leadT1ad

রয়টার্সের প্রতিবেদন

পাকিস্তানের যেসব অস্ত্রের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

পাকিস্তানের সঙ্গে বিস্তৃত অস্ত্র সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা হয়েছে, এটি এখন পুরোনো খবর। নতুন খবর হলো, দেশটির সঙ্গে আলোচনায় যেসব অস্ত্রের ব্যাপারে বাংলাদেশ আগ্রহ দেখিয়েছে, তা তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

পাকিস্তানের তিনটি প্রতিরক্ষা সূত্রের বরাতে সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে বিস্তৃত অস্ত্র সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

দুটি সূত্রের মতে, আলোচনায় বাংলাদেশ জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি (জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি) মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান, এমএফআই-১৭ মুশাক বিমান, মনুষ্যবিহীন পর্যবেক্ষণ ও আক্রমণে সক্ষম শাহপার ড্রোন, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মাইন-প্রতিরোধী সাঁজোয়া যান মুহাফিজ-এর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে।

তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য প্রকাশ করেনি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ—এই তথ্যটিও দিয়েছে রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বা ‘যুদ্ধে পরীক্ষিত’ তকমা পেয়েছে। এরপর থেকে দেশটির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন শিল্পে নতুন করে গতি পেয়েছে। কারণ ইতোমধ্যে দেশটির অস্ত্র কিনতে অনেক ক্রেতা আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি সম্পর্কে অবগত আছেন এমন তিনটি পাকিস্তানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, চীনের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত জেএফ-১৭ (জেএফ-১৭) যুদ্ধ বিমানসহ প্রশিক্ষণ বিমান, ড্রোন এবং অস্ত্র ব্যবস্থার চুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে ১৩টি দেশের সঙ্গে আলোচনা করেছে পাকিস্তান। এর মধ্যে ৬ থেকে ৮টি দেশের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো চুক্তির বিষয়েই বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি। তবে দেশটির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন মন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, বেশ কয়েকটি দেশ যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এই ব্যাপারে মন্তব্য জানতে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পাকিস্তানের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে অনেক ক্রেতা আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তানের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে অনেক ক্রেতা আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ছবি: রয়টার্স

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় দেশগুলো এখন নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) তৈরির চেষ্টা করছে। গত বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে আকাশ যুদ্ধে পাকিস্তানের অস্ত্রগুলো কার্যকর বিকল্প হিসেবে ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। অল্প কয়েক দিনের সেই যুদ্ধে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী উন্নত চীনা প্রযুক্তিতে নির্মিত জে-১০ (জে-১০)-এর পাশাপাশি জেএফ-১৭ (জেএফ-১৭) ব্যবহার করেছিল।

এসব প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়টি সূত্র, বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত তিন কর্মকর্তা এবং এক ডজন বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলেছে রয়টার্স। তাঁরা পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান অস্ত্র শিল্প এবং অস্ত্র বিক্রি আলোচনার অপ্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন।

ভূ-রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে পাকিস্তান উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে পারবে কি না তা নিয়ে কোনো কোনো বিশ্লেষক সংশয় প্রকাশ করলেও, পাকিস্তানি সামরিক সরঞ্জামের প্রতি যে আগ্রহ বহুগুণ বেড়েছে সে বিষয়ে সবাই একমত। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক এও সতর্ক করেছেন, অস্ত্র বিক্রির আলোচনা মানেই তা চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেবে এমন নয়।

এদিকে, অস্ত্র বিক্রির আলোচনাগুলোকে ‘সুরক্ষিত গোপন বিষয়’ অভিহিত করে প্রতিরক্ষা উৎপাদন মন্ত্রী রাজা হায়াত হাররাজ রয়টার্সকে বলেছেন, এই আলোচনাগুলো চলছে, (তবে) আন্তর্জাতিক চাপের কারণে এগুলো ভেস্তে যেতে পারে।

তিনি বলেন, অনেক শর্ত আসছে এবং আমরা আলোচনা করছি। এসময় তিনি জানান, বিমান বাহিনীর সরঞ্জাম, গোলাবারুদ এবং প্রশিক্ষণের বিষয়ে ক্রেতারা আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

এই মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তৈরি একই ধরনের অস্ত্রের সঙ্গে পাকিস্তানি বিমান ও অস্ত্রের দামের পার্থক্যের বিষয়টিই সামনে নিয়ে আসেন। যদিও পশ্চিমাদের তৈরি কিছু অস্ত্র প্রযুক্তিগতভাবে বেশি উন্নত হতে পারে। তবে সেগুলোর দাম জেএফ-১৭-এর মূল্যের প্রায় তিন গুণের বেশি। একটি জেএফ-১৭ এর মূল্য সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান তালিকা

সূত্রগুলো জানিয়েছে, অস্ত্র কিনতে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সুদান, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, ইথিওপিয়া এবং নাইজেরিয়া। এছাড়া খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন পূর্ব লিবিয়ার সরকারও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আবার জেএফ-১৭ এবং অন্যান্য অস্ত্রের বিষয়ে বাংলাদেশ ও ইরাকের সঙ্গে আলোচনার কথা পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে। তবে এই ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রায় সবাই পাকিস্তানের মতো মুসলিম প্রধান দেশ। তাদের মধ্যে অনেকেই মুসলিম প্রধান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। ঐতিহাসিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে পাকিস্তান ভূমিকা নিয়ে আসছে।

পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বা ‘যুদ্ধে পরীক্ষিত’ তকমা পেয়েছে। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বা ‘যুদ্ধে পরীক্ষিত’ তকমা পেয়েছে। ছবি: রয়টার্স

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখেন বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসিম সুলেমান। তিনি বলেন, ক্রেতা হিসেবে আফ্রিকার তিনটি দেশও আছে। এই সংক্রান্ত রয়টার্সের পূর্বের প্রতিবেদনে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি এবং সুদানের চুক্তিগুলোর কথা বলা হয়েছিল। তবে ওই তিনটি দেশ ওই তালিকায় নেই।

ক্রমবর্ধমান সরবরাহ ব্যবস্থা

একটি বড় বাধা হবে পাকিস্তান জেএফ-১৭-এর উৎপাদন বাড়াতে পারে কি না। এটি দেশটির অস্ত্র উৎপাদন কর্মসূচির মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের প্রশিক্ষণ বিমান এবং ড্রোনের চাহিদাও রয়েছে।

বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসিম সুলেমান বলেন, প্রধান কারখানার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের ফলে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান উৎপাদনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এমনকি বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ২০টি বিমান তৈরির সক্ষমতা থেকে তা দ্বিগুণ হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যত বাধা খুব কম। তাছাড়া বেইজিংয়ের সমর্থনে পাকিস্তান বেশিরভাগ বাধা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, পাকিস্তান ‘প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি সহজলভ্য ও মধ্যম স্তরের সরবরাহকারী হিসেবে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।’

তিনি বলেন, তারা প্রশিক্ষণ দিতে পারে, পরামর্শক পাঠাতে পারে, যৌথ মহড়া চালাতে পারে, সামুদ্রিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে এবং সাশ্রয়ী মূল্যের বিভিন্ন সরঞ্জামের প্রস্তাব করতে পারে। নাজুক আফ্রিকান অংশীদারদের জন্য এই প্যাকেজ আকর্ষণীয় হতে পারে। আর এটি পশ্চিমা অস্ত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুতও হয়। তাছাড়া রাজনৈতিকভাবে কম জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে সস্তা।

পাকিস্তানের অস্ত্র কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে অনেক দেশ। ছবি: রয়টার্স
পাকিস্তানের অস্ত্র কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে অনেক দেশ। ছবি: রয়টার্স

প্রতিরক্ষা খাতে, বিশেষ করে ড্রোন নির্মাণে পারদর্শী বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বও এই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে।

রাওয়ালপিন্ডি শহরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর অবস্থিত। এখানেই বেসরকারি কোম্পানি সিসভার্ভ অ্যারোস্পেস অবস্থিত। এই কারখানার কর্মীরা বছরে শত শত কামিকাজ এবং পর্যবেক্ষণকারী ড্রোন তৈরি করেন এবং সেগুলো সামরিক বাহিনীকে সরবরাহ করে।

কোম্পানির পরিচালক সাদ মীর রয়টার্সকে বলেন, স্বাভাবিকভাবেই সেনাবাহিনীর প্রবণতা এখন বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার দিকে যাচ্ছে।

চীনের অবস্থান

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অস্ত্র স্থানান্তর গবেষক সিমন ওয়েজম্যান বলেন, জেএফ-১৭ বিক্রির বিষয়ে চলার আলোচনার কতগুলো বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেবে তা স্পষ্ট নয়।

তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকের কাছে বিক্রির বিষয়ে বেইজিং আপত্তি জানাতে পারে।

যদিও মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাজুড়ে এই বিমানের বাজারজাতকরণে পাকিস্তান চীনের স্বাভাবিক অংশীদার। তবে ‘সুদান এবং লিবিয়ার সঙ্গে আলোচনাগুলো সত্যিই সমস্যাজনক।’

লিবিয়া এবং সুদানের দারফুর অঞ্চল জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি পাকিস্তান মিত্র দেশ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার উত্তেজনাও সামাল দিচ্ছে।

ইসলামাবাদ রিয়াদের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সৌদি আরব ও তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে আরেকটি প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে আলোচনাও করছে দেশটি। যদিও এর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইমের এমাদেদ্দিন বদি বলেন, আদর্শিক দিক থেকে ইসলামাবাদ সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে সৌদির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু ব্যবসা, বন্দর এবং খনিজ সম্পদ খাত হওয়ায় বিষয়গুলো জটিল হয়ে যায়। কারণ এই সরবরাহ ব্যবস্থাগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানেই মূল প্রতিযোগিতা চলছে এবং সৌদিকে এখন সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হচ্ছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত