খাল খাঁ খাঁ, তেল না পেয়ে খাবি খাচ্ছেন পাবনার বোরো চাষি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
পাবনা

ধানে ফুল আসার পর নিয়মিত সেচ দিতে হয়। তবে ডিজেল সংকটে পাবনার অনেক চাষি সেচযন্ত্র চালাতে পারছেন না। স্ট্রিম ছবি

ধানে ফুল আইসা গেছে। এখন পানি না দিলি ধান চিটা হয়ে যাবে। পাম্পে একদিন তেল পেলি ৩ দিন পাওয়া যায় না– জ্বালানি সংকটে বোরো ধানে পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পেরে এভাবেই আক্ষেপ করছিলেন পাবনার বেড়া উপজেলার চাকলা গ্রামের কৃষক টিপু মোল্লা।

বোরো মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুরো জেলার অবস্থায় এমন। অথচ এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কয়েকশ কোটি টাকার সেচখাল প্রকল্প রয়েছে। নিয়মিত সংস্কারের অভাবে সেই খালের বেশিরভাগ এখন পানিশূন্য।

এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের ভরসা সেচযন্ত্র। তবে তীব্র লোডশেডিং ও ডিজেল সংকটে গভীর-অগভীর কোনো নলকূপই প্রয়োজন মতো চালাতে পারছেন না চাষিরা। এতে ধানের পাশাপাশি পাট, তিল ও সবজির খেতও গ্রীষ্মের তাপদাহে পুড়ছে।

কৃষকরা বলছেন, ভোররাত থেকে পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও তারা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না। অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর শুনছেন তেল শেষ।

সাঁথিয়া উপজেলার বাওইকোলা গ্রামের কৃষক হাসান জানান, প্রতিদিন সেচের জন্য ৮-১০ লিটার ডিজেল লাগলেও পাম্প থেকে ৫ লিটারের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় পাম্প কর্তৃপক্ষ ‘তেল নেই’ বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ গোপনে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

৩৮৪ কোটির সেচ প্রকল্প গিলেছে অবহেলা

১৯৯২ সালে পাবনা সেচ প্রকল্পের যাত্রা শুরু। ওই সময় ৩৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল খালের মাধ্যমে ১৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। শুরুতে ৫ হাজার ৫০০ হেক্টরে পানি পৌঁছালেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আর প্রশাসনিক উদাসীনতায় বর্তমানে তা সংকুচিত হয়ে ৩ হাজার ৩০০ হেক্টরে নেমেছে।

এই রাস্তার পাশে এক সময় ছিল পাউবোর সেচনালা। তবে সংস্কারের অভাবে সেই নালা এখন ভরাট হয়ে গেছে। স্ট্রিম ছবি
এই রাস্তার পাশে এক সময় ছিল পাউবোর সেচনালা। তবে সংস্কারের অভাবে সেই নালা এখন ভরাট হয়ে গেছে। স্ট্রিম ছবি

সরেজমিনে সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দেখা যায়, গ্রামগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সেচখালগুলো মৃতপ্রায়। কোথাও কচুরিপানা ও আগাছায় ঠাসা, আবার কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলেছে। এ ছাড়া এক সময়ের পানিভর্তি সেচখাল এখন কোথাও খেলার মাঠ, আবার কোথাও আবর্জনার ভাগাড়।

কৃষকদের ভাষ্য, খালের পানি ব্যবহার করতে পারলে বিঘাপ্রতি সেচ খরচ হতো মাত্র ১৮০ টাকা। কিন্তু ব্যক্তিগত সেচযন্ত্রে (শ্যালো ইঞ্জিন) সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা।

হাহাকার চলনবিলেও

খরচ-লাভের হিসাবনিকাশে গত এক দশক ধরেই চলনবিলে কমছে ধানের উৎপাদন। এরপরও যারা আবাদে আছেন, সংকট তাঁদের পিছু ছাড়ে না।

কৃষিপঞ্জিকা অনুযায়ী, বোরোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এখন। তবে সেচ নিয়ে বিল এলাকার কৃষকরা চোখে অন্ধকার দেখছেন। কারণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নেমে যাওয়ার সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে তীব্র লোডশেডিং ও ডিজেল সংকট। এতে হাজারো কৃষক আদৌ ফসল পাবেন কিনা তা নিয়ে প্রমাদ গুনছেন।

দেশের সবচেয়ে বড় এ বিলের একটা অংশ পড়েছে জেলার চাটমোহর উপজেলায়। স্থানীয় কৃষি কার্যালয়ের হিসাব বলছে, উপজেলায় প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা প্রায় ২০ হাজার লিটার। কিন্তু সপ্তাহে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১০ হাজার লিটার। ডিজেলচালিত পাম্পে ভরসা রাখা কৃষক তাই পড়েছেন অথই সাগরে।

পাল্টে যাচ্ছে শস্যবিন্যাস

তীব্র খরা আর সেচ সংকটের কারণে পাবনার শস্যবিন্যাসও বদলে যাচ্ছে।

পুন্ডরিয়া গ্রামের কৃষক জানিক শেখ ও মনসুর আলী জানান, আগে ১০০ বিঘার মতো জমিতে ধান চাষ করতেন। কিন্তু পানির অভাবে অর্ধেকের বেশি জমিতে বাধ্য হয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। যারা ঝুঁকি নিয়ে ধান চাষ করেছেন, তাদের বিঘাপ্রতি খরচ ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই ব্যয় অনেক কৃষকের নাগালের বাইরে। এতে তারা অন্য ফসলে ঝুঁকছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, শিগগির সেচ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে।

পাউবোর বেড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জানান, সেচখাল উন্নয়নে নতুন প্রকল্প নেওয়ার কথা আছে। তা কবে নাগাদ তা বাস্তবায়ন হবে তা বলা যাচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে পাবনা জেলা কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের চরম উদাসীনতা আর পাউবোর আমলাতান্ত্রিক অবহেলার মাশুল পাবনার হাজার হাজার কৃষককে দিতে হচ্ছে। পানির অভাবে যেখানে মাঠের ফসল পুড়ে যাচ্ছে, সেখানে প্রশাসনের আশ্বাস আর দায়সারা বক্তব্য কৃষকদের সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। অবিলম্বে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক ও সেচখাল সংস্কার না করলে হাজারো কৃষক আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, ‘একটু কষ্ট হলেও কৃষক তেল পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকারে রেখেছি। তা ছাড়া জেলার অনেক জায়গায় সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। সেচে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়বে না। এর বাইরে পাট বা অন্যান্য ফসলে সেচ লাগবে। তারা যেন প্রয়োজনীয় তেল পান, তা নিয়ে কাজ করছি।’

পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রয়োজন ছাড়াই অনেকে কৃষক সেজে তেল নিচ্ছেন। এতে সমস্যা আরও বাড়ছে। কৃষকদের ভোগান্তিও বাড়ছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষক ও প্রশাসনকে সমন্বয় করে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত