জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান, জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

হরমুজে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত ও শিল্পখাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হবে না—ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করতে হবে। সংঘাত শুরুর দ্বিতীয় সপ্তাহে এমন মন্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

স্থানীয় সময় শুক্রবার (৬ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তি হবে না, যদি না তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। এরপর নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানকে পুনর্গঠনে সহায়তা করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ট্রাম্প দাবি করেন, এভাবে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব হবে।

পরে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ মানে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বরং এমন অবস্থাকে বোঝানো হচ্ছে, যখন ইরানের আর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা থাকবে না।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন মনে করবেন যে ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়, তখনই সেটিকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও যুদ্ধের বিস্তার

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের ভেতরে তিন হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব হামলায় পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও শীর্ষ নেতৃত্বের কমপ্লেক্স লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

সংঘাতের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে মার্কিন স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি তারা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।

এদিকে রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যে ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।

ইরানের অবস্থান

ইরান এখনই কোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনায় যেতে রাজি নয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এনবিসি নিউজকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধবিরতির আবেদন করছে না এবং সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুত রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, এমন পদক্ষেপ ‘সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়।’ জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলায় কোনো ‘লাল রেখা’ মানছে না।

বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব

সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং তা ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজার হাজার মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মতো কঠোর দাবি সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ প্রায় পুরো জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং এর উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালী ঘিরে থাকা সমুদ্রপথ দিয়ে আসে।

এই পথ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও পরিবহন খাতে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। বিপিসির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী দেশে ফার্নেস অয়েলের মজুদ কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে, তবে ডিজেলসহ কিছু জ্বালানির মজুদ তুলনামূলক কম।

সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ইতিমধ্যে জ্বালানি চালানগুলোর গতিবিধি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে বর্তমান বাজারের অস্থিরতা পূর্ণমাত্রার সরবরাহ সংকটে রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে এবং দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের কোনো লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি সংঘাত দ্রুত শেষ করবে, নাকি আরও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে রূপ দেবে—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।

সম্পর্কিত