প্রয়াণদিবসে স্মরণ
ফাবিহা বিনতে হক

‘গতকল্য বৃহস্পতিবার বেলা ১২.১৩ মিঃ সময় বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলিকাতা জোড়াসাঁকোস্থিত বাসভবনে মহাপ্রয়াণ করিয়াছেন। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স ৮০ বৎসর ৩ মাস হইয়াছিল।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯.১০ মিঃ সময় ডাক্তারগণ কবি রবীন্দ্রনাথের নাড়ীর অবস্থা সামান্য ভাল দেখিয়া তাঁহার শ্বাসকষ্ট লাঘব করিবার জন্য সর্ব প্রথম অক্সিজেন গ্যাস প্রয়োগ করেন। বেলা ১০টার সময় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ও ডাঃ ললিতমোহন ব্যানার্জী কবিকে পরীক্ষা করিয়া বলেন যে, কবির অবস্থা অতীব সংকটজনক। কবির একমাত্র পুত্র শ্রীযুক্ত রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর মধ্যাহ্ন প্রায় ১২টার সময় শেষবার তাঁহার পিতাকে দর্শন করেন। মৃত্যুবিয়োগ বেদনা সহ্য করিতে না পারিয়া অল্পক্ষণ পরেই তিনি ঐ কক্ষ ত্যাগ করেন।’
১৯৪১ সালের ৮ আগস্ট কলকাতার ‘যুগান্তর’ পত্রিকার পাতায় এভাবেই লেখা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ। তাঁর প্রয়াণের দিনটি ক্যালেন্ডারের হিসাবে ছিল ২২ শ্রাবণ, ৭ আগস্ট। কবির পছন্দের ঋতু বর্ষা। বৃষ্টি নিয়ে রবিঠাকুর লিখেছেন বহু গান, কবিতা। কে জানত, সেই শ্রাবণ মাসেই বেলা ১২টা ১০ মিনিটে তিনি চলে যাবেন এই পৃথিবী ছেড়ে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির জীবনে এসেছেন ‘বসন্তের বাতাসটুকুর মতো’। তিনি চলে গেছেন ঠিকই কিন্তু বাংলা সাহিত্য প্রাঙ্গণে ফুটিয়ে গেছেন শত শত ফুল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর আগের দিনই কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় লেখা হয়েছিল,
‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্য বর্তমানে অবস্থা সন্তোষজনক
বৃহস্পতিবার প্রাতে চিকিৎসকগণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে পরীক্ষা করিয়া তাহার স্বাস্থ্যে অবস্থা সন্তোষজনক বলিয়া ঘোষণা করেন।’
শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন রাণী চন্দ রচিত গুরুদেব বইয়ে কবির শেষ দিনগুলোর কথা বিস্তারিত লেখা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, সেসময় বেশ অসুস্থতায় ভুগছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সারা জীবন অস্ত্রোপচার এড়িয়ে চললেও এবার আর উপায় ছিল না। হোমিওপ্যাথি ও অ্যালোপ্যাথিসহ নানা চিকিৎসা চলছিল, কিন্তু অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছিল না। এদিকে চিকিৎসকেরা জানালেন, অসুখ সারাতে অস্ত্রোপচার ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এতে মোটেই রাজি ছিলেন না। তাঁর কথা ছিল, ‘একদিন তো মানুষকে মরতেই হবে। শরীরের শেষ যখন হবেই, তখন অকারণে কাটাছেঁড়া করে তাকে আর কষ্ট দেওয়ার কী প্রয়োজন?’
সেসময় তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনে। আর অস্ত্রোপচারের জন্য প্রিয় শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে আসতে হয় কলকাতায়। ২৫ জুলাই দুপুর ৩টা ১৫ মিনিটে তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে পৌঁছান। বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল বলে স্টেশন বা বাড়ির সামনে কোনো ভিড় ছিল না। তাঁকে স্ট্রেচারে করে বাড়ির দোতলার ‘পাথরের ঘরে’ নিয়ে যাওয়া হয়।
২৬ জুলাই, কবি বেশ হাসিখুশি ছিলেন। আশি বছরের রবীন্দ্রনাথ আর সত্তর বছরের ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ দীর্ঘ সময় ধরে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করেন। হাসি-আড্ডায় কেটে যায় অনেকটা সময়। ২৭ জুলাই সকালে রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে একটি কবিতা বলেন, আর রানী চন্দ তা লিখে নেন।

৩০ জুলাই অস্ত্রোপচারের দিন ঠিক হয়। তবে বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়নি। ছেলে রথীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কবে অপারেশন হবে?’ উত্তরে রথীন্দ্রনাথ বলেন, ‘কাল-পরশু’। এরপর চিকিৎসক ডা. ললিত এসে বললেন, ‘আজই যদি অস্ত্রোপচার করে ফেলা যায়?’ কথাটি শুনে প্রথমে বিস্মিত হলেও রবীন্দ্রনাথ শান্তভাবে বলেন, ‘আজই! ... তা ভালো। এ রকম হঠাৎ হয়ে যাওয়াই ভালো।’
সেদিন সকাল ১১টায় রবীন্দ্রনাথকে স্ট্রেচারে করে অস্ত্রোপচারের টেবিলে নেওয়া হয়। অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ দিয়ে কবির অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের সময় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হলেও তা তিনি প্রকাশ হতে দেননি। কিন্তু পরদিন থেকেই শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। জ্বর বাড়ে, যন্ত্রণা তীব্র হয়, ধীরে ধীরে বাকশক্তিও ক্ষীণ হয়ে আসে। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও অবস্থার আর উন্নতি হয়নি।
১৯৪১ সালের ৫ আগস্ট ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় লেখা হয়,
রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্যের অবস্থা
পুনরায় শরীরের উত্তাপ ও অন্যান্য উপসর্গ বৃদ্ধি
‘সোমবার দিনে কবি রবীন্দ্রনাথ বিশেষ শান্তিতে কাটাইতে পারেন নাই। অপরাহ্ণ হইতে শরীরের উত্তাপ বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং প্রফুল্লতাও অপেক্ষাকৃত হ্রাস পাইয়াছে। সোমবার দ্বিপ্রহরের বুলেটিনে বলা হইয়াছিল যে, কবিগুরু অপেক্ষাকৃত অধিক শাস্তিতে রাত্রি কাটাইয়াছেন তাঁহার পীড়ার প্রাবল্যও অপেক্ষাকৃত কম। সাধারণ স্বাস্থের অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে দেখা যায়।’
এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, পত্রিকাগুলোতে আগেরদিনের খবর পরের দিন ছাপা হয়। ফলে যে ঘটনা ঘটেছে ৪ আগস্ট, সেটিই ৫ আগস্ট প্রকাশিত হয়।

এদিকে ৬ আগস্টের যুগান্তর পত্রিকাতেও রবিঠাকুরকে নিয়ে কোনো সুসংবাদ ছিল না। সেখানে লেখা হয়,
‘রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্য অবস্থা উদ্বেগজনক
মঙ্গলবার রাত্রি ৮টা ১০ নিনিটের সময় একটি বুলেটিনে প্রকাশ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের অবস্থা একটু খারাপের দিকে গিয়াছে এবং উদ্বেগের কারণ দেখা যাইতেছে। রাত্রি ২ ঘটিকার সময় কবিগুরুর বাস-ভবনে অনুসন্ধান করিয়া এসো-সিয়েটেড প্রেস জানিতে পারিয়া-ছেন যে, কবিগুরুর অবস্থার কোন উন্নতি হয় নাই।’
এদিকে ৬ আগস্ট থেকেই জোড়াসাঁকোর বাড়িতে উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। শেষ রাতে কবির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। ৭ আগস্ট সকালে তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসে। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে থেমে যায় বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসংস্কৃতির অনন্য কণ্ঠস্বর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পরদিন ৮ আগস্টের যুগান্তর পত্রিকা জুড়েই জুড়েই ছিল রবীন্দ্র-বন্দনা। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল,
ভারতের গৌরব-রবি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ
সেখানে আরও লেখা, বৃহস্পতিবার মধ্যাহ্নে জোড়াসাঁকো বাসভবনে রবীন্দ্রনাথের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ। অমূল্য জীবন রক্ষায় শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা বিফল, পরিজন বেষ্টিত অবস্থায় ৮০ বৎসর ৩ মাস বয়সে গৌরবদীপ্ত কৰ্ম্মময় জীবনের অবসান, শেষ ইচ্ছানুযায়ী নিমতলা মহাশ্মশানে নশ্বরদেহ ভস্মীভূত।
সেদিনের পত্রিকার প্রথম কলামে লেখা ছিল, ‘পুষ্প-চন্দন বিভূষিত নশ্বরদেহ লইয়া শবযাত্রা’
লক্ষ লক্ষ নরনারীর যোগদান।
রবিঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কবিকে সাজানো হয় বেনারসি জোড়, কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি ও চাদরে। কপালে চন্দনের ফোঁটা, গলায় ফুলের মালা। কবির স্নেহভাজন শিক্ষার্থী রানী চন্দ তাঁর বুকের ওপর রাখা হাতে একটি পদ্মকুঁড়ি তুলে দেন। তারপর শুরু হয় বিশ্বকবির শেষযাত্রা।
কবিগুরুর মৃত্যুতে যুগান্তরের পাতায় মহাত্মা গান্ধীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে লেখা হয়, 'শুধু শ্রেষ্ঠতর কবি নহে, জাতীয়তাবাদী ও মনুষ্য সমাজ হিতৈষী মহামনীষীর মৃত্যু' মহাত্মা গান্ধীর বাণী।
সেই বছরের ২২ শ্রাবণের পর কেটে গেছে আট দশকেরও বেশি সময়। তবু প্রতি বর্ষায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জীবনে আসেন ‘নিশীথ রাতের বাদল ধারা’ কিংবা ‘শ্রাবণের ধারার মতো’ ঝরে পড়েন সুর হয়ে। কখনও কবিতা, ছোট গল্প কিংবা উপন্যাসে আমরা রবিঠাকুরকে স্মরণ করি। তাই তাঁর প্রয়াণের সংবাদ আজ ইতিহাস, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

‘গতকল্য বৃহস্পতিবার বেলা ১২.১৩ মিঃ সময় বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলিকাতা জোড়াসাঁকোস্থিত বাসভবনে মহাপ্রয়াণ করিয়াছেন। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স ৮০ বৎসর ৩ মাস হইয়াছিল।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯.১০ মিঃ সময় ডাক্তারগণ কবি রবীন্দ্রনাথের নাড়ীর অবস্থা সামান্য ভাল দেখিয়া তাঁহার শ্বাসকষ্ট লাঘব করিবার জন্য সর্ব প্রথম অক্সিজেন গ্যাস প্রয়োগ করেন। বেলা ১০টার সময় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ও ডাঃ ললিতমোহন ব্যানার্জী কবিকে পরীক্ষা করিয়া বলেন যে, কবির অবস্থা অতীব সংকটজনক। কবির একমাত্র পুত্র শ্রীযুক্ত রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর মধ্যাহ্ন প্রায় ১২টার সময় শেষবার তাঁহার পিতাকে দর্শন করেন। মৃত্যুবিয়োগ বেদনা সহ্য করিতে না পারিয়া অল্পক্ষণ পরেই তিনি ঐ কক্ষ ত্যাগ করেন।’
১৯৪১ সালের ৮ আগস্ট কলকাতার ‘যুগান্তর’ পত্রিকার পাতায় এভাবেই লেখা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ। তাঁর প্রয়াণের দিনটি ক্যালেন্ডারের হিসাবে ছিল ২২ শ্রাবণ, ৭ আগস্ট। কবির পছন্দের ঋতু বর্ষা। বৃষ্টি নিয়ে রবিঠাকুর লিখেছেন বহু গান, কবিতা। কে জানত, সেই শ্রাবণ মাসেই বেলা ১২টা ১০ মিনিটে তিনি চলে যাবেন এই পৃথিবী ছেড়ে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির জীবনে এসেছেন ‘বসন্তের বাতাসটুকুর মতো’। তিনি চলে গেছেন ঠিকই কিন্তু বাংলা সাহিত্য প্রাঙ্গণে ফুটিয়ে গেছেন শত শত ফুল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর আগের দিনই কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় লেখা হয়েছিল,
‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্য বর্তমানে অবস্থা সন্তোষজনক
বৃহস্পতিবার প্রাতে চিকিৎসকগণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে পরীক্ষা করিয়া তাহার স্বাস্থ্যে অবস্থা সন্তোষজনক বলিয়া ঘোষণা করেন।’
শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন রাণী চন্দ রচিত গুরুদেব বইয়ে কবির শেষ দিনগুলোর কথা বিস্তারিত লেখা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, সেসময় বেশ অসুস্থতায় ভুগছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সারা জীবন অস্ত্রোপচার এড়িয়ে চললেও এবার আর উপায় ছিল না। হোমিওপ্যাথি ও অ্যালোপ্যাথিসহ নানা চিকিৎসা চলছিল, কিন্তু অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছিল না। এদিকে চিকিৎসকেরা জানালেন, অসুখ সারাতে অস্ত্রোপচার ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এতে মোটেই রাজি ছিলেন না। তাঁর কথা ছিল, ‘একদিন তো মানুষকে মরতেই হবে। শরীরের শেষ যখন হবেই, তখন অকারণে কাটাছেঁড়া করে তাকে আর কষ্ট দেওয়ার কী প্রয়োজন?’
সেসময় তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনে। আর অস্ত্রোপচারের জন্য প্রিয় শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে আসতে হয় কলকাতায়। ২৫ জুলাই দুপুর ৩টা ১৫ মিনিটে তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে পৌঁছান। বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল বলে স্টেশন বা বাড়ির সামনে কোনো ভিড় ছিল না। তাঁকে স্ট্রেচারে করে বাড়ির দোতলার ‘পাথরের ঘরে’ নিয়ে যাওয়া হয়।
২৬ জুলাই, কবি বেশ হাসিখুশি ছিলেন। আশি বছরের রবীন্দ্রনাথ আর সত্তর বছরের ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ দীর্ঘ সময় ধরে পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করেন। হাসি-আড্ডায় কেটে যায় অনেকটা সময়। ২৭ জুলাই সকালে রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে একটি কবিতা বলেন, আর রানী চন্দ তা লিখে নেন।

৩০ জুলাই অস্ত্রোপচারের দিন ঠিক হয়। তবে বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়নি। ছেলে রথীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কবে অপারেশন হবে?’ উত্তরে রথীন্দ্রনাথ বলেন, ‘কাল-পরশু’। এরপর চিকিৎসক ডা. ললিত এসে বললেন, ‘আজই যদি অস্ত্রোপচার করে ফেলা যায়?’ কথাটি শুনে প্রথমে বিস্মিত হলেও রবীন্দ্রনাথ শান্তভাবে বলেন, ‘আজই! ... তা ভালো। এ রকম হঠাৎ হয়ে যাওয়াই ভালো।’
সেদিন সকাল ১১টায় রবীন্দ্রনাথকে স্ট্রেচারে করে অস্ত্রোপচারের টেবিলে নেওয়া হয়। অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ দিয়ে কবির অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের সময় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হলেও তা তিনি প্রকাশ হতে দেননি। কিন্তু পরদিন থেকেই শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। জ্বর বাড়ে, যন্ত্রণা তীব্র হয়, ধীরে ধীরে বাকশক্তিও ক্ষীণ হয়ে আসে। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও অবস্থার আর উন্নতি হয়নি।
১৯৪১ সালের ৫ আগস্ট ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় লেখা হয়,
রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্যের অবস্থা
পুনরায় শরীরের উত্তাপ ও অন্যান্য উপসর্গ বৃদ্ধি
‘সোমবার দিনে কবি রবীন্দ্রনাথ বিশেষ শান্তিতে কাটাইতে পারেন নাই। অপরাহ্ণ হইতে শরীরের উত্তাপ বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং প্রফুল্লতাও অপেক্ষাকৃত হ্রাস পাইয়াছে। সোমবার দ্বিপ্রহরের বুলেটিনে বলা হইয়াছিল যে, কবিগুরু অপেক্ষাকৃত অধিক শাস্তিতে রাত্রি কাটাইয়াছেন তাঁহার পীড়ার প্রাবল্যও অপেক্ষাকৃত কম। সাধারণ স্বাস্থের অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে দেখা যায়।’
এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, পত্রিকাগুলোতে আগেরদিনের খবর পরের দিন ছাপা হয়। ফলে যে ঘটনা ঘটেছে ৪ আগস্ট, সেটিই ৫ আগস্ট প্রকাশিত হয়।

এদিকে ৬ আগস্টের যুগান্তর পত্রিকাতেও রবিঠাকুরকে নিয়ে কোনো সুসংবাদ ছিল না। সেখানে লেখা হয়,
‘রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্য অবস্থা উদ্বেগজনক
মঙ্গলবার রাত্রি ৮টা ১০ নিনিটের সময় একটি বুলেটিনে প্রকাশ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের অবস্থা একটু খারাপের দিকে গিয়াছে এবং উদ্বেগের কারণ দেখা যাইতেছে। রাত্রি ২ ঘটিকার সময় কবিগুরুর বাস-ভবনে অনুসন্ধান করিয়া এসো-সিয়েটেড প্রেস জানিতে পারিয়া-ছেন যে, কবিগুরুর অবস্থার কোন উন্নতি হয় নাই।’
এদিকে ৬ আগস্ট থেকেই জোড়াসাঁকোর বাড়িতে উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। শেষ রাতে কবির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। ৭ আগস্ট সকালে তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসে। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে থেমে যায় বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসংস্কৃতির অনন্য কণ্ঠস্বর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পরদিন ৮ আগস্টের যুগান্তর পত্রিকা জুড়েই জুড়েই ছিল রবীন্দ্র-বন্দনা। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল,
ভারতের গৌরব-রবি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ
সেখানে আরও লেখা, বৃহস্পতিবার মধ্যাহ্নে জোড়াসাঁকো বাসভবনে রবীন্দ্রনাথের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ। অমূল্য জীবন রক্ষায় শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা বিফল, পরিজন বেষ্টিত অবস্থায় ৮০ বৎসর ৩ মাস বয়সে গৌরবদীপ্ত কৰ্ম্মময় জীবনের অবসান, শেষ ইচ্ছানুযায়ী নিমতলা মহাশ্মশানে নশ্বরদেহ ভস্মীভূত।
সেদিনের পত্রিকার প্রথম কলামে লেখা ছিল, ‘পুষ্প-চন্দন বিভূষিত নশ্বরদেহ লইয়া শবযাত্রা’
লক্ষ লক্ষ নরনারীর যোগদান।
রবিঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কবিকে সাজানো হয় বেনারসি জোড়, কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি ও চাদরে। কপালে চন্দনের ফোঁটা, গলায় ফুলের মালা। কবির স্নেহভাজন শিক্ষার্থী রানী চন্দ তাঁর বুকের ওপর রাখা হাতে একটি পদ্মকুঁড়ি তুলে দেন। তারপর শুরু হয় বিশ্বকবির শেষযাত্রা।
কবিগুরুর মৃত্যুতে যুগান্তরের পাতায় মহাত্মা গান্ধীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে লেখা হয়, 'শুধু শ্রেষ্ঠতর কবি নহে, জাতীয়তাবাদী ও মনুষ্য সমাজ হিতৈষী মহামনীষীর মৃত্যু' মহাত্মা গান্ধীর বাণী।
সেই বছরের ২২ শ্রাবণের পর কেটে গেছে আট দশকেরও বেশি সময়। তবু প্রতি বর্ষায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জীবনে আসেন ‘নিশীথ রাতের বাদল ধারা’ কিংবা ‘শ্রাবণের ধারার মতো’ ঝরে পড়েন সুর হয়ে। কখনও কবিতা, ছোট গল্প কিংবা উপন্যাসে আমরা রবিঠাকুরকে স্মরণ করি। তাই তাঁর প্রয়াণের সংবাদ আজ ইতিহাস, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।
.png)

‘যুদ্ধ’ শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর, ফেসবুকে ঢুকলেই ধ্বংসস্তূপ, আগুন আর মানুষের কান্নার ছবি। এত বেশি দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিউজফিড স্ক্রল করতে এখন আর আঙুল থেমে যায় না।
৪ ঘণ্টা আগে
রবীন্দ্রনাথকে ভাঙতে পারলে অনেকের শান্তি হয়; যদি ভাঙা নাও যায়, অন্ততপক্ষে আঁচড় কেটে কেউ কেউ তৃপ্তি পান। বাংলা অঞ্চলে সেই আঁচড় কাটার ইতিহাস বেশ পুরনো। এমনকি বিগত দুই বছরেও নানামাত্রিক নখরাঘাত চোখে পড়েছে; প্রশ্ন তোলা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের রাজনীতি, ধর্ম কিংবা অঞ্চলগত পরিচয় প্রসঙ্গে।
৪ ঘণ্টা আগে
হাড় সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন। এ ছাড়া ভিটামিন কে, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক ও ফসফরাস হাড় ও পেশি ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যালসিয়ামের কথা উঠলেই সবার আগে আসে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের নাম। ২০০ মিলিলিটার এক গ্লাস দুধে প্রায় ২৬০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে।
১৩ ঘণ্টা আগে
আমাদের প্রতিবাদী গানের ইতিহাস দীর্ঘ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সংগীত রাজপথে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রতিটি আন্দোলনেই প্রতিবাদী গান নিজস্ব স্বর ও স্বকীয়তা নিয়ে হাজির হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে র্যাপ গান।
১ দিন আগে