স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম: ‘চিহ্ন’ পত্রিকার ২৫ বছরের যাত্রায় ফিরে তাকালে আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন কী বলে মনে হয়?
শহীদ ইকবাল: অর্জন তো কোট-আনকোট (‘’)। আমরা কাজের নেশা থেকে কাজ করে যাচ্ছি। নিশ্চয়ই ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের জার্নিটা একটা প্রভাবশালী শক্তি। সামগ্রিক অবদান তো সেভাবে দেখা যাবে না। তবে বড় অর্জনের কথাটা সুপারলেটিভলি আসলে মনে হয়, সৃষ্টিশীল প্রজন্মের ভেতরে সৃষ্টির স্মৃতি ও প্রেরণা জাগাতে সক্ষম হয়েছি, যে বার্তাটা মাঝেমধ্যেই আমাদের তরঙ্গে স্পর্শ করে।
স্ট্রিম: কী ভাবনা থেকে ‘চিহ্ন’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন? সেই সময়ের সাহিত্যিক বাস্তবতা কেমন ছিল?
শহীদ ইকবাল: এটা হঠাৎ করেই। বন্ধুগোত্রের উদ্যোগের কেন্দ্র হয়ে পড়া আর কি! তারপর ‘ম্যাচ’ করে গেল। ‘সাহিত্যিক বাস্তবতা’ কথাটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। একদম পরিষ্কার, আশি ও নব্বই দশকে এখনকার চেয়ে কাগজের সাহিত্য (লিটলম্যাগের সাহিত্য) অনেক বেশি শক্তিপ্রবণ এবং পাঠ্যশীল ছিল। নিরীক্ষা করাটা পড়াশোনার ধারাকে মোটামুটি অনুসরণ করে চলত। রুচিরও প্রশংসা করব। এবং সেটা আমাদের ছুঁয়ে গিয়েছিল জন্যই আমরা তাতে মনস্কপ্রবণ হয়ে পড়ি। ঢাকার বাইরে তা যত দূরেই হোক—প্রতিকূলতাটাই হয়ে ওঠে কাজের প্রেরণা।
স্ট্রিম: দীর্ঘ এই পথচলায় সবচেয়ে বড় সংকট বা চ্যালেঞ্জ কী ছিল? কীভাবে তা অতিক্রম করেছেন?
শহীদ ইকবাল: কাগজের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ লেখা পাওয়া। তবে এখন সে চ্যালেঞ্জটা তেমন নেই। তবে গোড়ার দিকে সেটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তখন, মন খারাপ হলে মাস্টার হিসেবে শিক্ষার্থীদের বলতাম, তোরা এটা-এটা কর আর তুই এই-এই বিষয়ে লেখ। সময় দিয়ে লেখা নিতাম। যতক্ষণ ভালো লেখা না বের করতে পারছি ততক্ষণ লেখাতাম। যেহেতু ওদের ক্লাসে পড়াই সে কারণে আমার কথা ওরা বেদবাক্য মনে করে কাজ নামিয়ে দিত।
এভাবে লেখা পাওয়ার চ্যালেঞ্জটা প্রথমদিকে উতরানো গেল। পরে পরিচিতি বাড়লে, সিরিয়াস বিষয়ে বড় বড় লেখকদের সম্পৃক্ত করলে এক পর্যায়ে তা খানিকটা সহজ হয়ে যায়। তবে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, নতুনদের জায়গা দেওয়া। তাদের সৃষ্টির প্রেরণাকে জাগিয়ে তোলা।
স্ট্রিম: বাংলাদেশের সাহিত্যে ‘চিহ্ন’-এর স্বতন্ত্র অবদান কোথায় বলে আপনি মনে করেন?
শহীদ ইকবাল: ‘চিহ্ন-র মতো একটি কাগজ ...’—এমন কথা কেউ বললে, সেটাই তো স্বতন্ত্র-নির্দেশক স্বীকৃতি! এটা পাঠকই বলবে, তবুও নিয়ম করে নতুন কিছু প্রকাশ করা, যা চলমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুঘটক, এক অর্থে মননশীলতা উৎপাদনেরও শক্তি—তাই তার স্বাতন্ত্র্য। আমরা এ পরিবর্তনের ধারায় ৫০তম সংখ্যার পর আরও নতুন কিছু শাখা খোলার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে চিত্রকলা, সিনেমা, সংগীত প্রভৃতি—যা এর স্বাতন্ত্র্যকে আরও গরিমা দিতে পারে। আমরা সেটা প্রাপ্তি ও প্রতিষ্ঠা দিতে চেষ্টা করছি।
স্ট্রিম: অনেকেই ‘চিহ্ন’কে প্রচলিত অর্থে ছোটকাগজ বলতে চান না। আপনার দৃষ্টিতে ছোটকাগজের বৈশিষ্ট্য কী? ছোটকাগজের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
শহীদ ইকবাল: ‘চিহ্ন’ গোড়ার দিকে ছোটকাগজই ছিল। পরে সে আদর্শ থেকে সরে আসতে হয়েছে। এটা সামগ্রিক বাস্তবতার মর্মান্তিক পরিণতি। ছোটকাগজের যে বৈশিষ্ট্য তা মেনে এখন এটা করা সম্ভব নয়। এখন ছোটকাগজ নেই, আমরা ছোটকাগজের ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক’ আদর্শ কোনোমতে টিকে রাখার জন্য ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক—চিহ্ন-পরিপূরক ‘ডাকপাড়ি’, ‘স্নান’, ‘লোরকা’ করার চেষ্টা করেছি। এখনও ‘লোরকা’র কাজ চলছে। টিমটিম করে চলে। একধরনের আদেশ-নির্দেশের তর্জনী উঁচিয়ে। কিন্তু সেটাও তো ছোটকাগজের ধর্ম নয়। ফলে ছোটকাগজ হয় না, চলে না। এমন লোকও নেই।
আমরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কেন্দ্রে রেখে কাজটা করছি। বঙ্গীয় অঞ্চলে এর প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাই। বাংলাদেশটা বাইরে ছড়াতে চাই। বাংলাটা বুকে নিয়ে বৈশ্বিক নাগরিক হতে চাই। এ যাত্রায় সকল বাঙালিকে এক লক্ষ্যে যুক্ত করতে চাই। সেজন্য আমরা চিহ্নমেলা করি, জেলায়-বিভাগে সম্মেলন করি, বিদ্বজ্জনদের মেসেজটা দিতে চাই। অনলাইন অনুষ্ঠানগুলোও করি, একই উদ্দেশ্যে।
অথচ, ছোটকাগজই তো প্রকৃত সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। সাহস, নির্ভয়, কারুময়তা, মুভমেন্ট, সম্ভাব্যতা, নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, সাবলিমিটি—সবই তো তারই পীঠে সওয়ার হয়ে হয়েছে। এই যে বর্তমান জাতিগত অবস্থা, কালচারাল ডিভ্যালুয়েশন, ভায়োলেন্স, দুর্বৃত্তায়ন, করপোরেট নাগিণীর বিষাক্ত নিঃশ্বাস, ভোগ, প্রযুক্তির ছুটা দাপট সবমিলে মানবচরিত্র গত দুই দশকে মারাত্মক পরিবর্তিত। প্রতিনিয়ত ত্রস্ত-মনের ক্ষয় ব্যক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে—আরও অনেককিছু হাঙরের ন্যায় আমাদের সৃষ্টিশীলতাকে বিনাশ করে ফেলছে। পাঠক নেই। পাঠ-পরিচর্যা শূন্যের অনুগামী।
এ দিয়ে তারুণ্য ও নবীন তার যে সতেজ শক্তি সেটি দাঁড়াতে পারছে না। আপনারা দেখবেন, ইচ্ছা-আগ্রহ আছে প্রচুর, কিন্তু অস্থিরতায় তা পরাজিত। আপনি কোনো জিনিসই স্থিরপ্রজ্ঞ না হলে দিতে পারবেন না! ধৈর্য-সহনশীলতা বস্তুত ইচ্ছারই আনুকূল্য নির্ধারিত। সেটি নানা রূপে-রঙে ত্রস্ত ও পরাস্ত। যেন টিমিড, মেলাঙ্কলিক টোনে চাঞ্চল্য দূরীভূত। বর্তমান ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যখন ‘লোরকা’ বা অন্য ধরনের কাজে সম্পৃক্ত থাকি তখন তাই মনে হয়।
অথচ, পঁচিশ বছর আগেও এমনটা ছিল না। তবুও তো আশাবাদী! আমরা ছোটকাগজেরই লোক, সেটা করতে চাই, চেষ্টাও করে থাকি নানাভাবে, দেখা যাক। কিন্তু ‘চিহ্ন’ কোনো ছোটকাগজ নয়। এটা একদম বিশুদ্ধ সাহিত্যপত্রিকা।
স্ট্রিম: ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারের এই সময়ে মুদ্রিত সাহিত্য পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা কতটা রয়েছে বলে মনে করেন?
শহীদ ইকবাল: খুব রয়েছে। এর প্রয়োজন ফুরোবে না। উপযোগের তাগিদে ওয়েবপেজের ব্যবহার ও গুরুত্ব থাকবে বা বাড়বেও। কিন্তু মুদ্রিত পত্রিকার বা পুস্তকের পঠন-পাঠন চিরস্থায়ী। একদম, কোনো কারণ ছাড়াই প্যাশন থেকেও মানুষ এ ধরনের কিছু ম্যানুয়াল জিনিস পরিত্যাগ করতে পারবে না। আমার মনে হয় এটা মানবচরিত্র-সন্নিহিত ব্যাপার!
স্ট্রিম: একজন সম্পাদক হিসেবে লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন?
শহীদ ইকবাল: এ তো সম্পাদকের রুচি-চিন্তা-মেজাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ, সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক তো দৈনিকের সম্পাদক না। কিছু করতে বাধ্য নন। আমরা আদর্শভিত্তিক উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করি। সেক্ষেত্রে ক্রোড়পত্রে সাহিত্য যেমন থাকে তেমনি নিয়মিত বিভাগে সাহিত্য-ইতিহাস-সংস্কৃতি বা আত্মধর্মী বিষয়ও থাকে।
সাহিত্যধারা পরিমাপের জন্য অনিবার্য কিছু পুনর্মুদ্রণও হয়। ফলে, এর পূর্ণ মেজাজ সম্পাদক-সংশ্লিষ্ট। এক্ষেত্রে চিহ্ন ছকবাঁধা অ্যাকাডেমিক লেখাকে কম গুরুত্ব দিয়ে সৃষ্টিশীল, মৌলিক লেখাকে প্রাধান্য দেয়। বস্তুত, সৃষ্টিশীলতাই সর্বৈব। সাহিত্যে একটা কথা আছে ‘willful suspension of disbelief—এটার কৃত্যসাধন করা আমাদের কাজ। এর কাছাকাছি বোঝাপড়ার ভেতর থেকেই আমরা লেখা নির্বাচন করি। এর বেশি আর কী বলব!
স্ট্রিম: আপনার সম্পাদনা-জীবনে এমন কোনো সংখ্যা বা প্রকাশনা আছে কি, যেটিকে বিশেষভাবে স্মরণীয় মনে করেন?
শহীদ ইকবাল: এটা আপেক্ষিক প্রশ্ন। আর স্বগৃহের সৌন্দর্য নিয়ে কী বলব! তবে যে কাজ চ্যালেঞ্জিং সেটা ছুঁয়ে যায়। এমন অভিজ্ঞতা অনেক। থাক ওসব বেশি ব্যক্তিগত। নাই-বা বললাম।
স্ট্রিম: শিক্ষক, সম্পাদক ও লেখক—এই তিনটি পরিচয় কীভাবে একে অন্যকে সমৃদ্ধ করেছে?
শহীদ ইকবাল: একদম মনের কথাটা বলেছেন। তিনটি সত্তা কিন্তু সর্বদা সেটা লেপ্টে থাকে। তবে সবকিছুর কেন্দ্র পড়াশোনা। না পড়লে কিছুই সম্ভব নয়। দায়বদ্ধতা এড়াব কী করে? তবে সম্পাদনার কাজে আসায় পত্রিকা-পরিকল্পনার জন্য লেখাপড়াটা করতে বাধ্য হয়েছি। তাতে হয়তো কিছু লিখতে বা বলতে পেরেছি। সেটা শিক্ষার্থী বা মহৎ পাঠকরা এ নগণ্যকে কোনো মান্যতা দিলেও দিতে পারে।
স্ট্রিম: সম্পাদক হিসেবে পরিচিতির আড়ালে আপনার লেখকসত্তা অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। আপনার লেখালেখির মূল অনুপ্রেরণা কী? নিজের কোন বইটিকে আপনি সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল বলে মনে করেন এবং কেন?
শহীদ ইকবাল: একদম ঠিক। কেউ হয়তো সম্পাদনার বাইরে আর কিছু করি কিনা সেটাও ভুলে যান। আপনার কথায়, আবুল হাসনাতের কথা মনে পড়ল। কত জানাশোনা—কবি ও প্রাবন্ধিক অথচ তাঁর সে পরিচয় গৌণ। আপনি ভালোবেসে হয়তো আমার লেখার প্রেরণা সম্পর্কিত প্রশ্নটি করেছেন। আমি লিখতে ভালোবাসি।
প্রথমে রবীন্দ্রনাথ—যিনি সর্বদা কব্জায় রাখেন পরে জাগতিক সত্যে—দ্বিজেন শর্মা, হায়াৎ মামুদ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এদের চর্চা আর কিছুটা সমসময়ের দেখাশোনা আমাকে এ-পথের স্বপ্ন দেখায়। গদ্য লেখার হাতেখড়ি আমার শখের বই ‘বিশশতকের রূপকথার নায়কেরা’। পরে যা লিখেছি, তা অ্যাকাডেমিক। কিছু কাজের বলে মনে হয় না। ছাত্রছাত্রীদের নম্বরের লোভে কিছু হলেও হতে পারে।
স্ট্রিম: বর্তমান প্রজন্মের সাহিত্যপাঠ ও লেখালেখির প্রবণতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
শহীদ ইকবাল: খুব হতাশার ভেতরেও উজ্জ্বল কিছু চরিত্র পেয়ে যাই। তখন দুর্মর আশাবাদী হয়ে উঠি। অত্যন্ত মেধাবী প্রজন্ম কিন্তু পাঠ-উন্নাসিক, সেটাই হতাশার কারণ। ফেম-নেমের নেশাটা ঝেড়ে দিয়ে বিবেকের তাড়াটা বড় হলে তাদের আর পায় কে!
স্ট্রিম: বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার বর্তমান মান এবং সম্ভাবনাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
শহীদ ইকবাল: এ উত্তরের দায় এমন যে সবকিছু তো নিজের ঘাড়েই চলে আসে। এত সমৃদ্ধ ও সাবলীল, সঞ্চরণশীল একটি ভাষা, যার সাহিত্য আরও মনোমুগ্ধকর। আমরা তার সম্মান/উচ্চতা দিতে পারলাম কই! কোনো একাডেমিই তো দাঁড়াল না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাষা-সাহিত্য রক্ষা করতে পারবে না। এটা তাদের কাজও নয়। একাডেমিশিয়াতে তাদের অবদান কত পার্সেন্ট!
রাষ্ট্র স্বাধীন দেশে কোনো দায়িত্বশীল উদ্যোগ নেয়নি বরং বিপরীতে অবহেলা করার যাবতীয় উপকরণের জোগান দিয়েছে। আমাদের বাংলা ভাষার প্রাথমিক ভিত্তি আজও তৈরি হয়নি। শিক্ষা কার্যক্রমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখার আদর্শিক কোনো কর্মপ্রণালী নেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমই এর প্রমাণ। আর করপোরেট বাণিজ্যে বাংলা ভাষার উপযোগ নানাভাবে ন্যুব্জ করে রাখা হয়েছে। আইএলটিএস’র সঙ্গে তাল দিয়ে সর্বস্তরে বাংলাকে অবহেলিত রেখে ইংরেজির দাসত্ব, বাণিজ্য বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। আর আমাদের ‘উপনিবেশিক মনে’ জাতিগত দৈন্যের তো শেষ নেই! ক্রমাগত ঔদাসীন্য ও বিপর্যয়ে আমাদের সম্ভাবনার দিকগুলোও রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
পঁচিশ বছর আগেও এমনটা ছিল না। তবুও তো আশাবাদী! আমরা ছোটকাগজেরই লোক, সেটা করতে চাই, চেষ্টাও করে থাকি নানাভাবে, দেখা যাক। কিন্তু ‘চিহ্ন’ কোনো ছোটকাগজ নয়। এটা একদম বিশুদ্ধ সাহিত্যপত্রিকা।
এ নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। আমরা পিছিয়েই তো পড়ছি, এটা তো বাস্তব সত্য। বাংলা ভাষার মাল্টিডিসিপ্লিনারি পাঠ, আইন-আদালত পরিচালনা, সমসময়ের সাহিত্যের তুলনামূলক ডিসিপ্লিন কই! আলোচনা অনেক কিন্তু কাজ নেই। দু-একটা প্রতিষ্ঠান হলেও (নামগুলো আমাদের সবার জানা) তা নামসর্বস্ব, বরাদ্দ আর বাজেটের গোনাগুণতি শুধু, উপযোগ নেই।
স্ট্রিম: বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
শহীদ ইকবাল: গ্লোবাল ব্যাপারটাই তো চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন-সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট ও উপযোগ না থাকলে কিছুই টেকে না। আবেগে হা-হুতাশ করলে কী হবে। বাংলাকে কেন্দ্রে আনতে হবে। ভাষা আন্দোলনের পর কত সময় চলে গেছে কিংবা স্বাধীন রাষ্ট্রেই-বা আমরা কী করেছি?
আর ভাষা শেখা মানে তো সাহিত্যচর্চা না! মানুষ অনেক ভাষা শিখতে পারে কিন্তু সাহিত্য বোঝে কতজন! তাই সাহিত্য পড়লে ভাষাটাও অটোমেটিক শেখা হয়ে যায়। গোটা দেশে ইংরেজির ছাত্ররা তো ভাষাটা শেখে বা চর্চা করে ইংরেজি সাহিত্য কতজন পড়ে বা জানে? এসবের ভেদ উন্মোচন হলেই বাংলা ভাষা-সাহিত্যের চর্চা ও প্রয়োগ সহজেই সম্প্রসারিত হতো। আসলে প্ল্যান মেকারদের মাথা নষ্ট আর রাষ্ট্রের তো তারাই উমেদার। ফলে উল্টোরথে চলছে সব। আমরা পিছিয়ে পড়ছি।
স্ট্রিম: ‘চিহ্ন’ পত্রিকার আগামী ২৫ বছর নিয়ে আপনার স্বপ্ন বা পরিকল্পনা কী?
শহীদ ইকবাল: আমরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কেন্দ্রে রেখে কাজটা করছি। বঙ্গীয় অঞ্চলে এর প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাই। বাংলাদেশটা বাইরে ছড়াতে চাই। বাংলাটা বুকে নিয়ে বৈশ্বিক নাগরিক হতে চাই। এ যাত্রায় সকল বাঙালিকে এক লক্ষ্যে যুক্ত করতে চাই। সেজন্য আমরা চিহ্নমেলা করি, জেলায়-বিভাগে সম্মেলন করি, বিদ্বজ্জনদের মেসেজটা দিতে চাই। অনলাইন অনুষ্ঠানগুলোও করি, একই উদ্দেশ্যে। বিগত দিনের মতো এগুলো আমরা করে যাবো। কোনো প্রাপ্তিযোগের হিসেব নয়, কাজ করে যাওয়া। তাতে যতটুকু উন্নতি করা যায়!
স্ট্রিম: তরুণ লেখক, গবেষক এবং ‘চিহ্ন’-এর পাঠকদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
শহীদ ইকবাল: প্রভূত করপোরেট প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বাঁচাতে হবে। রবীন্দ্রনাথকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বাঙালিত্বকে ধারণ করে বৈশ্বিক হতে হবে। মিলাবে-মিলিবে ঘটবে আত্মপরিচয়ের ভেতর দিয়ে। সে মটো’টা কাগজটার ভেতর দিয়ে সম্মুখে চলবে। চিহ্ন তো নানারকম সাংগঠনিক কাজগুলোও করে থাকে, তার উদ্দেশ্য ও অভিমুখও ওই বাংলা সাহিত্যচর্চাকে কেন্দ্রে রেখেই। আর তাতে কিছু নির্বাচিত মানুষদের সঙ্গে রাখা—এইতো!

স্ট্রিম: ‘চিহ্ন’ পত্রিকার ২৫ বছরের যাত্রায় ফিরে তাকালে আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন কী বলে মনে হয়?
শহীদ ইকবাল: অর্জন তো কোট-আনকোট (‘’)। আমরা কাজের নেশা থেকে কাজ করে যাচ্ছি। নিশ্চয়ই ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের জার্নিটা একটা প্রভাবশালী শক্তি। সামগ্রিক অবদান তো সেভাবে দেখা যাবে না। তবে বড় অর্জনের কথাটা সুপারলেটিভলি আসলে মনে হয়, সৃষ্টিশীল প্রজন্মের ভেতরে সৃষ্টির স্মৃতি ও প্রেরণা জাগাতে সক্ষম হয়েছি, যে বার্তাটা মাঝেমধ্যেই আমাদের তরঙ্গে স্পর্শ করে।
স্ট্রিম: কী ভাবনা থেকে ‘চিহ্ন’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন? সেই সময়ের সাহিত্যিক বাস্তবতা কেমন ছিল?
শহীদ ইকবাল: এটা হঠাৎ করেই। বন্ধুগোত্রের উদ্যোগের কেন্দ্র হয়ে পড়া আর কি! তারপর ‘ম্যাচ’ করে গেল। ‘সাহিত্যিক বাস্তবতা’ কথাটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। একদম পরিষ্কার, আশি ও নব্বই দশকে এখনকার চেয়ে কাগজের সাহিত্য (লিটলম্যাগের সাহিত্য) অনেক বেশি শক্তিপ্রবণ এবং পাঠ্যশীল ছিল। নিরীক্ষা করাটা পড়াশোনার ধারাকে মোটামুটি অনুসরণ করে চলত। রুচিরও প্রশংসা করব। এবং সেটা আমাদের ছুঁয়ে গিয়েছিল জন্যই আমরা তাতে মনস্কপ্রবণ হয়ে পড়ি। ঢাকার বাইরে তা যত দূরেই হোক—প্রতিকূলতাটাই হয়ে ওঠে কাজের প্রেরণা।
স্ট্রিম: দীর্ঘ এই পথচলায় সবচেয়ে বড় সংকট বা চ্যালেঞ্জ কী ছিল? কীভাবে তা অতিক্রম করেছেন?
শহীদ ইকবাল: কাগজের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ লেখা পাওয়া। তবে এখন সে চ্যালেঞ্জটা তেমন নেই। তবে গোড়ার দিকে সেটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তখন, মন খারাপ হলে মাস্টার হিসেবে শিক্ষার্থীদের বলতাম, তোরা এটা-এটা কর আর তুই এই-এই বিষয়ে লেখ। সময় দিয়ে লেখা নিতাম। যতক্ষণ ভালো লেখা না বের করতে পারছি ততক্ষণ লেখাতাম। যেহেতু ওদের ক্লাসে পড়াই সে কারণে আমার কথা ওরা বেদবাক্য মনে করে কাজ নামিয়ে দিত।
এভাবে লেখা পাওয়ার চ্যালেঞ্জটা প্রথমদিকে উতরানো গেল। পরে পরিচিতি বাড়লে, সিরিয়াস বিষয়ে বড় বড় লেখকদের সম্পৃক্ত করলে এক পর্যায়ে তা খানিকটা সহজ হয়ে যায়। তবে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, নতুনদের জায়গা দেওয়া। তাদের সৃষ্টির প্রেরণাকে জাগিয়ে তোলা।
স্ট্রিম: বাংলাদেশের সাহিত্যে ‘চিহ্ন’-এর স্বতন্ত্র অবদান কোথায় বলে আপনি মনে করেন?
শহীদ ইকবাল: ‘চিহ্ন-র মতো একটি কাগজ ...’—এমন কথা কেউ বললে, সেটাই তো স্বতন্ত্র-নির্দেশক স্বীকৃতি! এটা পাঠকই বলবে, তবুও নিয়ম করে নতুন কিছু প্রকাশ করা, যা চলমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুঘটক, এক অর্থে মননশীলতা উৎপাদনেরও শক্তি—তাই তার স্বাতন্ত্র্য। আমরা এ পরিবর্তনের ধারায় ৫০তম সংখ্যার পর আরও নতুন কিছু শাখা খোলার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে চিত্রকলা, সিনেমা, সংগীত প্রভৃতি—যা এর স্বাতন্ত্র্যকে আরও গরিমা দিতে পারে। আমরা সেটা প্রাপ্তি ও প্রতিষ্ঠা দিতে চেষ্টা করছি।
স্ট্রিম: অনেকেই ‘চিহ্ন’কে প্রচলিত অর্থে ছোটকাগজ বলতে চান না। আপনার দৃষ্টিতে ছোটকাগজের বৈশিষ্ট্য কী? ছোটকাগজের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
শহীদ ইকবাল: ‘চিহ্ন’ গোড়ার দিকে ছোটকাগজই ছিল। পরে সে আদর্শ থেকে সরে আসতে হয়েছে। এটা সামগ্রিক বাস্তবতার মর্মান্তিক পরিণতি। ছোটকাগজের যে বৈশিষ্ট্য তা মেনে এখন এটা করা সম্ভব নয়। এখন ছোটকাগজ নেই, আমরা ছোটকাগজের ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক’ আদর্শ কোনোমতে টিকে রাখার জন্য ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক—চিহ্ন-পরিপূরক ‘ডাকপাড়ি’, ‘স্নান’, ‘লোরকা’ করার চেষ্টা করেছি। এখনও ‘লোরকা’র কাজ চলছে। টিমটিম করে চলে। একধরনের আদেশ-নির্দেশের তর্জনী উঁচিয়ে। কিন্তু সেটাও তো ছোটকাগজের ধর্ম নয়। ফলে ছোটকাগজ হয় না, চলে না। এমন লোকও নেই।
আমরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কেন্দ্রে রেখে কাজটা করছি। বঙ্গীয় অঞ্চলে এর প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাই। বাংলাদেশটা বাইরে ছড়াতে চাই। বাংলাটা বুকে নিয়ে বৈশ্বিক নাগরিক হতে চাই। এ যাত্রায় সকল বাঙালিকে এক লক্ষ্যে যুক্ত করতে চাই। সেজন্য আমরা চিহ্নমেলা করি, জেলায়-বিভাগে সম্মেলন করি, বিদ্বজ্জনদের মেসেজটা দিতে চাই। অনলাইন অনুষ্ঠানগুলোও করি, একই উদ্দেশ্যে।
অথচ, ছোটকাগজই তো প্রকৃত সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। সাহস, নির্ভয়, কারুময়তা, মুভমেন্ট, সম্ভাব্যতা, নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, সাবলিমিটি—সবই তো তারই পীঠে সওয়ার হয়ে হয়েছে। এই যে বর্তমান জাতিগত অবস্থা, কালচারাল ডিভ্যালুয়েশন, ভায়োলেন্স, দুর্বৃত্তায়ন, করপোরেট নাগিণীর বিষাক্ত নিঃশ্বাস, ভোগ, প্রযুক্তির ছুটা দাপট সবমিলে মানবচরিত্র গত দুই দশকে মারাত্মক পরিবর্তিত। প্রতিনিয়ত ত্রস্ত-মনের ক্ষয় ব্যক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে—আরও অনেককিছু হাঙরের ন্যায় আমাদের সৃষ্টিশীলতাকে বিনাশ করে ফেলছে। পাঠক নেই। পাঠ-পরিচর্যা শূন্যের অনুগামী।
এ দিয়ে তারুণ্য ও নবীন তার যে সতেজ শক্তি সেটি দাঁড়াতে পারছে না। আপনারা দেখবেন, ইচ্ছা-আগ্রহ আছে প্রচুর, কিন্তু অস্থিরতায় তা পরাজিত। আপনি কোনো জিনিসই স্থিরপ্রজ্ঞ না হলে দিতে পারবেন না! ধৈর্য-সহনশীলতা বস্তুত ইচ্ছারই আনুকূল্য নির্ধারিত। সেটি নানা রূপে-রঙে ত্রস্ত ও পরাস্ত। যেন টিমিড, মেলাঙ্কলিক টোনে চাঞ্চল্য দূরীভূত। বর্তমান ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যখন ‘লোরকা’ বা অন্য ধরনের কাজে সম্পৃক্ত থাকি তখন তাই মনে হয়।
অথচ, পঁচিশ বছর আগেও এমনটা ছিল না। তবুও তো আশাবাদী! আমরা ছোটকাগজেরই লোক, সেটা করতে চাই, চেষ্টাও করে থাকি নানাভাবে, দেখা যাক। কিন্তু ‘চিহ্ন’ কোনো ছোটকাগজ নয়। এটা একদম বিশুদ্ধ সাহিত্যপত্রিকা।
স্ট্রিম: ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারের এই সময়ে মুদ্রিত সাহিত্য পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা কতটা রয়েছে বলে মনে করেন?
শহীদ ইকবাল: খুব রয়েছে। এর প্রয়োজন ফুরোবে না। উপযোগের তাগিদে ওয়েবপেজের ব্যবহার ও গুরুত্ব থাকবে বা বাড়বেও। কিন্তু মুদ্রিত পত্রিকার বা পুস্তকের পঠন-পাঠন চিরস্থায়ী। একদম, কোনো কারণ ছাড়াই প্যাশন থেকেও মানুষ এ ধরনের কিছু ম্যানুয়াল জিনিস পরিত্যাগ করতে পারবে না। আমার মনে হয় এটা মানবচরিত্র-সন্নিহিত ব্যাপার!
স্ট্রিম: একজন সম্পাদক হিসেবে লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন?
শহীদ ইকবাল: এ তো সম্পাদকের রুচি-চিন্তা-মেজাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কারণ, সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক তো দৈনিকের সম্পাদক না। কিছু করতে বাধ্য নন। আমরা আদর্শভিত্তিক উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করি। সেক্ষেত্রে ক্রোড়পত্রে সাহিত্য যেমন থাকে তেমনি নিয়মিত বিভাগে সাহিত্য-ইতিহাস-সংস্কৃতি বা আত্মধর্মী বিষয়ও থাকে।
সাহিত্যধারা পরিমাপের জন্য অনিবার্য কিছু পুনর্মুদ্রণও হয়। ফলে, এর পূর্ণ মেজাজ সম্পাদক-সংশ্লিষ্ট। এক্ষেত্রে চিহ্ন ছকবাঁধা অ্যাকাডেমিক লেখাকে কম গুরুত্ব দিয়ে সৃষ্টিশীল, মৌলিক লেখাকে প্রাধান্য দেয়। বস্তুত, সৃষ্টিশীলতাই সর্বৈব। সাহিত্যে একটা কথা আছে ‘willful suspension of disbelief—এটার কৃত্যসাধন করা আমাদের কাজ। এর কাছাকাছি বোঝাপড়ার ভেতর থেকেই আমরা লেখা নির্বাচন করি। এর বেশি আর কী বলব!
স্ট্রিম: আপনার সম্পাদনা-জীবনে এমন কোনো সংখ্যা বা প্রকাশনা আছে কি, যেটিকে বিশেষভাবে স্মরণীয় মনে করেন?
শহীদ ইকবাল: এটা আপেক্ষিক প্রশ্ন। আর স্বগৃহের সৌন্দর্য নিয়ে কী বলব! তবে যে কাজ চ্যালেঞ্জিং সেটা ছুঁয়ে যায়। এমন অভিজ্ঞতা অনেক। থাক ওসব বেশি ব্যক্তিগত। নাই-বা বললাম।
স্ট্রিম: শিক্ষক, সম্পাদক ও লেখক—এই তিনটি পরিচয় কীভাবে একে অন্যকে সমৃদ্ধ করেছে?
শহীদ ইকবাল: একদম মনের কথাটা বলেছেন। তিনটি সত্তা কিন্তু সর্বদা সেটা লেপ্টে থাকে। তবে সবকিছুর কেন্দ্র পড়াশোনা। না পড়লে কিছুই সম্ভব নয়। দায়বদ্ধতা এড়াব কী করে? তবে সম্পাদনার কাজে আসায় পত্রিকা-পরিকল্পনার জন্য লেখাপড়াটা করতে বাধ্য হয়েছি। তাতে হয়তো কিছু লিখতে বা বলতে পেরেছি। সেটা শিক্ষার্থী বা মহৎ পাঠকরা এ নগণ্যকে কোনো মান্যতা দিলেও দিতে পারে।
স্ট্রিম: সম্পাদক হিসেবে পরিচিতির আড়ালে আপনার লেখকসত্তা অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। আপনার লেখালেখির মূল অনুপ্রেরণা কী? নিজের কোন বইটিকে আপনি সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল বলে মনে করেন এবং কেন?
শহীদ ইকবাল: একদম ঠিক। কেউ হয়তো সম্পাদনার বাইরে আর কিছু করি কিনা সেটাও ভুলে যান। আপনার কথায়, আবুল হাসনাতের কথা মনে পড়ল। কত জানাশোনা—কবি ও প্রাবন্ধিক অথচ তাঁর সে পরিচয় গৌণ। আপনি ভালোবেসে হয়তো আমার লেখার প্রেরণা সম্পর্কিত প্রশ্নটি করেছেন। আমি লিখতে ভালোবাসি।
প্রথমে রবীন্দ্রনাথ—যিনি সর্বদা কব্জায় রাখেন পরে জাগতিক সত্যে—দ্বিজেন শর্মা, হায়াৎ মামুদ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এদের চর্চা আর কিছুটা সমসময়ের দেখাশোনা আমাকে এ-পথের স্বপ্ন দেখায়। গদ্য লেখার হাতেখড়ি আমার শখের বই ‘বিশশতকের রূপকথার নায়কেরা’। পরে যা লিখেছি, তা অ্যাকাডেমিক। কিছু কাজের বলে মনে হয় না। ছাত্রছাত্রীদের নম্বরের লোভে কিছু হলেও হতে পারে।
স্ট্রিম: বর্তমান প্রজন্মের সাহিত্যপাঠ ও লেখালেখির প্রবণতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
শহীদ ইকবাল: খুব হতাশার ভেতরেও উজ্জ্বল কিছু চরিত্র পেয়ে যাই। তখন দুর্মর আশাবাদী হয়ে উঠি। অত্যন্ত মেধাবী প্রজন্ম কিন্তু পাঠ-উন্নাসিক, সেটাই হতাশার কারণ। ফেম-নেমের নেশাটা ঝেড়ে দিয়ে বিবেকের তাড়াটা বড় হলে তাদের আর পায় কে!
স্ট্রিম: বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার বর্তমান মান এবং সম্ভাবনাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
শহীদ ইকবাল: এ উত্তরের দায় এমন যে সবকিছু তো নিজের ঘাড়েই চলে আসে। এত সমৃদ্ধ ও সাবলীল, সঞ্চরণশীল একটি ভাষা, যার সাহিত্য আরও মনোমুগ্ধকর। আমরা তার সম্মান/উচ্চতা দিতে পারলাম কই! কোনো একাডেমিই তো দাঁড়াল না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাষা-সাহিত্য রক্ষা করতে পারবে না। এটা তাদের কাজও নয়। একাডেমিশিয়াতে তাদের অবদান কত পার্সেন্ট!
রাষ্ট্র স্বাধীন দেশে কোনো দায়িত্বশীল উদ্যোগ নেয়নি বরং বিপরীতে অবহেলা করার যাবতীয় উপকরণের জোগান দিয়েছে। আমাদের বাংলা ভাষার প্রাথমিক ভিত্তি আজও তৈরি হয়নি। শিক্ষা কার্যক্রমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখার আদর্শিক কোনো কর্মপ্রণালী নেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমই এর প্রমাণ। আর করপোরেট বাণিজ্যে বাংলা ভাষার উপযোগ নানাভাবে ন্যুব্জ করে রাখা হয়েছে। আইএলটিএস’র সঙ্গে তাল দিয়ে সর্বস্তরে বাংলাকে অবহেলিত রেখে ইংরেজির দাসত্ব, বাণিজ্য বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। আর আমাদের ‘উপনিবেশিক মনে’ জাতিগত দৈন্যের তো শেষ নেই! ক্রমাগত ঔদাসীন্য ও বিপর্যয়ে আমাদের সম্ভাবনার দিকগুলোও রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
পঁচিশ বছর আগেও এমনটা ছিল না। তবুও তো আশাবাদী! আমরা ছোটকাগজেরই লোক, সেটা করতে চাই, চেষ্টাও করে থাকি নানাভাবে, দেখা যাক। কিন্তু ‘চিহ্ন’ কোনো ছোটকাগজ নয়। এটা একদম বিশুদ্ধ সাহিত্যপত্রিকা।
এ নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। আমরা পিছিয়েই তো পড়ছি, এটা তো বাস্তব সত্য। বাংলা ভাষার মাল্টিডিসিপ্লিনারি পাঠ, আইন-আদালত পরিচালনা, সমসময়ের সাহিত্যের তুলনামূলক ডিসিপ্লিন কই! আলোচনা অনেক কিন্তু কাজ নেই। দু-একটা প্রতিষ্ঠান হলেও (নামগুলো আমাদের সবার জানা) তা নামসর্বস্ব, বরাদ্দ আর বাজেটের গোনাগুণতি শুধু, উপযোগ নেই।
স্ট্রিম: বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
শহীদ ইকবাল: গ্লোবাল ব্যাপারটাই তো চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন-সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট ও উপযোগ না থাকলে কিছুই টেকে না। আবেগে হা-হুতাশ করলে কী হবে। বাংলাকে কেন্দ্রে আনতে হবে। ভাষা আন্দোলনের পর কত সময় চলে গেছে কিংবা স্বাধীন রাষ্ট্রেই-বা আমরা কী করেছি?
আর ভাষা শেখা মানে তো সাহিত্যচর্চা না! মানুষ অনেক ভাষা শিখতে পারে কিন্তু সাহিত্য বোঝে কতজন! তাই সাহিত্য পড়লে ভাষাটাও অটোমেটিক শেখা হয়ে যায়। গোটা দেশে ইংরেজির ছাত্ররা তো ভাষাটা শেখে বা চর্চা করে ইংরেজি সাহিত্য কতজন পড়ে বা জানে? এসবের ভেদ উন্মোচন হলেই বাংলা ভাষা-সাহিত্যের চর্চা ও প্রয়োগ সহজেই সম্প্রসারিত হতো। আসলে প্ল্যান মেকারদের মাথা নষ্ট আর রাষ্ট্রের তো তারাই উমেদার। ফলে উল্টোরথে চলছে সব। আমরা পিছিয়ে পড়ছি।
স্ট্রিম: ‘চিহ্ন’ পত্রিকার আগামী ২৫ বছর নিয়ে আপনার স্বপ্ন বা পরিকল্পনা কী?
শহীদ ইকবাল: আমরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কেন্দ্রে রেখে কাজটা করছি। বঙ্গীয় অঞ্চলে এর প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাই। বাংলাদেশটা বাইরে ছড়াতে চাই। বাংলাটা বুকে নিয়ে বৈশ্বিক নাগরিক হতে চাই। এ যাত্রায় সকল বাঙালিকে এক লক্ষ্যে যুক্ত করতে চাই। সেজন্য আমরা চিহ্নমেলা করি, জেলায়-বিভাগে সম্মেলন করি, বিদ্বজ্জনদের মেসেজটা দিতে চাই। অনলাইন অনুষ্ঠানগুলোও করি, একই উদ্দেশ্যে। বিগত দিনের মতো এগুলো আমরা করে যাবো। কোনো প্রাপ্তিযোগের হিসেব নয়, কাজ করে যাওয়া। তাতে যতটুকু উন্নতি করা যায়!
স্ট্রিম: তরুণ লেখক, গবেষক এবং ‘চিহ্ন’-এর পাঠকদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
শহীদ ইকবাল: প্রভূত করপোরেট প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বাঁচাতে হবে। রবীন্দ্রনাথকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বাঙালিত্বকে ধারণ করে বৈশ্বিক হতে হবে। মিলাবে-মিলিবে ঘটবে আত্মপরিচয়ের ভেতর দিয়ে। সে মটো’টা কাগজটার ভেতর দিয়ে সম্মুখে চলবে। চিহ্ন তো নানারকম সাংগঠনিক কাজগুলোও করে থাকে, তার উদ্দেশ্য ও অভিমুখও ওই বাংলা সাহিত্যচর্চাকে কেন্দ্রে রেখেই। আর তাতে কিছু নির্বাচিত মানুষদের সঙ্গে রাখা—এইতো!
.png)

‘গতকল্য বৃহস্পতিবার বেলা ১২.১৩ মিঃ সময় বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলিকাতা জোড়াসাঁকোস্থিত বাসভবনে মহাপ্রয়াণ করিয়াছেন। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স ৮০ বৎসর ৩ মাস হইয়াছিল।
১৩ ঘণ্টা আগে
‘যুদ্ধ’ শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর, ফেসবুকে ঢুকলেই ধ্বংসস্তূপ, আগুন আর মানুষের কান্নার ছবি। এত বেশি দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিউজফিড স্ক্রল করতে এখন আর আঙুল থেমে যায় না।
১৬ ঘণ্টা আগে
রবীন্দ্রনাথকে ভাঙতে পারলে অনেকের শান্তি হয়; যদি ভাঙা নাও যায়, অন্ততপক্ষে আঁচড় কেটে কেউ কেউ তৃপ্তি পান। বাংলা অঞ্চলে সেই আঁচড় কাটার ইতিহাস বেশ পুরনো। এমনকি বিগত দুই বছরেও নানামাত্রিক নখরাঘাত চোখে পড়েছে; প্রশ্ন তোলা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের রাজনীতি, ধর্ম কিংবা অঞ্চলগত পরিচয় প্রসঙ্গে।
১৭ ঘণ্টা আগে
হাড় সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন। এ ছাড়া ভিটামিন কে, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক ও ফসফরাস হাড় ও পেশি ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যালসিয়ামের কথা উঠলেই সবার আগে আসে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের নাম। ২০০ মিলিলিটার এক গ্লাস দুধে প্রায় ২৬০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।
০৬ আগস্ট ২০২৬