কারিকুলাম পরিমার্জনায় আমাদের তাড়াহুড়ো শুভ ফল আনবে কি

ফজিলাতুন নেসা শাপলা
ফজিলাতুন নেসা শাপলা

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১০: ১৮
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জনের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ১৩৩টি পাঠ্যবই পরিমার্জন করা হচ্ছে, যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন বিষয় ও বিষয়বস্তু। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মহৎ—শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা। কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে অন্য জায়গায়। সেটি হলো- এই নতুন পরিবর্তন সামলানোর জন্য আমাদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা কতটা প্রস্তুত?

নাকি বরাবরের মতো এবারও হঠাৎ করে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটি সিদ্ধান্তের গিনিপিগ হতে যাচ্ছে আমাদের সন্তানেরা?

এ প্রসঙ্গে আমার নিজের সরাসরি কিছু অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর আমি জাপান সরকারের ‘কমিউনিকেশন অ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট (সিএডি)’ প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। জাপানের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় শিক্ষাক্রম সংশোধনের অংশ ছিলো এই (সিএডি) প্রোগ্রামটি। জাপানিজ এলিমেন্টারি এবং জুনিয়র হাই স্কুলগুলোতে যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধিই ছিলো এর মূল লক্ষ্য ছিল। এই প্রোগ্রামে বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় কথোপকথন এবং শিশু-কিশোদের ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ও বিনিময়ের ধারণাটি যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

সাইতামা প্রিফেকচারের উরাওয়া বোর্ড অব এডুকেশনের অধীনে অন্যান্যদের সঙ্গে আমি জাপানি শিশু-কিশোরদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রায়োগিক ও আধুনিক কারিক্যুলাম তৈরির কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। লক্ষ্য ছিল একটাই—জাপানি শিশুরা যেন কেবল ব্যাকরণ মুখস্থ না করে দৈনন্দিন জীবনে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বাচ্ছন্দ্যে ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ করে ভিন্ন সংস্কৃতি বিনিময়ে অংশ নিতে পারে।

জাপান সরকার বা সেখানকার বোর্ড অব এডুকেশন কি নতুন এই ধারণাগুলো রাতারাতি এক টেবিলে বসে পুরো দেশে চালু করে দিয়েছিল? একদমই না। ওরা দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে এসব নতুন ভাবনা মূল জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

মাঠপর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট স্কুলে কয়েক বছর ধরে যাচাই-বাছাই না করে পুরো দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ওপর পরীক্ষামূলকভাবে নতুন কন্টেন্ট চাপিয়ে দিলে যদি তা ব্যর্থ হয়, তবে একটি আস্ত প্রজন্মের শিক্ষাজীবনের ওপর ভয়ংকর প্রভাব পড়ে। আমাদের দেশে বারবার কারিক্যুলাম পরিবর্তন ও বাতিলের এই চক্র তারই প্রমাণ।

প্রথমে পুরো সাইতামা অঞ্চলের ১৫৭টি স্কুলকে ‘পাইলট স্কুল’ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। নতুন কারিক্যুলামের ওপর যে কন্টেন্টগুলো তৈরি হতো সেগুলো ক্লাসে কীভাবে পড়াতে হবে তার ওপর প্রতি মাসে শিক্ষকদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকেরা ঠিক কী কী বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, শিশুরা কন্টেন্ট বুঝতে পারছে কি না—তা প্রতি মাসে শিক্ষকদের কাছ থেকে সরাসরি শুনে নোট নেওয়া হতো। প্রতি তিন মাস পরপর বোর্ড অব এডুকেশনের মূল্যায়নকারী ও পরীক্ষক দল সরেজমিনে স্কুলে যেতেন। তারা শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকের শিখনপদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করতেন এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী এমনকি স্কুল কর্তৃপক্ষের মতামত সংগ্রহ করতেন।

সেই প্রাপ্ত ফিডব্যাকের ভিত্তিতে প্রতি বছর শেষে কারিক্যুলাম সংশোধন ও পরিমার্জন করা হতো। এভাবে টানা ২০০৬ থেকে ধারাবাহিকভাবে মাঠপর্যায়ের গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সংশোধনের পর ২০১২ সালে এসে চূড়ান্ত কারিক্যুলাম প্রকাশ করা হয় এবং তা জাপানের শিক্ষা ও কারিক্যুলাম নীতি অনুযায়ী, ২০১২ সালে চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত এই পাঠক্রম ১০ বছরের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রমে যুক্ত করা হয়েছিল। নতুন একটি বিষয় জাতীয় শিক্ষাক্রমে যুক্ত করতে জাপান সময় নিয়েছিল দীর্ঘ ৬ বছর!

এবার ফিরে আসি আমাদের দেশের প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরেই কারিকুলাম নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা ও তড়িঘড়ির সংস্কৃতি চলে আসছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের নতুন শিক্ষাক্রম চালু করার পর শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নপদ্ধতি নিয়ে চরম বিতর্ক তৈরি হয়। এই বিতর্কের বড় একটা কারণ ছিলো, যে বিষয়গুলো চালু করা হয়েছিল সেসব সম্পর্কে যথার্থ সম্যক ধারণা শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের ছিলো না। সময়োপযোগী ও উন্নতমানের শিক্ষাক্রম হওয়া সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘ প্রস্তুতির অভাবে পুরো বিষয়টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পরিণতিতে সেই শিক্ষাক্রম বাতিল করে আবার ২০১২ সালের পুরাতন শিক্ষাক্রমে ফিরে যেতে হয়।

এখন আবার ঠিক একইভাবে ২০২৭ সালকে লক্ষ্য করে নতুন কন্টেন্ট, চতুর্থ শ্রেণিতে ‘আনন্দপাঠ’ কিংবা ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’-এর মতো নানা নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ন্যূনতম মানসিকভাবে প্রস্তুত না করে এবং যথাযথ পাইলটিং ছাড়া এভাবে তড়িঘড়ি কারিকুলাম পরিমার্জন বা পরিবর্তনের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা আমাদের গভীরভাবে ভাবা দরকার।

মাঠপর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট স্কুলে কয়েক বছর ধরে যাচাই-বাছাই না করে পুরো দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ওপর পরীক্ষামূলকভাবে নতুন কন্টেন্ট চাপিয়ে দিলে যদি তা ব্যর্থ হয়, তবে একটি আস্ত প্রজন্মের শিক্ষাজীবনের ওপর ভয়ংকর প্রভাব পড়ে। আমাদের দেশে বারবার কারিক্যুলাম পরিবর্তন ও বাতিলের এই চক্র তারই প্রমাণ।

ইতিহাস, বিষয়বস্তু বা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংযোজন করার উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু একটি মানসম্মত ও নিখুঁত কারিকুলাম তৈরির পূর্বশর্ত হলো—যথাযথ সময় নেওয়া, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মতামত নেওয়া এবং সীমিত পরিসরে দীর্ঘদিন পাইলটিং করে তার সফলতা ও ভুলগুলো চিহ্নিত করা।

জাপানের অভিজ্ঞতা আমাদের নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বাস্তবে প্রস্তুত না করে, গবেষণা ছাড়াই হুট করে কারিকুলাম পরিবর্তন করার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সরে আসতে হবে। তা না হলে কোটি কোটি টাকার বই ছাপা হবে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যই লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে।

  • ফজিলাতুন নেসা শাপলা: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত