গাবতলী টার্মিনালে স্বস্তি, মহাসড়কে ভোগাচ্ছে ফিটনেসবিহীন বাস

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ২২: ০১
গাবতলী টার্মিনালে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় নেই। স্ট্রিম ছবি

ঈদযাত্রার শেষ সময়ে গাবতলী টার্মিনালে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় নেই। তবে মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন বাস, যানজট ও বাড়তি ভাড়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।

পবিত্র ঈদুল আজহার আগের দিন ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনালে সরেজমিনে দেখা যায়, চিরচেনা উপচে পড়া ভিড় বা বিশৃঙ্খলা নেই। শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার কর্মী মো. রেজাউল জানান, সিংহভাগ যাত্রী ২৪, ২৫ ও ২৬ মের মধ্যেই ঢাকা ছেড়েছেন এবং আজ দুপুরের পর থেকে কাউন্টারগুলো প্রায় ফাঁকা।

২৭ বছরের অভিজ্ঞতায় এবারের ঈদযাত্রাকে ‘সুন্দর ও নির্বিঘ্ন’ অভিহিত করে আল-হামরা পরিবহনের ম্যানেজার মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য বছর টিকিট না পেয়ে বাসের বনেটে যাওয়ার যে মরিয়া চেষ্টা থাকে—এবার তেমন কোনো সংকট নেই।’

গাবতলীতে এই স্বস্তির প্রধান কারণ হিসেবে পদ্মা সেতুকে চিহ্নিত করেছেন পরিবহন কর্মীরা। সৌহার্দ্য পরিবহনের সুপারভাইজার শামসুল ইসলাম দুলাল জানান, আগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব গাড়ি গাবতলী দিয়ে চলত, যা এখন সায়েদাবাদ বা গুলিস্তান হয়ে পদ্মা সেতু দিয়ে যাতায়াত করছে। ফলে গাবতলীর ওপর থেকে চার ভাগের তিন ভাগ যাত্রীর চাপ কমে গেছে।

টার্মিনালে যাত্রীর চাপ কম থাকলেও মহাসড়কে যানজটে অনেক গাড়ির শিডিউল বিপর্যয় ঘটছে। পরিবহন কর্মীরা এর জন্য ঢাকা শহরে চলাচলকারী ফিটনেসবিহীন লোকাল বাসগুলোকে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, এইসব ‘মফিজ গাড়ি’ দূরপাল্লার রুটে ঢুকে যানজট তৈরি করেছে।

হানিফ পরিবহনের কাউন্টার কর্মী রিজন আহমেদ বলেন, ‘যাত্রীর চাপ কম হলেও গাড়ি ফাঁকা যাচ্ছে না। তবে মহাসড়কে যানজটে বাসের ট্রিপ কমে গেছে। ৩টার গাড়ি যানজটে আটকে রাত ১০টায় এসেছে।’

লোকাল বাসের চালকদের অনভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দূরপাল্লার ড্রাইভার এবং সিটির ড্রাইভারের গাড়ি চালানোর ধরন ও অভিজ্ঞতা এক নয়। হাইওয়েতে কোথায় ইউটার্ন আছে, কোথায় কেমন স্পিডে চালাতে হবে— তা দূরপাল্লার ড্রাইভাররা আগে থেকে জানে। কিন্তু সিটির ড্রাইভাররা এসব না জেনেই গাড়ি চালায়, ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে।’

মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও যানজট বাড়ার পেছনে লোকাল বাস চালকদের 'অতিরিক্ত ট্রিপ' মারার প্রবণতাকে দায়ী করে দিগন্ত পরিবহনের কর্মী শামসুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘ওদের টার্গেট থাকে দ্রুত যাত্রী নামিয়ে দিয়ে আরেক ট্রিপ ধরার। যে কারণে ওরা দ্রুত গাড়ি চালায়। অনেক সময় চালকরা নিজেরা হেলপারদের হাতেও বাস দিয়ে দেয়।’

আল-হামরা পরিবহনের দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘শহরের লোকাল বাসগুলো রংপুর-দিনাজপুরের রুটে দ্বিগুণ ভাড়ায় যাত্রী টানছে এবং এগুলোর কারণে রাস্তায় জ্যাম লেগেছে।’

চুক্তিতে যাত্রী আনা-নেওয়া করা এই লোকাল বাসগুলো রংপুর রুটে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে। খোদ পুলিশের সামনেই দরকষাকষি চললেও তারা নির্বিকার।

এক বাসের সহকারী নির্দ্বিধায় বলেন, ‘এই তো সামনে পুলিশ, পুলিশের সামনেই তো আমরা বসে আছি।’

সৌহার্দ্য পরিবহনের সুপারভাইজার এই অব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গাফিলতিকে দায়ী করে বলেন, ‘কোনো গাড়ির রোড পারমিট বা ট্যাক্স টোকেন নেই, তা বিআরটিএ ভালো করেই জানে।’

গাবতলী টার্মিনালে নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। স্ট্রিম ছবি
গাবতলী টার্মিনালে নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। স্ট্রিম ছবি

এ বিষয়ে বিআরটিএ-এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এছাড়া টার্মিনাল সংলগ্ন গাবতলী পশুর হাটের কারণেও প্রতিটি গাড়ি দুই থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে পৌঁছাচ্ছে বলে জানান দেলোয়ার হোসেন।

যানজট ও বাড়তি ভাড়ার নৈরাজ্য থাকলেও গাবতলী টার্মিনালে নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। সেখানে কোনো চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনি।

পুলিশ কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গাবতলীর সার্বিক নিরাপত্তা ভালো, কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। পুলিশ, র‍্যাব এবং বিআরটিএ-এর টিম সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছে।’

টার্মিনালে দায়িত্বরত র‍্যাব কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে র‍্যাব, পুলিশ ও ট্রাফিকের আলাদা কন্ট্রোল রুম রয়েছে। চার দিন ধরে ডিউটি করছি, কোনো অভিযোগ পাইনি।’

মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজেদের উৎসব বিসর্জন দেওয়ার কথা জানিয়ে এই র‍্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সবাই ছুটিতে বাড়ি গেলে দেশের নিরাপত্তার কী হবে? মানুষের সুরক্ষার স্বার্থেই আমাদের সবার বাড়ি যাওয়া হয় না।’

সম্পর্কিত