জন্মাষ্টমীর জেন্ডার পলিটিক্স: পৌরুষ মহিমার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এক নারীবাদী আখ্যান

রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং লিঙ্গভিত্তিক রাজনীতির আলোকে পবিত্র জন্মাষ্টমীর পৌরাণিক আখ্যানকে এই নিবন্ধে পুনঃবিশ্লেষণ করা হয়েছে। নিবন্ধটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে কংসের চরম স্বৈরাচারী ‘ভয়ের সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিরোধ বা ‘কাউন্টার প্রোপাগান্ডা’ এসেছিল নবজাতক কন্যা যোগমায়ার হাত ধরে, অথচ পরবর্তীকালে শাস্ত্র ও সংস্কৃতির পুরুষতান্ত্রিক সম্পাদনায় সেই বৈপ্লবিক কণ্ঠস্বর ঢাকা পড়ে গেছে শ্রীকৃষ্ণের পৌরুষ মহিমা ও ঈশ্বরত্বের আড়ালে। পৌরাণিক এই প্রেক্ষাপটকে সমকালীন বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রগঠনে নারীর প্রান্তিকীকরণের সাথে তুলনা করে ধর্মীয় ও সামাজিক বয়ান উপস্থাপন করেছেন রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ক গবেষক ও শিক্ষক রাজীব নন্দী।

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ০৫
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

পুরাকালে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির এক মহাদুর্যোগপূর্ণ রাতে যমুনার দুই পাড়ে জন্ম নেয় দুই ভিন্ন মায়ের দুই সন্তান—কৃষ্ণ ও যোগমায়া। মথুরার কারাগারে দেবকীর কোলে শ্রীকৃষ্ণ, আর ওপারে গোকুলে যশোদার ঘরে যোগমায়া। আজ তাঁদের জন্মদিন।

কৃষ্ণের মহিমা অপার। তিনি সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীদের কাছে ঈশ্বর, সর্বভূতে বিরাজমান, সর্বত্রগামী ও সুপরিচিত। তার বিপরীতে যোগমায়া ততোধিক অপরিচিত, অনুল্লিখিত ও ব্রাত্য। কংসের হাত থেকে ফসকে গিয়ে শূন্যে তিনি যে অষ্টভুজা রূপ ধারণ করেছিলেন, তা ছিল দুর্গারই আরেক রূপ। পরবর্তীতে তিনি বিন্ধ্য পর্বতে নিবাস করেন বলে তাঁকে ‘বিন্ধ্যবাসিনী’ নামেও পূজা করা হয়।

পুরাণ অনুযায়ী, কংসের মহাকালরূপী কারাগার থেকে দেবকী-বসুদেব মথুরার যে কৃষ্ণকে লুকিয়েছিলেন, তিনি মূলত ছিলেন পরম ব্রহ্মের ‘বিষ্ণু’ রূপ। আর ওপারে যমুনার তীরে, মায়াপীঠ গোকুলে যশোদার জঠর থেকে জন্ম নেওয়া কন্যাটি ছিলেন স্বয়ং ‘মহামায়া’। ক্ষাত্রশক্তির সুরক্ষায় ব্রজের এক প্রান্তিক গোপ-সংস্কৃতির নবজাতিকাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের বলির পাঁঠা বানাতে মথুরার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি করা হলো। অথচ কংসের জল্লাদ-হস্ত স্পর্শ করার আগেই মহাশূন্যে অট্টহাস্য করে সেই কন্যাই প্রথম কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন স্বৈরাচারের রাজদণ্ড। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এখানেই—যে কন্যার আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে কৃষ্ণ নামক এক পরম পুরুষ, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক আইকনের জন্ম হলো, ভক্তিবাদের প্রাবল্যে আরেক মহাশক্তির জন্মদিন আজ লোকসংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।

এই মিথলজিক্যাল ট্র্যাজেডি কি কেবলই এক অলৌকিক লীলাখেলা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন ‘স্ট্র্যাটেজিক জেন্ডার সাইলেন্সিং’? মথুরার সেই আদি ‘ভয়ের সংস্কৃতির’ দেয়াল ভাঙার প্রথম কৃতিত্ব কেন শাস্ত্র ও লোকাচারের পুরুষতান্ত্রিক সম্পাদনায় কেবলই কৃষ্ণের একচ্ছত্র মহিমায় ঢাকা পড়ে গেল? সনাতন দর্শনের লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার এই জটিল মনস্তত্ত্ব এবং কংসের ‘আয়নাঘর’ চূর্ণ করা সেই অবদমিত নারী কণ্ঠস্বরের তাত্ত্বিক ময়নাতদন্ত দেখতে—আসুন, মূল আলোচনায় প্রবেশ করা যাক।

কংসের শাসনব্যবস্থা টিকে ছিল এক চরম স্বৈরাচারী ‘ভয়ের সংস্কৃতি’র ওপর। সেখানে ভবিষ্যদ্বাণী বা ইনফরমেশন সেন্সর করার জন্য নবজাতকদের হত্যা করা হতো— যা আধুনিক রাষ্ট্রের গুম বা বিচারবহির্ভুত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডেরই প্রাচীন রূপ। মহাভারত আমাদের শেখায়, সেই নিশ্ছিদ্র ভয়ের দেওয়ালে প্রথম ফাটল ধরান যে নারী, তিনি যোগমায়া।

পবিত্র জন্মাষ্টমী বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পীতবসনধারী ভগবান কৃষ্ণের অবয়ব, মথুরার কারাগার ভেঙে বসুদেবের যমুনা পারাপার আর গোকুলের আনন্দোৎসব; আজ যার জন্মদিন তিনি সফল কূটনৈতিক, চৌকস যোদ্ধা, রতিরসিক পুরুষ, রহস্যঘেরা প্রেমিক ও আর্তের সহায় শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু এইসব সুপরিচিত আধ্যাত্মিক আখ্যানের সমান্তরালে লুকিয়ে আছে পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন এবং জেন্ডার স্টাডিজের এক অত্যন্ত শক্তিশালী কিন্তু সুকৌশলে আড়াল করা অধ্যায়। কংসের লৌহকবাটঘেরা যে কারাগারকে আজ আমরা রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ বা ‘আয়নাঘর’ বলতে পারি, সেখানে প্রথম মুক্তির বার্তা কৃষ্ণের মতো কোনো পুরুষ কণ্ঠ থেকে আসেনি; এসেছিল এক নবজাতক কন্যার অবয়বে আবির্ভূত শক্তি বা যোগমায়ার কাছ থেকে। অথচ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-মনস্তত্ত্ব ও অন্ধ ভক্তিবাদ এবং রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদী প্রচারকৌশলের গ্যাঁড়াকলে আজ সেই সহোদরা নারীর জন্মদিন বাঙালির ঘরে ঘরে ব্রাত্য, আলোর সবটুকু অংশ একচেটিয়াভাবে যেন কেবল কৃষ্ণের!

রাজনৈতিক যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কংসের শাসনব্যবস্থা টিকে ছিল এক চরম স্বৈরাচারী ‘ভয়ের সংস্কৃতি’র ওপর। সেখানে ভবিষ্যদ্বাণী বা ইনফরমেশন সেন্সর করার জন্য নবজাতকদের হত্যা করা হতো— যা আধুনিক রাষ্ট্রের গুম বা বিচারবহির্ভুত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডেরই প্রাচীন রূপ। মহাভারত আমাদের শেখায়, সেই নিশ্ছিদ্র ভয়ের দেওয়ালে প্রথম ফাটল ধরান যে নারী, তিনি যোগমায়া। কংস যখন তাকে পাথরে আছাড় মারতে উদ্যত হয়, তখন তার হাত থেকে ফসকে শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটি ছিল শোষকের বিরুদ্ধে প্রথম সফল ‘পলিটিক্যাল রেজিস্ট্যান্স’। শূন্যে ভেসে উঠে তাঁর দেওয়া সেই অমোঘ বার্তা— "তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে"—ছিল মূলত একটি কাউন্টার প্রোপাগান্ডা। একদলীয় ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরাচারী মনস্তাত্ত্বিক ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী এবং স্ট্র্যাটেজিক রাজনৈতিক যোগাযোগ আর কি হতে পারত? এটি কংসের সাজানো আয়নাঘরের ভেতরেই ভয়ের স্রোত উল্টোদিকে বইয়ে দিয়েছিল।

তবে জেন্ডার স্টাডিজের লেন্স দিয়ে তাকালে এই মুক্তির বার্তার পরবর্তী পরিণতিতে এক চরম বৈষম্য দৃশ্যমান হয়। সমাজতত্ত্ব মতে, গণমাধ্যম বা লৌকিক সংস্কৃতিতে যখন কোনো বিশেষ শ্রেণী বা জেন্ডারকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে রাখা হয়, তখন তাদের অবদান সমাজ থেকে মুছে যায়। যোগমায়ার ক্ষেত্রেও কি ঠিক তাই ঘটেছে? যিনি কংসের মনোযোগ ও আক্রমণ নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে কৃষ্ণকে সুরক্ষিত গোকুলে পৌঁছানোর মোক্ষম সুযোগ করে দিয়েছিলেন? অর্থাৎ, ভাদ্রের মহাবিপ্লবের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ‘ফ্রন্টলাইন’ যোদ্ধা ছিলেন একজন নারী। অথচ, পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজনের চিরন্তন নিয়মে নারীর এই আত্মত্যাগকে কেবলই ‘সহায়ক ভূমিকা’ বা ‘অনুঘটক’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে আসছে। মূল কৃতিত্ব বা 'এজেন্সি' অর্পণ করা হয়েছে পুরুষ অবয়বের ওপর, যার ফলে আজকের উৎসবটি কেবল ‘জন্মাষ্টমী’ নামে পুরুষ-কেন্দ্রিক আখ্যানে রূপান্তরিত হয়েছে।

মিথলজির এই রূপান্তর আসলে আমাদের সমকালীন সমাজ ও রাজনীতিরই এক প্রাচীন দর্পণ। ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা মুক্তির লড়াইয়ে নারীরা প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, বুক পেতে দিয়েছেন বুলেটের সামনে কিংবা শাসকের অত্যাচারের মুখে। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে যখন নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন রাজনৈতিক বয়ান থেকে নারীদের নাম সুকৌশলে ছেঁটে ফেলা হয়। যোগমায়া বাঙালি সমাজ আজ কতটুকু ‘দেবী’ হিসেবে দূর থেকে প্রণাম পায়? কৃষ্ণের মতো তাঁর জন্মদিনের লৌকিক উদযাপন বা লড়াকু সত্তার রাজনৈতিক স্বীকৃতি বাঙালির ঘরে নেই। জন্মাষ্টমীর এই মিথলজিক্যাল প্রেক্ষিত তাই কেবল একটি ধর্মীয় উপাখ্যান নয়, বরং এটি ক্ষমতা, জেন্ডার পলিটিক্স এবং কীভাবে একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীর বিপ্লবী কণ্ঠস্বরকে আড়াল করে তাকে কেবলই 'নেপথ্যের ত্যাগী চরিত্র'-তে বন্দী করে রাখে—তার এক জীবন্ত রাজনৈতিক দলিল।

মিথলজির এই রূপান্তর আসলে আমাদের সমকালীন সমাজ ও রাজনীতিরই এক প্রাচীন দর্পণ। ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা মুক্তির লড়াইয়ে নারীরা প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, বুক পেতে দিয়েছেন বুলেটের সামনে কিংবা শাসকের অত্যাচারের মুখে। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে যখন নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন রাজনৈতিক বয়ান থেকে নারীদের নাম সুকৌশলে ছেঁটে ফেলা হয়।

মিথলজির এই জেন্ডার পলিটিক্স বা লিঙ্গভিত্তিক রাজনীতির সমান্তরাল প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া প্রবল গণঅভ্যুত্থানের পর রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের পাতায়। চব্বিশে ভয়ের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে রাজপথে প্রথম সারির ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হিসেবে বুক পেতে দিয়েছিলেন এদেশের অগণিত নারী ও ছাত্রীরা। ঠিক যেভাবে যোগমায়া নিজের জীবন বিপন্ন করে কংসের আক্রমণকে রুখে দিয়ে কৃষ্ণকে রক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন, তেমনি বাংলাদেশের নারীরাও বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে পলিটিক্যাল রেজিস্ট্যান্স বা রাজনৈতিক প্রতিরোধের নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের সেই চরম মুহূর্ত পার হতেই, ক্ষমতার নতুন সমীকরণে নারীদের সেই দৃশ্যমান উপস্থিতি সুকৌশলে মুছে ফেলার এক চেনা পুরুষতান্ত্রিক খেলা শুরু হয়।

সমাজবিজ্ঞানী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘সাবঅল্টার্ন’ তত্ত্বের সূত্র ধরে বলা যায়, বিপ্লবের ময়দানে নারীর কণ্ঠস্বর যতটাই উচ্চকিত থাকে, বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের টেবিলে তাদের ততটাই প্রান্তিক করে রাখা হয়। বাংলাদেশে একদলীয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের পতনের পর নীতি-নির্ধারণী পর্যায়, সংস্কার কমিশন কিংবা রাষ্ট্রের প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর দিকে তাকালে জেন্ডার রিপ্রেজেন্টেশনের এক চরম খরা চোখে পড়ে। রাজপথ কাঁপানো সেই লড়াকু নারীরা আজ ক্ষমতার অলিন্দে অদৃশ্য। এটি প্রমাণ করে যে, পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো নারীকে কেবলই ‘বিপ্লবের জ্বালানি’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু ক্ষমতার অংশীদার বা ‘এজেন্সি’ হিসেবে মেনে নিতে তার চিরন্তন আপত্তি রয়েছে।

অনেকের মতে, সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, পুরনো নিপীড়ন ব্যবস্থার অবসান ঘটলেও তার খোলস বদলে এক নতুন ধরণের পুরুষতান্ত্রিক ও চরম রক্ষণশীল উগ্র ডানপন্থী শাসনের উত্থান ঘটছে। গণঅভ্যুত্থানের পর জনপরিসরে নারীর অধিকার, পোশাকের স্বাধীনতা এবং সংস্কৃতির উপর যে পদ্ধতিগত, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আক্রমণ শুরু হয়েছে, তা মূলত কংসের সেই পুরনো ভয়ের সংস্কৃতিরই এক নতুন জেন্ডারড ভার্সন। যখন নারীবাদী কণ্ঠস্বরকে দমন করা হয়, কিংবা সংস্কৃতির শুদ্ধিকরণের নামে নারীর স্বাধীনতাকে সংকুচিত করা হয়, তখন তা আসলে ক্ষমতার সেই চিরন্তন পুরুষতান্ত্রিক মেরুকরণকেই স্পষ্ট করে।

জন্মাষ্টমীর আখ্যানে যোগমায়ার অবদানের রাষ্ট্রীয় বিলোপন এবং সমকালীন বাংলাদেশে সফল অভ্যুত্থানের পর নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের এই সংকোচন—আসলে একই সুতোয় গাঁথা। দুই ক্ষেত্রেই ক্ষমতার নতুন বয়ান তৈরিতে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য জিতে যায়, আর হেরে যায় মুক্তির প্রথম বার্তা আউড়ানো অবদমিত নারী কণ্ঠস্বর।

সনাতন দর্শনে পরম ব্রহ্ম 'লিঙ্গাতীত' হলেও লৌকিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্ব ঈশ্বরকে বারবার একচ্ছত্র পৌরুষ অবয়বেই হাজির করেছে। ফলস্বরূপ, ভক্তিবাদ যখন কৃষ্ণের মোহন বাঁশির সুরে মেতে ওঠে, তখন সেই সুরের মূর্ছনায় ঢাকা পড়ে যায় যোগমায়ার সেই প্রথম বিপ্লবী হুংকার। কৃষ্ণের প্রতি বাঙালির যে প্রেম ও ভক্তি— তা নিঃসন্দেহে এক পরম আধ্যাত্মিক আশ্রয়; যেখানে আত্মসমর্পণই মুক্তির পথ। কিন্তু এই তীব্র ভক্তিবাদের এক অন্ধ চোরাবালিও রয়েছে। এই ভক্তিমার্গ অবলীলায় একজন পুরুষ ঈশ্বরের দাসত্ব বা শরণাগতিকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে, নারীর নিজস্ব ‘এজেন্সি’ বা স্বাধীন সত্তাকে হরণ করে নেয়। কৃষ্ণকে ‘পূর্ণ ব্রহ্ম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লৌকিক তাড়নায় সমাজ ভুলে যায় যে, সেই কৃষ্ণের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই যোগমায়াকে নিজের দেবত্ব বিসর্জন দিয়ে কংসের পাথরে আছাড় খেতে হয়েছিল। ভক্তির এই একপেশে আলো কেবল পুরুষের বাঁশিকেই অমরত্ব দেয়, আর নেপথ্যের যে নারী নিজের স্বর ও অস্তিত্ব বিলীন করে সেই মোহন বাঁশি বাজার মঞ্চ তৈরি করে দিলেন—তাঁকে করে রাখে চিরকালের জন্য ব্রাত্য ও নীরব।

গণঅভ্যুত্থানের পর জনপরিসরে নারীর অধিকার, পোশাকের স্বাধীনতা এবং সংস্কৃতির উপর যে পদ্ধতিগত, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আক্রমণ শুরু হয়েছে, তা মূলত কংসের সেই পুরনো ভয়ের সংস্কৃতিরই এক নতুন জেন্ডারড ভার্সন। যখন নারীবাদী কণ্ঠস্বরকে দমন করা হয়, কিংবা সংস্কৃতির শুদ্ধিকরণের নামে নারীর স্বাধীনতাকে সংকুচিত করা হয়, তখন তা আসলে ক্ষমতার সেই চিরন্তন পুরুষতান্ত্রিক মেরুকরণকেই স্পষ্ট করে।

সনাতন সংস্কৃতির মহাআখ্যান মহাভারত ও পবিত্র রামায়ন ঘাঁটলে দেখা যায়, সমাজ সর্বদা ‘সীতা’র মতো ত্যাগী, সহনশীল ও অগ্নিপরীক্ষা দেওয়া বাধ্য নারী চরিত্রকেই দেবত্বের সুউচ্চ আসনে বসাতে এবং ঘরে ঘরে পূজা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। কিন্তু যখনই কোনো নারী ‘দ্রৌপদী’র মতো ভরা রাজসভায় দাঁড়িয়ে পিতৃতন্ত্রের মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দিয়ে প্রতিরোধের আগুন জ্বালেন, কিংবা ‘যোগমায়া’র মতো কংসের কারাগারে প্রথম বিদ্রোহী বার্তা আউড়ান—তখনই পুরুষতান্ত্রিক লৌকিক ধর্মতত্ত্ব সুকৌশলে তাঁদের হয় উপেক্ষিত, নয়তো আড়ালেই রাখে। ইতিহাসের এই দীর্ঘ চেনা ছক আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে— পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কি তবে কেবল নারীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আর নীরব ত্যাগকেই ‘পূজনীয়’ ভাববে? আর সমাজ ও সংস্কৃতির অলিন্দে নারীর স্বাধীন এজেন্সি, জেন্ডার পলিটিক্স ও বৈপ্লবিক স্বর কি এভাবেই যুগে যুগে কৃষ্ণের পৌরুষ মহিমার আড়ালে চিরকাল উপেক্ষিতই থেকে যাবে?

পুরানের এই দীর্ঘ চেনা ছক আজ আমাদের এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সর্বশক্তিমান 'ঈশ্বর' শ্রীকৃষ্ণ একচ্ছত্রভাবে 'পুরুষ' অবয়বে হাজির বলেই কি তবে এই প্রকাশ্য লৈঙ্গিক বৈষম্য? অথচ হওয়ার কথা ছিল অন্যরকম। আহমদ ছফা তাঁর উপন্যাসে যে চিরন্তন সত্যের সন্ধান করেছিলেন— নারীর মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক অলৌকিক চালিকাশক্তি, যেখানে সে একাধারে ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’।

আজকের এই পরম তিথিতে মর্ত্যের ঘরে ঘরে পুরুষ ঈশ্বর বন্দনার পাশাপাশি কি আরাধনা হওয়ার কথা নয় সেই লড়াকু ঈশ্বরী সত্তার? সমাজ ও সংস্কৃতির অলিন্দে নারীর স্বাধীন এজেন্সি, জেন্ডার পলিটিক্স ও বৈপ্লবিক স্বর কি এভাবেই যুগে যুগে কৃষ্ণের পুরুষালি মহিমার আড়ালে চিরকাল উপেক্ষিতই থেকে যাবে, নাকি ছফার সেই ঈশ্বরী কোনোদিন তাঁর পূর্ণ মহিমায় প্রাপ্য হিস্যা বুঝে নিতে পুনরুত্থিত হবে?

  • লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; পিএইচডি রিসার্চ স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত