ad

তারেক মাসুদের পুরোনো সাক্ষাৎকার

‘পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের মধ্যেই উগ্রপন্থী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে’

ঢাকাই চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান নির্মাতা তারেক মাসুদ। ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে তিনি তাঁদের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অডিওভিশনের মাধ্যমে বহু প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ‘মাটির ময়না’ ২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং এটি তাঁদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।

এই সাক্ষাৎকারে তারেক মাসুদ তাঁর মাদ্রাসাজীবনের শৈশবের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশে সুফি মরমিয়া ঐতিহ্যের গুরুত্ব, গণমাধ্যমে রাজনৈতিক সহিংসতার উপস্থাপন, মাটির ময়না নির্মাণের অভিজ্ঞতা, চলচ্চিত্রে সংগীত ও স্থাপত্যের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৪৯
তারেক মাসুদ। এআই জেনারেটেড ছবি

‘মাটির ময়না’ আপনার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এটি কতটা আত্মজৈবনিক? একজন মুসলিম ও বাংলাদেশি হিসেবে ভেতর থেকে গল্প বলার সুযোগটি আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

তারেক মাসুদ: প্রথমত, এটি অনেকটাই আত্মজৈবনিক। কারণ চলচ্চিত্রটির সব চরিত্র ও ঘটনা আমার নিজের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ। দ্বিতীয়ত, আমরা মূলত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। সুযোগ থাকলে আমি আমার জীবন নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রই বানাতাম। কিন্তু সেটা প্রায় অসম্ভব, কারণ বিষয়টি আমার নিজের জীবনের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ।

চলচ্চিত্রটি যেহেতু আমার নিজের জীবনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এতটা মিলে যায়, তাই এটি একই সঙ্গে নিজের ভেতর, নিজের সমাজ ও নিজের ধর্মের দিকে ফিরে তাকানোরও একটি যাত্রা। আমার মনে হয়, চলচ্চিত্রটির একটি শক্তির জায়গা হয়তো এটাই যে আমি একজন ভেতরের মানুষ। মাদ্রাসা নিয়ে সাধারণত এমন মানুষেরাই কথা বলেছেন, যারা কখনো মাদ্রাসায় পড়েননি। এখন, বিশেষ করে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমেও মাদ্রাসা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। এমনকি পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো যেসব দেশে মাদ্রাসা একটি বড় বাস্তবতা, সেখানেও মাদ্রাসা নিয়ে কথা বলেন মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যারা নিজেরা মাদ্রাসায় পড়েননি এবং সন্তানদেরও সেখানে পড়ান না।

মজার ব্যাপার হলো, ৯/১১-এর আগেই চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য লেখা, শুটিং এবং সম্পাদনা—সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ৯/১১-এর পর মাদ্রাসা হঠাৎ খুব আলোচিত একটি বিষয় হয়ে ওঠে। অথচ আমার ক্ষেত্রে মাদ্রাসা ছিল স্রেফ আমার জীবনের একটি অংশ। সেখানে কাটানো সময়ের আনন্দ ও কষ্ট—দুটোই আমি নিজের মধ্যে বহন করে আসছিলাম। বিষয়টি এমন ছিল না যে আমি বাইরের মানুষের সঙ্গে এসব ভাগ করে নিতে চেয়েছিলাম। বরং অনেক দিন ধরেই আমি আমার সেই মুসলিম ভাইবোনদের সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চেয়েছিলাম, যারা মাদ্রাসার জীবন সম্পর্কে জানেন না। এর একটি কারণ, যেমন বলেছি, খুব কম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানই মাদ্রাসায় পড়তে যায়।

কলেজে পড়ার সময় আমার সহপাঠীরা আমাকে জিজ্ঞেস করত, আমি কোথায় পড়েছি। প্রথম দিকে আমি প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু যখন বলতাম যে আমি মাদ্রাসায় পড়েছি, তখন সহপাঠীদের মধ্যে আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হতো। একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার, আমার কলেজটি ছিল সহশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। ফলে মাদ্রাসা থেকে সেখানে এসে পড়া আমার জন্য পরিবর্তনটা আরও নাটকীয় ছিল!

তখনই ভাবতে শুরু করলাম, মাদ্রাসায় কাটানো আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু একটা করা উচিত। কলেজের পর আমি চলচ্চিত্র সংসদের সঙ্গে যুক্ত হলাম এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র দেখতে শুরু করলাম। এর মধ্যে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীও ছিল। তখন থেকেই ভাবতে শুরু করলাম, এই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানানো যায়।

এরপর ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে থাকার সুযোগ আমার চিন্তাটাকে আরও পরিষ্কার করে দেয়। নিজের দেশ থেকে দূরে থাকলে সাধারণভাবেই নিজের দেশকে একটু দূর থেকে দেখার সুযোগ তৈরি হয়। আর নিউইয়র্কের মতো বহুসাংস্কৃতিক ও বহু জাতিগোষ্ঠীর শহরে থাকলে সেই দৃষ্টিভঙ্গি আরও তৈরি হয়। তখনই ক্যাথরিন ও আমি বিষয়টি নিয়ে সত্যিকার অর্থে কথা বলা শুরু করি—বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে কীভাবে প্রস্তুতি নেব, কীভাবে আমার মাদ্রাসাজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করব।

‘মাটির ময়না’ নামটির তাৎপর্য কী?

তারেক মাসুদ: ছবিতে নিশ্চয়ই মনে আছে, আমার চরিত্রটি ছুটিতে মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটি গ্রামের মেলায় থামে এবং তার বোনকে দেওয়ার জন্য একটি মাটির ময়না কিনে নেয়। বাস্তব জীবনেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। আমি আমার বোনের জন্য একটি মাটির ময়না কিনেছিলাম এবং পরে সেটি আমার বোনের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। আমার কাছে এর বিশেষ অর্থ রয়েছে, কারণ পরবর্তীতে আমার বোনের জীবনে যা ঘটেছিল, তার সঙ্গে এই স্মৃতিটিও জড়িয়ে আছে।

মাটির ময়নাটি আমার কাছে বোনের স্মৃতির কারণে খুবই বেদনাময় ও আবেগপূর্ণ ছিল। কারণ ছোটবেলাতেই আমরা জানতাম, বাবা আমাদের এটি রাখতে দেবেন না—এ ধরনের জিনিসকে পৌত্তলিক মনে করা হতো। অবশ্য শিশু হিসেবে কোনো কিছু নিষিদ্ধ হওয়ার কারণেই সেটির প্রতি আমাদের কৌতূহল আরও বেড়ে যেত। অন্য শিশুরা যখন এ ধরনের মূর্তি, পুতুল ইত্যাদি নিয়ে খেলত, বাবা আমাদের সেগুলো করতে নিষেধ করতেন।

ষাটের দশকের শেষের দিকের কথা মনে পড়ে, যখন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে প্লাস্টিকের পুতুল পাওয়া যেতে শুরু করেছিল। ঢাকায় গেলে আমি আমার কাজিনদের সেগুলো নিয়ে খেলতে দেখতাম। কিন্তু জানতাম, আমি সেই পুতুলগুলো বাড়িতে নিয়ে যেতে পারব না। আমার বোনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটত। তার কাজিন ও বন্ধুরা যে পুতুল নিয়ে খেলত, সে তা থেকে বঞ্চিত ছিল। গ্রামীণ পরিবেশে বিষয়টি আরও কঠিন ছিল, কারণ সেখানে মেলা বসত, আর সেই মেলাগুলোতে নানা ধরনের খেলনা, মূর্তি, পুতুল ইত্যাদি পাওয়া যেত। তাই ছবিটির নাম বেছে নেওয়ার প্রধান কারণগুলোর একটি ছিল শৈশব ও আমার বোনের সঙ্গে এর সম্পর্ক।

যারা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে, তারাই যে উগ্রপন্থী হয়ে যায়—বিষয়টি এমন নয়। অল্পশিক্ষিত মাদ্রাসাছাত্ররাই যে সবচেয়ে বেশি উগ্র ইসলামপন্থী হয়ে ওঠে, তা-ও নয়। বরং সবচেয়ে বেশি পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের মধ্যেই উগ্রপন্থী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে এটি ছবিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনাকেও ধারণ করে—স্বাধীনতা বনাম মানুষের ওপর থাকা বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা। সুফিবাদে বলা হয়, মানুষ মাটি দিয়ে তৈরি আর আত্মার সঙ্গে সবসময় একটি মুক্ত পাখির সম্পর্ক রয়েছে। আত্মা একটি মাটির দেহের ভেতরে বন্দি। শরীর সীমাবদ্ধ, ক্ষণস্থায়ী, ভঙ্গুর ও দুর্বল; অথচ আত্মা সবসময় মুক্ত হতে চায়, তার মধ্যে মুক্তির প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকে।

ছবিটিতে যদি কোনো একটি ধারাবাহিক ও বারবার ফিরে আসার বিষয় থাকে, তা হলো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা শারীরিক যে সীমাবদ্ধতাই হোক না কেন। আয়েশা একজন নারী হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে মুক্ত হতে চায়। আনু নিজের ইচ্ছামতো যা খুশি করার স্বাধীনতা চায়। মিলন জাতীয় ও ভৌগোলিক স্বাধীনতার সন্ধান করে—যেটি তার স্বাধীনতার নিজস্ব, কিছুটা সংকীর্ণ ধারণা। আর মাঝি আরও বড়, মরমি ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার কথা বলে। অর্থাৎ প্রতিটি চরিত্রই নিজের মতো করে স্বাধীনতার সন্ধান করছে।

ছবিতে যে রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো দেখানো হয়েছে, সেগুলোর পটভূমিতেও স্বাধীনতার এই বিষয়টি ফিরে আসে। তাই ছবিটির মূল ভাবনা হলো সীমাবদ্ধতা বনাম স্বাধীনতা। আর এই ভাবনাকেই ‘মাটির ময়না’ নামটি ধারণ করে। একই সঙ্গে এটি সুফিবাদের প্রতি একটি শ্রদ্ধার্ঘ্যও, বিশেষ করে আত্মা ও শরীরের সম্পর্ক নিয়ে সুফি ভাবনার প্রতি।

বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে সুফি মরমিয়া ঐতিহ্যের গুরুত্ব, ইসলামের ভেতরের ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক—আপনি ছবিতে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ধর্মীয় চর্চার যে গভীরতা ও ধর্মতাত্ত্বিক পরিশীলন রয়েছে, সেটিও এসেছে। বিশেষ করে শেষের গানটিতে প্রথাগত ও মরমি ইসলামের মধ্যে একটি আকর্ষণীয় দ্বন্দ্ব দেখা যায়। সেখানে শুরুতে যে নারীশিল্পী প্রথাগত ইসলামের অবস্থান নেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই মরমি ও মানবতাবাদী অবস্থানের সঙ্গে যোগ দেন। আপনি কি মনে করেন, সাধারণ মানুষের ধর্মীয় চর্চা মূলত মরমি ও মানবতাবাদী, আর প্রথাগত ধর্মীয় চর্চা রাষ্ট্রের—বিশেষ করে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের—তৈরি একটি কাঠামো?

তারেক মাসুদ: আমি নির্দিষ্টভাবে পাকিস্তানের মতো কোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ কথা বলতে পারব না। আমি সাধারণভাবে পাকিস্তান, বাংলাদেশ কিংবা অন্য যেকোনো মুসলিম দেশের কথা বলব। তবে বাংলাদেশকে আমি সবচেয়ে ভালোভাবে চিনি, তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলতে পারি—সাধারণ মানুষের ইসলাম নিঃসন্দেহে বাস্তব জীবনের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। এই অর্থে সাধারণ মানুষের ইসলাম অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বহুত্ববাদী, বৈচিত্র্যময় ও সমন্বয়ধর্মী। এটি প্রজ্ঞা ও সাধারণ বোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

এর সম্পূর্ণ বিপরীত হলো যাকে আমি বলি ‘শাস্ত্রনির্ভর’ ইসলাম—এক ধরনের বইপড়া ও আধুনিকতাবাদী ইসলাম। তবে এই আধুনিকতাবাদী প্রবণতা শুধু ইসলামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আরও বিস্তৃত এবং সব ধর্মের ওপরই এর প্রভাব রয়েছে। আধুনিকতাবাদীরা নিজেদের স্বার্থে এই শাস্ত্রনির্ভর ইসলামকে ব্যবহার করছে। তারা সংস্কৃতি নয়, একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাস বা মতবাদ চাপিয়ে দিতে চাইছে। অথচ স্পষ্টতই ইসলাম শুধু একটি বিশ্বাসব্যবস্থা নয়, এটি অন্য যেকোনো ধর্মের মতোই একটি সংস্কৃতি। ধর্মের একটি বড় অংশই সংস্কৃতি।

সব জায়গাতেই আধুনিকতাবাদীরা একটি বিমূর্ত বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে—বই থেকে, শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটি কখনোই সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল না। সাধারণ মানুষের ইসলাম স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়েছে এবং এর পেছনে সুফি মরমি ঐতিহ্যের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম তরবারির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েনি। কোনো কোনো জায়গায় হয়তো ভূমি তরবারির মাধ্যমে জয় করা হয়েছিল, কিন্তু মানুষের আত্মা জয় হয়েছিল সুফিবাদের মাধ্যমে। গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনটা—মাটি জয় করা, নাকি মানুষের আত্মা জয় করা? সুফিরা মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। এটা শুধু কথার কথা নয়; বাস্তব ঘটনাপ্রবাহও এমনই ছিল।

এখন ইরাকের দিকে তাকালেও দেখা যায়, মানুষের মন জয় করতে চাইলে তরবারি দিয়ে সেটা করা সহজ নয়। কারও হৃদয় জয় করতে চাইলে অন্য পথ অনুসরণ করতে হয়।

এই অর্থে আমি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ইসলামের শিকড়কে খুব গভীর বলে মনে করি। পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই সুফিবাদের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে, যা এই অঞ্চলের বিভিন্ন সুফি সাধকের মাজারে দেখা যায়। মানুষের এই ধরনের ধর্মীয় চর্চার প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ রয়েছে। এটি তাদের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। এর জন্য তাদের আলাদা করে ধর্মীয় মতবাদে দীক্ষিত করার প্রয়োজন হয় না। তারা সাধক ও মাজারকে শ্রদ্ধা করতে পারে, গান ও সংগীতের মাধ্যমে ঈশ্বরের উপাসনা ও উদযাপন করতে পারে।

ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বৈচিত্র্য। বাংলাদেশে ইসলাম স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খুব গভীরভাবে মিশে গেছে। ইসলাম যেসব দেশ ও সংস্কৃতিতে বিকশিত হয়েছে, সেসব দেশের সংস্কৃতির মতোই ইসলামও বৈচিত্র্যময়। এটাই এর সৌন্দর্য। ইসলাম স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে—এটাই সুন্দর। এটাই যেকোনো বড় ধর্মের শক্তি; এটি নিজের সংস্কৃতি অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় না।

আপনার কি মনে হয়, সাধারণ মানুষের এই মানবতাবাদী ও সুফি ঐতিহ্য আজ বাংলাদেশে হুমকির মুখে? স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সমন্বয়ধর্মী পরিচয়ের ইতিহাসকে আপনি কীভাবে দেখেন?

তারেক মাসুদ: বাংলাদেশের সৃষ্টি পাকিস্তানের সৃষ্টির চেয়ে একেবারেই আলাদা ছিল। পাকিস্তান কমবেশি ইসলামকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছিল—দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে, অর্থাৎ মুসলমানদের ধর্মের ভিত্তিতে একটি আলাদা রাষ্ট্র প্রয়োজন—এই ধারণা থেকে। আর বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল এই ধারণার ভিত্তিতে যে রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।

কিন্তু সংবিধান ও সরকারের ক্ষেত্রে সেখান থেকে অবশ্যই বিচ্যুতি ঘটেছে। ১৯৭৫ সাল থেকে আমরা আবার পাকিস্তানি সামরিক শাসনের উত্তরাধিকারের দিকে ফিরে যাই। সামরিক শাসকদের যেহেতু জনপ্রিয় সমর্থনের নিজস্ব কোনো ভিত্তি থাকে না, তারা সবসময় ধর্মকে ব্যবহার করে। নেতারা নিজেরা ইসলামের প্রতি আগ্রহী না হলেও জনপ্রিয় সমর্থন পাওয়ার জন্য সংবিধানে ইসলামী উপাদান যুক্ত করতেন। তারা নিজেদের ইসলামের স্বঘোষিত রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেন, বলতেন ইসলাম বিপদের মধ্যে আছে এবং তারাই ইসলামকে রক্ষা করবেন। অবশ্য এসবই ছিল নিজেদের স্বার্থে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। সংবিধানও এখনো পুরোপুরি সেই পরিবর্তন থেকে ফিরে আসেনি। এমন কিছু সংশোধন করা হয়েছিল, যার ফলে সংবিধান আগের তুলনায় কম ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে ওঠে।

এরপর ৯/১১ এবং ভারতে মুসলমানদের ওপর সংঘটিত নানা নির্যাতনের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ইসলামী মৌলবাদী প্রবণতা বেড়েছে। তবে ইসলামী দলগুলো এখনো নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে, তার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও বিষয়টিকে দেখা যায় এবং সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এর কারণ কিছুটা বোঝা যায়।

তারেক মাসুদ। ছবি: সংগৃহীত
তারেক মাসুদ। ছবি: সংগৃহীত

তবে একই সময়ে, যেমন আমরা আগেই আলোচনা করেছি, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে সাধারণ মানুষের ইসলামের মধ্যে সুফি প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী।

আরেকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ১৯৭১ সালে কয়েকটি বড় ইসলামী দল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল। প্রতিটি নির্বাচনের সময় বিষয়টি আবার সামনে আসে। যুদ্ধাপরাধের সেই তকমা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে সেটিও একটি প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নিয়ে তাদের পক্ষে নির্বাচনে জয়ী হওয়া খুব কঠিন। এমনকি পাকিস্তানেও এখন পর্যন্ত কোনো ইসলামী দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি।

চলচ্চিত্রটিতে সংগীত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গান ও সংগীত সম্পর্কে একটু বলবেন? এগুলো কোন ঐতিহ্য থেকে এসেছে এবং আপনি যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন, সেগুলোর সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক কী?

তারেক মাসুদ: প্রথমত, এই গানগুলো একটি জীবন্ত সংস্কৃতির অংশ। এগুলো শুধু ষাটের দশকের সংস্কৃতি নয়। এটি একটি বিশাল ঐতিহ্য, যার পেছনে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে আছে ইসলামী সুফি ঐতিহ্য, বিশেষ করে সুফি কবিতা, বৈষ্ণব মরমিবাদ এবং বৌদ্ধ মরমিবাদ।

ব্রাহ্মণদের হাতে দক্ষিণ এশিয়া থেকে বৌদ্ধরা বিতাড়িত হওয়ার আগে পূর্ববঙ্গ ছিল তাদের শেষ আশ্রয়স্থল। ফলে এখানে বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনেক কিছুই রয়ে গেছে এবং বৌদ্ধ সংগীতেরও একটি বড় প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশে এটিকে ‘বাউল’ বলা হয়, আর এখন এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে অনেক নারীশিল্পী রয়েছেন। ছবিতে যে নারীদের গাইতে দেখা যায়, তারা অভিনেত্রী নন; তারা সত্যিকারের গায়িকা। তাদের বলা হয় ‘বয়াতি’ শিল্পী এবং তারা খুব জনপ্রিয়। ছবিতে অবশ্য আমরা তাদের মাত্র তিন-চার মিনিট গান গাইতে দেখেছি। কিন্তু বাস্তবে তাদের অনেকেই একটানা কয়েক ঘণ্টা গান করেন—প্রায়ই রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত। আর সেই গানের বড় একটি অংশ তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি বা পরিবেশিত হয়।

বাউল সংস্কৃতি এখন আরও জনপ্রিয় হচ্ছে এবং শহরের তরুণ ব্যান্ডগুলোর ওপর এর বড় প্রভাব পড়ছে। এসব ব্যান্ড বাউল সংস্কৃতি থেকে ব্যাপকভাবে অনুপ্রেরণা নিচ্ছে এবং বাউল সুফি গানকে নতুনভাবে পরিবেশন বা রিমিক্স করছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশেও এমনটা দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের বাউল সংস্কৃতির একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের কাজের মাধ্যমে এই সংস্কৃতি আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, বাউল সংগীতের সাম্যবাদী দর্শন শুধু গ্রামীণ এলাকায় নয়, শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। আমার মনে হয়, এই মহান ঐতিহ্যের জন্য এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময় থেকে বাংলা জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বাংলার গ্রামাঞ্চলের সৌন্দর্য গভীরভাবে যুক্ত। আপনার চলচ্চিত্রেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের সৌন্দর্য খুব স্পষ্টভাবে এসেছে। আপনি কি নিজেকে সেই ঐতিহ্যের অংশ মনে করেন?

কিছুটা মনে করি, আবার কিছুটা করি না।

তারেক মাসুদ: শহরের তুলনায় বাংলাদেশের গ্রাম অবশ্যই সুন্দর। তবে সেটা তো যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই সত্যি। কিছু চলচ্চিত্রে ইচ্ছা করেই সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এটা একটা ফাঁদ। বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে সমতল দেশ হলেও এর ভূদৃশ্য অসাধারণ ও বৈচিত্র্যময়।

তবে আমরা ইচ্ছা করেই দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখানোর সেই ফাঁদে পড়তে চাইনি। আমরা বরং গ্রামের সাধারণ মানুষের ভেতরের সৌন্দর্যকে ধরতে চেয়েছি—তাদের সংস্কৃতি থেকে জন্ম নেওয়া এক ধরনের অন্তর্গত সৌন্দর্য। তারা কোনো তারকা বা সুন্দর মুখের মানুষ নয়; তারা সাধারণ পরিশ্রমী কৃষক, যাদের নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে।

সেই অর্থে এটি কোনো গীতল বা কাব্যিক চলচ্চিত্র নয়। আমরা বেশি গুরুত্ব দিয়েছি সংস্কৃতিকে—উৎসব, আবৃত্তি, গ্রামের মেলা, ঈদ—এসবকে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক দৃশ্যের চেয়ে মানুষের ভেতরের সৌন্দর্যকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি।

অন্য অনেক বাংলা চলচ্চিত্রে—সত্যজিৎ রায়ের মতো মহান নির্মাতাদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি—গ্রাম বা বাংলার গ্রামীণ জীবনকে কাব্যিক ও রোমান্টিক করে দেখানোর একটি প্রবল প্রবণতা রয়েছে। আমরা সচেতনভাবেই সেটা এড়িয়ে গেছি।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় আমরা শুধু হলিউড ও বলিউডের শৈলী ও কৌশলই অনুকরণ করি না, তাদের সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তুও অনুকরণ করি। খুব কম ক্ষেত্রেই দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্রে কোনো মুসলিম পরিবারের সংস্কৃতি বা মুসলিম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান দেখা যায়।

বাংলাদেশে ১৯৭১ নিয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত অনেক চলচ্চিত্রে, যদি সবগুলোতে না-ও হয়, বাণিজ্যিক ও শোষণমূলকভাবে অতিরিক্ত সহিংসতা দেখানো হয়েছে। ধর্ষণের দৃশ্যসহ নানা ধরনের নৃশংসতা এত বেশি দেখানো হয়েছে যে বিষয়টি একটি প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।

শুরুতে আমরাও এই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এই ছবিতে আমরা দৈনন্দিন জীবনের মধ্য দিয়ে একটি মুসলিম পরিবারের জটিল সাংস্কৃতিক কাঠামোকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি—পরিবার, নামাজ, অজু এবং এই পরিবারের অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানসহ।

পথের পাঁচালী আমার কাছে একটি বড় অনুপ্রেরণা। সত্যজিৎ রায়ের আমি একজন বড় ভক্ত এবং তাঁর সরলতা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। মাটির ময়না-তে আমি সচেতনভাবে সেই সরলতাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি।

পথের পাঁচালী একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু পরিবারের জীবনকে অসাধারণভাবে তুলে ধরে। আমরা খুবই বিনীতভাবে একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম পরিবারের জীবনকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বাংলার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে হলে এই দুই ধরনের চিত্রায়ণই দেখা দরকার।

শুধু মাটির ময়না দিয়ে পুরো বাংলাকে তুলে ধরা সম্ভব নয়। আর আমার নিজের জীবনের সঙ্গে যতটা ঘনিষ্ঠই হোক না কেন, আমি বাঙালি হিন্দু পরিবার ও সমাজকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারব না। আমি ধর্মচর্চাকারী মুসলিম কি না, সেটা আলাদা বিষয়। কিন্তু আমি যে একজন মুসলিম, সেটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ফলে একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা ও জীবনযাপনের অভিজ্ঞতাকে কিছুটা নির্ভুলভাবে তুলে ধরতে পারি।

আপনি পুরোনো মসজিদ ও মাদ্রাসার স্থাপত্যের পাশাপাশি এর পাশের ঘাটকেও ছবিতে বেশ সময় দিয়ে দেখিয়েছেন। এই স্থাপত্য আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?

তারেক মাসুদ: এটি মূলত খুবই ব্যক্তিগত বিষয়। আমার শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকেই এগুলো এসেছে এবং স্থাপত্যকে অনেকটা শিশুর চোখে দেখার অভিজ্ঞতাকে প্রতিফলিত করে।

আমার ছোট্ট গ্রাম থেকে আমি যখন ওই শহরে গেলাম, তখন সেখানে অসাধারণ সুন্দর, কিন্তু একই সঙ্গে অদ্ভুত ও আমার কাছে ভয় জাগানো বিশাল স্থাপত্য দেখতে পেলাম। সেই বিশাল স্থাপত্য আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। এর মধ্যে এক ধরনের মহিমা ছিল, আবার একই সঙ্গে সৌন্দর্যও ছিল। হয়তো এর কারণ ছিল আমি যে নদীঘেরা, পরিবর্তনশীল গ্রাম থেকে এসেছিলাম, তার সঙ্গে এই স্থাপত্যের তীব্র বৈপরীত্য।

মাদ্রাসার সবচেয়ে পুরোনো যে স্মৃতিগুলোর একটি আমার মনে আছে, তা হলো মাদ্রাসার সামনে বিশাল সিঁড়িগুলোর ওপর কুয়াশা। ছোট্ট ছেলে হিসেবে সিঁড়িগুলো আমার কাছে অনেক বড় ও বিশাল মনে হতো, আর কুয়াশা সেই জায়গাটিকে এক ধরনের রহস্যময়তা দিত।

অবচেতনভাবেই হয়তো চলচ্চিত্রটি বানানোর সময় আমি আমার শৈশবের সেই স্থাপত্য ও আচার-অনুষ্ঠানের দৃশ্যগুলো আবার তৈরি করতে চেয়েছি। ছবিতে যে সিঁড়িগুলো দেখা যায়, সেগুলো আমার বাস্তব জীবনের মাদ্রাসার সিঁড়ির সঙ্গে খুব মিল ছিল।

কখনো কখনো আমি এসব বিষয়ে এতটাই জেদি ছিলাম যে আমার দলের জন্য কাজটা কঠিন হয়ে যেত। যেমন ভোরের আগে সিঁড়ির ওপর কুয়াশা—আমি ঠিক সেই পরিস্থিতিটা তৈরি করতে চাইতাম। এটা কোনো হলিউডের চলচ্চিত্র ছিল না, যেখানে কৃত্রিমভাবে কুয়াশা তৈরি করা যায়। আমাদের কুয়াশা আসার জন্য তিন রাত অপেক্ষা করতে হয়েছিল!

আমার মনে আছে, বর্ষার এক বৃষ্টিভেজা দিনে মাদ্রাসায় ফেরার সময় আমি এই কুয়াশা দেখেছিলাম। সেই দৃশ্যটি আমার মনে চিরদিনের জন্য গেঁথে গিয়েছিল। আমি সেটিই আবার তৈরি করতে চেয়েছিলাম—কালো মেঘে ঢাকা আকাশ, সামান্য বাতাস, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি এবং চারপাশে জমে থাকা পানি।

আসলে আমার বোন মারা যাওয়ার পরদিন আমরা তার কবরটিও খুঁজে পাচ্ছিলাম না, কারণ পানিতে সেটি ডুবে গিয়েছিল। ছবিতে যে স্থাপত্য ও দৃশ্যগুলো দেখা যায়, সেগুলো এসব ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকেই এসেছে।

যারা এই বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের কাছে ঘাটে ছেলেদের বারবার অজু করার দৃশ্যগুলো দেখলে সঙ্গে সঙ্গে বেনারসের গঙ্গা ও সেখানে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের স্নান বা ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের দৃশ্য মনে হতে পারে। আপনি কি ইচ্ছাকৃতভাবে এই সম্পর্কটি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন?

তারেক মাসুদ: না, এটি সচেতনভাবে তৈরি করা কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে এ ধরনের অভিন্ন প্রতীকের সৌন্দর্যই এখানে। এই মিল শুধু হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে নয়, খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপটিজমের সঙ্গেও রয়েছে। পানির একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

ছবিতে এ ধরনের আরও কিছু অভিন্নতার ইঙ্গিত রয়েছে। যেমন ইব্রাহিমের আত্মত্যাগের গল্পের একটি ইঙ্গিত রয়েছে। শিক্ষকের নাম আমরা ইব্রাহিম রেখেছি। এটি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলামের একটি অভিন্ন সূত্রের দিকে ইঙ্গিত করে—একই ঐশী গ্রন্থের উত্তরাধিকার ভাগ করে নেওয়ার ধারণার দিকে।

আমরা সাধারণত ধর্মগুলোর মধ্যে সংঘাতের কথাই বলি। কিন্তু তাদের মধ্যে কতগুলো মিল রয়েছে, সেটিও সমানভাবে বিস্ময়কর। মূলত একই বিষয়ই রয়েছে, শুধু বাইরের পার্থক্যের আবরণটি আলাদা।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক নৃশংসতা ও গণহত্যার কথা বিবেচনা করলে, চলচ্চিত্রে সামরিক অভিযানকে বরং সংযতভাবেই দেখানো হয়েছে। আপনি কি সচেতনভাবেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

তারেক মাসুদ: আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ঠিক কেন, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে কোনো চলচ্চিত্রে সামান্য রক্তও আমি দেখতে পারি না। সহিংসতার দৃশ্য আমি দেখতে পারি না।

আমরা সরাসরি সহিংসতা দেখানোর বদলে সহিংসতার একটি অনুভূতি তৈরি করতে চেয়েছি। দর্শক যেন সহিংসতাকে চোখে দেখার বদলে অনুভব করেন। যুদ্ধ নিয়ে তৈরি প্রায় সব চলচ্চিত্রেই অতিরিক্ত সহিংসতা দেখানো হয়—এটা একটা প্রতিষ্ঠিত রীতির মতো হয়ে গেছে।

আরেকটি বিষয় হলো, আমরা সচেতনভাবেই একটি কোমল চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছি। এই কোমলতাই চলচ্চিত্রটির মূল বিষয়—সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও শান্তির আহ্বান। তাই এর বিপরীতভাবে অতিরিক্ত সহিংসতা দেখানো সম্ভব ছিল না।

আরও একটি বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭১ নিয়ে এখন পর্যন্ত নির্মিত অনেক চলচ্চিত্রে, যদি সবগুলোতে না-ও হয়, বাণিজ্যিক ও শোষণমূলকভাবে অতিরিক্ত সহিংসতা দেখানো হয়েছে। ধর্ষণের দৃশ্যসহ নানা ধরনের নৃশংসতা এত বেশি দেখানো হয়েছে যে বিষয়টি একটি প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।

তাই মাটির ময়না এক অর্থে এই প্রবণতার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। অতিরিক্ত নৃশংসতা ও সহিংসতা দেখানোর বিপরীতে এটি দাঁড়িয়েছে। আমরা মনে করেছি, একই প্রবণতাকে আবার অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।

ক্যামেরায় চোখ তারেক মাসুদের। ছবি: সংগৃহীত
ক্যামেরায় চোখ তারেক মাসুদের। ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংঘটিত গণহত্যা একটি যুদ্ধাপরাধ এবং চলচ্চিত্রে সেটি খুব স্পষ্টভাবেই প্রকাশ করা হয়েছে, একই সঙ্গে এর নিন্দাও করা হয়েছে। সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু গ্রাফিক বা সরাসরি দেখানোর প্রয়োজন নেই।

আমাদের সমসাময়িক গণমাধ্যম ঠিক এটাই করে—গ্রাফিক সহিংসতা বারবার পুনরুৎপাদন করে। এটি একটি দুষ্টচক্র। বাস্তবে সহিংসতা আছে, আর গণমাধ্যম সেই সহিংসতার প্রতিফলন ঘটায়। এর ফলে মানুষের সংবেদনশীলতা ভোঁতা হয়ে যায়, মানুষ ধীরে ধীরে সহিংসতার প্রতি অসাড় হয়ে পড়ে। এ কারণেই পৃথিবীতে কী ঘটছে, এত সহিংসতা ঘটছে—এসব নিয়ে মানুষ আর খুব একটা পরোয়া করে না।

মানুষ যেন সহিংসতায় আক্রান্ত হয়, তার বিধ্বংসী পরিণতি অনুভব করে—সেটি দেখানো গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে শুধু সহিংসতা দেখালে মানুষ আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে। আমরা সেই পথ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি।

আপনার ছবির মাঝি চরিত্রটি—যিনি অনেকটা সাধুর মতোও—কাজী, অর্থাৎ আনুর বাবা সম্পর্কে একটি মজার কথা বলেন। তিনি বলেন, কাজী একসময় ইংরেজদের মতো পোশাক পরতেন, পরে যেন নতুন করে জন্ম নেন। ছবিতে আপনি এই পরিবর্তনটি খুব একটা দেখাননি। তাহলে এই কথার মাধ্যমে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

তারেক মাসুদ: প্রথমত, এটিও আত্মজৈবনিক। এটি আমার বাবার গল্প থেকেই এসেছে। আমার বাবা কলকাতার সবচেয়ে পশ্চিমা ধাঁচের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি পশ্চিমাদের চেয়েও বেশি পশ্চিমাপন্থী ছিলেন। নিজেকে প্রকাশ্যে নাস্তিক হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি হিন্দুস্তানি ধ্রুপদি সংগীতের শিল্পী ছিলেন এবং তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ, উদারপন্থী ও পশ্চিমীকৃত একটি পরিবার থেকে এসেছিলেন।

এখানেই পুরো বিষয়টির একটি বৈপরীত্য রয়েছে। যারা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে, তারাই যে উগ্রপন্থী হয়ে যায়—বিষয়টি এমন নয়। অল্পশিক্ষিত মাদ্রাসাছাত্ররাই যে সবচেয়ে বেশি উগ্র ইসলামপন্থী হয়ে ওঠে, তা-ও নয়। বরং সবচেয়ে বেশি পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের মধ্যেই উগ্রপন্থী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এটি শুধু ইসলাম বা মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রে সত্যি নয়। খ্রিষ্টধর্ম ও হিন্দুধর্মেও একই ঘটনা দেখা যায়। বেশি পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষই ‘নতুন করে’ মুসলিম, ‘নতুন করে’ খ্রিষ্টান কিংবা ‘নতুন করে’ হিন্দু হয়ে উঠছেন।

আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং ছবিও এই বিষয়টি প্রতিফলিত করে—সমস্যা তৈরি করেন ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মবিশ্বাসী মানুষরা নন; বরং যারা নতুন করে ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যেই এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

পশ্চিমা দেশগুলোতেও এর উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন নতুন করে খ্রিষ্টান হওয়া মানুষরা—হোয়াইট হাউসেও এমন উদাহরণ রয়েছে!—অনেক বেশি উগ্রপন্থী।

আমার বাবা ও ছবির কাজী চরিত্রের মধ্যে আরেকটি মিল রয়েছে। যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধের পর আমি আমার বাবকে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে দেখেছি। তাঁর বিশ্বাস ছিল খুব কঠোর ও দৃঢ়। কিন্তু বছরের পর বছর সেই বিশ্বাস অনেক নরম হয়ে আসে।

ছবির কাজী চরিত্রের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। ছবির শেষদিকে মুসলমান মুসলমানকে হত্যা করতে পারে না—এই সরল বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, ধ্বংস হয়ে যায়। আমার বাবার ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল। তিনি ধীরে ধীরে অনেক কম কর্তৃত্বপরায়ণ, অনেক বেশি শান্ত ও নরম হয়ে ওঠেন। নিজের বিশ্বাস নিয়েও তিনি গভীরভাবে নাড়া খান। একপর্যায়ে তিনি আমাকে মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে নেন এবং সাধারণ স্কুলে ভর্তি করেন।

মানুষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরিণত হয়, ধর্ম সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধির মধ্য দিয়ে পরিণত হয়। আপনি যখন কোনো ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে সবচেয়ে কম জানেন, তখন হঠাৎ ধর্মীয় হয়ে উঠলে আপনার মধ্যে এক ধরনের তীব্র উৎসাহ ও আবেগ দেখা যায়। কারণ আপনি যে নতুন মতাদর্শ গ্রহণ করেছেন, সে সম্পর্কে আপনার জ্ঞান তুলনামূলকভাবে কম।

কিন্তু আপনি যখন আরও বেশি জানেন, তখন আপনার মধ্যে আরও বেশি প্রজ্ঞা তৈরি হয়। কাজী চরিত্রটির ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটে।

আপনি আগেই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, তবু জানতে চাই—‘মাটির ময়না’র সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র তুলনা করা হয়েছে। এই তুলনাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

তারেক মাসুদ: একটি শিল্পকর্মে অন্য একটি শিল্পকর্মের প্রতি সচেতনভাবে ইঙ্গিত করা এবং সেটির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো একটি প্রচলিত শিল্পরীতি। আমি এক অর্থে একজন বাঙালি মুসলিম পরিবারের সমান্তরাল গল্প বলতে চেয়েছিলাম। আগেই বলেছি, আমার চলচ্চিত্রটি সত্যজিৎ রায় এবং তাঁর কাজের প্রতি একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

অবশ্যই আমার কাজকে সত্যজিৎ রায়ের কাজের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে—এটা নিয়ে আমি খুব গর্বিত। একই সঙ্গে এটি মানুষের বোঝার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় হিসেবেও কাজ করতে পারে। কেউ যদি জানেন যে আমার চলচ্চিত্রটি তাঁর ছবির মতো, তাহলে ছবিটি কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে তিনি একটি ধারণা পেয়ে যান।

আর যেমন বলেছি, এটি একটি শ্রদ্ধার্ঘ্যও। সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে আমি তাঁর সরলতা ধার করেছি, তাঁর কাছে আমি ঋণী। আমরা আড়ম্বর ও কৃত্রিমতা এড়িয়ে চলতে চেয়েছি। ছবিতে বড় কোনো অভিনয় নেই, জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা নেই, বিশাল কোনো দৃশ্য নেই। কিছুই নেই। এটি খুব সরল, সরলরৈখিক এবং অনেকটাই না-বলা একটি গল্প।

পথের পাঁচালীর প্রতি সচেতনভাবে শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি ছাড়াও আরও কিছু মিল রয়েছে, যেগুলো কাকতালীয়। যেমন আমার ব্যক্তিগত জীবন মাটির ময়না-র চেয়ে পথের পাঁচালী-র সঙ্গে অনেক বেশি মিলে যায়।

স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে তারেক মাসুদ। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে তারেক মাসুদ। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

পথের পাঁচালীতে দুর্গা অপুর চেয়ে বড় ছিল। বাস্তব জীবনেও আসমা—ছবিতেও যে নামটি রাখা হয়েছে—ছিল আমার বড় বোন। কিন্তু চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে আমি তাকে ছোট বোন করেছি।

আমি যখন প্রথম পথের পাঁচালী দেখি, তখন আমার বয়স প্রায় ১৪ বা ১৫। মাদ্রাসায় থাকাকালে আমি কোনো চলচ্চিত্র দেখতে পারতাম না। ফলে এটি ছিল আমার দেখা প্রথম দিককার চলচ্চিত্রগুলোর একটি।

মাদ্রাসায় আমাকে শেখানো হয়েছিল, চলচ্চিত্র খুবই খারাপ ও অশ্লীল একটি বিষয়—গান ও নাচ থাকে, আর অবশ্যই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কথাটা সত্যি! তাই চলচ্চিত্রের প্রতি আমার এক ধরনের বিরূপতা তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু পথের পাঁচালী যখন দেখি, সেটি ছিল আমার দেখা প্রথম দিককার চলচ্চিত্রগুলোর একটি এবং আমি অবিশ্বাস্যভাবে অভিভূত হয়েছিলাম। কারণ ছবিটি আমার নিজের গল্পের এত কাছাকাছি ছিল।

আমার বোনের সঙ্গে আমার সম্পর্কও ওই ছবিতে দেখানো সম্পর্কের মতো ছিল। সে ছিল খুব সক্রিয় ও চঞ্চল, প্রকৃতিকে ভালোবাসত, সবসময় বাইরে যেতে চাইত। আর আমি ছিলাম লাজুক, শান্ত, বাধ্য এবং নরম স্বভাবের।

ছবির বাবার চরিত্রটিও আমার বাবার মতো ছিল—একেবারে উদাসীন ও বাস্তবতা সম্পর্কে অসচেতন একজন পুরুষ! আর ছবির মা শুধু পরিবারের সবকিছু সামলাতেন না, পরিবারের পুরো সংগ্রাম ও বোঝাটাই যেন তাঁর ওপর ছিল। সেটিও আমাকে আমার মায়ের কথা মনে করিয়ে দিত।

আর আমার বোনের মধ্যে জীবনের প্রতি যে আকাঙ্ক্ষা, জীবনের প্রতি যে তীব্র আনন্দ ছিল, দুর্গার মধ্যেও সেটি ছিল। একইভাবে ছিল প্রকৃতি, উৎসব—সবকিছু। আমি এই সুন্দর বাঙালি লোকজ ও পৌত্তলিক উৎসবগুলোর মধ্যেই বড় হয়েছি।

তাই এটি একদিকে কাকতালীয়ও। কিন্তু আবার আমাদের চলচ্চিত্রে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে, যা পথের পাঁচালীতে স্বাভাবিকভাবেই নেই। সেটি হলো ধর্মতাত্ত্বিক বা ধর্মীয় মাত্রা।

আর মাটির ময়নার পটভূমিতে রয়েছে একটি জাতির জন্ম। বিষয়টি খুবই আকর্ষণীয়, কারণ এখানে শুধু প্রধান চরিত্রের বেড়ে ওঠার গল্প নেই; একই সঙ্গে একটি জাতিরও বেড়ে ওঠার গল্প রয়েছে। এটি একই সঙ্গে একটি সময়ের, একটি জাতির এবং একটি ছোট ছেলে ও তার পরিবারের গল্প। এই জায়গাগুলোতেই পথের পাঁচালী থেকে আমাদের ছবির কিছুটা ভিন্নতা তৈরি হয়েছে।

আর কারা আপনার কাজকে প্রভাবিত করেছেন বা অনুপ্রাণিত করেছেন?

তারেক মাসুদ: আমি যে চলচ্চিত্র দেখি, সেখান থেকেই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হই! তবে অনেকের মধ্যে বিশেষভাবে ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি এবং জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতা ওজুর সরলতা ও সংযম আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

যেকোনো চলচ্চিত্র নির্মাতা সরলতাকে গুরুত্ব দিলে তিনি আমাকে আকৃষ্ট করেন। আমি কারসাজি বা চমকপ্রদ কৌশলের ভক্ত নই। জাঁকজমকও আমার পছন্দ নয়। আর চলচ্চিত্রে সহিংসতারও আমি কোনোভাবেই ভক্ত নই!

এখন কী নিয়ে কাজ করছেন? আরেকটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা আছে?

তারেক মাসুদ: হ্যাঁ। আমরা সবেমাত্র একটি নতুন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুটিং শেষ করেছি। ছবিটির নাম অন্তর যাত্রা। ইংরেজি নাম কী হবে, তা এখনো ঠিক করিনি। তবে আক্ষরিক অর্থ হলো ‘অন্তরের যাত্রা’ বা ‘ভেতরের যাত্রা’। এবারও গল্পটি একজন একক মা ও তাঁর ছেলেকে নিয়ে।

বিষয়গতভাবে ছবিটি খুবই সমসাময়িক কিছু বাস্তবতাকে স্পর্শ করে। বিশেষ করে পরিচয়ের বিষয়টি—পরিচয় নিয়ে সংকট নয়, বরং পরিচয়ের জটিলতা। যেসব প্রজন্ম নিজেদের জন্মভূমির বাইরে, যেমন ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় বড় হয়ে উঠছে, তাদের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

গল্পটি বাংলাদেশে সেট করা। মা ও ছেলে ১৫ বছর পর বাংলাদেশে ফিরে আসে। তাদের আত্মঅনুসন্ধান, বিচ্ছিন্নতা, পরিচয়—এসব বিষয়ই ছবিতে উঠে আসে।

মায়ের জন্য এই ফিরে আসাটা খুব জটিল। তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এবং তিনি অনেক তিক্ততা বয়ে বেড়াচ্ছেন। এরপর তাঁর সাবেক স্বামী মারা যান এবং তাঁকে ছেলের সঙ্গে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে বাংলাদেশে ফিরে আসতে হয়। তাই তাঁর জন্য এই ফিরে আসা খুবই জটিল একটি অভিজ্ঞতা। আর ছেলেটির জন্য এটি নিজের দেশকে নতুন করে আবিষ্কারের মতো।

মূলত ছবিটি প্রবাসী জীবনের মানুষদের মুখোমুখি হওয়া বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে। বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে।

আমরা নিজেরাও যেহেতু অনেকটা সময় দেশের বাইরে কাটাই, তাই আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে ছবিটি কিছু বাস্তব ঘটনার ওপরও ভিত্তি করে তৈরি। আশা করছি, চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যে এটি মুক্তি পাবে।

(সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এশিয়া সোসাইটির নেরমিন শেখ। ইংরেজি থেকে অনূবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত