্গ মেরামত করে শক্তি বৃদ্ধি করছে। এছাড়াও বিভিন্নভাবে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।
সিরাজ এসব কর্মকাণ্ডকে নবাবি কর্তৃত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে কোম্পানি চায় তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখতে। এই দ্বন্দ্ব দ্রুত সংঘাতে রূপ নেয়।
কোম্পানির কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, সামরিক শক্তির পাশাপাশি নবাবি দরবারের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও পারিবারিক কলহকে কাজে লাগানো গেলে তাদের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। ফলে শুরু হয় গোপন যোগাযোগ, দরকষাকষি ও ষড়যন্ত্র।

পলাশীর যুদ্ধ
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পক্ষে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার সৈন্য ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার পদাতিক, ১৫ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য এবং ৫৩টি কামান ছিল।
অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার ১০০ জন। এর মধ্যে ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় সৈন্য ছিল ৯৫০ জনের মতো, আর বাকি প্রায় ২ হাজার ১৫০ জন ছিল দেশীয় ভারতীয় সিপাহী ও গোলন্দাজ।
এই অল্প সংখ্যক সৈন্যকে সহজেই পরাজিত করতে পারত নবাবের বাহিনী। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতে, নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এই বিশাল বাহিনীর একটি বড় অংশ যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ছিল। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী জয়লাভ করে এবং সিরাজউদ্দৌলার শাসনের অবসান ঘটে।
তবে পলাশী যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুদ্ধের পর কোম্পানি নিজে বাংলার সিংহাসনে বসেনি। মীর জাফরকে নবাব বানানো হয়। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল, বাংলায় এখনো নবাবই শাসন করছেন। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা ছিল ইংরেজ কোম্পানির হাতে। এটাই ছিল কোম্পানির কৌশল। তারা সরাসরি শাসনের দায় নিতে চায়নি, কিন্তু শাসনের সুবিধা ভোগ করতে চেয়েছিল।
পুতুল নবাবের রাজনীতি
মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসানোর পর কোম্পানি বিপুল অর্থ, উপঢৌকন এবং বাণিজ্যিক সুবিধা দাবি করে। যুদ্ধের ব্যয় মেটানো, কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা এবং কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য নবাবের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়তে থাকে।
কিছুদিনের মধ্যেই মীর জাফর কোম্পানির প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হন। তখন কোম্পানি তাঁকে সরিয়ে মীর কাসিমকে নবাব বানায়। মীর কাসিম ছিলেন অপেক্ষাকৃত দক্ষ ও স্বাধীনচেতা শাসক। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার এবং সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। তিনি কোম্পানির অযৌক্তিক বাণিজ্যিক সুবিধার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ফলস্বরূপ সংঘাত আবার শুরু হয়।
মীর কাসিমের প্রতিরোধ ও বক্সারের যুদ্ধ
মীর কাসিম বুঝতে পেরেছিলেন যে কোম্পানি শুধু ব্যবসা করতে চায় না। তারা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও চায়। তাই তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
কোম্পানির সঙ্গে সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে তিনি মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় এবং আওধের নবাব শুজাউদ্দৌলার সঙ্গে জোট গঠন করেন। কিন্তু ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে এই জোট পরাজিত হয়।
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, বাংলার ওপর কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বক্সারের যুদ্ধ পলাশীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই যুদ্ধের পর কোম্পানির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধের সম্ভাবনা অনেকটাই শেষ হয়ে যায়।
১৭৬৫: যখন বণিক হলো রাজস্বের মালিক
পলাশী যুদ্ধের আট বছর পর আসে সেই ঘটনা, যা কোম্পানির প্রকৃত রূপান্তর সম্পন্ন করে। ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার প্রদান করেন।
শুনতে এটি প্রশাসনিক একটি সিদ্ধান্ত মনে হলেও বাস্তবে এর অর্থ একদমই ভিন্ন। একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব বা কর সংগ্রহের ক্ষমতা। যে প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে, প্রকৃত ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত তার হাতেই থাকে।
দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার বিপুল সম্পদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। নবাবের পদ তখনও ছিল, কিন্তু তিনি ক্রমশ আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী শাসকে পরিণত হন। বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পদের কেন্দ্র কার্যত কোম্পানির হাতে চলে যায়।

দ্বৈত শাসনের বাস্তবতা
দেওয়ানি পাওয়ার পর কোম্পানি একটি বিশেষ ব্যবস্থা চালু করে, যাকে ইতিহাসে ‘দ্বৈত শাসন’ বলা হয়। এ ব্যবস্থায় নবাব প্রশাসনিক ও বিচারিক দায়িত্বের প্রতীকী কর্তৃত্ব ধরে রাখেন। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকে কোম্পানির হাতে। ফলে দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে বিচ্ছেদ তৈরি হয়। জনগণের কাছে জবাবদিহির দায় ছিল নবাবের, কিন্তু অর্থের নিয়ন্ত্রণ ছিল কোম্পানির।
এই ব্যবস্থায় কোম্পানি শাসনের সুবিধা পেলেও তার কোনো দায় নিতে হতো না। এই সুযোগে ইংরেজরা প্রজাদের ওপর খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে দেয়।
বাংলার সম্পদ কোথায় গেল
পলাশী যুদ্ধের আগে কোম্পানি বাংলা থেকে পণ্য কিনত। অর্থাৎ তাদের ইউরোপ থেকে টাকা এনে এখানে ব্যয় করতে হতো। কিন্তু দেওয়ানির পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
এরপর কোম্পানি বাংলা থেকেই রাজস্ব সংগ্রহ করছে এবং সেই অর্থ দিয়েই বাংলার পণ্য কিনছে। অর্থাৎ নিজের পকেট থেকে অর্থ ব্যয় না করেই তারা বিপুল সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছিল।
এর ফলে বাংলার সম্পদ ধীরে ধীরে ইউরোপমুখী হতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে অনেক অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ এই প্রক্রিয়াকে ‘ড্রেইন অব ওয়েলথ’ বা সম্পদ নিঃসরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বাংলার কৃষক, তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা ক্রমশ নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে স্থানীয় অর্থনীতির চেয়ে কোম্পানির মুনাফা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের দীর্ঘ প্রভাব
পলাশীর যুদ্ধকে আমরা বিশ্বাসঘাতকতার গল্প হিসেবেই জানি। নিঃসন্দেহে মীর জাফর ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করলে এর পেছনের বড় ছবিটি দেখা যায় না।
পলাশীর পেছনে ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, নবাবি দরবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ইউরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, কোম্পানির সামরিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের জটিল সমন্বয়। ১৭৫৭ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ার দরজা খুলে দেয়, আর ১৭৬৫ সালের দেওয়ানি সেই রূপান্তরকে প্রায় সম্পূর্ণ করে।
২৩ জুন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। সেই অধ্যায়ের পরিণতিতে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী শাসকে পরিণত হয় এবং পরবর্তী প্রায় ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়।
.png)

একজন তরুণ ডাক্তার, যিনি বেছে নিয়েছিলেন মানুষের মুক্তির পথ। প্রথাগত পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার বদলে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। আর তা দেশ, কাল আর সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া, কিউবা বিপ্লবের অন্যতম মহানায়ক, আর কঙ্গো ও বলিভিয়ায় বিপ্লবের অগ্নিস্ফুল
১২ মিনিট আগে
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যেগুলো শুধু একটি যুদ্ধ বা একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এর ফলে একটি জাতির ভাগ্য বদলে গেছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ ঠিক তেমনই একটি ঘটনা।
১ ঘণ্টা আগে
কোভিডের সময় সোশ্যাল মিডিয়া ছিল আমাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। সেসময় প্রায়ই দেখতাম ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে, একটি সিনেমার ভিডিওক্লিপ। দু’জন মানুষ মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছে, হাতে সুন্দর ফুল গাছ।
১৯ ঘণ্টা আগে
প্রতি বছর বাবা দিবস এলেই ফেসবুকের হোমপেজ ভরে যায় বাবাকে নিয়ে লেখা সুন্দর সুন্দর কথা আর স্মৃতিতে। বাবা সুপারম্যান, বাবা সব আবদার পূরণ করেছেন; এমন অনেককিছু। আমি কখনও তেমন লিখেছি কি-না মনে পড়ে না, লেখার কথা না।
২ দিন আগে