দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান

হামাস সদস্যদের সঙ্গে কথিত ‘মেলামেশার’ অভিযোগেই ৭ ত্রাণকর্মীকে হত্যা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩: ২৬
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) সাত ত্রাণকর্মী। ওপরে বাঁ থেকে ব্রিটিশ নাগরিক জেমস হেন্ডারসন, জেমস কিরবি ও জন চ্যাপম্যান। নিচে বাঁ থেকে ড্যামিয়ান সোবল, লালজাওমি ফ্র্যাঙ্ককম, জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার ও সাইফেদ্দিন আবুতাহা। ছবি: ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) সাত ত্রাণকর্মী। ওপরে বাঁ থেকে ব্রিটিশ নাগরিক জেমস হেন্ডারসন, জেমস কিরবি ও জন চ্যাপম্যান। নিচে বাঁ থেকে ড্যামিয়ান সোবল, লালজাওমি ফ্র্যাঙ্ককম, জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার ও সাইফেদ্দিন আবুতাহা। ছবি: ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন

হামাস সদস্যদের সঙ্গে কথিত ‘মেলামেশার’ অভিযোগে গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) সাত ত্রাণকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী। গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কয়েকজন ফিলিস্তিনির সঙ্গে ৩/৪ মিনিটের কথাবার্তা হওয়ায় ত্রাণকর্মীদেরকে ‘হামাস-সংশ্লিষ্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল আইডিএফ। পরে প্রমাণিত হয়েছে, ত্রাণকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা ওই ফিলিস্তিনিরাও কেউ হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন।

২০২৪ সালের এপ্রিলের ওই ঘটনায় গাজায় খাদ্য সহায়তা দিয়ে ফেরার সময় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ডব্লিউসিকের তিনটি গাড়িতে পরপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে তিন ব্রিটিশ ত্রাণকর্মী জেমস কিরবি, জেমস হেন্ডারসন ও জন চ্যাপম্যান, অস্ট্রেলিয়ার জোমি ফ্রাঙ্ককম, ফিলিস্তিনের সাইফেদ্দিন আবুতাহা, পোল্যান্ডের ড্যামিয়ান সোবোল এবং মার্কিন-কানাডীয় দ্বৈত নাগরিক জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার নিহত হন।

গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ওই হত্যাকাণ্ডকে শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক বাদ পড়ে যায়। তাদের ভাষ্য, গাজায় লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ‘হাফলালা’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ ‘অপরাধে সম্পৃক্তকরণ’। এই পদ্ধতিতে কোনো সন্দেহভাজন হামাস সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ, কাছাকাছি থাকা বা একসঙ্গে চলাফেরার কারণেও কাউকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে।

ডব্লিউসিকের ত্রাণ বহরে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন রিজার্ভ কর্নেল নোচি মেন্ডেল। তার ভাষ্য, ত্রাণকর্মীদের সঙ্গে হামাসের সদস্য বলে ধারণা করা কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে কয়েক মিনিটের জন্য দেখা হয়েছিল। ওই ব্যক্তিদের হামাসের সঙ্গে যুক্ত বলে ধরে নিয়েই ত্রাণকর্মীদের ‘হামাস সংশ্লিষ্ট’ হিসেবে বিবেচনা করেন তিনি। মেন্ডেলের ব্যাখ্যায়, ‘হামাস সংশ্লিষ্ট’ বলতে সংগঠনটির কাছাকাছি থাকা, সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা, একসঙ্গে সময় কাটানোসহ বিভিন্ন বিষয় বোঝানো হয়েছে। পুরো বহরটি লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই’।

গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউকেকে) ত্রাণবহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ধ্বংস হয়ে যাওয়া ত্রাণকর্মীদের বহনকারী গাড়ি। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউকেকে) ত্রাণবহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ধ্বংস হয়ে যাওয়া ত্রাণকর্মীদের বহনকারী গাড়ি। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

মেন্ডেলের দাবি ছিল, ওই যোগাযোগের কারণে ত্রাণকর্মীরা আর নির্দোষ ছিলেন না। কিন্তু যাদের হামাস সদস্য বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, পরে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ কয়েক মিনিটের ওই কথাবার্তা ও কাছাকাছি অবস্থানের ভিত্তিতে তৈরি করা সন্দেহই শেষ পর্যন্ত সাত ত্রাণকর্মীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

গাজা বিভাগের যুদ্ধ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা রিজার্ভ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওরেন সলোমনও এই পদ্ধতির ভয়াবহ দিক তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য, কোনো গাড়িকে আগে থেকেই হামাস-সংশ্লিষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হলে সেখান থেকে কেউ অন্য গাড়িতে চলে গেলেও ওই ‘সম্পৃক্তকরণ’ তার সঙ্গেই থাকে। এতে তার সঙ্গে থাকা অন্যরাও হামলার শিকার হতে পারেন।

ঘটনার সময় ডব্লিউসিকে বহরটি ইসরায়েলি সেনাদের কাছাকাছি ছিল না। কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই সময় বহরটি ইসরায়েলি সেনাদের জন্য কোনো হুমকিও ছিল না। বরং হামলাটি চালানো হয়েছিল হামাস যাতে গাজায় ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে—সেই সামরিক মিশনের অংশ হিসেবে।

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, গাজায় ত্রাণ বিতরণে হামাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে একটি ব্যাপক আশঙ্কা কাজ করছিল। পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেই ধারণার ভিত্তি ছিল দুর্বল। সে সময় ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজায় তীব্র খাদ্যসংকট চলছিল। এ কারণে ত্রাণ পেতে মরিয়া বেসামরিক মানুষ, অপরাধী চক্র ও হামাসের সশস্ত্র সদস্যদের বাধার মুখে পড়ছিল ত্রাণবাহী গাড়িগুলো।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) অবশ্য বলেছে, হামলাটি ছিল ‘ভুল মূল্যায়নের’ ফল। তাদের ভাষ্য, গাড়িগুলোতে হামাসের সামরিক সদস্য রয়েছে—এমন ভুল ধারণার পাশাপাশি অভিযানে গুরুতর প্রক্রিয়াগত ব্যর্থতাও হয়েছিল। তবে তদন্ত শেষে ফৌজদারি অপরাধের বিষয়ে সন্দেহের পর্যাপ্ত ভিত্তি না পাওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে ফৌজদারি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে ডব্লিউসিকে এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, হামলার সময় তাদের কর্মীরা নিরস্ত্র ছিলেন এবং কারও জন্য কোনো হুমকি তৈরি করছিলেন না। ইসরায়েলি বাহিনী তাদের পরিচয়, গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড আগে থেকেই জানত বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।

হামলার ঘটনায় ফৌজদারি ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। নিহত ত্রাণকর্মীদের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ডব্লিউসিকে বহরে হামলার ঘটনা ইসরায়েলি বাহিনীর গাজা অভিযানে বেসামরিকদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ার বৃহত্তর প্রশ্নটিও সামনে আনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ধ্বংসের বিস্তৃত সামরিক লক্ষ্য এবং লক্ষ্য নির্ধারণে কর্মকর্তাদের ব্যাপক স্বাধীনতার কারণে ‘সম্পৃক্তকরণ’ পদ্ধতি বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত