ad

এআইয়ের দৌড়ে জাপান কেন পিছিয়ে

লেখা:
লেখা:
মাইকেল ফিটজপ্যাট্রিক

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০: ০০
এআইয়ের যুগে জাপানের অফিসে এখনো ‘প্রস্তর যুগ’! স্ট্রিম গ্রাফিক
এআইয়ের যুগে জাপানের অফিসে এখনো ‘প্রস্তর যুগ’! স্ট্রিম গ্রাফিক

জাপানে শ্রমিকের ঘাটতি বাড়ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে দেশটি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সমস্যায় ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে জাপানি কোম্পানিগুলোতে এআই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ারই কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা অন্য রকম। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তুলনায় জাপানের কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের গতি এখনো বেশ ধীর।

জাপানের এআই নিয়ে বর্তমান অবস্থাকে দেশটির ঐতিহ্যবাহী ‘নোহ’ নাটকের সঙ্গে তুলনা করা যায়। মঞ্চে থাকা মুখোশ পরা চরিত্রগুলো সবাই জানে, এখনই কিছু করা দরকার। সবাই গুরুগম্ভীরভাবে তাতে একমত হয়। কিন্তু কেউ নড়ছে না। নাটকের জন্য দৃশ্যটি দারুণ। কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধানের জন্য খুব একটা কার্যকর নয়।

জাপান পিছিয়ে কেন?

কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের তথ্যও বলছে, জাপান পিছিয়ে পড়েছে। দেশটির কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পরিসংখ্যানও বিষয়টি স্পষ্ট করে। গত বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপানের মাত্র ৮ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মী তাঁদের কাজের অংশ হিসেবে এআই ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৫০ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৩২ শতাংশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর সিঙ্গাপুরে এআই ব্যবহারের হার বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এশিয়ায় দেশটির অবস্থান শীর্ষে। সেখানে ৫৬ শতাংশ কর্মী সপ্তাহে একাধিকবার এআই ব্যবহার করেন বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

জাপানের স্বাস্থ্য খাতে এআইয়ের ব্যবহারও বেশ ধীরগতির। দেশটির কিছু হাসপাতাল এখনো রোগীদের তথ্য পুরোপুরি ডিজিটাল করতে পারেনি। একটি জাপানি হাসপাতালের কর্মী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেখানে কাগজের নথি এত বেশি জমে যে পরিস্থিতিকে তাঁর কাছে ‘প্রস্তর যুগের’ মতো মনে হয়।

তাহলে জাপান পিছিয়ে কেন? যুক্তরাষ্ট্রের এআই স্টার্টআপ কিউজ এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা অস্টিন শু মনে করেন, এর বড় কারণ জাপানি কোম্পানিগুলোর রক্ষণশীল মানসিকতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা। তাঁর প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি জাপানে অফিস খুলে দেশটির কোম্পানিগুলোর কাছে এআই ব্যবস্থা বিক্রি শুরু করেছে।

শুর ভাষায়, জাপানের অনেক প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে বেশি। কারণ সেখানে কাজের ক্ষেত্রে নিয়ম, প্রক্রিয়া এবং সবার সম্মতির ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এআই কোনো ভুল করলে সেটি মেনে নেওয়ার মানসিকতাও কম।

বিশেষ করে গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কাজে ভুলের সুযোগ খুবই কম রাখতে চায় প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে কোনো পদ খালি রাখাও তাদের কাছে অনেক সময় এআই দিয়ে কাজ করানোর চেয়ে নিরাপদ মনে হয়। আবার এআইকে বিশ্বাস করার আগে তারা নিশ্চিত হতে চায়, প্রযুক্তিটি ভুল করবে না বা ভুল করলেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করবে না।

ভুলের ভয় বড় বাধা

কিয়োটো ইউনিভার্সিটি অব অ্যাডভান্সড সায়েন্সের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক পারিসা হাঘিরিয়ানও মনে করেন, জাপানি কোম্পানিগুলো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণত ঝুঁকি এড়িয়ে চলে। এআই গ্রহণের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তাঁর মতে, জাপানি প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের বাধাগুলো আসলে অন্য যেকোনো পরিবর্তন আনার সময় যে সমস্যাগুলো দেখা যায়, তারই মতো। তাই কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার এখনো সীমিত এবং সতর্ক। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো ভুল, অনিশ্চয়তা ও সুনাম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে বেশি সংবেদনশীল।

জেনারেটিভ এআই এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে জাপানে এটি মূলত কম ঝুঁকির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন লেখা তৈরি, লেখা সংক্ষেপ করা কিংবা তথ্য খোঁজা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া, মূল কার্যক্রম পরিচালনা কিংবা পুরো কাজের প্রক্রিয়া বদলে দেওয়ার মতো জায়গায় এআইয়ের ব্যবহার এখনো অনেক কম।

জাপানের স্বাস্থ্য খাতে এআইয়ের ব্যবহারও বেশ ধীরগতির। দেশটির কিছু হাসপাতাল এখনো রোগীদের তথ্য পুরোপুরি ডিজিটাল করতে পারেনি। একটি জাপানি হাসপাতালের কর্মী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেখানে কাগজের নথি এত বেশি জমে যে পরিস্থিতিকে তাঁর কাছে ‘প্রস্তর যুগের’ মতো মনে হয়।

সরকারও এবার নড়েচড়ে বসেছে

জাপান সরকার অবশ্য সমস্যাটি বুঝতে পারছে। দেশটিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়াতে গত বছর সংসদে এআই প্রমোশন অ্যাক্ট পাস করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো খুব বেশি কঠোর নিয়ম না করে এআই নিয়ে গবেষণা ও বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দেওয়া। টোকিও চায়, এআই তৈরি ও ব্যবহারের জন্য জাপান বিশ্বের সবচেয়ে সহায়ক দেশ হয়ে উঠুক।

অধ্যাপক ওগাসাওয়ার কথায়, জাপানে পরিবর্তন এখনো সীমিত। তাঁর মতে, জাপানি সমাজ এমন পরিবর্তন চায়, যাতে খুব বেশি অস্বস্তি বা ক্ষতি না হয়। ফলে বড় ধরনের সংস্কার করা কঠিন।

এর পেছনে বড় একটি কারণ উৎপাদনশীলতা। উন্নত দেশগুলোর জি-৭ জোটের মধ্যে জাপানের উৎপাদনশীলতা এখনো সবচেয়ে কম। জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের হার গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাঁচ বছর আগে যেখানে মাত্র ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করত, এখন সেই সংখ্যা ৭৫ শতাংশ।

তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সমালোচকদের বক্তব্য, কোনো প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে মানেই সেখানে অধিকাংশ কর্মী এআই ব্যবহার করছেন, এমন নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে হাতে গোনা কয়েকজন কর্মী এআই ব্যবহার করছেন। তাঁরাও আবার খুব সাধারণ কিছু কাজে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছেন।

দক্ষ লোকেরও ঘাটতি

মেইজি ইউনিভার্সিটির জাপানের সামাজিক ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়াসুশি ওগাসাওয়ার মতে, জাপানের আরেকটি বড় সমস্যা হলো দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীর ঘাটতি। তাঁর ভাষায়, জাপানিরা স্মার্টফোনসহ নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পছন্দ করলেও সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল দক্ষতা এখনো কম।

বিষয়টি বোঝা যায় আরেকটি পরিসংখ্যানেও। চলতি বছরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে জাপানে প্রায় ৮ লাখ আইটি পেশাজীবীর ঘাটতি হতে পারে। শুধু দক্ষ কর্মীর অভাব নয়, অনেক কোম্পানির কম্পিউটার ব্যবস্থাও বেশ পুরোনো। দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ কম্পিউটার সিস্টেমের বয়স ২০ বছরের বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর সঙ্গে আছে আরেকটি বড় সমস্যা, সেটা চাকরি হারানোর ভয়। ওগাসাওয়ার মতে, মানুষের চাকরি কমিয়ে দিতে পারে এমন এআই তৈরি করার চেয়ে বেকারত্ব না বাড়ানোর চাপই জাপানি কোম্পানিগুলোর ওপর বেশি।

তিনি বলেন, সরকার এআই, পুনঃদক্ষতা অর্জন এবং ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে কর্মীদের নতুন ডিজিটাল দক্ষতায় নিয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ জাপানে পূর্ণ কর্মসংস্থান ধরে রাখাকে এখনো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নতুন প্রজন্ম বদল আনছে

তবে পরিবর্তনের কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। কিছু জাপানি কোম্পানি এখন নতুন কর্মী নিয়োগের সময় এআই সম্পর্কে ধারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর একটি উদাহরণ কানেমাতসু। বড় এই ট্রেডিং কোম্পানিতে গত এপ্রিলেই যোগ দিয়েছেন উতা ইয়ামাগুচি। কর্মক্ষেত্রে তিনি নিয়মিত এআই ব্যবহার করেন।

ই-মেইল লেখা, জটিল নথি সংক্ষেপ করা, সভার রেকর্ড তৈরি এবং সেগুলোর সারাংশ বানানোর মতো কাজে তিনি এআই ব্যবহার করেন। তাঁর অনেক সহকর্মীও নিয়মিত এআই ব্যবহার করছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখানেও পার্থক্য আছে। এমন এআই ব্যবস্থা, যা নিজে থেকে কয়েক ধাপের একটি পুরো কাজ সম্পন্ন করতে পারে, জাপানের কর্মক্ষেত্রে এখনো প্রায় দেখা যায় না।

তবে ইয়ামাগুচির প্রতিষ্ঠান সেই পরিবর্তনের দিকেই এগোচ্ছে। অধ্যাপক ওগাসাওয়ার কথায়, জাপানে পরিবর্তন এখনো সীমিত। তাঁর মতে, জাপানি সমাজ এমন পরিবর্তন চায়, যাতে খুব বেশি অস্বস্তি বা ক্ষতি না হয়। ফলে বড় ধরনের সংস্কার করা কঠিন।

কিন্তু সমস্যাটা হলো, জাপানের সামনে এখন সময় কম। শ্রমিকের ঘাটতি বাড়ছে, জনসংখ্যা বয়স্ক হচ্ছে, আর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠছে। এআই এই সমস্যাগুলোর কিছুটা সমাধান করতে পারে। কিন্তু শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, সেটি কাজে লাগানোর মানসিকতাও দরকার।

জাপান হয়তো হঠাৎ করে আমূল বদলে যাবে না। কিন্তু পরিবর্তনের গতি যদি খুব ধীর থাকে, তাহলে যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য দেশটি এআইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, সেটিই অধরা থেকে যেতে পারে।

• বিবিসিতে মাইকেল ফিটজপ্যাট্রিক-এর লেখা অবলম্বনে

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত