
রফিক সাহেবের (ছদ্মনাম) বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। সকালে তার ঘুম ভাঙে অ্যালার্মের শব্দে। এরপর তাড়াহুড়ো করে অফিসের গাড়িতে ওঠেন। গাড়ি পৌঁছে দেয় অফিসের গেটে। সেখান থেকে লিফটে চড়ে সোজা নিজের ডেস্কে গিয়ে বসেন। সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, দুপুরে তাড়াহুড়োয় খাওয়া কোনো ফাস্টফুড, আর রাতে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া—এটাই তার প্রতিদিনের রুটিন।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, জীবনটা কত সহজ হয়ে গেছে। এক ক্লিকেই খাবার চলে আসে দরজায়, এক বোতাম টিপলেই গাড়ি হাজির, সিঁড়ি বেয়ে ওঠার কষ্ট করতে হয় না। কারণ লিফট তো আছেই।
কিন্তু কিছুদিন ধরে শরীরটা যেন আগের মতো নেই। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠেন, রাতে ঘুম আসতে চায় না, আর পেটের চারপাশে জমতে থাকা মেদ প্রতিদিনই যেন একটু একটু করে বাড়ছে। ডাক্তারের কাছে গিয়ে যখন রিপোর্ট হাতে পেলেন, তখন চোখে পড়ল একটি শব্দ—‘প্রি-ডায়াবেটিস’।
রফিক সাহেবের এই গল্প শুধু তার একার নয়। নগরজীবনের অভ্যাসগুলো শরীরকে দিচ্ছে আরাম, কিন্তু কেড়ে নিচ্ছে প্রয়োজনীয় নড়াচড়া। তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে রাত জাগা, অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, মিষ্টি ও কোমল পানীয়ের অভ্যাস এবং ক্রমেই কমে যাওয়া শারীরিক পরিশ্রম। সবমিলিয়ে শরীরে বাসা বাঁধছে ডায়াবেটিস।
দ্রুত বাড়ছে ডায়াবেটিসের সংখ্যা
ডায়াবেটিস হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী বা আজীবন বিপাকীয় ব্যাধি। আমরা যা খাবার খাই, আমাদের শরীর তা ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তর করে। এই গ্লুকোজ আমাদের শরীরে শক্তি জোগায়। কিন্তু ডায়াবেটিস হলে শরীর এই গ্লুকোজকে সঠিকভাবে কোষে পৌঁছে দিতে বা ব্যবহার করতে পারে না, ফলে রক্তে শর্করার বা গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস হওয়ার মূল কারণ হলো ইনসুলিন নামক হরমোনের সমস্যা। ইনসুলিন আমাদের শরীরের অগ্ন্যাশয় থেকে তৈরি হয় এবং এটি রক্তে থাকা গ্লুকোজকে শরীরের কোষগুলোতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) হিসাবে, সর্বশেষ প্রকাশিত ১১তম ডায়াবেটিস অ্যাটলাস অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্ক ২০-৭৯ বছর বয়সীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ দশমিক ১১ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এটি প্রতি ৯ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৮ কোটি ৯০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই রোগে ভুগছেন। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪২ দমমিক ৮ শতাংশ মানুষ (প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ) জানেনই না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে এ সংখ্যা ২ কোটি ৩১ লাখে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষ করে শহুরে জীবনে। আজকের শহর হয়তো মানুষের জীবনকে করেছে দ্রুত, আরামদায়ক ও প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু সেই আরামের আড়ালেই তৈরি হচ্ছে এমন এক জীবনধারা, যা শরীরকে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে ডায়াবেটিসের দিকে।
সকাল শুরু হয় চেয়ারে, দিন শেষ হয় সোফায়
ঢাকায় একজন কর্মজীবী মানুষের দিনের শুরুই হয় ব্যস্ততা দিয়ে। ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পরে কর্মস্থলে। এরপর হাঁটার পরিবর্তে গাড়ি, বাস কিংবা রিকশায় করে পৌঁছান অফিসে। অফিসে পৌঁছে সিঁড়ির বদলে উঠেন লিফট দিয়ে। তারপর টানা কয়েক ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা। দুপুরের খাবারে খান ভাত, পরোটা, ফাস্টফুড কিংবা তেল-মসলায় ভরা খাবার। বিকেলে চা বা কফির সঙ্গে বিস্কুট, কেক কিংবা মিষ্টিজাতীয় খাবার।
অফিস শেষে যানজট পেরিয়ে বাসায় ফেরেন। শরীর তখন ক্লান্ত। হাঁটার বদলে বিশ্রাম। রাতে খাবারের পর মোবাইল বা টেলিভিশনের সামনে আরও কয়েক ঘণ্টা সময় পার করেন। দিন শেষে হিসাব করলে দেখা যায়, মানুষটি হয়তো প্রায় পুরো দিনই বসে কাটিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৩১ শতাংশ বা প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মানুষ প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্রিয়তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছেন না। অর্থাৎ তারা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা অলস জীবনযাপন করছেন। শরীর যত কম নড়াচড়া করে, ইনসুলিনের কার্যকারিতাও তত কমতে পারে। দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা ও অতিরিক্ত ওজন তৈরি করে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করার পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।
শহরের মানুষের নেই কায়িক পরিশ্রম
বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে খাদ্যাভ্যাসও বড় কারণ। একসময় শারীরিক শ্রমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে পরিমাণ খাবার খাওয়া হতো, শহুরে জীবনে অনেকেই সেই পরিমাণ খাবার ও ক্যালরি গ্রহণ করছেন, কিন্তু সেই পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম করছেন না। সাদা ভাত, পরিশোধিত ময়দা, মিষ্টি, কোমল পানীয়, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া সব মিলিয়ে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হচ্ছে শর্করা ও অতিরিক্ত ক্যালরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসে থাকা জীবনযাপন এবং চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত স্টার্চজাতীয় খাবার যেমন সাদা ভাত ও পরিশোধিত ময়দা বাংলাদেশে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বিস্তারে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু চিনি খাওয়াতেই নয়। শরীর যত ক্যালরি খরচ করছে, তার চেয়ে বেশি ক্যালরি নিয়মিত গ্রহণ করছে। এর ফলে ওজন বাড়ছে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমছে। আর এখান থেকেই বাড়ছে ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি।
হাঁটার বদলে লিফটের ব্যবহার
শহুরে জীবনের আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো চলাফেরার ধরন। আগে কয়েক মিনিট হাঁটা ছিল দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এখন কয়েকশ মিটার পথেও অনেকেই যানবাহন ব্যবহার করেন। সিঁড়ির বদলে লিফট, হাঁটার বদলে এস্কেলেটর, মাঠের বদলে মোবাইলের পর্দা। ধীরে ধীরে শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়ার জায়গা দখল করছে প্রযুক্তি। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা শুধু ওজন বাড়ায় না, এটি শরীরের বিপাকীয় ব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক ডা. জোয়ান ম্যানসনের মতে, পেশির শক্তি বাড়ানো ও নিয়মিত শরীরচর্চা পেশির ইনসুলিন-সংবেদনশীলতা এবং গ্লুকোজ গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়। অর্থাৎ, পেশি যত সক্রিয় হবে, রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজ সামলানোর সক্ষমতাও তত ভালো হয়।
শুধু স্থূলকায় মানুষই কি এই ঝুঁকিতে
অনেকে মনে করেন, ডায়াবেটিস মানেই অতিরিক্ত ওজনের মানুষ। এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীতে তুলনামূলক কম বয়সে এবং অপেক্ষাকৃত কম বডি ওয়েটেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাই শুধু ওজন স্বাভাবিক দেখাচ্ছে বলেই ঝুঁকি নেই এমনটা ভাবারও সুযোগ নেই।
পারিবারিক ইতিহাস, বয়স, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত পেটের মেদ সবকিছু মিলেই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কয়েক দশকে দ্রুত বেড়েছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
রক্তে শর্করা নির্ণয়ে অসচেতনতা
ডায়াবেটিসের শুরুতে অনেক সময় তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। ফলে একজন মানুষ বছরের পর বছর নিজের শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়েছে কিনা সে বিষয়ে সচেতন থাকেন না। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডায়াবেটিসের সঙ্গে কিডনি বিকল হওয়া, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং পায়ের নিচের অংশ কেটে ফেলার মতো গুরুতর জটিলতার সম্পর্ক রয়েছে। অর্থ্যাৎ এটি এমন একটি রোগ, যার প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির শরীরে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবার, কর্মক্ষমতা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ওপরও পড়ে বড় চাপ।
শহুর জীবনে এই সমস্যার সমাধান কী
শহুরে জীবনের ব্যস্ততা পুরোপুরি বদলে ফেলা হয়তো সম্ভব নয়, তবে কিছু অভ্যাস বদলালেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে প্রতি ৩০-৬০ মিনিট পরপর কিছুক্ষণ হাঁটা বা নড়াচড়া করা, লিফটের বদলে সম্ভব হলে সিঁড়ি ব্যবহার এবং দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই শারীরিক পরিশ্রম বাড়ানো। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি, কোমল পানীয় ও প্যাকেটজাত খাবার কমিয়ে পরিশোধিত ময়দা ও অতিরিক্ত ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার বাড়ানোও উপকারী।
শুধু খাবার ও ব্যায়াম নয়, ঘুম ও মানসিক চাপের দিকেও নজর দিতে হবে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ঘুমের সময় মেনে চলা এবং কাজের ফাঁকে মানসিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানোর চেষ্টাও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। ঝুঁকি বেশি থাকলে নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করাও জরুরি। কারণ, শহরকে বদলানো হয়তো কঠিন, কিন্তু শহুরে জীবনের অভ্যাস বদলানো আমাদের হাতেই।
.png)








