ফিরে দেখা/৩০ মিনিটে ৬৩ জেলায় বিস্ফোরণ, সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ২১ বছর আজ। ছবি: বাসস থেকে নেওয়া

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। বেলা ১১টার দিকে দেশের মানুষ যখন স্বাভাবিক কর্মদিবসে ব্যস্ত, ঠিক তখনই একের পর এক বিস্ফোরণের খবর আসতে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। প্রথমে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যায়, এগুলো আলাদা কোনো হামলা নয়, একই পরিকল্পনার অংশ।

মাত্র প্রায় আধা ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলায় একযোগে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নথিতে বিস্ফোরণের সংখ্যা প্রায় ৫০০ বলা হয়েছে। তবে হামলার পরদিন প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর সমসাময়িক প্রতিবেদনে অন্তত ৪৫৯টি টাইম বোমা বিস্ফোরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে এত বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসরে এত সমন্বিত বোমা হামলার নজির ছিল না। হামলার দায় পরে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) স্বীকার করে।

সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল

ওই সময়ের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ আগস্ট সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণগুলো ঘটে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতির একটি বক্তব্যেও বলা হয়েছে, সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শুরু করে প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে ৬৩ জেলায় প্রায় ৫০০ বিস্ফোরণ ঘটে।

ঢাকাতেও বিস্ফোরণ ঘটে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বহু স্থানের আশপাশে। দ্য ডেইলি স্টার-এর পরদিনের প্রতিবেদনে রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ঢাকার জজ কোর্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, বিমানবন্দর রেলস্টেশন, পুলিশ সদর দপ্তর, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়।

চট্টগ্রামেও নগরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটে। আদালত ভবন, বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। সিলেটেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিস্ফোরণ ঘটে।

অর্থাৎ হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল শুধু একটি শহর বা একটি নির্দিষ্ট স্থাপনা নয়। দেশের প্রায় সর্বত্র একই সময়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা প্রদর্শন করতে চেয়েছিল।

কোথায় হয়েছিল বিস্ফোরণ

হামলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিস্তৃতি। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে শুধু মুন্সীগঞ্জ বাদে ৬৩ জেলায় বিস্ফোরণ ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় সমন্বিত বোমা হামলায় দুজন নিহত এবং প্রায় ১০০ জন আহত হন। হামলার ঘটনাস্থলগুলোতে পাওয়া প্রচারপত্র থেকে জেএমবির সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সেই সময়ে দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল—হামলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে একজন এবং সাভারে আরেকজন নিহত হন; আহত হন শতাধিক মানুষ।

জাতিসংঘও সেদিনই বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে সংঘটিত সমন্বিত বোমা হামলার নিন্দা জানায়। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান হামলায় একজন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হওয়ার খবরের কথা উল্লেখ করে হামলাকে ‘নির্বিচার সহিংসতা’ হিসেবে নিন্দা করেন।

প্রচারপত্রে কী বার্তা ছিল

বিস্ফোরণের পর বিভিন্ন ঘটনাস্থলে জেএমবির নামে প্রচারপত্র পাওয়া যায়। এসব প্রচারপত্রে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও বিচারব্যবস্থার বিরোধিতা এবং ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক প্রতিবেদনে ১৭ আগস্টের হামলার সঙ্গে এমন প্রচারপত্রের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ২০১০ সালের বিশ্লেষণেও বলা হয়, হামলার সঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার প্রচারপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল হামলার দায় জানানো ও ইসলামি শাসনের দাবি তুলে ধরা।

ফলে বিস্ফোরণের সংখ্যা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল একই সময়ে দেশের প্রায় সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া সেই রাজনৈতিক-আদর্শিক বার্তা।

সেই সিরিজ বোমা হামলার আগে সরকার অবশ্য জেএমবি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার জেএমবি ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এর কয়েক মাস পরই ১৭ আগস্টের সমন্বিত হামলা ঘটে।

হামলার পর তদন্ত ও গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার হয়। পরবর্তী সময়ে জেএমবির শীর্ষ নেতা শেখ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইসহ সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা গ্রেপ্তার হন। পরে বিভিন্ন মামলায় তাদের বিরুদ্ধে সাজা হয়।

মামলার কী হলো

দেশজুড়ে বিস্ফোরণের ঘটনায় বিভিন্ন জেলায় আলাদা আলাদা মামলা হয়। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, ১৭ আগস্টের হামলা নিয়ে সারাদেশে ১৫৯টি মামলা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯৪টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এসব মামলায় ৩৩৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। আরও ৫৫টি মামলা তখনও বিচারাধীন ছিল এবং এসব মামলায় আসামি ছিলেন ৩৮৬ জন। বিভিন্ন মামলায় ২৭ জনের মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল।

তবে সব মামলার বিচার একই সময়ে শেষ হয়নি। বিভিন্ন জেলার মামলায় পরবর্তী বছরগুলোতেও রায় হয়েছে। যেমন ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলে ১৭ আগস্টের হামলার একটি মামলায় ১৪ জেএমবি সদস্যকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ঢাকার খিলক্ষেতের একটি মামলায় ২০১৯ সালে পাঁচ জেএমবি সদস্যকে ১২ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

৩০ মিনিটে ৬৩ জেলায় বিস্ফোরণ, সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল