মাশহাদে সমাহিত হলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি, লাখো মানুষের শোকযাত্রা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ইরানে শিয়া মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান ইমাম রেজার মাজারে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সমাহিত করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে লাখো মানুষের শোকযাত্রা ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতে ইরানে শিয়া মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান ইমাম রেজার মাজারে তাকে সমাহিত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ইরান এবং প্রতিবেশী ইরাকের পাঁচটি শহরে টানা ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটল।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আলী খামেনি, তার নাতনি, জামাতা, মেয়ে এবং মোজতবার স্ত্রীর কফিনবাহী একটি উড়োজাহাজ ইরাক থেকে মাশহাদে এসে পৌঁছায়। এর আগে ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালার রাস্তায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তাদের কফিনের শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে মাশহাদের কেন্দ্রস্থলের প্রধান সড়কে কালো পোশাক পরা হাজার হাজার শোকার্ত মানুষের সুবিশাল কফিনযাত্রা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হয়।

কফিনযাত্রায় অংশ নেওয়া অনেকের হাতেই প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ছবি এবং প্রতিশোধের প্রতীক সংবলিত লাল রঙের ব্যানার ছিল। সড়কের ওপরে ঝুলতে দেখা যায় অফিশিয়াল স্লোগান সংবলিত ব্যানার, যাতে লেখা ছিল ‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’। হুদা (৩৫) নামের এক গৃহিণী ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘নেতাকে হারানোর শোক আমাদের মা-বাবাকে হারানোর চেয়েও বড়।’

পরে একটি ট্রাকে করে খামেনির কফিন ধীরে ধীরে শোকার্ত মানুষের ভিড় ঠেলে ইমাম রেজার মাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত নামার আগেই কফিনটি মাজার প্রাঙ্গণে পৌঁছায়।

ইমাম রেজা ছিলেন শিয়াদের অষ্টম ইমাম এবং শিয়াদের ১২ জন প্রধান ইমামের মধ্যে একমাত্র তিনি ইরানে সমাহিত আছেন বলে বিশ্বাস করা হয়। নবম শতাব্দীতে নির্মিত এই মাজারটির বিশাল সোনালি গম্বুজ ও মিনার রয়েছে, যেখানে প্রতিবছর লাখ লাখ তীর্থযাত্রী আসেন।

শোকার্ত মানুষের বিশাল কফিনযাত্রা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হয়। সংগৃহীত ছবি
শোকার্ত মানুষের বিশাল কফিনযাত্রা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হয়। সংগৃহীত ছবি

ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা জানায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলার উত্তেজনার মধ্যেই এই দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলা দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধ অবসানের জন্য সই হওয়া প্রাথমিক চুক্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। গত রাতে তেহরান থেকে মাশহাদগামী রেলপথের দুটি ব্রিজে মার্কিন বোমাবর্ষণের যে অভিযোগ ইরান করেছে, তা এই দাফন আয়োজনকে ব্যাহত বা ম্লান করার উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছিল বলে রেভল্যুশনারি গার্ডসের দাবি।

এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে তেহরানে খামেনির সরকারি বাসভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি এবং তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হন। খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন। তবে ওই হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা তেহরান ও কোমে অনুষ্ঠিত জানাজা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি এবং মাশহাদের দাফন অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি।

সংগৃহীত ছবি
সংগৃহীত ছবি

খামেনি মাশহাদেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শিয়া ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র কোমে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে তিনি মাশহাদের মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি সর্বোচ্চ নেতা নিযুক্ত হন। ক্ষমতায় থাকা ৩৭ বছরে তিনি ইরানের রাজনীতি ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইস্যুতে তিনি সব সময় কট্টর অবস্থানে ছিলেন।

ইরানের নেতৃত্ব খামেনির এই জানাজা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শন করতে চেয়েছিল। কারণ এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং গত জানুয়ারি মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে আরও হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় রাতে চালানো মার্কিন হামলার পর ট্রাম্প সতর্ক করেছেন যে মার্কিন হামলা আরও ভয়াবহ হতে পারে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা নষ্ট করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

এর তিন সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছিল, যেখানে সব যুদ্ধ ফ্রন্টে বৈরিতা অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে দুই দেশের জন্য দুই মনে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, যার আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত