কৃষক প্রজা পার্টি থেকে এনসিপি
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩৬ দফা ইশতেহার প্রকাশ করেছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ওঠে আসা দলটি এই ইশতেহারকে বলছে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। কৃষক প্রজা পার্টি থেকে শুরু করে জাতীয় নাগরিক পার্টি—সব রাজনৈতিক দলের জন্মই কোনো না কোনো ঐতিহাসিক সংকট, আন্দোলন বা রাজনৈতিক বাঁকের ভেতর দিয়ে। কেমন ছিল ঢাকায় প্রতিষ্ঠা হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারের ভাষা ও অঙ্গীকার?
গৌতম কে শুভ

পূর্ববঙ্গ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ—এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার মোড় নিয়েছে বিভিন্ন দিকে। ঔপনিবেশিক শাসন, রাষ্ট্রভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা শাসনব্যবস্থার পতন—প্রতিটি বাঁকে নতুন নতুন রাজনৈতিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। আর সেই পরিপ্রেক্ষাপটেই জন্ম নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল। কেউ এসেছে গণমানুষের দাবি নিয়ে, কেউ ক্ষমতার কাঠামোকে রূপ দিতে, কেউ আবার বিদ্যমান রাজনীতির বিকল্প হাজির করতে। সময়ের পরীক্ষায় অনেক দল টিকে আছে, অনেক দল হারিয়ে গেছে, কেউ কেউ আবার ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে।
এই লেখায় যে দলগুলোর কথা বলা হচ্ছে—কৃষক প্রজা পার্টি থেকে শুরু করে জাতীয় নাগরিক পার্টি—সব রাজনৈতিক দলের জন্মই কোনো না কোনো ঐতিহাসিক সংকট, আন্দোলন বা রাজনৈতিক বাঁকের ভেতর দিয়ে হয়েছে। ভৌগোলিকভাবেও এই লেখায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আনা হয়েছে, এসব দলের সব কটির প্রতিষ্ঠা ঢাকায় অথবা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে দরকষাকষি, প্রতিরোধ কিংবা পুনর্গঠনের রাজনীতি এই ভূখণ্ডেই রচিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে, বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, দল গঠনের পটভূমি এবং তাদের প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারের ভাষা ও অঙ্গীকার এই লেখায় সেগুলোকেই সংক্ষিপ্তভাবে এক জায়গায় ধরা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি চলমান রেখা হিসেবে।
ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগে বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে এক গভীর সংকট তৈরি হয়। জমিদারিব্যবস্থার শোষণ, কৃষক সমাজের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন এবং একই সঙ্গে বাংলায় মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান—এই তিনটি বাস্তবতা মিলেই নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন তৈরি করে। সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ তখন বাংলার গ্রামীণ মানুষের কথা বলছিল না। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় কৃষক প্রজা পার্টি।
কৃষক প্রজা পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৯ সালে, পূর্ববঙ্গে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতা ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। গ্রামবাংলা ঘুরে কৃষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, জমিদারি শোষণ ভাঙা ছাড়া বাংলার সামাজিক মুক্তি সম্ভব নয়। এই দলটি হয়ে ওঠে বাংলার উদীয়মান মুসলমান মধ্যবিত্তের প্রথম কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
শেরে বাংলার নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিপীড়িত কৃষক-প্রজার দল হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। দলের প্রথম ও প্রধান দাবি ছিল কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই কৃষকের জন্য ‘মৃত্যুফাঁস’ হয়ে দাঁড়ানো জমিদারি প্রথা সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। এই দাবিকে কেন্দ্র করেই ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে ১৪ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন, যেটাকে অনেকে ‘১৪ দফা ইশতেহার’ বলে উল্লেখ করেন।
ইশতেহারে জমিদারিব্যবস্থা উচ্ছেদ, প্রকৃত চাষির হাতে জমির মালিকানা স্বীকৃতি, নজর সেলামি নামে শোষণমূলক করপ্রথা বাতিল, ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে কৃষকদের ঋণের ভার লাঘব এবং পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মতো মৌলিক দাবিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। কৃষক সমাজের কাছে এই ১৪ দফা ইশতেহার এক অর্থে মুক্তির সনদে পরিণত হয়েছিল।
বাংলার কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগ—কোনো দলই সে সময় এ রকম জনবান্ধব ও কৃষককেন্দ্রিক নির্বাচনী ইশতেহার দিতে পারেনি। এই দুই দলের নেতাদের শ্রেণি-অবস্থানের কারণেই ভোটের রাজনীতিতে কৃষকের মনের কথা মাঠে-ময়দানে উচ্চারিত হয়নি। কৃষক প্রজা পার্টির ইশতেহারের আরো কিছু দফাও সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি প্রতি থানায় একটি করে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা সে সময়ের রাজনীতিতে ছিল স্পষ্টভাবে অগ্রসর ও ব্যতিক্রমী চিন্তার প্রকাশ।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে তীব্র অসন্তোষ জমে ওঠে। কেন্দ্রীয় শাসনের বৈষম্য, বাংলা ভাষার ওপর দমননীতি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি—এই সবকিছু মিলেই একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন তৈরি করে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ দ্রুতই সুবিধাভোগী ও আমলাতান্ত্রিক দলে পরিণত হয়; ত্যাগী নেতা-কর্মীরা সেখানে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ভাষা প্রশ্নে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরোধিতা এবং বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন পূর্ব বাংলায় গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় আওয়ামী মুসলিম লীগ।
আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন, ঢাকার পুরোনো শহরের কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে। দলের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের আবহেই এই দল দ্রুত গণমানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ১৯৫৫ সালে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ রাখা হয়।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
আওয়ামী মুসলিম লীগের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা আসে ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে। মুসলিম লীগের শাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট যে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে, সেটিই ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের স্পষ্ট প্রকাশ।
২১ দফা কর্মসূচি মূলত পূর্ব বাংলার ভাষা, অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরে। এতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ছিল প্রধান বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন, খাজনা ও শোষণমূলক কর বাতিল, পাটশিল্প জাতীয়করণ এবং কৃষি–শিল্পের আধুনিকায়নের কথা বলা হয়। কৃষিতে সমবায়ব্যবস্থা, কুটির শিল্পের উন্নয়ন, লবণ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইশতেহারে সামাজিক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সারা দেশে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য করা, শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন এবং স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন, শাসনব্যয় কমানো, মন্ত্রীদের বেতন সীমিত রাখা এবং বিচারবিভাগকে শাসনবিভাগ থেকে পৃথক করার অঙ্গীকার ছিল।
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দফাগুলোতে নাগরিক স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া হয়। কালাকানুন বাতিল, বিনাবিচারে আটক বন্দীর মুক্তি, সংবাদপত্র ও সভাসমিতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবিও এতে ছিল। সর্বোপরি, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি ২১ দফাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মুক্তির ঘোষণাপত্রে পরিণত করে।
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর কেন্দ্রীয় শাসনের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, সামরিক–বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং কৃষক–শ্রমিক আন্দোলনের বিস্তারের ভেতরেই নতুন এক প্রগতিশীল রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের ভেতরে পশ্চিমা সামরিক জোটঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে মতবিরোধ তীব্র হলে বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতিকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ জোরদার হয়। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)।
ন্যাপ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে, তৎকালীন ঢাকায়। দলের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভাসানীর রাজনৈতিক বিচ্ছেদ প্রকাশ্য রূপ নেয় ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের পর। একই বছরের জুলাই মাসে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বামপন্থী নেতাদের অংশগ্রহণে ন্যাপ গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দলটি পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, ভূমি সংস্কার এবং জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গীকার করে।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
ন্যাপ ১৯৫৭ সালে গঠিত হওয়ার পর পাকিস্তানে দেশব্যাপী প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। নির্বাচনের আগে তারা প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। যদিও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে ন্যাপ ভাসানী নিজেদের মধ্যে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। তারপরও ন্যাপ তাদের নির্বাচনী ইশতাহার ঘোষণা করে।
ন্যাপের (ভাসানী গ্রুপ) নির্বাচনী ইশতেহারের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক ও ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা। এতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয় এবং দেশীয় রাজা, উপজাতীয় এলাকা ও এজেন্সিসহ সব বিশেষ অঞ্চলকে প্রাদেশিক কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মৌলিক অধিকার সনদ অনুসারে ধর্ম, বংশ বা গোত্র নির্বিশেষে সব নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়।
ইশতেহারে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। সকল নাগরিকের জন্য খাদ্য, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়। নারী সমাজকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমান অধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বেকার, বৃদ্ধ ও অক্ষমদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি কাশ্মীরের জনগণকে গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার আদায়ে সমর্থনের ঘোষণাও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অর্থনৈতিক নীতিতে ইশতেহারটি ছিল স্পষ্টভাবে কৃষক ও শ্রমিকপক্ষীয়। পূর্ব পাকিস্তানে ভূস্বামীদের কাছ থেকে বিনা ক্ষতিপূরণে জমি নিয়ে ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টনের অঙ্গীকার করা হয়। শিল্পক্ষেত্রে ইজারাদারি ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান এবং শ্রমিক আইন সংস্কারের মাধ্যমে শ্রমিকদের কারখানার লভ্যাংশের অংশীদার করা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, ধর্মঘট ও সম্মিলিত দরকষাকষির অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।
পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা প্রশ্নে ইশতেহারে দেশের উভয় অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের অঙ্গীকার ন্যাপকে (ভাসানী) সে সময়ের রাজনৈতিক ধারায় একটি স্পষ্ট প্রগতিশীল অবস্থানে দাঁড় করায়।
মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও রাজনৈতিকভাবেও হতাশা তৈরি হয়। যুদ্ধশেষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক, শাসক দলের ভেতরে ক্ষমতাকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ছাত্রলীগের বিভক্তি, সব মিলিয়ে এক নতুন বিপ্লবী রাজনীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। এই সময়েই ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ ধারণাকে সামনে রেখে নতুন রাজনীতির উত্থান ঘটে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, সংক্ষেপে জাসদ।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর, ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মূল নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, এম এ জলিল, শাজাহান সিরাজ ও কর্নেল (অব.) আবু তাহের।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
জাসদের প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নির্বাচনব্যবস্থাকে বলা হয়, সাধারণ মানুষকে ঠকানোর একটি ফন্দি ও মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও বিক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলমাত্র। জাসদ সংবিধানকে ‘আজব কেতাব’ বলে আখ্যায়িত করে এবং দাবি করে এটি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বৈধ করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নিজস্ব সাংবিধানিক রূপরেখা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাসদ তাদের ইশতেহারে ঘোষণা করে, রাষ্ট্র হবে জনগণের প্রতিষ্ঠান। উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্বের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ পৃথক থাকবে, সমাজতান্ত্রিক নীতিবিরোধী সব আইন বাতিল করা হবে, ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং জনগণের জীবিকা, শিক্ষা ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায় রাষ্ট্র বহন করবে।
জাসদ নেতারা ৭৩-এর নির্বাচনকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের প্রথম ধাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাদের মতে, এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ আসন্ন সামাজিক বিপ্লবের প্রস্তুতির একটি কৌশলমাত্র। একই সঙ্গে তারা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী, ফ্যাসিবাদী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও গণবিরোধী সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। জাসদের অভিযোগ ছিল—আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে বিকিয়ে দিচ্ছে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
স্বাধীনতার পর বিশেষ করে ১৯৭৫–পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদল, একদলীয় ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা, বহুদলীয় রাজনীতিতে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার উত্থান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার ভেতর জনগণের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে আসে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর, ঢাকায় রমনা বটমূলের নিচের উন্মুক্ত মাঠে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জিয়াউর রহমান। বিএনপি আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং জাতীয় ঐক্য গঠনের রাজনৈতিক ঘোষণা দেয়। দলের মূল দর্শন হিসেবে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-কে সামনে আনা হয়, যা ধর্ম, সম্প্রদায় ও শ্রেণি নির্বিশেষে জনগণের ঐক্যের ওপর জোর দেয়।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
বিএনপি প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১৯৭৯ সালে। ইশতেহারে বিএনপি সারা দেশে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ দ্রুত সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করে। আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হেকিমি ও অন্যান্য দেশজ চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়ন ও বিস্তারের কথাও এতে উল্লেখ করা হয়। গ্রামভিত্তিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে পল্লি অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প স্থাপন, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যমান উন্নয়ন এবং প্রশাসনকে গ্রামমুখী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বাস্তবভিত্তিক ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে জাতীয় সমৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়; প্রতি ইউনিয়নে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, একটি করে সাব-হেলথ সেন্টার স্থাপন এবং প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
কৃষিকে স্বনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাপক কৃষি সংস্কার ও প্রগতিশীল কৃষিনীতি প্রণয়নের কথা বলা হয়। ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে বিশেষ কর্মসূচির অঙ্গীকার করা হয় এবং পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন কমপক্ষে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়। সমবায়ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অনুন্নত অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শিল্পনীতিতে দেশের নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভরশীল দ্রুত শিল্পায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। মৌলিক ও ভারী শিল্প এবং প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট শিল্প রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে রাখার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। শিল্পপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আনা এবং রপ্তানি বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার কথা বলা হয়।
ইশতেহারে নারী ও যুবসমাজকে জাতীয় উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। নারীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, যুবসমাজের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির অঙ্গীকার করা হয়। জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, জনশক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়; পাশাপাশি পঙ্গু ও বয়স্কদের সহায়তা এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
ঘোষণাপত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় বীরের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাদের কল্যাণে বিশেষ তহবিল জোরদারের কথা বলা হয়। সামাজিক অনাচার, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করে জাতীয় প্রতিরক্ষা জোরদার করার অঙ্গীকারও এতে ছিল। পররাষ্ট্রনীতিতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতির কথা ঘোষণা করে বিএনপি। শেষ পর্যন্ত ইশতেহারে জনগণের রায়ের ওপর আস্থা রেখে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিয়ে একটি সুখী, শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
১৯৮২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর সেই শাসনকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও বেসামরিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর সামরিক কর্তৃত্ব বজায় রেখেই দল–রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা, নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা থেকে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় জাতীয় পার্টি (জাপা)।
জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি, ঢাকায়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই ছিল জাপা প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। দলটি গঠনের পর থেকেই সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয় এবং ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন ছাড়া প্রায় সব জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
নির্বাচনী ইশতেহার
জানা যায়, ১৯৯৬ সালের আগে জাতীয় পার্টির কোনো নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয়নি। পরে জাপার নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়। এর মধ্যে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা, উচ্চ আদালতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, সব ধরনের ‘কালো আইন’ বাতিল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংসদে নারীদের জন্য আসন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি পূর্ণ উপজেলা ব্যবস্থা ও উপজেলা আদালত প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও করা হয়।
পরবর্তী নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে এসব দাবির সঙ্গে যুক্ত হয় প্রাদেশিক কাঠামো প্রবর্তন, স্থানীয় উন্নয়নে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি।
জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন মোড় নেয়। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, নাগরিক অধিকার সংকোচন ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ঘাটতির বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ এই সময় বিস্ফোরিত হয়। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শিক্ষার্থী ও তরুণদের নেতৃত্ব, যারা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দাবি সামনে আনে।
এই গণঅভ্যুত্থান নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মতো কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা-বিন্যাস, নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা, এসব বিষয় জোরালোভাবে আলোচিত হয়।
এই ভাবনাগুলোকে সংগঠিত রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরে আনতে হিসেবে যাত্রা শুরু করে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি)।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী আছে
পাঁচ বছরের মধ্যে নতুন এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দলীয় ইশতেহারে এ প্রতিশ্রুতির কথা জানায় দলটি।
‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’– এ ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’বিনির্মাণের রূপরেখা হিসেবে ৩৬ দফা কর্মসূচি তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এনসিপি একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে।
ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা এবং আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এনসিপি বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলে সংঘটিত গণহত্যা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নে স্বাধীন কমিশন করার কথা বলেছে। এছাড়া পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে ১৮৬১ ও ১৮৯৮ সালের পুরোনো আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে ইশতেহারে।
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের জন্য ‘হিসাব দাও’ নামের পোর্টাল চালু করবে এনসিপি। সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি শতভাগ পারফরমেন্সভিত্তিক করার পাশাপাশি আমলাতন্ত্রে ল্যাটারাল এন্ট্রি বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে এনসিপি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এছাড়া টিসিবির ট্রাক সেলের পরিবর্তে কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত মুদি দোকান থেকে পণ্য কেনার সুবিধা রাখবে এনসিপি।
ইশতেহারে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তনের কথা বলেছে এনসিপি। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো, স্নাতক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ এবং শিক্ষা খাতে জিডিপির ৩ শতাংশ বরাদ্দের অঙ্গীকার রয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে দেশের উত্তর ও দক্ষিণে ‘বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন (এসএইচবজেড’ গড়ে তোলা এবং জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর ঘোষণা দিয়েছে জুরাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র নেতৃত্বের দলটি।
নারীর ক্ষমতায়নে সংসদে ১০০ সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা, কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসের পাশাপাশি পুরুষদের এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রেখেছে এনসিপি।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, শেখ হাসিনাসহ পলাতক অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে দলটি। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে সেনাবাহিনীতে ড্রোন ব্রিগেড গঠন ও রিজার্ভ ফোর্স দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার ঘোষণা রয়েছে ইশতেহারে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করে, কেবল সরকার পরিবর্তন নয় বরং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব। এই লক্ষ্যে তারা ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ গড়ে তুলবে।

পূর্ববঙ্গ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ—এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার মোড় নিয়েছে বিভিন্ন দিকে। ঔপনিবেশিক শাসন, রাষ্ট্রভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা শাসনব্যবস্থার পতন—প্রতিটি বাঁকে নতুন নতুন রাজনৈতিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। আর সেই পরিপ্রেক্ষাপটেই জন্ম নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল। কেউ এসেছে গণমানুষের দাবি নিয়ে, কেউ ক্ষমতার কাঠামোকে রূপ দিতে, কেউ আবার বিদ্যমান রাজনীতির বিকল্প হাজির করতে। সময়ের পরীক্ষায় অনেক দল টিকে আছে, অনেক দল হারিয়ে গেছে, কেউ কেউ আবার ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে।
এই লেখায় যে দলগুলোর কথা বলা হচ্ছে—কৃষক প্রজা পার্টি থেকে শুরু করে জাতীয় নাগরিক পার্টি—সব রাজনৈতিক দলের জন্মই কোনো না কোনো ঐতিহাসিক সংকট, আন্দোলন বা রাজনৈতিক বাঁকের ভেতর দিয়ে হয়েছে। ভৌগোলিকভাবেও এই লেখায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আনা হয়েছে, এসব দলের সব কটির প্রতিষ্ঠা ঢাকায় অথবা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে দরকষাকষি, প্রতিরোধ কিংবা পুনর্গঠনের রাজনীতি এই ভূখণ্ডেই রচিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে, বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, দল গঠনের পটভূমি এবং তাদের প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারের ভাষা ও অঙ্গীকার এই লেখায় সেগুলোকেই সংক্ষিপ্তভাবে এক জায়গায় ধরা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি চলমান রেখা হিসেবে।
ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগে বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে এক গভীর সংকট তৈরি হয়। জমিদারিব্যবস্থার শোষণ, কৃষক সমাজের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন এবং একই সঙ্গে বাংলায় মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান—এই তিনটি বাস্তবতা মিলেই নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন তৈরি করে। সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ তখন বাংলার গ্রামীণ মানুষের কথা বলছিল না। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় কৃষক প্রজা পার্টি।
কৃষক প্রজা পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৯ সালে, পূর্ববঙ্গে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতা ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। গ্রামবাংলা ঘুরে কৃষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, জমিদারি শোষণ ভাঙা ছাড়া বাংলার সামাজিক মুক্তি সম্ভব নয়। এই দলটি হয়ে ওঠে বাংলার উদীয়মান মুসলমান মধ্যবিত্তের প্রথম কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
শেরে বাংলার নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিপীড়িত কৃষক-প্রজার দল হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। দলের প্রথম ও প্রধান দাবি ছিল কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই কৃষকের জন্য ‘মৃত্যুফাঁস’ হয়ে দাঁড়ানো জমিদারি প্রথা সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। এই দাবিকে কেন্দ্র করেই ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে ১৪ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন, যেটাকে অনেকে ‘১৪ দফা ইশতেহার’ বলে উল্লেখ করেন।
ইশতেহারে জমিদারিব্যবস্থা উচ্ছেদ, প্রকৃত চাষির হাতে জমির মালিকানা স্বীকৃতি, নজর সেলামি নামে শোষণমূলক করপ্রথা বাতিল, ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে কৃষকদের ঋণের ভার লাঘব এবং পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মতো মৌলিক দাবিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। কৃষক সমাজের কাছে এই ১৪ দফা ইশতেহার এক অর্থে মুক্তির সনদে পরিণত হয়েছিল।
বাংলার কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগ—কোনো দলই সে সময় এ রকম জনবান্ধব ও কৃষককেন্দ্রিক নির্বাচনী ইশতেহার দিতে পারেনি। এই দুই দলের নেতাদের শ্রেণি-অবস্থানের কারণেই ভোটের রাজনীতিতে কৃষকের মনের কথা মাঠে-ময়দানে উচ্চারিত হয়নি। কৃষক প্রজা পার্টির ইশতেহারের আরো কিছু দফাও সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি প্রতি থানায় একটি করে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা সে সময়ের রাজনীতিতে ছিল স্পষ্টভাবে অগ্রসর ও ব্যতিক্রমী চিন্তার প্রকাশ।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে তীব্র অসন্তোষ জমে ওঠে। কেন্দ্রীয় শাসনের বৈষম্য, বাংলা ভাষার ওপর দমননীতি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি—এই সবকিছু মিলেই একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন তৈরি করে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ দ্রুতই সুবিধাভোগী ও আমলাতান্ত্রিক দলে পরিণত হয়; ত্যাগী নেতা-কর্মীরা সেখানে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ভাষা প্রশ্নে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরোধিতা এবং বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন পূর্ব বাংলায় গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় আওয়ামী মুসলিম লীগ।
আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন, ঢাকার পুরোনো শহরের কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে। দলের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের আবহেই এই দল দ্রুত গণমানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ১৯৫৫ সালে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ রাখা হয়।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
আওয়ামী মুসলিম লীগের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা আসে ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে। মুসলিম লীগের শাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট যে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে, সেটিই ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের স্পষ্ট প্রকাশ।
২১ দফা কর্মসূচি মূলত পূর্ব বাংলার ভাষা, অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরে। এতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ছিল প্রধান বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন, খাজনা ও শোষণমূলক কর বাতিল, পাটশিল্প জাতীয়করণ এবং কৃষি–শিল্পের আধুনিকায়নের কথা বলা হয়। কৃষিতে সমবায়ব্যবস্থা, কুটির শিল্পের উন্নয়ন, লবণ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইশতেহারে সামাজিক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সারা দেশে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য করা, শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন এবং স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন, শাসনব্যয় কমানো, মন্ত্রীদের বেতন সীমিত রাখা এবং বিচারবিভাগকে শাসনবিভাগ থেকে পৃথক করার অঙ্গীকার ছিল।
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দফাগুলোতে নাগরিক স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া হয়। কালাকানুন বাতিল, বিনাবিচারে আটক বন্দীর মুক্তি, সংবাদপত্র ও সভাসমিতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবিও এতে ছিল। সর্বোপরি, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি ২১ দফাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মুক্তির ঘোষণাপত্রে পরিণত করে।
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর কেন্দ্রীয় শাসনের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, সামরিক–বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং কৃষক–শ্রমিক আন্দোলনের বিস্তারের ভেতরেই নতুন এক প্রগতিশীল রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের ভেতরে পশ্চিমা সামরিক জোটঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে মতবিরোধ তীব্র হলে বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতিকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ জোরদার হয়। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)।
ন্যাপ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে, তৎকালীন ঢাকায়। দলের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভাসানীর রাজনৈতিক বিচ্ছেদ প্রকাশ্য রূপ নেয় ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনের পর। একই বছরের জুলাই মাসে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বামপন্থী নেতাদের অংশগ্রহণে ন্যাপ গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দলটি পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, ভূমি সংস্কার এবং জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গীকার করে।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
ন্যাপ ১৯৫৭ সালে গঠিত হওয়ার পর পাকিস্তানে দেশব্যাপী প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে। নির্বাচনের আগে তারা প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। যদিও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে ন্যাপ ভাসানী নিজেদের মধ্যে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। তারপরও ন্যাপ তাদের নির্বাচনী ইশতাহার ঘোষণা করে।
ন্যাপের (ভাসানী গ্রুপ) নির্বাচনী ইশতেহারের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক ও ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা। এতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয় এবং দেশীয় রাজা, উপজাতীয় এলাকা ও এজেন্সিসহ সব বিশেষ অঞ্চলকে প্রাদেশিক কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘের মৌলিক অধিকার সনদ অনুসারে ধর্ম, বংশ বা গোত্র নির্বিশেষে সব নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়।
ইশতেহারে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। সকল নাগরিকের জন্য খাদ্য, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়। নারী সমাজকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমান অধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বেকার, বৃদ্ধ ও অক্ষমদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি কাশ্মীরের জনগণকে গণভোটের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার আদায়ে সমর্থনের ঘোষণাও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অর্থনৈতিক নীতিতে ইশতেহারটি ছিল স্পষ্টভাবে কৃষক ও শ্রমিকপক্ষীয়। পূর্ব পাকিস্তানে ভূস্বামীদের কাছ থেকে বিনা ক্ষতিপূরণে জমি নিয়ে ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টনের অঙ্গীকার করা হয়। শিল্পক্ষেত্রে ইজারাদারি ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান এবং শ্রমিক আইন সংস্কারের মাধ্যমে শ্রমিকদের কারখানার লভ্যাংশের অংশীদার করা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, ধর্মঘট ও সম্মিলিত দরকষাকষির অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।
পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা প্রশ্নে ইশতেহারে দেশের উভয় অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের অঙ্গীকার ন্যাপকে (ভাসানী) সে সময়ের রাজনৈতিক ধারায় একটি স্পষ্ট প্রগতিশীল অবস্থানে দাঁড় করায়।
মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও রাজনৈতিকভাবেও হতাশা তৈরি হয়। যুদ্ধশেষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক, শাসক দলের ভেতরে ক্ষমতাকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ছাত্রলীগের বিভক্তি, সব মিলিয়ে এক নতুন বিপ্লবী রাজনীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। এই সময়েই ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ ধারণাকে সামনে রেখে নতুন রাজনীতির উত্থান ঘটে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, সংক্ষেপে জাসদ।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর, ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মূল নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, এম এ জলিল, শাজাহান সিরাজ ও কর্নেল (অব.) আবু তাহের।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
জাসদের প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নির্বাচনব্যবস্থাকে বলা হয়, সাধারণ মানুষকে ঠকানোর একটি ফন্দি ও মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ ও বিক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলমাত্র। জাসদ সংবিধানকে ‘আজব কেতাব’ বলে আখ্যায়িত করে এবং দাবি করে এটি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বৈধ করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নিজস্ব সাংবিধানিক রূপরেখা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাসদ তাদের ইশতেহারে ঘোষণা করে, রাষ্ট্র হবে জনগণের প্রতিষ্ঠান। উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্বের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ পৃথক থাকবে, সমাজতান্ত্রিক নীতিবিরোধী সব আইন বাতিল করা হবে, ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং জনগণের জীবিকা, শিক্ষা ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায় রাষ্ট্র বহন করবে।
জাসদ নেতারা ৭৩-এর নির্বাচনকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের প্রথম ধাপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাদের মতে, এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ আসন্ন সামাজিক বিপ্লবের প্রস্তুতির একটি কৌশলমাত্র। একই সঙ্গে তারা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী, ফ্যাসিবাদী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও গণবিরোধী সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। জাসদের অভিযোগ ছিল—আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে বিকিয়ে দিচ্ছে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
স্বাধীনতার পর বিশেষ করে ১৯৭৫–পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদল, একদলীয় ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা, বহুদলীয় রাজনীতিতে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার উত্থান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার ভেতর জনগণের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে আসে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর, ঢাকায় রমনা বটমূলের নিচের উন্মুক্ত মাঠে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জিয়াউর রহমান। বিএনপি আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং জাতীয় ঐক্য গঠনের রাজনৈতিক ঘোষণা দেয়। দলের মূল দর্শন হিসেবে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-কে সামনে আনা হয়, যা ধর্ম, সম্প্রদায় ও শ্রেণি নির্বিশেষে জনগণের ঐক্যের ওপর জোর দেয়।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল
বিএনপি প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১৯৭৯ সালে। ইশতেহারে বিএনপি সারা দেশে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ দ্রুত সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করে। আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হেকিমি ও অন্যান্য দেশজ চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়ন ও বিস্তারের কথাও এতে উল্লেখ করা হয়। গ্রামভিত্তিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে পল্লি অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প স্থাপন, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যমান উন্নয়ন এবং প্রশাসনকে গ্রামমুখী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বাস্তবভিত্তিক ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে জাতীয় সমৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়; প্রতি ইউনিয়নে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, একটি করে সাব-হেলথ সেন্টার স্থাপন এবং প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
কৃষিকে স্বনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাপক কৃষি সংস্কার ও প্রগতিশীল কৃষিনীতি প্রণয়নের কথা বলা হয়। ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে বিশেষ কর্মসূচির অঙ্গীকার করা হয় এবং পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন কমপক্ষে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়। সমবায়ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অনুন্নত অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শিল্পনীতিতে দেশের নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভরশীল দ্রুত শিল্পায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। মৌলিক ও ভারী শিল্প এবং প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট শিল্প রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে রাখার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। শিল্পপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আনা এবং রপ্তানি বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার কথা বলা হয়।
ইশতেহারে নারী ও যুবসমাজকে জাতীয় উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। নারীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, যুবসমাজের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির অঙ্গীকার করা হয়। জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, জনশক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়; পাশাপাশি পঙ্গু ও বয়স্কদের সহায়তা এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
ঘোষণাপত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় বীরের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাদের কল্যাণে বিশেষ তহবিল জোরদারের কথা বলা হয়। সামাজিক অনাচার, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করে জাতীয় প্রতিরক্ষা জোরদার করার অঙ্গীকারও এতে ছিল। পররাষ্ট্রনীতিতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতির কথা ঘোষণা করে বিএনপি। শেষ পর্যন্ত ইশতেহারে জনগণের রায়ের ওপর আস্থা রেখে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিয়ে একটি সুখী, শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
১৯৮২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর সেই শাসনকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও বেসামরিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর সামরিক কর্তৃত্ব বজায় রেখেই দল–রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা, নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা থেকে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই জন্ম নেয় জাতীয় পার্টি (জাপা)।
জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি, ঢাকায়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই ছিল জাপা প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। দলটি গঠনের পর থেকেই সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয় এবং ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন ছাড়া প্রায় সব জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
নির্বাচনী ইশতেহার
জানা যায়, ১৯৯৬ সালের আগে জাতীয় পার্টির কোনো নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশিত হয়নি। পরে জাপার নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়। এর মধ্যে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা, উচ্চ আদালতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, সব ধরনের ‘কালো আইন’ বাতিল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সংসদে নারীদের জন্য আসন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি পূর্ণ উপজেলা ব্যবস্থা ও উপজেলা আদালত প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও করা হয়।
পরবর্তী নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে এসব দাবির সঙ্গে যুক্ত হয় প্রাদেশিক কাঠামো প্রবর্তন, স্থানীয় উন্নয়নে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি।
জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন মোড় নেয়। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, নাগরিক অধিকার সংকোচন ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ঘাটতির বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ এই সময় বিস্ফোরিত হয়। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শিক্ষার্থী ও তরুণদের নেতৃত্ব, যারা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দাবি সামনে আনে।
এই গণঅভ্যুত্থান নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মতো কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা-বিন্যাস, নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা, এসব বিষয় জোরালোভাবে আলোচিত হয়।
এই ভাবনাগুলোকে সংগঠিত রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরে আনতে হিসেবে যাত্রা শুরু করে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি)।
প্রথম নির্বাচনী ইশতেহারে কী আছে
পাঁচ বছরের মধ্যে নতুন এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দলীয় ইশতেহারে এ প্রতিশ্রুতির কথা জানায় দলটি।
‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’– এ ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’বিনির্মাণের রূপরেখা হিসেবে ৩৬ দফা কর্মসূচি তুলে ধরেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এনসিপি একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে।
ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা এবং আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এনসিপি বিগত ১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলে সংঘটিত গণহত্যা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নে স্বাধীন কমিশন করার কথা বলেছে। এছাড়া পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে ১৮৬১ ও ১৮৯৮ সালের পুরোনো আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে ইশতেহারে।
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের জন্য ‘হিসাব দাও’ নামের পোর্টাল চালু করবে এনসিপি। সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি শতভাগ পারফরমেন্সভিত্তিক করার পাশাপাশি আমলাতন্ত্রে ল্যাটারাল এন্ট্রি বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে এনসিপি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এছাড়া টিসিবির ট্রাক সেলের পরিবর্তে কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত মুদি দোকান থেকে পণ্য কেনার সুবিধা রাখবে এনসিপি।
ইশতেহারে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তনের কথা বলেছে এনসিপি। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো, স্নাতক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ এবং শিক্ষা খাতে জিডিপির ৩ শতাংশ বরাদ্দের অঙ্গীকার রয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে দেশের উত্তর ও দক্ষিণে ‘বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন (এসএইচবজেড’ গড়ে তোলা এবং জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর ঘোষণা দিয়েছে জুরাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র নেতৃত্বের দলটি।
নারীর ক্ষমতায়নে সংসদে ১০০ সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা, কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসের পাশাপাশি পুরুষদের এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রেখেছে এনসিপি।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, শেখ হাসিনাসহ পলাতক অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে দলটি। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে সেনাবাহিনীতে ড্রোন ব্রিগেড গঠন ও রিজার্ভ ফোর্স দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার ঘোষণা রয়েছে ইশতেহারে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করে, কেবল সরকার পরিবর্তন নয় বরং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব। এই লক্ষ্যে তারা ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ গড়ে তুলবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের চূড়ান্ত দুর্ভাগ্য যে জীবিত জহির রায়হানকে পায়নি স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্র। আজ থেকে ৬০ বছরের ও আগের সময়ে যেভাবে তিনি ভেবেছেন এবং ভাবনার চিত্রায়ণ করেছেন, তা এতবছর পরে এসেও খুব কম নির্মাতা ভাবতে পারেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আধুনিকায়ন ও উৎকর্ষ শব্দটির সঙ্গে এই মানুষটির নাম তাই ইতি
৩ ঘণ্টা আগে
সুস্থ থাকার জন্য সুষম খাবারের কোনো বিকল্প নেই, এই কথাটি আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাঁচ বছরের শিশুর জন্য যে খাবারটি অমৃতসম, পঞ্চাশ বছরের একজন মানুষের জন্য সেটিই ধীরে ধীরে সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে খাবারের ধরন না বদলালে দীর্
১০ ঘণ্টা আগে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
১ দিন আগে
বয়স বাড়লে ত্বকে ভাঁজ পড়বে, এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু যদি সেই ভাঁজ বিশ কিংবা ত্রিশের কোঠাতেই চোখে পড়তে শুরু করে, তখন তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জানলে অবাক হবেন যে নিত্যদিন ব্যবহার করা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবের স্ক্রিন থেকে বের হওয়া নীল আলো বা ব্লু-লাইটের
১ দিন আগে