গণঅভ্যুস্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ১৮ মাস পর ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন নেতৃত্ব বেছে নিয়েছে। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বড় ধরনের বিজয় পেয়েছে। দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসন জিতে দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
এছাড়া এই নির্বাচনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। তাদের মিত্র গণঅভ্যুস্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জিতেছে ছয়টি আসন।
এদিকে নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬০ শতাংশের বেশি ভোটার প্রস্তাবিত ব্যাপক সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। যদিও জামায়াত কিছু আসনে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে এই নির্বাচন অধিকাংশ বাংলাদেশির চোখে বৈধতা পেয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের জন্য এটি স্বস্তির বিষয়।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিএনপির এই বড় জয় দিল্লির কৌশলগত স্বার্থের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ভারতে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল, তা নতুন করে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইতিহাসে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক বেশিরভাগ সময়ই টানাপোড়েনপূর্ণ ছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি আগের মতো নয়। এবার বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে নেই। জামায়াত পাকিস্তানপন্থী হওয়ায় দলটির সঙ্গে ভারতের সহযোগিতা করা কঠিন হতো।
বিএনপির নেতা তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়বেন, যেখানে সবাই অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং সংখ্যালঘুরা সম্মান ও নিরাপত্তা পাবে। তিনি আরও বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে তিনি পক্ষ নেবেন না—এমন নীতি দিল্লির জন্য গ্রহণযোগ্য। যদিও ভারত ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাইত। কিন্তু এবার দলটি নির্বাচনে নিষিদ্ধ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও তারেক রহমানের সঙ্গে ভারত কাজ করতে চাইবে।
ভারত ইতিমধ্যেই বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়তে শুরু করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে ঢাকায় যান। খালেদা জিয়া ছিলেন তারেক রহমানের মা। শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যে দ্রুত অভিনন্দনমূলক ফোনালাপও এই ইতিবাচক অগ্রগতিকে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
টেলিগ্রাফের সম্পাদকীয়র স্ক্রিনশটতবে বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক—উভয়ের ক্ষেত্রেই নির্বাচন ও তার ফলাফল কেবল স্বাভাবিকতার পথে প্রথম ধাপ। একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনে মাত্র ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সহিংসতার পরিবেশ এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ না পাওয়ার বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
তারেক রহমানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ গণভোটে দেওয়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করাও রয়েছে। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায়নি। দীর্ঘদিন শেখ হাসিনাকে ভারতের সমর্থন দেওয়া একটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে আছে। ভারত তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশিরা ভীষণ অসন্তুষ্ট। নয়াদিল্লি ও ঢাকার নতুন সরকারকে এগুলো সমাধানে কাজ করতে হবে। উভয় পক্ষকেই পরিপক্বতার পরিচয় দিতে হবে। পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় ভারত ও বাংলাদেশের একে অপরের প্রয়োজন রয়েছে।