ফিরে দেখা

সেদিন মাইলস্টোনে যা ঘটেছিল

শাহরিয়ার ইসলাম শোভন
শাহরিয়ার ইসলাম শোভন

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে উদ্ধার তৎপরতা। ছবি: সংগৃহীত

এক বছর আগে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর (বিএএফ) একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দেওয়া সেই ট্র্যাজেডিতে ২৬ জন শিক্ষার্থীসহ ৩২ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং আরও ১৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হন।

ওই ট্র্যাজেডির পর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে সামরিক বিমান চলাচল অব্যাহত রাখা উচিত কিনা, তা নিয়ে দেশব্যাপী বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। একই সঙ্গে বেঁচে ফেরা মানুষ, শোকসন্তপ্ত পরিবার এবং উদ্ধারকর্মীদের মানসিক বিপর্যয়ের দিকে নজর দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বিমান চলাচলের ব্যাপারে আরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে, আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে।

এসবরে পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এই বিধ্বস্তের ঘটনার একটি তদন্ত শুরু করেছে। অন্যদিকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ তাদের ক্যাম্পাসে পর্যায়ক্রমে একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে। তবে যেসব পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, তারা আজও সেই দুঃসহ শোক বয়ে বেড়াচ্ছে।

সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার এক বছর পর ঢাকা স্ট্রিম ফিরে দেখার চেষ্টা করেছে সেই দিনে কী ঘটেছিল, সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছেল, কী কী বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল এবং বিশেষজ্ঞরা কী বলেছিলেন।

যেভাবে মাইলস্টোনে আছড়ে পড়েছিল যুদ্ধবিমানটি

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্যমতে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফটি-৭বিজিআই ফাইটার বিমানটি ২০২৫ সালের ২১ জুলাই কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করার কয়েক মিনিট পরেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। দুপুর আনুমানিক ১টা ১৮ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দোতলা ভবনে আছড়ে পড়ে। তার আগে পাইলট যুদ্ধবিমানটিকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি সফল হননি।

তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে ক্লাস চলছিল। যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলভবনে আগুন ধরে যায়। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। হতাহতদের উদ্ধার করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

সরকারি পদক্ষেপ

বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্থাকে যুক্ত করে জরুরি কার্যক্রম শুরু করে। ২২ জুলাইকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার জন্য চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানো হয়।

বিপর্যয়ের পর জারি করা সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, গুরুতর আহতদের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং আরও কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তারা সরকারি খরচে চিকিৎসা পান।

সরকার নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তাও ঘোষণা করে। পাশাপাশি উপদেষ্টারা চিকিৎসার তদারকি করতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।

বেঁচে ফেরা মানুষ ও শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে সার্বক্ষণিক মানসিক সহায়তা প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্য তথ্য ও টেলিমেডিসিন সেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’ চালু করে। সরকারি সংস্থাগুলো নিহতদের শনাক্তকরণের কাজও সমন্বয় করে এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়।

আইএসপিআর ও বিমান বাহিনী যা করেছে

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে একটি ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারি’ গঠন করে আর আইএসপিআর হতাহতের সংখ্যা, উদ্ধার তৎপরতা এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট প্রদান করতে থাকে।

বিমান বাহিনীর সদস্যরা ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে উদ্ধারকাজে যোগ দেন এবং হতাহতদের হাসপাতালে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেন।

এই ট্র্যাজেডির কয়েক দিন পর বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন বলেন, দুর্ঘটনার পরও কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গেছে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা ও রাজধানী সুরক্ষায় এই ঘাঁটির ভূমিকার ওপর জোর দেন।

মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ যেভাবে সামলেছিল সেই দুর্ঘটনা

বিমান বিধ্বস্তের পরপরই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ তাদের একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত করে। জ্বলন্ত ভবন থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বের করে আনতে শিক্ষক ও কর্মচারীরা জরুরি উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে যোগ দেন।

কলেজ কর্তৃপক্ষের মতে, নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করতে হাজিরা খাতা ব্যবহার করা হয়েছিল। পাশাপাশি কর্মকর্তারা হাসপাতাল এবং প্রিয়জনদের খুঁজছেন এমন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন। প্রতিষ্ঠানটি পরে নিহতদের স্মরণে স্মরণসভার আয়োজন করে এবং ক্যাম্পাস পুনর্বাসন কাজের পর ধীরে ধীরে একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে।

কলেজ কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য কাউন্সেলিং সহায়তারও উদ্যোগ নেয়। তারা জানায়, ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে প্রতিষ্ঠানটি সবসময় থাকবে।

পরিবার, বেঁচে ফেরা মানুষ এবং অভিভাবক

দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শত শত অভিভাবক তাদের সন্তানদের খোঁজে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে যান। কারণ হতাহতদের একাধিক চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে অনেক অভিভাবক একটি স্বচ্ছ তদন্ত, অবহেলা পাওয়া গেলে জবাবদিহিতা, আহত শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি জানান।

এখনো রয়ে গেছে মানসিক ক্ষত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী স্ট্রিম-কে বলেন, ‘শুধু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রমা বা মানসিক আঘাত দূর হয় না। ঘটনার এক বছর পরও অনেক সারভাইভার বা বেঁচে ফেরা মানুষ উদ্বেগ, অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি, ঘুমের ব্যাঘাত বা মানসিক কষ্টে ভুগতে পারেন।’

অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে মানসিক প্রতিক্রিয়া দেরিতে প্রকাশ পেতে পারে, যার কারণে দীর্ঘমেয়াদী কাউন্সেলিং এবং পারিবারিক সহায়তা অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, ‘মানসিক ক্ষত থেকে উত্তরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া, এবং বেঁচে ফেরা মানুষের যতদিন প্রয়োজন ততদিন মানসিক স্বাস্থ্য দেওয়া উচিত।’

ঘটনার পরপরই স্ট্রিম-এর সঙ্গে কথা বলার সময় মাইন্ড টু হার্ট সাইকোলজিক্যাল ওয়েলনেস সেন্টারের মনোবিজ্ঞানী এবং ট্রমা বিশেষজ্ঞ মো. মেহেদী হাসান বলেন, বেঁচে ফেরা মানুষরা—বিশেষ করে যেসব শিশু এই দুর্ঘটনাটি নিজ চোখে দেখেছে বা এর শিকার হয়েছে, তারা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভোগার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ধরনের সমস্যা কোনো মর্মান্তিক ঘটনার কয়েক দিন বা এমনকি কয়েক মাস পরেও দেখা দিতে পারে।

মেহেদী হাসান বলেন, ‘পিটিএসডির লক্ষণগুলো কয়েক দিন বা এমনকি কয়েক মাস পরেও প্রকাশ পেতে পারে এবং এর মধ্যে ফ্ল্যাশব্যাক, দুঃস্বপ্ন এবং তীব্র উদ্বেগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।’

মেহেদী হাসানের মতে, এটি কেবল শিশুদের মধ্যেই নয়, বরং শিক্ষক, অভিভাবক, জরুরি উদ্ধারকর্মী, সাংবাদিক এবং উদ্ধার বা পুনরুদ্ধারের কাজে সরাসরি যুক্ত থাকা চিকিৎসা কর্মীদের মধ্যেও দেখা দিতে পারে।

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জিএসটিইউ) মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নুসরাত শারমিন দুর্ঘটনার পর স্ট্রিম-কে বলেন, এই মানসিক আঘাত বা ট্রমা কিছু সারভাইভারদের মধ্যে অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) এবং বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (বিপিডি)-এর মতো সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

এমনকি এই ট্র্যাজেডি ওসিডি এবং বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (বিপিডি)-এর মতো মানসিক অবস্থারও জন্ম দিতে পারে বলে জানান তিনি। নুসরাক শারমিন বলেন, ‘ওসিডির ক্ষেত্রে বেঁচে ফেরা মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা, বিশেষ করে শিশুরা ঘটনাটির সাথে সম্পর্কিত অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা অনুভব করতে শুরু করতে পারে। তীব্র উদ্বেগ মোকাবিলার উপায় হিসেবে ওসিডি তাদেরকে পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ করতে বাধ্য করে।’

মনোবিজ্ঞানের এই শিক্ষক আরও বলেন, যাদের আগে থেকেই বিপিডি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, এই ট্রমা তাদের আবেগজনিত অস্থিরতা এবং আপনজনদের হারানোর ভয়কে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত