রংপুরে লোডশেডিং

চলছে না হাসপাতালের প্যাথলজি, গরমে নাকাল রোগীরা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রংপুর

বিদ্যুৎ নেই, হাসপাতালে শিশুকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন এক মা। স্ট্রিম ছবি
বিদ্যুৎ নেই, হাসপাতালে শিশুকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন এক মা। স্ট্রিম ছবি

রংপুরের কয়েকটি উপজেলায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ মিলছে অর্ধেক। এতে সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীরা। বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের ফ্যান বন্ধ। চলছে না এক্স-রে, ইসিজি, নেবুলাইজারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। কোথাও আবার জরুরি বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় মুঠোফোনের আলোয় রোগী দেখতে হচ্ছে চিকিৎসক-নার্সদের।

রংপুরের তারাগঞ্জ, পীরগঞ্জ, পীরগাছার ও কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

তারাগঞ্জে মেইন গ্রিড থেকে ২০ মেগাওয়াটের বিপরীতে বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ১০ মেগাওয়াট। ছয়টি ফিডারের মধ্যে এই বিদ্যুৎ ভাগ করে সরবরাহ করতে হচ্ছে। ফলে দিনে-রাতে মিলিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। শনিবার দুপুর সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগী ও স্বজনদের ভিড়। বাইরে প্রচণ্ড গরম। ভেতরেও একই অবস্থা। মাথার ওপর সিলিং ফ্যান আছে। কিন্তু ঘুরছে না। কেউ হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। কেউ কাগজের প্যাড দিয়ে। অসুস্থ রোগীদের অনেকে ঘামে ভিজে যাচ্ছেন।

বরাতি গ্রামের আমেনা বেগম চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তিনি বলেন, দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালে থাকা খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে।

জগদীশপুর গ্রামের মজনু মিয়ার বুকব্যথা। চিকিৎসক তাঁকে এক্স-রে করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষা করাতে পারেননি। তাঁর প্রশ্ন, বিদ্যুৎ না থাকলে হাসপাতাল অচল থাকবে কেন?

তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন বহির্বিভাগে সাত শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নেন। গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ জন রোগী ভর্তি থাকেন। চলতি বছরের এপ্রিলে হাসপাতালটি ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, লোডশেডিংয়ের কারণে এক্স-রে, ইসিজি, অটোক্লেভ, ডেন্টাল ইউনিট, নেবুলাইজার, এনালাইজার, মাইক্রোস্কোপসহ বিভিন্ন যন্ত্র নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে জেনারেটর রয়েছে। কিন্তু সেটিও নিয়মিত চালানো যায় না।

ইকরচালী গ্রামের শামীমা বেগম তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর শ্বাসকষ্ট রয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত আসে না। তখন গরমে শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. হামদুল্লাহ বলেন, লোডশেডিংয়ে রোগীদের সাময়িক কষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগকে জানানো হয়েছে। দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে। সংযোগ পাওয়া গেলে সমস্যার সমাধান হবে।

তারাগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের জেনারেল ম্যানেজার শরীফ লেহাজ আলী বলেন, ‘২২ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১০ মেগাওয়াট বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। ছয়টি ফিডারে ভাগ করে সরবরাহ করায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’

পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই সংকট। সেখানে দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার যন্ত্র বন্ধ থাকে। ভ্যাকসিন সংরক্ষণের ডিপ ফ্রিজ সচল রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমে বহির্বিভাগের রোগীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।’

এ কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও সরকারি তেলের বরাদ্দ নেই। ফলে নিয়মিত চালানো যায় না। জেনারেটর পরিচালনার জন্য নেই জুনিয়র মেকানিকও। নিজের অর্থায়নে মাঝে মধ্যে তেল কিনে জেনারেটর সচল করেন, যাতে নষ্ট না হয়।

পীরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের জেনারেল ম্যানেজার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘যখন চাহিদা ২৪ মেগাওয়াট উঠে, তখন আমরা ১৪ পাই। আবার কখনও অর্ধেকে নেমে আসে।’

পীরগাছায় ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ২১ থেকে ১৬ মেগাওয়াট। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

পীরগাছা পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের জেনারেল ম্যানেজার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। আজ (শনিবার) চাহিদা ১৬ মেগাওয়াট কিন্তু আমরা পেয়েছি ৭ মেগাওয়াট। যা অর্ধেকেরও কম। শুক্রবার-শনিবার চাহিদা কম থাকে। কিন্তু অন্যান্য দিন চাহিদা বেশি থাকলেও ৫০ ভাগের বেশি সরবরাহ পাওয়া যায় না।’

বিদ্যুৎ না থাকলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে ও অন্যান্য যন্ত্র বন্ধ থাকে। রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। জেনারেটর থাকলেও খরচ বেশি হওয়ায় নিয়মিত চালানো সম্ভব হয় না।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত