ad
বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া দিবস

সোশ্যাল মিডিয়া যখন আপনাকে আপনার চেয়েও বেশি বোঝে

বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া দিবস

সোশ্যাল মিডিয়া। স্ট্রিম গ্রাফিক

সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘নিজেকে জানো’। একবিংশ শতাব্দীতে এই উক্তি পালটে গেছে। আমরা নিজেদের যতটা চিনি, তার চেয়ে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম আমাদের বেশি চেনে। আপনি কী দেখবেন, কী ভাববেন, এমনকি কী কিনতে চাইবেন, তা-ও ঠিক করে দিচ্ছে কয়েক হাজার মাইল দূরের কোনো সার্ভারে থাকা গাণিতিক কোড।

কয়েক বছর আগেও ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম কেবল বন্ধুদের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা হয়ে উঠেছে সামাজিক, রাজনৈতিক, এমনকি সাংস্কৃতিক প্রভাবের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্‌ম। প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি অ্যালগরিদমের প্রভাব স্যোশাল মিডিয়াকে আরও ‘বুদ্ধিমান’ করে তুলেছে। এটি আমাদের ব্যক্তিত্বকে বিশ্লেষণ করে পছন্দ-অপছন্দ, আগ্রহ এবং সে অনুযায়ী কনটেন্ট দেখায়। বলা যায়, আমরা হয়ে গেছি সোশ্যাল মিডিয়ার হাতের পুতুল।

যেখানে কোনো কূল-কিনারা নেই

কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের মতো ডিজিটাল সামগ্রীকে ঘিরে এই জগৎ আমরা তৈরি করেছি। সেখানেই আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে: তাঁদের ছবি দেখছি, শুভেচ্ছা বিনিময় করছি, কথাবার্তা বলছি, এমনকি ওই জগতে নতুন নতুন বন্ধুও তৈরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই আমরা রিলস কিংবা ভিডিও-তে এমনভাবে ডুব মারছি যেখানে কোনো কূল-কিনারা নেই।

ফেসবুকে কেউ যদি কোন থ্রিলার বই-এর খোঁজ করেন এর পর থেকে ফেসবুক তাঁকে থ্রিলার বই-এর খবর পাঠাতে থাকবে। এবং তিনি শুধু এ ধরনের বই-ই পড়তে থাকবেন। ভয়টা এখানেই। তিনি হয়তো জানতেও পারবেন না যে থ্রিলারের বাইরেও রোমান্টিক ও অ্যাডভেঞ্চার ধরনের বই রয়ে গেছে।

ভার্চুয়াল এই জগৎ পরিচালনা করার মূলে রয়েছে গাণিতিক কিছু নির্দেশনা, কম্পিউটারের পরিভাষায় যাকে বলা হয় অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদমই ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সোশাল মিডিয়া এবং গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি এত বেশি বিস্তৃত যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, গাণিতিক এসব নির্দেশনাই যেন মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে।

রিভার্স ফ্লিন ইফেক্টের কবলে আমরা

ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব আমাদের বুদ্ধিমত্তার ওপরও আঘাত আনছে। বিংশ শতাব্দীতে দেখা গিয়েছিল, প্রতি দশকে মানুষের গড় আইকিউ প্রায় ৩ পয়েন্ট করে বাড়ছে, যা ‘ফ্লিন ইফেক্ট’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। বর্তমান জেনারেশন; অর্থাৎ ‘জেন–জি’-এর ক্ষেত্রে বুদ্ধি বাড়ার বদলে কমতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট’।

অতিরিক্ত স্ক্রিন নির্ভরতা, গভীর চিন্তার অভাব এবং অ্যালগরিদমের তৈরি করা বুদবুদ বা ‘ফিল্টার বাবল’ তরুণ প্রজন্মের এই মেধা হ্রাসের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন গবেষকেরা। আমরা ক্রমশ আমাদের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি।

তবে সুখবর হচ্ছে যারা অ্যালগরিদমের ডিজাইন করছেন তারা এখন সোশাল মিডিয়াকে এধরনের বাবল বা বৃত্তের ভেতর থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছেন। তারা অ্যালগরিদমে বৈচিত্র্য আনার কাজ করছেন যাতে মানুষ কেবল একঘেয়ে বা একই ধরনের কনটেন্ট না দেখে ভিন্ন মত ও স্বাদের কনটেন্টের মুখোমুখি হতে পারে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন যদি সফল হয়, তবে হয়তো মানুষ আবার তার চিন্তার স্বাধীনতা কিছুটা হলেও ফিরে পাবে। কিন্তু দিনশেষে সচেতনতা একান্তই আমাদের নিজেদের।

‘মনোযোগের অর্থনীতি'

ফোনের স্ক্রিনে আটকে রাখাই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আয়ের উৎস। আর এভাবে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মতো কোম্পানিগুলোও হাজার হাজার কোটি টাকা রোজগার করে। যত বেশী সময় ধরে আমাদের আটকে রাখা যাবে, ততই মুনাফা বাড়তে থাকবে। তবে, কোনো পণ্য ব্যবহার করতে আপনাকে যদি মূল্য দিতে না হয়, তবে মনে রাখবেন পণ্যটি স্বয়ং আপনিই।

আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার এই খেলায় জয়ী হচ্ছে বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। একে বলা হচ্ছে ‘মনোযোগের অর্থনীতি’। এ ছাড়া এই প্রক্রিয়াটি আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা এক ধরনের আসক্তিও তৈরি করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলে মনে হয়, আমরা কীভাবে ভাবছি, এবং কীভাবে ভাববো, এই বিষয়গুলোও কেউ ডিজাইন করে দিচ্ছে। কোন খবরটা দেখবো আর কোনটা দেখবো না সেই সিদ্ধান্তও হয়তো অন্য কেউ নিচ্ছে।

ফেসবুকে কেউ যদি কোন থ্রিলার বই-এর খোঁজ করেন এর পর থেকে ফেসবুক তাঁকে থ্রিলার বই-এর খবর পাঠাতে থাকবে। এবং তিনি শুধু এ ধরনের বই-ই পড়তে থাকবেন। ভয়টা এখানেই। তিনি হয়তো জানতেও পারবেন না যে থ্রিলারের বাইরেও রোমান্টিক ও অ্যাডভেঞ্চার ধরনের বই রয়ে গেছে। এলগরিদমের এই অন্তহীন লুপ আমাদের চিন্তার পরিধিকে ছোট করে দিচ্ছে।

তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘মনিটাইজেশন’ সুবিধা আসার পর থেকে এর ব্যবহারেও এসেছে পরিবর্তন। কোনো কনটেন্টের নির্দিষ্ট পরিমাণ ভিউ আসলে ফেসবুক, ইউটিউব থেকে তাকে টাকা দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে চারপাশে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের অভাব নেই। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব খুললেই ছোট ছোট রিলস, শর্টস, ভ্লগ যেন আমাদের নিয়ে যাচ্ছে অন্য দুনিয়ায়। এভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার সময়ও যেন আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। যেমন কোনো জায়গায় বেড়াতে গেলে সেখানে উপভোগ করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয় ভিডিও করা, ভ্লগ বানানো, ছবি তোলা। যারা ভ্লগ বানাচ্ছে, তাঁরাও আবার দর্শক হয়ে অন্য কারো ভ্লগ দেখে সময় কাটিয়ে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার গোলকধাঁধায় এখন সবাই কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সবাই কনটেন্ট কনজিউমার। এই গোলকধাঁধা থেকে আমাদের মুক্তি নেই।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত