ভোটের আগেই যুদ্ধ চান নেতানিয়াহু, তুরস্ক কী টার্গেট

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০: ৫১
নির্বাচন জিততে তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবেন নেতানিয়াহু। স্ট্রিম গ্রাফিক
নির্বাচন জিততে তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবেন নেতানিয়াহু। স্ট্রিম গ্রাফিক

ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের দুই মাসও বাকি নেই। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর দলগুলোর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার নয়। জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে তাঁর লিকুদ পার্টির সমর্থন কমছে। প্রধান বিরোধী দল দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ডানপন্থী বেশ কিছু নতুন দলের উত্থান লিকুদ পার্টির নিজস্ব ভোটব্যাংকে ভাগ বসাচ্ছে।

অতীতে নিরাপত্তা-হুমকি ও ভয়ভীতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাপে ফেলতেন নেতানিয়াহু। এবার সেই কৌশল কাজ করবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ক্ষমতা হারানোর এই বাস্তব ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে এখন কী করবেন নেতানিয়াহু?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকাররা আশঙ্কা করছেন নেতানিয়াহু নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারেন। বিরোধীদের বিরুদ্ধে পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া, নির্বাচন কমিশনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা ট্রাম্পের কায়দায় ভোট চুরির অভিযোগ তোলার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ বাধাবেন নেতানিয়াহু!

ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে পুরোনো ছকে হাঁটতে শুরু করেছেন। তিনি চাইবেন দেশে এক বা একাধিক নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি করা। নিজের পুরোনো ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ বা নিরাপত্তার কাণ্ডারি ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য। লিকুদ পার্টি ছেড়ে যাওয়া মধ্যপন্থী ভোটারদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া তাঁর লক্ষ্য।

তারা তুরস্ককে উসকানি দিচ্ছে। নির্বাচনের আগে ভোট টানার জন্য এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক চাল হতে পারে। মার্কিন দূত টম ব্যারাক

প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের হাতে দেশ ছেড়ে দেওয়া অনিরাপদ হবে, এমন বার্তা নেতানিয়াহু দিতে চাইছেন। পুরো মাত্রার যুদ্ধ না বাঁধিয়েও সীমিত সামরিক সংঘাতকে বড় আকারের নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখানোই যথেষ্ট।

গত ১৮ আগস্ট সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমান ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু এবং তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর মাধ্যমে তুরস্ককে সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে। তুর্কি একটি সামরিক প্রতিনিধি দল ওই এলাকায় ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের প্রভাব বিস্তার নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ অস্বাভাবিক নয়। অনেকে এই হামলার পেছনে নিরাপত্তাজনিত দাবির চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বেশি দেখছেন। তুরস্ক ও সিরিয়া বিষয়ক মার্কিন দূত টম ব্যারাক বলেন, ‘তারা তুরস্ককে উসকানি দিচ্ছে। নির্বাচনের আগে ভোট টানার জন্য এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক চাল হতে পারে।’

অন্যান্য ফ্রন্টে ট্রাম্পের বাধার মুখে নেতানিয়াহু

অন্যান্য রণাঙ্গনে নতুন সংঘাত বাধানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বাধার মুখে পড়ছেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি জনগণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ইরান। নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে বড় সামরিক সংঘাত চান না বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। গাজা এবং লেবাননে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির কারণে নেতানিয়াহুর হাত-পা বাঁধা পড়েছে।

সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে আগ্রাসী আচরণও বড় ধরনের ঝুঁকির জন্ম দিচ্ছে। সিরিয়ার স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং দেশটিকে পশ্চিমাদের কাছাকাছি আনতে দামেস্কের বর্তমান প্রশাসনকে সমর্থন দিচ্ছে ওয়াশিংটন। এই কাজে তুরস্কের সামরিক সহায়তাকে সহায়ক মনে করে ট্রাম্প প্রশাসন।

যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই সিরিয়ার বর্তমান সরকারকে দুর্বল করতে চায় না। সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে তুরস্কের সঙ্গে সংকট তৈরি করলে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে।

সম্প্রতি নেতানিয়াহু তুরস্ককে ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের মনস্তত্ত্বে আঙ্কারার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য লড়াইয়ের প্রস্তুতি তৈরি করতেই এই বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানও পাল্টা আক্রমণাত্মক বক্তব্যে জবাব দিচ্ছেন। এর ফলে তুরস্ককে সম্ভাব্য বড় শত্রু হিসেবে উপস্থাপনে সুবিধা নেওয়ার পাঁয়তারায় আছেন নেতানিয়াহু।

পশ্চিম তীরের বাস্তব বিপদ

সবচেয়ে বড় বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পশ্চিম তীরে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে সেখানে কট্টরপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। চরমপন্থীরা কেবল ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে না। বিদেশি সাংবাদিক, ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মী এমনকি বাধা দিতে আসা ইসরায়েলি সেনাদের ওপরও তারা চড়াও হচ্ছে। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির সতর্ক করেছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

নেতানিয়াহু এবং তাঁর মন্ত্রিসভা এই সহিংসতায় কান দিচ্ছে না। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে থাকা উগ্র ধর্মীয় শরিকরা এই সুযোগে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে নতুন জমি দখল করতে চাইছে। তাদের প্রত্যাশা হলো ফিলিস্তিনিরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। বড় আকারের সামরিক অভিযান চালিয়ে সব ফিলিস্তিনিদের চিরতরে তাড়িয়ে দেওয়ার পথ তৈরি হবে।

নেতানিয়াহু হয়তো এমন ধর্মীয় উন্মাদনায় পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না। নিজের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তিনি এই সংকটকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করছেন। ফিলিস্তিনিদের পাল্টা হামলা শুরু হলে সাধারণ ইসরায়েলিরা সংঘাত শুরুর কারণ খুঁজবে না। সংকট সামলানোর জন্য নেতানিয়াহুকেই সবচেয়ে নিরাপদ নেতা মনে করবে বলে বাজি ধরেছেন তিনি।

পশ্চিম তীরের উসকানির বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সবসময় নমনীয় থেকেছে। মার্কিন দূতরা মৃদু প্রতিবাদ করলেও ট্রাম্প নিজে কখনোই কোনো কড়া কথা বলেননি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না জড়িয়ে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ানো নেতানিয়াহুর জন্য তুলনামূলক সহজ।

নির্বাচন পেছানোর ছক

পশ্চিম তীর কিংবা সিরিয়া সীমান্তে বড় সংঘাত শুরু হলে জরুরি অবস্থা জারি করে জাতীয় নির্বাচন স্থগিত করার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। আইন অনুযায়ী নেসেটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (সুপারমেজরিটি) ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সমালোচকরা মনে করেন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এমন বেপরোয়া চালেও হাত দিতে পারেন তিনি।

অতীতে নিরাপত্তা-হুমকি ও ভয়ভীতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাপে ফেলতেন নেতানিয়াহু। এবার সেই কৌশল কাজ করবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

টানা তিন বছরের যুদ্ধের পর ভোটাররা নতুন সংঘাতের পক্ষে ভোট দেবেন কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্লান্তি রয়েছে। যুদ্ধের পরও দেশ নিরাপদ হয়নি বলে মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জুলাইয়ের জরিপে দেখা গেছে, ৩৭ শতাংশ ইসরায়েলি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে খুব খারাপ মনে করেন। নেতানিয়াহুর সমর্থক ভোটারদের মধ্যেও ৪৯ শতাংশ দেশের নিরাপত্তা নিয়ে হতাশ।

যুদ্ধ বাঁধানোর এই চাল নেতানিয়াহুকে জয় এনে দেবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। জনমত জরিপ বলছে অধিকাংশ মানুষ মনে করে ভোটের স্বার্থেই তিনি সামরিক সিদ্ধান্ত নেন। সেনাবাহিনীর তুলনায় নেতানিয়াহুর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা অনেক কম।

ক্ষমতা ধরে রাখতে যেকোনো অনৈতিক কৌশল ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত এই রাজনীতিক। আগামী নির্বাচনে হেরে যাওয়ার অর্থ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের চিরতরে সমাপ্তি। নতুন দল ক্ষমতায় আসলে ২০২৩ অক্টোবরে হামাসের হামলা নিয়ে সরকারি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়ে যাবে। তাঁর বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি দুর্নীতির মামলা পেছানো বা দোষ স্বীকার করে সমঝোতার (প্লি ডিল) সব সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। নিজের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে তুরস্ক বা অন্য যেকোনো ফ্রন্টে শেষ বাজি ধরতে নেতানিয়াহু পিছপা হবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফরেইন পলিসির বিশ্লেষণ

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত